পশ্চিমবঙ্গের ধান পাট ও চা উৎপাদক অঞ্চল এবং অনুকূল পরিবেশ এর বিবরণ দাও

 

পশ্চিমবঙ্গের ধান উৎপাদক অঞ্চলগুলির পরিচয় দাও এবং ধান চাষের অনুকূল পরিবেশ আলােচনা করো।

■ পশ্চিমবঙ্গের ধান উৎপাদক অঞ্চল

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে ধান উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ | শার্মশান অধিকার করে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলায় ধান চাষ করা হলেও তার মধ্যে কয়েকটি জেলায় খুব বেশি পরিমানে ধান উৎপাদিত হয় এবং সেই অঞ্চলগুলিকে প্রধান ধান উৎপাদক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন

পশ্চিমবঙ্গের-ধান-পাট-ও-চা-উৎপাদক-অঞ্চল-এবং-অনুকূল-পরিবেশ-এর-বিবরণ-দাও


●প্রধান ধান উৎপাদক অঞ্চল: পশ্চিম ও পূর্ব বর্ধমান, নদিয়া, বীরভূম, হুগলি, হাওড়া, উত্তর 24 পরগনা, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মুরশিদাবাদ, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলায় প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে পূর্ব বর্ধমান জেলাকে পশ্চিমবঙ্গের ‘ধানের গােলা’ নামে অভিহিত করা হয়। এইসব জেলার প্রতি হেক্টরে 2000 কেজি বা তারও বেশি ধান উৎপাদিত হয়।

● পশ্চিমবঙ্গের অপ্রধান ধান উৎপাদক অঞ্চল: 

 দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, পুরুলিয়া, দক্ষিণ 24 পরগনা, ঝাড়গ্রাম প্রভৃতি জেলায় তুলনামূলকভাবে কম ধান উৎপাদিত হয়। জেলাগুলিতে ধানের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে 2000 কেজির কম।

পশ্চিমবঙ্গের ধান চাষের অনুকূল পরিবেশ

ধান চাষের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক উভয় পরিবেশই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

1. প্রাকৃতিক পরিবেশ : ধান চাষের উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশগুলি হল—

১. বৃষ্টিপাত : ধান চাষের প্রাথমিক অবস্থাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত প্রয়ােজন। বার্ষিক 100-200 সেমি বৃষ্টি ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত। তবে, 100 সেমির কম বৃষ্টি হলে জলসেচের প্রয়ােজন হয়।

২.উয়তা: সাধারণত বীজের অঙ্কুরােদ্গমের থেকে ধান পাকা পর্যন্ত 20 °সে-30 °সে তাপমাত্রা প্রয়ােজন।

৩.আর্দ্রতা: ধানের চারা বৃদ্ধির সময় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকা প্রয়ােজন। তবে ধান কাটার সময় শুষ্ক আবহাওয়া আদর্শ।

৪. মৃত্তিকা সাধারণত উর্বর পলিমাটি ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। এ ছাড়া উর্বর দোআঁশ, এঁটেল, বেলে মাটিতেও ধান চাষ হয়।

৫.ভূমি: গাছের গােড়ায় জলে জমে থাকলে ধান গাছের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে বলে বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকা বা বদ্বীপ অঞ্চলের নীচু সমতলভূমি ধান চাষের পক্ষে আদর্শ।

2. অপ্রাকৃতিক পরিবেশ : ধান চাষের অপ্রাকৃতিক পরিবেশগুলি হল—

১.শ্রমিক : সাধারণত ধান চাষ শ্রমনিবিড় হওয়ার কারণে অধিক জনঘনত্বপূর্ণ অঞ্চলে ধান চাষের সর্বাধিক উন্নতি লক্ষ করা যায়।

২.পরিবহণ : সাধারণত ধান চাষের বিভিন্ন প্রকার উপকরণ সংগ্রহ ও উৎপাদিত ফসল মজুত করা বা বিপণন কেন্দ্রে পাঠানাে প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধার জন্য উন্নত ও দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা প্রয়ােজন।

৩. চাহিদা: যেসব অঞলে খাদ্যশস্য হিসেবে ধানের চাহিদা বেশি, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই ধান চাষও দ্রুত প্রসার লাভ করে।

■ পশ্চিমবঙ্গের পাট উৎপাদক অঞ্চলগুলির নাম উল্লেখ করাে এবং পাট চাষের অনুকুল পরিবেশগুলি লেখাে।

●পশ্চিমবঙ্গের পাট উৎপাদক অঞ্চল

পাট হল পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম অর্থকরী ফসল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসমূহের মধ্যে পাট উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষস্থান অধিকার করে।

প্রধান পাট উৎপাদক অঞ্চল :
উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এবং পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল ছাড়া রাজ্যের অবশিষ্ট অংশে পাট চাষ করা হলেও তার মধ্যে কয়েকটি জেলায় খুব বেশি পরিমাণে পাট উৎপাদিত হয়। এই অলগুলিকে পাটের প্রধান উৎপাদক অল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যেমন—নদিয়া, মুরশিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি—এই জেলাগুলিতে সর্বাধিক পাটের উৎপাদন হয়। প্রকৃতপক্ষে, ভাগীরথী-হুগলি নদীর উভয়পার্শ্বের উর্বর পলিমাটি এবং পরিমিত উয়তা ও বৃষ্টিপাত এইসব জেলাগুলিতে পাট চাষের উন্নতিতে বিশেষ সহায়তা করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের অপ্রধান পাট উৎপাদক অঞ্চল : 

 কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমান প্রভৃতি জেলায় তুলনামূলকভাবে কম পাট উৎপাদিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের পাট চাষের অনুকূল পরিবেশ

1. প্রাকৃতিক পরিবেশ : পাট চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশগুলি হল—

১. উষ্ণতা : পাট হল ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞলের ফসল। সাধারণত 22 °সে-35 °সে উয়তা পাট চাষের পক্ষে অনুকূল। মেঘ ও রৌদ্রের ক্ষণপরিবর্তনশীল আবহাওয়া পাট চাষের পক্ষে উপযােগী।

২. আদ্রত। পাট চায়ের জন্য দৈনিক প্রায় 57%97% আর্দ্রতা থাকা দরকার।

৩. বৃষ্টিপাত : 100-200 সেমি বৃষ্টিপাতযুক্ত স্থানে পাট চাষ ভালো হয়। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ 100 সেমির কম হলে পাট চাষ ব্যহত হয়।

৪.মৃত্তিকা : পাট চাষের জন্য উর্বর পলিমাটি বা ভারী দোআঁশ মাটি (যার, pH-এর মান প্রায় 6) প্রয়ােজন। এ ছাড়া পটাশ ও নাইট্রোজেন মিশ্রিত মাটি পাট চাষের পক্ষে উপযােগী।

৫. ভূমির অবস্থা : জমির জলমগ্ন অবস্থা পাট চাষের ক্ষতি করে। ফলে সমতল, জলমগ্নহীন নবীন প্লাবনভূমি বা বদ্বীপ পাট চাষের পক্ষে উপযুক্ত।

৬. জলাশয় : পাটক্ষেতের কাছাকাছি জলাশয় থাকা দরকার। কারণ পাট গাছ কেটে কিছুদিন জলাশয়ে ভিজিয়ে রাখলে তবেই কাণ্ড থেকে তন্তু ছাড়ানাে যায়।

2. অপ্রাকৃতিক পরিবেশ : পশ্চিমবঙ্গের পাট চাষের অপ্রাকৃতিক পরিবেশগুলি হল—

১.শ্রমিক : জমিকে আগাছামুক্ত করা, সার ও কীটনাশক প্রয়ােগ করা, পাটের থেকে আঁশ সংগ্রহ করা প্রভৃতি কাজের জন্য শ্রমিকের প্রয়ােজন হয়।

২. সার : নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ফসফরাস প্রভৃতি সারের সুষম প্রয়ােগে পাট চাষ ভালাে হয়।

৩. পরিকাঠামাে : পাট একটি অর্থকরী বাণিজ্যিক ফসল হওয়ার জন্য পাট উৎপাদন ক্ষেত্র ও পাট শিল্পকেন্দ্রগুলির মধ্যে পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত হওয়া প্রয়ােজন।

৪. অন্যান্য বিষয় : এ ছাড়া, পাটের চাহিদা বা বাজার থাকলে পাট চাষের বিস্তার ঘটে। অবশ্য পাট পচনশীল পরিবেশমিত্র তন্তু হওয়ায় বর্তমানে পাটের চাহিদা অনেক বেশি, যা পাট চাষের বিস্তারে বিশেষ সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

■ পশ্চিমবঙ্গের চা উৎপাদক অঞ্চলগুলি উল্লেখ করাে এবং চা চাষের অনুকূল পরিবেশগুলি লেখাে।

পশ্চিমবঙ্গের চা উৎপাদক অঞ্চল

চা হল একটি মৃদু উত্তেজক পানীয় এবং একই সাথে অর্থকরী ও বাণিজ্যিক ফসল। প্রধানত ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় বলয়ের মৌসুমি জলবায়ু অধ্যুষিত বৃষ্টিবহুল পাহাড়ের ঢালে বা পাদদেশভূমিতে চা বাগিচাগুলি গড়ে উঠেছে। চা উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ভারতে দ্বিতীয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান প্রধান চা উৎপাদক অঞ্চল :
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান চা উৎপাদক অঞ্চলটি দার্জিলিং-কালিম্পং জেলায় গড়ে উঠেছে। এখানকার 90 মিটার-2000 মিটার উচ্চতায় পর্বতের ঢালে ধাপ কেটে চায়ের চাষ হয়। এর মধ্যে দার্জিলিঙের চা স্বাদ ও গন্ধে সর্বোৎকৃষ্ট। এখানকার প্রধান চা বাগিচা (Tea estate)-গুলি হল—সামশিং, হ্যাপিভ্যালি, মকাইবাড়ি, কার্সিয়াং, সুখিয়াপােখরি, তিনধরিয়া, গিদ্দা পাহাড়, রােহিণী, আমবুটিয়া, হিলটন প্রভৃতি। এর মধ্যে সামশি পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম চা বাগিচা।

পশ্চিমবঙ্গের অপ্রধান চা উৎপাদক অঞ্চল: 

তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার প্রভৃতি জেলায় বেশ কিছু চা বাগিচা আছে। এদের মধ্যে—মাল, মেটেলি, চালসা, নাগরাকাটা, মাদারীহাট, কুমারগ্রাম, নকশালবাড়ী, জয়শ্রী, কালচিনি, বীরপাড়া, লংকাপাড়া প্রভৃতি উল্লেখযােগ্য। বর্তমানে উত্তর দিনাজপুর জেলায় কিছু স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে চা চাষ করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের চা চাষের অনুকূল পরিবেশ

চাষের অনুকূল অবস্থাগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা—

১.প্রাকৃতিক পরিবেশ : প্রাকৃতিক অবস্থাগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য বিষয়গুলি হল— : -

১. ভূপ্রকৃতি : চা চাষের জন্য ঢালু জমি দরকার যেখানে জল দাঁড়াতে পারে না। সেই কারণে পার্বত্য অঞ্চলের ঢালু জমিতে চা বাগিচাগুলি গড়ে ওঠে। তবে এখানে ভূমিক্ষয়ের সম্ভাবনাও বেশি থাকে বলে সমােন্নতি রেখা বরাবর ধাপ কেটে চাষ করা হয়।

২.জলবায়ু : চা-এর গন্ধ, বর্ণ, স্বাদ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি স্থানীয় আবহাওয়া এবং আদ্রর্তার দ্বারা প্রভাবিত। প্রকৃতপক্ষে চা চাষের জন্য অধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত উষ্ণ ও আদ্র

জলবায়ু প্রয়ােজন। 150 সেমি থেকে 200 সেমি বৃষ্টিপাত এবং বাৎসরিক গড় উয়তা 17°সে-27 °সে হলে চাষের চাষ ভালাে হয়। গ্রীষ্মকালে গড় উয়তা 27 °সে হলে তা চা চাষের পক্ষে আদর্শ। তবে তুষারপাত চা গাছের পক্ষে ক্ষতিকর।

ও মত্তিকা : চা চাষের জন্য উর্বর, অম্লধর্মী লােহা ও ম্যাঙ্গানিজ মিশ্রিত মৃত্তিকা উপযােগী। তবে সেই সঙ্গে মৃত্তিকায় পরিমাণমতাে নাইট্রোজেন, জিংক, পটাশিয়াম মেশাতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লােহা ও পটাশসমৃদ্ধ মৃত্তিকা চায়ে সুগন্ধি আনে।

2. অপ্রাকৃতিক পরিবেশ :পশ্চিমবঙ্গের চা চাষের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অপ্রাকৃতিক অবস্থাগুলি হল— :

 মূলধন : চা চাষের ক্ষেত্রে বাগিচা তৈরি করা, বাগানের পরিচর্যা, :

শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রপাতি, সার, চা প্রক্রিয়াকরণের জন্য কারখানা স্থাপন করা ইত্যাদির জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়ােজন হয়।

 শ্রমিক : চা বাগান পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিপুণভাবে চা পাতা তােলার জন্য দক্ষ শ্রমিকের প্রয়ােজন হয়। দার্জিলিং, কালিম্পং ও জলপাইগুড়ি জেলায় লেপচা, ভুটিয়া, গােখা মহিলারা এসব কাজে বিশেষ দক্ষ।

পরিবহণ : চা বাগানগুলি যেহেতু পার্বত্যভূমিতে গড়ে ওঠে, সেই কারণে চা প্রক্রিয়াকরণের পর সেগুলি বিপণন কেন্দ্রে বা বিদেশে রপ্তানি করার জন্য উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার প্রয়ােজন হয়। 

 অন্যান্য : এই সমস্ত কারণগুলি ছাড়াও চা চাষের জন্য উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, চা-এর চাহিদা, প্রশাসনিক সুযােগসুবিধা ইত্যাদি কারণগুলি চা চাষকে প্রভাবিত করে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ