প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

 প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

 

প্রতিবাদী আন্দোলনের কারণ:

প্রতিবাদী আন্দোলন :

প্রতিবাদী-আন্দোলন-এবং-জৈন-ধর্ম-ও-বৌদ্ধ-ধর্মের-মূল-কথা

 

• সূচনা 

  খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্রাম্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে যে ধর্ম বিপ্লব হয় তাকে ধর্মীয় প্রতিবাদ আন্দোলন বলা হয়। বৈদিক ধর্মের জটিলতা, আড়ম্বরতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবা হতে থাকে। ফলে বহু নতুন ধর্মমতের উদ্ভব হয়। এই যুগে তেষট্টি-টি প্রতিবাদী ধর্মের উৎখনি। ঘটে। ব্রাত্মণ্য ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক-অর্থনৈতিক যে বৈষম্য ঘটেছিল তার বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছিল – এই প্রতিবাদী আন্দোলন।

 

 • প্রতিবাদী আন্দোলনের সামাজিক কারণ ঃ 

 ভারতে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বর্ণভিত্তিক সমাজ ছিল অত্যন্ত কঠোর। জন্মভিত্তিক জাতিভেদে বিভক্ত সমাজ ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। ব্রাম্মণদের মর্যাদা ছিল সবার উপরে। শাসক সম্প্রদায় ও যােদ্ধারা ছিল ক্ষত্রিয়। এদের সামাজিক মর্যাদা ছিল ব্রাত্মণদের নীচে। ক্ষত্রিয়রা ব্রাত্মণদের আধিপত্য মেনে নিতে পারছিল না। বৈশ্যরাও ব্রাহ্মণদের প্রতি রুষ্ট ছিল। ব্রাত্মণদের অনুশাসনে বৈশ্যদের ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হত। বৈশ্যদের বেশি দিতে হত। কিন্তু তাদের সামাজিক সম্মান ছিল না। এই সব কারণে বৈশ্যরা ব্ৰায়ণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরােধিতা করতে শুরু করে এবং একটা নতুন ধর্ম চাইল যাতে তারা ব্রাহ্মণদের সমান মর্যদা ও সুযােগসুবিধা পেতে পারে। শূদ্রদের অবস্থা অত্যন্ত শােচনীয়। তারা অস্পৃশ্য ও সামাজিক মর্যাদাহীন ছিল। সামাজিক মর্যাদাহীন বৈশ্য ও শূদ্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ব্রাত্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে। এই সামাজিক অগ্নিগর্ভ অবস্থা প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের একটি প্রধান কারণ।

 

প্রতিবাদী আন্দোলন অর্থনৈতিক কারণ ঃ

  বৈদিক যুগের শেষ দিকে লােহার প্রচলন হওয়ায় কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন হয়। লােহার তৈরি কৃষি সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে কৃষি উৎপাদন বেড়ে যায়। কৃষিকার্যের জন্য গাে-সম্পদের রক্ষা ও পশুপালন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই সময় ব্রাত্মণ্য ধর্মে যাগযজ্ঞে পশুবলি বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু সম্পদ কমে যায়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে পশুহত্যা বন্ধের প্রয়ােজনীয়তা দেখা দেয়। বৈশ্য সম্প্রদায় পশুবলির বিরােধিতা করেন। তাই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে জীবে অহিংসার কথা বলা হয়েছে।

 

কৃষির উন্নতিতে কৃষি উৎপাদিত ফসল বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ধরনের শিল্পে উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃদ্ধি ঘটে। শিল্প বাণিজ্যে বৈশ্যদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। ধনবান বৈশ্যদের সামাজিক মর্যাদা ছিল না অথচ তাদের কর বেশি দিতে হত। এই পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্যরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরােধী হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণদের আরােপিত নিষেধাজ্ঞা সমুদ্রযাত্রায় ও সুদ প্রদান বৈশ্যদের ক্ষুদ্ধ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাত্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত বিক্ষোভই প্রতিবাদী আন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে। এরই পরিণতিতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাব ঘটে।

 

রাজনৈতিক কারণ : 

 ভারতের শাসকগণ বৈদিকযুগের প্রথম দিকে রাজার দৈব সত্তা ও রাজকীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়ােজনে বাধ্য হয়ে ব্রাত্মণদের আধিপত্য মেনে নিয়েছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠশতকে লৌহ নির্মিত অস্ত্রশস্ত্রাদির দ্বারা শাসক ক্ষত্রিয়রা শক্তিশালী হওয়ায় তারা ব্রাত্মণদের অধিপত্য ও ক্ষমতা খর্ব করতে সচেষ্ট হয়। বৈশ্য ও শূদ্ররা ব্রাত্মণ ও ক্ষত্রিয় শাসকদের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। পূর্বভারতের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন এই প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলনের আত্মপ্রকাশে বিশেষ সহায়তা করেছিল।

 

ধর্মীয় কারণ ঃ 

 বৈদিক যুগের শেষ দিকে ব্রাত্মণ্য ধর্মের মধ্যে নানা জটিলতা বৃদ্ধি পায়। ধর্মাচরণ আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব, ব্যয়বহুল, জটিল ক্রিয়াকর্ম ও আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের কাছে এই ধর্মাচরণ দুর্বোধ্য, অর্থশূন্য, ভক্তিহীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। যাগযজ্ঞ ও পশুবলি ধর্মানুষ্ঠানের প্রধান অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। ভক্তিভাব উপেক্ষিত হয়। পুরােহিত তন্ত্র প্রাধান্য বিস্তার করে। ফলে এই ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্ম মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় তৃপ্তি সৃষ্টি করতে পারেনি। বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস জীবন সকলের কাছে গ্রহণযােগ্য ছিল না। ব্রাত্মণদের ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় ধর্মাচরণ কুসংস্কার ও মন্ত্রতন্ত্রে ভারাক্রান্ত হয়। এই সমস্ত কারণে বৈদিক ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থাহীন হয়ে পড়ে। যাগযজ্ঞ পশুবলির বিরুদ্ধে মানুষ সােচ্চার হয়। নিম্নবর্ণের মানুষ ধর্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং নীচুশ্রেণির লােকেদের প্রতি ঘৃণা এবং তাদের ওপর অন্যায় অবিচার ও জুলুম ক্রমেই বেড়ে চলছিল। এই সব কারণে নতুন ধর্মীয় চিন্তা ও আদর্শের দিকে মানুষ অগ্রসর হয়। প্রতিবাদী 

 

প্রতিবাদী আন্দোলনের আদর্শ:

 

প্রতিবাদী আন্দোলনে বৈদিক ব্রাত্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার দুটি ধারা ছিল। একটি ধারা নাস্তিকতামূলক যা দেবদেবীর এবং ব্রাত্মণ প্রাধান্যকে অস্বীকার করেছিল। অপর ধারাটি ছিল আস্তিকতা মূলক একেশ্বরবাদী যা ভক্তিকেই প্রধান উপায় বলে মনে করত। প্রাচীন ভারতে এই দুই প্রতিক্রিয়ার ফলে বৌদ্ধ, জৈন, শৈব ও বৈষুব – এই চারটি ধর্ম সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। এই চারটি ধর্মত আধ্যাত্মিক সত্যের উৎস হিসাবে বৈদিক আচার অনুষ্ঠানের দাবীকে অস্বীকার করেছিল। এটি ছিল সার্বিক বিকল্প সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। শৈব ধর্ম সম্প্রদায় শিব এবং বৈষ্ণব ধর্ম সম্প্রদায় বিষুর পূজারী। উভয় সম্প্রদায় একেশ্বরবাদী এবং ভক্তিই তাদের সাধনার পথ। পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন তাদের সাধনার লক্ষ্য। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষেরা পবিত্রতা, ত্যাগ, সততা, অহিংসা, নৈতিকতা, প্রজ্ঞা, কর্মফল, জন্মান্তরবাদ প্রভৃতিতে বিশ্বাস করে। জৈনরা কিছু হিন্দু দেবদেবীর আরাধনা করে এবং বৌদ্ধরা ভােগবিলাস ও সন্ন্যাসের মধ্যবর্তী “মধ্যপন্থা অনুসরণ করে। উপনিষদের তত্ত্বের সঙ্গে এই চার ধর্ম সম্প্রদায়ের ধর্মমতের সাদৃশ্য রয়েছে। এই চার ধর্ম সম্প্রদায় অনুষ্ঠান সর্বস্বতা ও জাতিভেদ প্রথার বিরােধী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৈসাদৃশ্য থাকলেও শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মমতের সঙ্গে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মমতের মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে। অতএব শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম সম্প্রদায়ের সঙ্গে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম সম্প্রদায়কে একই পঙক্তিতে রাখা যায়। 

প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

জৈন ধর্মের মূল শিক্ষা ও প্রভাব |

 

সূচনা ঃ জৈনদের মতে প্রাচীনকাল থেকে চব্বিশজন তীর্থঙ্কর জৈন ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এই সকল তীর্থঙ্করদের মধ্যে বাইশ জনের কোনাে ঐতিহাসিক সন্ধান পাওয়া যায় নি। প্রথম মগধ, তীর্থঙ্কর ছিলেন ঋষভদেব এবং শেষ তীর্থঙ্কর হলেন মহাবীর। তেইশতম তীর্থঙ্কর ছিলেন পার্শ্বনাথ। মহাবীর জৈনধর্মকে প্রভাবশালী করেছিলেন। সম্ভবত ৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশালী কাছে কুন্দপুর নামক স্থানে বা কুন্দু গ্রামে এক ক্ষত্রিয় রাজবংশে মহাবীরের জন্ম হয়। তা পিতৃদত্ত নাম ছিল বর্ধমান। তাঁর পিতা জ্ঞাতৃক উপজাতির অধিপতি ছিলেন। লিচ্ছবী রাজকন ত্রিশলা ছিলেন তার মা। ত্রিশ বছর বয়সে পরম সত্যের সন্ধানে স্ত্রী কন্যাকে ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন। বারাে বছর কঠোর সাধনার পর ঋজুপালিকা নদীর তীরে সিদ্ধিলাভ করে জিন বা জিতেন্দ্রিয় বা কৈবল্য লাভ করেন। জীবনের অবশিষ্ট ত্রিশ বছর চম্পা, মিথিলা, বৈশালী, কোশল প্রভৃতি দেশে পরিভ্রমণ করে জৈন ধর্ম প্রচার করেন। ৭২ বছর বয়েসে ৪৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নালন্দার কাছে পাওয়াপুরীতে তিনি দেহত্যাগ করেন। 

 

জৈন ধর্মের নীতি ও মূল কথা :

 

পঞমহাব্রতঃ

  পার্শ্বনাথ জৈনধর্মের চারটি মূল নীতি স্থির করেছিলেন, তাকে চতুর্যাম হয়। এই চারটি নীতি হল – (১) অহিংসা, (২) সত্যবাদিতা, (৩) অচৌর্য এবং (৪) অনাসক্তি বা অপরিগ্রহ। এই চারটি নীতির সঙ্গে মহাবীর যুক্ত করেন ব্রম্মচর্য। এই পাঁচটি নীতি পঞমহাব্রত নামে পরিচিত। জৈনধর্মে পরম লক্ষ্য হল সিদ্ধশিলা অর্থাৎ আত্মার মুক্তি লাভ করা। এই আত্মার মুক্তি বা মােক্ষ লাভের দ্বারাই চিরশান্তি লাভ করা যায়। এই মুক্তি লাভের জন্য প্রয়ােজন ত্রিরত্ন অর্থাৎ সৎ জ্ঞান, সৎ বিশ্বাস ও সৎ আচরণ। জৈন ধর্মের আদর্শ কথা হল সর্বজীবে দয়া, অহিংসা, অপরিগ্রহ, কৃচ্ছসাধান ও রিপুজয়। জৈনরা যাগযজ্ঞ, জীব হত্যার বিরােধী। এরা বিশ্বাস করেন গাছ, পাথরে প্রাণ আছে। তাই তারা কঠোরভাবে অহিংসা নীতি মেনে চলে।

 

 নির্বাণ লাভ ঃ 

  যাগযজ্ঞ ও ঈশ্বরের অস্তিত্বে, জৈনরা বিশ্বাস করে না। তারা জাতিভেদ প্রথা মানে না। পূনর্জন্ম ও কর্মফলে জৈনরা বিশ্বাসী। পঞমহাব্রত ও কৃচ্ছু সাধনের মধ্য মহাবীর দিয়ে আত্মার উন্নতি সাধিত হয়। অবশেষে আত্মা পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি লাভ করে। জৈন ধর্মের শেষ লক্ষ্য নির্বাণ অর্থাৎ মানব আত্মার নির্বাণ লাভ।

প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

দিগম্বর ও শ্বেতাম্বরঃ

  মহাবীর কোনাে নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেননি। পার্শ্বনাথ যে ধর্মমত প্রচার করেছিলেন মহাবীর এর সঙ্গে একটা নতুন সূত্র ব্রম্মচর্য যােগ করেন। মহাবীর ও পার্শ্বনাথের ন্যায় জগতের সমস্ত দ্রব্যের প্রতি আসক্তিহীন ও লােভ মুক্ত হতে বলেছেন। তিনি নিজের পরিধেয় বস্ত্রের উপর আসক্তি শূন্য হয়ে দিগম্বর হয়ে থাকতেন। যারা মহাবীরের অনাসক্তির পথ অনুসরণ করে বস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন তাদের দিগম্বর বলা হত। মহাবীরের মৃত্যুর তিনশাে বছর পর স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে একটি নতুন সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। তারা দিগম্বর রীতি পরিবর্তন করে শ্বেতবস্ত্র পরিধান করতেন। তাদের শ্বেতাম্বর বলা হত। ফলে জৈনদের মধ্যে শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর নামে দুটি গােষ্ঠীর সৃষ্টি হয়।

 

জৈন ধর্মশাস্ত্র :

  জৈন ধর্মের মূল সূত্রগুলি মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে গ্রন্থাকারে জৈন ধর্মশাস্ত্র সংকলিত হয়। ভদ্রবাহু চোদ্দটি পর্বে মহাবীরের বাণী নিয়ে কল্পসূত্র নামে আদি পাশা রচনা করেন। আনুমানিক তিনশাে খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে পাটলীপুত্রে প্রথম জৈন সংগীতি বা সম্মেলনে ধর্ম শাস্ত্রকে চোদ্দটি পর্বের পরিবর্তে বারােটি পর্বে সংকলিত করা হয়। এগুলি “দ্বাদশ অঙ্গ” বলা হয়। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকে শ্বেতাম্বর জৈনরা গুজরাটের বলভীতে দ্বিতীয় জৈন সংগীতিতে পুনরায় নতুনভাবে ধর্মগ্রন্থ সংকলিত করেন। ঐ সংকলনকে জৈন সিদ্ধান্ত বলে। দিগম্বর জৈনরা পৃথক শাস্ত্রগ্রন্থ – চতুর্বেদ, পরিশিষ্ট-পার্বণ প্রভৃতি গ্রন্থ সংকলন করেন। এই সব ধর্ম গ্রন্থ প্রাকৃত ভাষায় রচিত।

 

জৈন ধর্মের প্রসার :

 বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম একই সময়ে প্রচারিত হয়েছিল। জৈনধর্মের ব্যাপক প্রসার না হলেও এই ধর্ম জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। কলিঙ্গ মগধ, চম্পা, মালব, গুজরাট, রাজস্থান, মিথিলা, কোশল প্রভৃতি স্থানে জৈন ধর্ম প্রসারিত হয়েছিল। দক্ষিণ ভারত ও বহির্ভারতে জৈন ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়নি।

 

অবদান :

 ভারতের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জৈন ধর্মের প্রভাব উল্লেখযােগ্য। (১) জৈন ধর্ম বৈদিক সমাজের বর্ণভেদ প্রথার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে সাম্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিল। (২) বৈদিক ধর্মের আচার অনুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ, পশুবলি, ব্রায়ণের শ্রেষ্ঠত্ব ও ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জৈনরা আত্মার উৎকর্ষ ও শক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছিল। (৩) জৈনরা সংস্কৃত ভাষার স্থানে সহজ সরল প্রাকৃতভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছিল। (৪) জৈনরা কঠোর অহিংসা নীতি দ্বারা পশুদের রক্ষা করে কৃষির উন্নতি ঘটায়। (৫) বণিকদের সম্পদ, ব্যবসা বাণিজ্যে ও শিল্পে ব্যয় করার “জৈন নীতি” ব্যবসা বাণিজ্য ও নগর সভ্যতাকে সমৃদ্ধি করেছিল। গৃহীরা এই ধর্মের মধ্যে বেঁচে থাকার সহজ পথ খুঁজে পায়। (৬) শিল্প ও বিজ্ঞান চর্চায় জৈনদের বিশেষ অবদান আছে।

প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

বৌদ্ধ ধর্মের মূল শিক্ষা ও প্রভাব :

 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক বুদ্ধদেব। বুদ্ধত্ব লাভের আগে তার নাম ছিল সিদ্ধার্থ বা গৌতম। নেপালের তরাই অঞলে কপিলাবস্তু নামক রাজ্যের শাক্য বংশীয় রাজা শুদ্ধোধন ছিলেন তার পিতা। সম্ভবত ৫৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশাখী পূর্ণিমার দিন সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। ষােল বছর বয়সে যশােধরার সঙ্গে সিদ্ধার্থের বিবাহ হলেও সংসার ধর্ম তাকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট সিদ্ধার্থের হৃদয় ভারাক্রান্ত করত। মানুষের দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় সন্ধানে ঊনত্রিশ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেন। এই সংসার ত্যাগ করাকে মহাভিনিষ্ক্রমণ বলা হয়। সত্যের সন্ধানে বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে তিনি গয়ার কাছে উরুবি নামক স্থানে কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হন। কঠোর সাধনার পর তিনি সম্যক জ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন। যে পিপুল গাছের নীচে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন সেটি বােধিবৃক্ষ নামে পরিচিত।

 

বুদ্ধদেব প্রথম পাঁজন সাধককে তাঁর সম্যক জ্ঞানের বাণী প্রচার করেন বারাণসীর কাছে সারনাথের মৃগদাব উপবনে। এই পাঁচজন হলেন – কৌন্ডিন্য, ভদ্রিক, অশ্বজিৎ, বাষ্প ও মহানাম। তাদের পঞভিক্ষু বলা হয়। বুদ্ধদেবের ধর্মপ্রচারকে ধর্মচক্র প্রবর্তন বলে। ধনী-দরিদ্র, স্ত্রী-পুরুষ নানা বর্ণের মানুষ তাঁর ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। জীবনের ৪৫ বছর ধর্ম প্রচার করার পর ৮০ বছর বয়সে গােরক্ষপুরের কুশিনগরে বুদ্ধদেব দেহত্যাগ করেন। তাঁর দেহত্যাগকে মহা-পরিনির্বাণ বলা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের নীতি ও মূল শিক্ষা ও

 

বৌদ্ধ ধর্মের লক্ষ্য :

  বৌদ্ধ ধর্ম সহজ, সরল এবং সকলের বােধগম্য ছিল। বুদ্ধ ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্পর্কে কিছুই বলেন নি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল মানুষের দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ের সন্ধান দেওয়া। তিনি জাতিভেদ প্রথা স্বীকার করেননি। তবে তিনি কর্মফল ও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন কর্মফলের জন্য মানুষ দুঃখ কষ্ট ভোগ করে। তিনি বলেছেন মােহ, বাসনা, লােভ ত্যাগ করলে নির্বাণ লাভ করা যায়। নির্বাণের দ্বারা পরম সত্যে উপলদ্ধি ও চির শান্তি লাভ করা সম্ভব।

প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

আর্যসত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ :

 

 তাঁর ধর্মের মূল সত্য হল – (১) জগৎ দুঃখময়, (২) আসনি কামনা বাসনা দুঃখের কারণ, (৩) দুঃখের কারণ দূর করলে দুঃখ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। (৪ এই কারণগুলি ধ্বংসের উপায় আছে। এই চারটি সত্যকে আর্যসত্য বলে। আসক্তি বিনাশের জন্য তিনি আটটি পথের কথা বলেছেন। এই গুলিকে অষ্টাঙ্গি মার্গ বলা হয়। এই গুলি হল (১) সৎ বাক্য, (২) সৎ কায় (৩) সৎ জীবন, (৪) সৎ চিন্তা, (৫) সৎ সংকল্প, (৬) স চেষ্টা, (৭) সৎ দৃষ্টি, (৮) সৎ সমাধি। তিনি পঞশীল নামে পাঁচটি আচরণ বিধি পালন করতে বলেছেন। যেমন, লােভ হিংসা, অসত্য, দুর্নীতি ও অন্যায় করা থেকে নিবৃত্ত থাকা ও অষ্টমার্গ অনুশীলন করলেই নির্বাণ লাভ করা যায়। তিনি মনে করতেন যে চরম ভােগবিলাস এবং চরম কৃচ্ছু সাধন এই দুই পথে আত্মার উন্নতি হয় না। তাই তিনি এই দুই পথের মধ্যবর্তী মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলেছেন। 

 বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থ ঃ 

 বুদ্ধদেব পালিভাষায় উপদেশ দান করতেন। বুদ্ধদেবের জীবদ্দশায় তাঁর বাণী লিপিবদ্ধ হয় নি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা রাজগৃহে এক সম্মেলন বা বৌদ্ধ সংগীতিতে মিলিত হয়ে তাঁর উপদেশ গুলিকে লিপিবদ্ধ করে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করেন। পালি ভাষায় রচিত এই ধর্ম । বুদ্ধদেব গ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। এই ত্রিপিটক হল সূত্রপিটক, বিনয় পিটক ও অভিধর্ম পিটক। সূত্র পিটকে বুদ্ধের উপদেশাবলি, বিনয় পিটকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আচরণবিধি এবং অভিধর্ম পিটকে বৌদ্ধ ধর্মের দার্শনিক তত্ত্ব সমূহ বিষয়ে আলােচনা রয়েছে। চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতিতে বৌদ্ধ ধর্মের মত বিরােধকে কেন্দ্র করে মহাযান ও হীনযান নামে দুটি সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। মহাযানরা বােধিসত্ত্ববাদে বিশ্বাস করত। হীনযানদের লক্ষ্য হল অহিংসা ও নির্বাণ লাভের চেষ্টা করা।

 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব :

 ভারতীয় সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। (১) বৌদ্ধ ধর্ম জাতিভেদ প্রথার বিরােধিতা করে সামাজিক সাম্যের বাণী প্রচার করে। (২) বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে কৃষির উন্নয়ন, সমুদ্রযাত্রা ও সুদ গ্রহণ প্রভৃতি প্রচলিত হওয়ায় ; ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় এবং নগর সভ্যতা ও নগর বাণিজ্য গড়ে ওঠে। (৩) বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসার বাণীত পশু সম্পদ রক্ষা করে। (৪) এই ধর্মের প্রভাবে শিক্ষা সংস্কৃতির উন্নতি হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলি শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। নালন্দা; বিক্রমশিলা; ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। (৫) বৈদিক সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ব্রাত্মণ্য ধর্মের আড়ম্বর বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে দূর হয় এবং যুক্তিবাদী মানসিকতার উন্মেষ ঘটে। পালি ভাষা, সমৃদ্ধ হয় ও লােক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। (৭) বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে এবং ভারতের বাইরে চীন, জাপান, সুবর্ণ দ্বীপ, সিংহল, ব্ৰহ্বদেশ, শ্যামদেশ প্রভৃতি স্থানে প্রসারিত হয় এবং ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি প্রসারিত হয়।

প্রতিবাদী আন্দোলন এবং জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের মূল কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *