History class xi

পলিসের পতনের কারণ | একাদশ শ্রেণি ইতিহাস | গ্রিসের নগররাষ্ট্রের অবক্ষয়

Table of Contents

পলিসের পতনের কারণ: প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রের অবলুপ্তি – একাদশ শ্রেণির ইতিহাস

পলিসের পতনের কারণ

পলিসের পতনের কারণ:

ভূমিকা

প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে ‘পলিস’ (Polis) বা নগররাষ্ট্রের কথা সবার আগে আসে। এথেন্স, স্পার্টা, থিবস বা করিন্থের মতো ছোট ছোট নগররাষ্ট্রগুলি ছিল গ্রীক সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এই গৌরবময় নগররাষ্ট্রগুলির পতন ঘটে এবং তাদের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা হারিয়ে যায়। একাদশ শ্রেণির ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন এই শক্তিশালী পলিসগুলি ধ্বংস হয়ে গেল? এর পেছনে কি কেবল বাইরের শত্রুর আক্রমণ দায়ী ছিল, নাকি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও ছিল?

আজকের এই প্রবন্ধে আমরা আপনার সিলেবাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোর উপর ভিত্তি করে পলিসের পতনের কারণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

১. সুযোগ্য সেনাপতির অভাব (Lack of Capable Generals)

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিসে পেরিক্লিস, থেমিস্টোক্লিস বা মিলটিয়াডিসের মতো দূরদর্শী এবং দক্ষ সমরনায়কদের দেখা গিয়েছিল। তাঁরা কেবল যুদ্ধেই দক্ষ ছিলেন না, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ।

  • নেতৃত্বের শূন্যতা: পেলোপনেসিয় যুদ্ধের (Peloponnesian War) পরবর্তী সময়ে গ্রিসে এমন কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নেতার জন্ম হয়নি যিনি সমস্ত গ্রিসকে একতাবদ্ধ করতে পারেন।
  • কৌশলগত দুর্বলতা: পরবর্তীকালের সেনাপতিরা ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং সাময়িক জয়ের দিকে বেশি নজর দিতেন। দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। স্পার্টার লাইসান্ডার বা থিবসের ইপামিনন্ডাস দক্ষ হলেও, তাঁদের মৃত্যুর পর যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে।

২. সামরিক ত্রুটি ও দুর্বলতা (Military Flaws)

পলিসগুলোর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাদের সামরিক কাঠামোর রক্ষণশীলতা এবং ত্রুটি।

  • ফালাংস (Phalanx) পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা: গ্রীকরা যুদ্ধের ক্ষেত্রে মূলত ‘ফালাংস’ পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এটি ছিল পদাতিক বাহিনীর একটি নিরেট দেওয়াল। কিন্তু সমতল ভূমি ছাড়া এই পদ্ধতি অকার্যকর ছিল। এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি এলাকায় ফালাংস ভেঙে যেত।
  • অশ্বারোহী বাহিনীর অভাব: গ্রীক পলিসগুলো পদাতিক বাহিনীর ওপর অত্যধিক জোর দিলেও অশ্বারোহী বাহিনী বা ক্যাভালরি (Cavalry) গঠনে পিছিয়ে ছিল। যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত গতিবিধি পরিবর্তনের জন্য যা অপরিহার্য ছিল।

৩. নৌ শক্তির অভাব ও অবহেলা (Lack of Naval Power)

এথেন্স ছাড়া গ্রিসের অধিকাংশ নগররাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল না।

  • স্পার্টার সীমাবদ্ধতা: স্পার্টা স্থলযুদ্ধে অপরাজেয় হলেও সমুদ্রে ছিল অত্যন্ত দুর্বল। যদিও পারস্যের সাহায্যে তারা নৌবাহিনী গঠন করেছিল, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই ছিল না।
  • বাণিজ্য ও সুরক্ষায় প্রভাব: গ্রিসের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল দ্বীপময়। নৌ শক্তি ছাড়া বাণিজ্য রক্ষা করা এবং দূরবর্তী দ্বীপগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব ছিল। নৌ শক্তির অভাবে অনেক পলিস বহিরাগত আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয় এবং খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে।

৪. নাগরিক অধিকার লোপ ও গণতন্ত্রের অবক্ষয় (Loss of Civil Rights)

পলিসগুলোর মূল শক্তি ছিল তার নাগরিকরা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই নাগরিক চেতনায় ফাটল ধরে।

  • গণতন্ত্র বনাম অলিগার্থি: এথেন্সে গণতন্ত্র প্রচলিত থাকলেও বারবার অভিজাততন্ত্র বা ‘অলিগার্থি’র (Oligarchy) উত্থান সাধারণ নাগরিকদের অধিকার খর্ব করেছিল।
  • নাগরিকত্বের সংকোচন: অনেক পলিস কঠোর নাগরিকত্ব আইন তৈরি করে। ফলে রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ অধিকারহীন হয়ে পড়ে। যখন সাধারণ মানুষ দেখল রাষ্ট্রের ওপর তাদের কোনো অধিকার নেই, তখন তারা রাষ্ট্র রক্ষার জন্য প্রাণ দিতেও কুণ্ঠিত বোধ করল। দেশপ্রেমের স্থান নিল উদাসীনতা।

৫. ক্রীতদাস প্রথা ও প্রযুক্তি বিমুখতা (Slavery and Technological Stagnation)

এটি পলিসের পতনের একটি গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ।

  • শ্রমের অমর্যাদা: গ্রীক সমাজে কায়িক শ্রমকে নিচু চোখে দেখা হতো। সমস্ত উৎপাদনমূলক কাজ—কৃষি থেকে শিল্প—সবই করত ক্রীতদাসরা (Helots/Slaves)।
  • প্রযুক্তিগত স্থবিরতা: যেহেতু ক্রীতদাসদের মাধ্যমে সস্তায় শ্রম পাওয়া যেত, তাই গ্রীকরা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা প্রযুক্তি আবিষ্কারের প্রয়োজন মনে করেনি।
  • অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব: প্রযুক্তি বিমুখতার ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। অন্যধারে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সম্পদের জোগান বাড়েনি, যা পলিসগুলোর অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়।

৬. ব্যক্তিস্বার্থ বৃদ্ধি ও দেশপ্রেমের অভাব (Rise of Self-Interest)

পলিসের স্বর্ণযুগে ‘রাষ্ট্রই সব’—এই ধারণা প্রচলিত ছিল। কিন্তু চতুর্থ শতকে এসে ‘ব্যক্তিস্বার্থ’ বড় হয়ে দাঁড়ায়।

  • সোফিস্টদের প্রভাব: সোফিস্ট দার্শনিকরা প্রচার করতে থাকেন যে, “মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি”। এই দর্শন পরোক্ষভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে উস্কে দেয়।
  • দুর্নীতি: রাজনীতিবিদ এবং সেনাপতিরা রাষ্ট্রের মঙ্গলের চেয়ে নিজেদের পকেট ভরাতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পারস্যের রাজার কাছ থেকে অর্থ বা ঘুষ গ্রহণ করে গ্রীক নেতারা নিজেদের দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিতেও দ্বিধা করেননি।

৭. বাণিজ্যিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক সংঘাত (Commercial Disputes)

গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলির মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যিক রেষারেষি ছিল প্রবল।

  • এথেন্স ও করিন্থের দ্বন্দ্ব: এথেন্স, করিন্থ, মেগারা—এই পলিসগুলোর মধ্যে বাজার দখল এবং বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল।
  • আমদানি নির্ভরতা: গ্রিসের মাটি খুব একটা উর্বর ছিল না, তাই তাদের শস্যের জন্য কৃষ্ণসাগর বা মিশরের ওপর নির্ভর করতে হতো। এই বাণিজ্য পথ দখলের লড়াই পলিসগুলোকে একে অপরের শত্রুতে পরিণত করে। একে অপরের জাহাজ লুঠ করা এবং বন্দর অবরোধ করার ফলে সামগ্রিক গ্রীক অর্থনীতি ভেঙে পড়ে।

৮. ভাড়াটে সৈনিক বা মার্সেনারিদের ওপর নির্ভরতা (Mercenary Soldiers)

জনসংখ্যার হ্রাস এবং নাগরিকদের যুদ্ধবিমুখতার কারণে পলিসগুলোকে ‘ভাড়াটে সৈন্য’ নিয়োগ করতে হতো।

  • আনুগত্যের অভাব: এই ভাড়াটে সৈন্যরা অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধ করত। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম বা ত্যাগের কোনো স্থান ছিল না। যেই পক্ষ বেশি টাকা দিত, তারা সেই পক্ষেই যোগ দিত।
  • রাষ্ট্রের বোঝা: ভাড়াটে সৈন্যদের বেতন দিতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য হয়ে যেত। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই সৈন্যরা প্রায়ই পালিয়ে যেত, যা পলিসের পতনের পথ প্রশস্ত করে।

৯. অনাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি (Increase in Non-Citizens)

প্রতিটি পলিসে ‘মেটিক’ (Metics) বা বিদেশী এবং ক্রীতদাসদের সংখ্যা নাগরিকদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল।

  • সামাজিক ভারসাম্যহীনতা: স্পার্টায় ‘হেলট’ (ভূমিদাস) এবং এথেন্সে দাসদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, বিদ্রোহের ভয় সবসময় লেগে থাকত।
  • নিরাপত্তার ঝুঁকি: রাষ্ট্রের বিপদের সময় এই বিপুল অনাগরিক জনসংখ্যা রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াত না, বরং তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকত কখন শাসকের পতন হবে। ফলে অভ্যন্তরীণ কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায়।

১০. ম্যাসিডনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ফিলিপের উত্থান (Supremacy of Macedonia)

পলিসগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উত্তর গ্রিসের ম্যাসিডন শক্তি সঞ্চয় করে। এটিই ছিল কফিনে শেষ পেরেক।

  • ফিলিপের কূটনীতি ও সমরকৌশল: ম্যাসিডনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ গ্রীক পলিসগুলোর অনৈক্যের সুযোগ নেন। তিনি উন্নত ‘ম্যাসিডোনিয়ান ফালাংস’ তৈরি করেন এবং দীর্ঘ বর্শা বা ‘সারিসা’ (Sarissa) ব্যবহার করেন, যা গ্রীকদের ছোট তরবারির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী ছিল।
  • কিয়ারোনিয়ার যুদ্ধ (৩৩৮ খ্রি:পূ:): খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৮ অব্দে কিয়ারোনিয়ার যুদ্ধে ফিলিপ এথেন্স ও থিবসের মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই পরাজয়ের মাধ্যমেই স্বাধীন পলিস ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক পতন ঘটে এবং গ্রিস ম্যাসিডনের অধীনে চলে যায়।

উপসংহার ও মূল্যায়ন

পরিশেষে বলা যায়, গ্রীক পলিসগুলোর পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের ফল। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিকরা এই অবক্ষয় লক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু তা রোধ করতে পারেননি। নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধ (যেমন পেলোপনেসিয় যুদ্ধ), ঐক্যের অভাব এবং সংকীর্ণ মনোভাব গ্রিসকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই ম্যাসিডোনিয়া গ্রীক স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করে।

পলিসের পতন আমাদের শেখায় যে, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে, যতই শক্তিশালী সভ্যতা হোক না কেন, তার পতন অনিবার্য।

 পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ (Personal Advice for Students)

প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, পরীক্ষায় এই প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করলে তোমরা বেশি নম্বর পেতে পারো:

  1. পয়েন্ট ভিত্তিক উত্তর: উপরের পয়েন্টগুলো হুবহু ব্যবহার করো। প্যারাগগ্রাফ করে লেখার চেয়ে পয়েন্ট দিয়ে লিখলে পরীক্ষক খুশি হন।
  2. ম্যাপ বা ছক: পারলে গ্রিসের একটি ছোট ম্যাপ এঁকে এথেন্স, স্পার্টা ও ম্যাসিডনের অবস্থান দেখিয়ে দিও। অথবা ফ্লো-চার্ট ব্যবহার করে কারণগুলো দেখাও।
  3. উদ্ধৃতি: ঐতিহাসিক থুকিডিডিস বা আধুনিক ঐতিহাসিকদের দু-একটি উক্তি ব্যবহার করলে উত্তরের মান বাড়ে।
  4. ভূমিকা ও উপসংহার: একটি শক্তিশালী ভূমিকা এবং নিজস্ব মতামতসহ উপসংহার অবশ্যই দেবে।
 আরও জানুন (High Authority Resources)

এই বিষয়ে আরও গভীর পড়াশোনার জন্য আপনারা নিচের লিঙ্কগুলো দেখতে পারেন (ইংরেজি রিসোর্স):

 আপনার মতামত দিন (Call to Action)

এই নোটটি কি আপনার উপকারে এসেছে? পলিসের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ আপনার কাছে কোনটি মনে হয়? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন যাতে তারাও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে। নিয়মিত শিক্ষামূলক আপডেটের জন্য আমাদের পেজটি বুকমার্ক করে রাখুন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *