শ্বসন প্রশ্ন উত্তর Teacj Sanjib

 শ্বসন প্রশ্ন উত্তর Teacj Sanjib

শ্বসন-প্রশ্ন-উত্তর


 নমস্কার বন্ধুরা, আমি এই আর্টিকেলটিতে শ্বসন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করছি। এবং পরের ধাপে শ্বসন  নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর আলোচনা করছি। আর্টিকেলটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন যাতে মিস না হয়। 


 নিচের এই প্রশ্ন উত্তর গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। 


১. শ্বসন কাকে বলে?

২.শ্বসন অনুপাত কাকে বলে?

৩. শ্বসন কি ধরনের বিপাক?

৪. শ্বসন কি ধরনের প্রক্রিয়া?

৫. শ্বসন  কোথায় ঘটে 

৬. শ্বসন বস্তু কাকে বলে?

৭. শ্বসনের গুরুত্ব কি?

৮. মানুষের শ্বসন প্রক্রিয়া আলোচনা কর?

৯. শ্বসন কত প্রকার ও কি কি?

১০. সবাত শ্বসন কী?

১১. অবাত শ্বসন কি?

১২. শ্বসন প্রক্রিয়ায় কি উৎপন্ন হয়?

১৩. কোষীয় শ্বসন কি?


শ্বসন প্রশ্ন উত্তর: শ্বসন (Respiration) কী? শ্বাসপ্রশ্বাস, ফুসফুসের যত্ন এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য (বিস্তারিত গাইড)


ভূমিকা: জীবনের প্রথম এবং শেষ স্পন্দন

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, জীবন আসলে কী? আমরা যখন জন্ম নিই, আমাদের প্রথম কাজ হলো একটি দীর্ঘ শ্বাস নেওয়া। আবার যখন আমরা পৃথিবী ছেড়ে যাই, তখন শেষবারের মতো শ্বাস ত্যাগ করি। এই দুই শ্বাসের মাঝখানের সময়টাই হলো আমাদের জীবন।


আমরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০,০০০ বার শ্বাস নিই। কিন্তু আমরা কি কখনো এই চমৎকার প্রক্রিয়াটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবি? আমরা যখন ঘুমাই, হাসিখুশি থাকি বা দুশ্চিন্তায় ভুগি, আমাদের শরীর নিঃশব্দে এই কাজটি করে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় শ্বসন বা Respiration।


আজ আমরা এই অতি পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত জটিল বিষয়টি নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করব। এটি শুধু বিজ্ঞানের বইয়ের একটি অধ্যায় নয়; এটি আপনার, আমার, আমাদের সবার বেঁচে থাকার গল্প।


শ্বসন (Respiration) আসলে কী?

সাধারণ মানুষের কাছে "শ্বসন" মানে হলো নাক দিয়ে বাতাস টানা এবং ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আরও অনেক গভীর।


শ্বসন হলো এমন একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জীবদেহের কোষগুলো খাদ্য ভেঙে শক্তি উৎপাদন করে। সহজ কথায়, আপনি যে খাবার খান, তা সরাসরি আপনাকে শক্তি দেয় না। শ্বাস নেওয়ার সময় যে অক্সিজেন আপনার শরীরে প্রবেশ করে, তা ওই খাবারকে (গ্লুকোজ) পুড়িয়ে বা ভেঙে ATP (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) নামের এক ধরনের শক্তি তৈরি করে। এই শক্তি দিয়েই আমরা হাঁটি, কথা বলি, এমনকি চিন্তা করি।


শ্বসন প্রধানত দুই প্রকার:

শ্বসন প্রক্রিয়াটি অক্সিজেনের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত।


১. সবাধ শ্বসন (Aerobic Respiration):

এই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। মানুষ, পশু-পাখি এবং বেশিরভাগ উদ্ভিদে এই ধরনের শ্বসন ঘটে। এখানে গ্লুকোজ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে প্রচুর পরিমাণে শক্তি (৩৮ অণু ATP) উৎপন্ন করে।


২. অবাধ শ্বসন (Anaerobic Respiration):

এই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের কোনো দরকার হয় না। কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট (Yeast) এবং পরজীবী প্রাণীর মধ্যে এটি দেখা যায়। অনেক সময় আমরা যখন খুব ভারী ব্যায়াম করি, তখন আমাদের পেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। তখন আমাদের পেশিতেও সাময়িকভাবে অবাধ শ্বসন হয়, যার ফলে ল্যাকটিক এসিড তৈরি হয় এবং আমরা পেশিতে ব্যথা অনুভব করি।


মানুষের শ্বাসতন্ত্র কীভাবে কাজ করে?

আমাদের শ্বাসতন্ত্র একটি অত্যাধুনিক যন্ত্রের মতো। আসুন ধাপে ধাপে দেখি এটি কীভাবে কাজ করে:


নাক ও নাসাগহ্বর: আমরা প্রথমে নাক দিয়ে বাতাস গ্রহণ করি। নাকের ভেতরের ছোট ছোট লোম এবং মিউকাস বাতাসের ধুলোবালি আটকে দেয়। বাতাসকে একটু গরম ও আর্দ্র করে ফুসফুসের উপযোগী করে তোলে।


ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালী: এটি একটি পাইপের মতো অংশ, যা বাতাসকে ফুসফুসের দিকে নিয়ে যায়।


ব্রঙ্কাস ও ব্রঙ্কিওল: শ্বাসনালী দুটি ভাগে ভাগ হয়ে ডান ও বাম ফুসফুসে প্রবেশ করে। এদের ব্রঙ্কাস বলে। এগুলো আবার গাছের ডালপালার মতো অসংখ্য ছোট ছোট নালীতে ভাগ হয়, যাদের ব্রঙ্কিওল বলে।


অ্যালভিওলাই (Alveoli): ব্রঙ্কিওলের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকে আঙুরের থোকার মতো ছোট ছোট বায়োথলি। এদের অ্যালভিওলাই বলে। এখানেই আসল ম্যাজিক ঘটে!


অ্যালভিওলাইয়ের গায়ে অসংখ্য রক্তজালক থাকে। বাতাস থেকে অক্সিজেন রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্তের ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড অ্যালভিওলাইয়ে ফিরে আসে, যা আমরা শ্বাস ছাড়ার সময় বের করে দিই।


অবাক করা কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পরিসংখ্যান

আমি বিজ্ঞানের এই দিকগুলো নিয়ে পড়তে খুব পছন্দ করি। কিছু তথ্য সত্যিই অবাক করার মতো:


বিশাল পৃষ্ঠতল: আপনার ফুসফুসে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি অ্যালভিওলাই আছে। যদি এই অ্যালভিওলাইগুলোকে চ্যাপ্টা করে বিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে এটি প্রায় একটি টেনিস কোর্টের সমান জায়গা দখল করবে!


শ্বাস-প্রশ্বাসের হার: একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষ প্রতি মিনিটে ১২ থেকে ২০ বার শ্বাস নেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি।


ফুসফুসের ক্ষমতা: আমাদের ফুসফুস একসঙ্গে প্রায় ৬ লিটার বাতাস ধারণ করতে পারে। কিন্তু সাধারণ শ্বাস-প্রশ্বাসে আমরা মাত্র আধা লিটার বাতাস ব্যবহার করি।


দূষণের ভয়াবহতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯% মানুষ দূষিত বায়ু গ্রহণ করছে। এটি আমাদের ফুসফুসের জন্য এক বিশাল হুমকি।


আমার দৃষ্টিকোণ: বিশ্লেষণ ও শ্বসনের ভবিষ্যৎ

একজন মানুষ  হিসেবে আমি যখন বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকাই, তখন একটু ভয়ই লাগে। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, তা দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে। কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির গ্যাস এবং ধূলিকণার কারণে পিএম ২.৫ (PM 2.5) এর মাত্রা বিপজ্জনক হারে বাড়ছে।


কেন এই বিষয়টি এখন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কোভিড-১৯ মহামারী আমাদের শিখিয়েছে যে, একটি সুস্থ ফুসফুস কতটা মূল্যবান। ভাইরাসটি সরাসরি আমাদের শ্বসনতন্ত্রে আক্রমণ করেছিল। এরপর থেকে মানুষের মধ্যে ফুসফুসের যত্ন নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। হাঁপানি (Asthma), সিওপিডি (COPD) এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো রোগগুলো এখন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে।


ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে শ্বসনতন্ত্রের চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।


ন্যানো-রোবট: হয়তো এমন দিন আসবে যখন রক্তের মধ্যে ছোট ছোট ন্যানো-রোবট ছেড়ে দেওয়া হবে, যা ফুসফুসের অ্যালভিওলাই পরিষ্কার করবে।


আর্টিফিশিয়াল লাংস (কৃত্রিম ফুসফুস): ৩ডি বায়োপ্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে ল্যাবে কৃত্রিম ফুসফুস তৈরি করার কাজ চলছে। এটি সফল হলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হবে।


স্মার্ট পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি: স্মার্টওয়াচগুলো ইতিমধ্যে রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা (SpO2) মাপতে পারে। ভবিষ্যতে এগুলো হয়তো হাঁপানির আক্রমণ হওয়ার আগেই আমাদের সতর্ক করে দেবে।


আপনার ফুসফুস সুস্থ রাখার জন্য ব্যক্তিগত পরামর্শ

আমি চাই আপনি এবং আপনার পরিবারের সবাই সুস্থ থাকুন। ফুসফুস ভালো রাখার জন্য প্রতিদিনের জীবনে কিছু ছোট পরিবর্তন আনতে পারেন:


নিয়মিত ব্যায়াম করুন: দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানোর মতো কার্ডিও ব্যায়াম ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়।


প্রাণায়াম বা ডিপ ব্রিদিং: প্রতিদিন সকালে ৫-১০ মিনিট গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করুন। এটি ফুসফুসের প্রতিটি কোণায় অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।


ধূমপান থেকে দূরে থাকুন: এটি ফুসফুসের সবচেয়ে বড় শত্রু। প্যাসিভ স্মোকিং (অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া গ্রহণ) থেকেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন।


ইনডোর প্ল্যান্টস লাগান: ঘরে স্নেক প্ল্যান্ট বা অ্যালোভেরার মতো গাছ রাখুন। এগুলো ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখে।


মাস্ক ব্যবহার করুন: অতিরিক্ত ধুলোবালি বা দূষিত এলাকায় যাওয়ার সময় অবশ্যই ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার করবেন।


আরও জানুন (High Authority External Link)

বায়ু দূষণ কীভাবে আমাদের শ্বসনতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এর থেকে বাঁচার উপায় কী, সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এই অফিসিয়াল গাইডলাইনটি পড়তে পারেন:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) - বায়ু দূষণ ও স্বাস্থ্য প্রভাব (এটি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং Do-follow রেফারেন্স লিঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন আপনার ওয়েবসাইটের জন্য)।


উপসংহার ও কল টু অ্যাকশন (Call to Action)

শ্বসন শুধু একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়; এটি প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। আমাদের প্রতিটি শ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা জীবিত। তাই এই মহামূল্যবান ফুসফুসের যত্ন নেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।


আপনার জন্য একটি প্রশ্ন: আপনি আপনার ফুসফুস সুস্থ রাখার জন্য প্রতিদিন কী ধরনের নিয়ম মেনে চলেন? আপনি কি সকালে যোগব্যায়াম করেন, নাকি দূষণ থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করেন? আপনার মতামত এবং অভিজ্ঞতা নিচে কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন। আপনার একটি ভালো অভ্যাস হয়তো অন্য কাউকে অনুপ্রাণিত করতে পারে!


লেখাটি ভালো লাগলে এবং তথ্যবহুল মনে হলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।


ডিসক্লেইমার (Disclaimer): এই আর্টিকেলে প্রদত্ত তথ্যগুলো সম্পূর্ণ শিক্ষামূলক এবং সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা ফুসফুস সংক্রান্ত যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের (Pulmonologist) পরামর্শ গ্রহণ করুন।

 শ্বসন প্রশ্ন উত্তর: দ্বিতীয় ধাপে উপরে দেওয়া শাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তরগুলি আলোচনা করলাম। 

শ্বসন (Respiration) জীববিদ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আপনার দেওয়া প্রশ্নগুলোর তথ্যসমৃদ্ধ ও নির্ভুল উত্তর নিচে আলোচনা করা হলো:

১. শ্বসন কাকে বলে?

যে জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোষস্থ খাদ্য (প্রধানত গ্লুকোজ) অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বা অনুপস্থিতিতে উৎসেচকের সহায়তায় জারিত হয়ে শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে এবং উপজাত বস্তু হিসেবে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জল নির্গত হয়, তাকে শ্বসন বলে।

২. শ্বসন অনুপাত (Respiratory Quotient - RQ) কাকে বলে?

শ্বসন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO_2) এবং গৃহীত অক্সিজেনের (O_2) আয়তনের অনুপাতকে শ্বসন অনুপাত বা RQ বলে।

> সূত্র: RQ = \frac{\text{নির্গত } CO_2 \text{ এর আয়তন}}{\text{গৃহীত } O_2 \text{ এর আয়তন}}

৩. শ্বসন কি ধরনের বিপাক?

শ্বসন একটি অপচিতি বিপাক (Catabolic Metabolism)। কারণ এই প্রক্রিয়ায় জটিল খাদ্যবস্তু ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত হয় এবং জীবদেহের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়।

৪. শ্বসন কি ধরনের প্রক্রিয়া?

শ্বসন একটি জৈব-রাসায়নিক (Bio-chemical) এবং শক্তির মুক্তি ঘটানোর প্রক্রিয়া। এটি একটি জারণ প্রক্রিয়া যেখানে খাদ্যের স্থৈতিক শক্তি গতিশক্তি বা তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

৫. শ্বসন কোথায় ঘটে?

শ্বসন প্রতিটি জীবন্ত কোষে ঘটে। কোশীয় অঙ্গাণু হিসেবে এটি প্রধানত সাইটোপ্লাজম (গ্লাইকোলাইসিস পর্যায়) এবং মাইটোকনড্রিয়া (ক্রেবস চক্র পর্যায়)-তে সম্পন্ন হয়।

৬. শ্বসন বস্তু কাকে বলে?

শ্বসন প্রক্রিয়ায় যেসব জৈব যৌগ (যেমন— শর্করা, প্রোটিন বা ফ্যাট) জারিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, তাদের শ্বসন বস্তু (Respiratory Substrate) বলে। গ্লুকোজ হলো প্রধান শ্বসন বস্তু।

৭. শ্বসনের গুরুত্ব কী?

 * শক্তি উৎপাদন: জীবের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি (ATP) এই প্রক্রিয়া থেকেই আসে।

 * গ্যাসের ভারসাম্য: পরিবেশে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।

 * বিপাকীয় কাজ: চলন, রেচন, জনন ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় কাজ সম্পন্ন করতে শক্তি যোগায়।

৮. মানুষের শ্বসন প্রক্রিয়া

মানুষের শ্বসন প্রক্রিয়া দুটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত:

 * বহিঃশ্বসন (External Respiration): ফুসফুসের মাধ্যমে পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ (প্রশ্বাস) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বর্জন (নিঃশ্বাস)।

 * অন্তঃশ্বসন (Internal Respiration): রক্ত ও দেহকোষের মধ্যে গ্যাসের বিনিময় এবং কোষের ভেতরে খাদ্যের জারণ।

৯. শ্বসন কত প্রকার ও কী কী?

শ্বসন প্রধানত তিন প্রকার:

 * সবাত শ্বসন: অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ঘটে।

 * অবাত শ্বসন: মুক্ত অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে ঘটে (অজৈব অক্সাইডের সাহায্যে)।

 * সন্ধান (Fermentation): অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে অসম্পূর্ণ জারণ।

১০. সবাত শ্বসন কী?

যে শ্বসন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন (O_2)-এর উপস্থিতিতে শ্বসন বস্তু (গ্লুকোজ) সম্পূর্ণভাবে জারিত হয়ে জল, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং উচ্চ পরিমাণে শক্তি (৩৮ অণু ATP) উৎপন্ন করে, তাকে সবাত শ্বসন বলে।

১১. অবাত শ্বসন কী?

যে শ্বসন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে কোনো অজৈব অক্সাইড (যেমন— নাইট্রেট, সালফেট)-এর সাহায্যে খাদ্য আংশিক জারিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, তাকে অবাত শ্বসন বলে। এটি সাধারণত কিছু ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর দেহে ঘটে।

১২. শ্বসন প্রক্রিয়ায় কী উৎপন্ন হয়?

শ্বসন প্রক্রিয়ার শেষে প্রধানত শক্তি (ATP), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO_2) এবং জল (H_2O) উৎপন্ন হয়। এছাড়াও উপজাত হিসেবে তাপশক্তি নির্গত হয়।

১৩. কোষীয় শ্বসন কী?

কোষের অভ্যন্তরে (সাইটোপ্লাজম ও মাইটোকনড্রিয়া) খাদ্যের জারণ ঘটিয়ে রাসায়নিক শক্তিকে ATP অণুর মধ্যে আবদ্ধ করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকেই কোষীয় শ্বসন (Cellular Respiration) বলা হয়।

সবাত শ্বসন ও অবাত শ্বসনের পার্থক্য

বৈশিষ্ট্য

সবাত শ্বসন (Aerobic)

অবাত শ্বসন (Anaerobic)

অক্সিজেনের প্রয়োজন

মুক্ত অক্সিজেনের (O_2) উপস্থিতি আবশ্যিক।

মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না।

স্থান

সাইটোপ্লাজম ও মাইটোকনড্রিয়া—উভয় স্থানে ঘটে।

শুধুমাত্র কোষের সাইটোপ্লাজমে ঘটে।

শ্বসন বস্তুর জারণ

গ্লুকোজ সম্পূর্ণভাবে জারিত হয়।

গ্লুকোজ আংশিকভাবে জারিত হয়।

উৎপন্ন পদার্থ

কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO_2) ও জল (H_2_O) উৎপন্ন হয়।

CO_2 এবং বিভিন্ন অজৈব অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

শক্তির পরিমাণ

প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয় (৩৮ অণু ATP)।

খুব কম শক্তি উৎপন্ন হয় (২ অণু ATP)।

কার দেহে ঘটে

উন্নত মানের উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে ঘটে।

কিছু ব্যাকটিরিয়া ও অন্তপরজীবীর দেহে ঘটে।


সবাত শ্বসনের সমীকরণ:

C_6H_{12}O_6 + 6O_2 \rightarrow 6CO_2 + 6H_2O + 686 \ kcal}

অবাত শ্বসনের একটি উদাহরণ: নাইট্রিফাইং ব্যাকটিরিয়া (যেমন- Pseudomonas) এই পদ্ধতিতে শক্তি সংগ্রহ করে।

গ্লাইকোলাইসিস এবং ক্রেবস চক্র 

গ্লাইকোলাইসিস এবং ক্রেবস চক্র হলো কোষীয় শ্বসনের দুটি প্রধান পর্যায়। নিচে এদের বিস্তারিত এবং সহজ আলোচনা দেওয়া হলো:

১. গ্লাইকোলাইসিস (Glycolysis)


এটি কোষীয় শ্বসনের প্রথম পর্যায়, যা কোষের সাইটোপ্লাজমে ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় এক অণু গ্লুকোজ ভেঙে দুই অণু পাইরুভিক অ্যাসিড তৈরি হয়।
 * বিবরণ: এই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না, তাই এটি সবাত ও অবাত—উভয় শ্বসনেরই সাধারণ পর্যায়। একে EMP পথ (Embden-Meyerhof-Parnas pathway) বলা হয়।
 * উৎপন্ন পদার্থ: ২ অণু পাইরুভিক অ্যাসিড, ২ অণু NADH_2 এবং মোট ৪ অণু ATP (যার মধ্যে ২ অণু খরচ হয়ে যায়, অর্থাৎ নিট লাভ ২ অণু ATP)।

২. ক্রেবস চক্র (Krebs Cycle)


এটি সবাত শ্বসনের দ্বিতীয় পর্যায়, যা কোষের মাইটোকনড্রিয়ার ম্যাট্রিক্সে (Matrix) ঘটে। বিজ্ঞানী স্যার হ্যান্স ক্রেবস এটি আবিষ্কার করেন বলে একে ক্রেবস চক্র বলা হয়।
 * বিবরণ: গ্লাইকোলাইসিসে উৎপন্ন পাইরুভিক অ্যাসিড প্রথমে 'অ্যাসিটাইল কো-এ' (Acetyl Co-A)-তে রূপান্তরিত হয় এবং চক্রে প্রবেশ করে। এই চক্রের প্রথম উৎপন্ন স্থায়ী যৌগটি হলো সাইট্রিক অ্যাসিড (৬ কার্বন বিশিষ্ট), তাই একে সাইট্রিক অ্যাসিড চক্র বা TCA চক্র (Tricarboxylic Acid Cycle) বলা হয়।
 * উৎপন্ন পদার্থ: এই চক্রে প্রচুর পরিমাণে H^+ আয়ন মুক্ত হয় যা NAD^+ এবং FAD-কে বিজারিত করে NADH_2 এবং FADH_2 তৈরি করে। এছাড়া CO_2 এবং সামান্য ATP (GTP হিসেবে) উৎপন্ন হয়।

৩. গ্লাইকোলাইসিস ও ক্রেবস চক্রের তুলনা


বৈশিষ্ট্য

গ্লাইকোলাইসিস

ক্রেবস চক্র

স্থান

কোষের সাইটোপ্লাজম।

মাইটোকনড্রিয়ার অভ্যন্তরে।

প্রকৃতি

রৈখিক পথ (Linear)।

চক্রাকার পথ (Cyclic)।

অক্সিজেন

প্রত্যক্ষভাবে প্রয়োজন নেই।

অক্সিজেন পরোক্ষভাবে যুক্ত।

অন্য নাম

EMP পথ।

সাইট্রিক অ্যাসিড চক্র বা TCA চক্র।

শক্তি উৎপাদন

নিট ২ অণু ATP উৎপন্ন হয়।

তুলনামূলক বেশি শক্তি বাহক (NADH_2, FADH_2) তৈরি হয়।


৪. গাণিতিক হিসাব: কেন মাইটোকনড্রিয়াকে 'শক্তির ঘর' বলে?


গ্লাইকোলাইসিস এবং ক্রেবস চক্রে উৎপন্ন NADH_2 এবং FADH_2 যখন মাইটোকনড্রিয়ার অন্তঃপর্দায় অবস্থিত ইলেকট্রন পরিবহন তন্ত্রে (ETS) প্রবেশ করে, তখন প্রচুর পরিমাণে শক্তি (ATP) উৎপন্ন হয়। ১ অণু গ্লুকোজ সম্পূর্ণ জারিত হয়ে মোট ৩৮ অণু ATP তৈরি করে, যার সিংহভাগই ক্রেবস চক্রের পরবর্তী ধাপে মাইটোকনড্রিয়াতে উৎপন্ন হয়।
আপনি কি মানুষের ফুসফুসের গঠন বা গ্যাসীয় আদান-প্রদান (প্রশ্বাস-নিঃশ্বাস) সম্পর্কে কোনো ডায়াগ্রাম দেখতে চান?

শ্বসন (Respiration) - সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর

১. শ্বসন ও দহনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

শ্বসন একটি জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া যা জীবন্ত কোষে এনজাইমের উপস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটে এবং শক্তি ধাপে ধাপে মুক্ত হয়। অন্যদিকে, দহন একটি অজৈব ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়া যেখানে অক্সিজেন সরাসরি যুক্ত হয়ে দ্রুত তাপ ও আলোক শক্তি উৎপন্ন করে।

২. মাইটোকনড্রিয়াকে কেন 'কোষের শক্তিঘর' বলা হয়?

সবাত শ্বসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় 'ক্রেবস চক্র' এবং 'ইলেকট্রন পরিবহন তন্ত্র' মাইটোকনড্রিয়ার অভ্যন্তরে সম্পন্ন হয়। এখানে ১ অণু গ্লুকোজ জারিত হয়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ শক্তি (ATP) উৎপন্ন করে, যা কোষের যাবতীয় কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই একে শক্তির ঘর বলা হয়।

৩. গ্লাইকোলাইসিসকে কেন 'সাধারণ পথ' বলা হয়?

গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়াটি সবাত শ্বসন এবং অবাত শ্বসন—উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন। অক্সিজেনের উপস্থিতি থাক বা না থাক, শ্বসনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কোষের সাইটোপ্লাজমে গ্লাইকোলাইসিস অবশ্যই ঘটে। তাই একে শ্বসনের সাধারণ পথ বা EMP পথ বলে।

৪. অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে পেশিতে ব্যথা হয় কেন?

কঠোর পরিশ্রমের সময় পেশিকোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিলে সেখানে আংশিক শ্বসন বা 'ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান' ঘটে। পেশিতে এই ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ার ফলে পেশি অবসাদ বা ব্যথা অনুভব হয়।

৫. উদ্ভিদের কি রাতে শ্বসন হয়?

হ্যাঁ, শ্বসন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় ক্ষেত্রেই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ঘটে। তবে রাতে সালোকসংশ্লেষ বন্ধ থাকে বলে উদ্ভিদ তখন কেবল অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ