কর্তার ভূত গল্পের top 3 প্রশ্ন উত্তর টেকজ সঞ্জীব

 কর্তার ভূত গল্পের top 3 প্রশ্ন উত্তর টেকজ সঞ্জীব

কর্তার-ভূত-গল্পের-top-3-প্রশ্ন-উত্তর

 

কর্তার ভূত

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কর্তার ভূত গল্পের ভুতুড়ে জেলখানার পরিচয় দাও

 

প্রশ্নঃ।। কর্তার ভূত’ ছােটোগল্প অবলম্বনে ‘ভুতুড়ে জেলখানার বর্ণনা দাও। কাদের সম্বন্ধে এবং কেন লেখক বলেছেন যে, ‘তারা ভয়ংকর সজাগ আছে?

 

 উত্তর

 

‘কর্তার ভূত’ রচনায় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন যে, ভূতের নায়েব হলেন ভূত-শাসিত কারাগারের পাহারাদার। সেই কারাগারের দেয়াল অবশ্য চোখে দেখা যায় না। এ কারণে সেখানে যেসব মানুষ বন্দি থাকে, তারা বুঝে উঠতে পারে না যে, কীভাবে সে-দেয়াল ফুটো করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। ভূতুড়ে কারাগারেও মানুষকে সাধারণ কারাগারের অপরাধীদের মতােই ঘানি ঘােরাতে হয়।তবে অবিরাম ঘুরিয়েও সেখানকার ঘানি থেকে এক ছটাক তেল বের হয় না। বরং সেই ঘানি ঘােরালে বের হয় ঘানি-ঘােরানাে মানুষের তেজ ও শক্তি। সেই শক্তি শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এদেশের মানুষ ক্রমশ ঠান্ডা অর্থাৎ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

 

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষ ‘ভূতগ্রস্ত’ অর্থাৎ সংস্কারাচ্ছন্ন না হওয়ায় সেইসব দেশে ঘানি থেকে যে তেল বের হয়, সেই তেল দিয়ে তারা তাদের দেশের রথচক্রকে সচল রাখে। অর্থাৎ তারা গঠনমূলক শ্রমের মধ্য দিয়ে তাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিপকর|তা ছাড়া, “অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে।” অর্থাৎ সেখানে ধর্মতত্ত্ব ও কুসংস্কার মাথাচাড়া দিলে সেসব দেশের মানুষ বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হয়। আর এসব কারণেই ওইসব দেশের মানুষ একেবারে নিরুদ্যম হয়ে পড়েনি বা নেতিয়ে যায়নি, “তারা ভয়ংকর সজাগ আছে।”

 

 

কর্তার ভূত ছােটোগল্পের বিষয়বস্তু

 

প্রশ্নঃ।।  ‘কর্তার ভূত’ ছােটোগল্পের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করাে। 

 

উত্তর ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ প্রবন্ধের শেষাংশে রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন- আমাদের হয়েছে। সেই সর্বাঙ্গসম্পন্ন প্রাচীন সভ্যতা বহুদিন হল পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, আমাদের বর্তমান সমাজ তারই প্রেতযােনি মাত্র”, তখনই ‘কর্তার ভূত’ কাহিনি সৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

 

 

রবীন্দ্রনাথ কর্তার রূপকের মাধ্যমে আমাদের সমাজে বিরাজমান আপাত শান্তির আড়ালে যে স্থবিরত্ব, মানসিক জড়তা ও দুর্বলতা, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতা আছে, সেটিকেই তুলে ধরেছেন। প্রাচীন বিশ্বাসরূপ ভূতের কাছে যাবতীয় চিন্তাচেতনা বন্ধক রেখে ক্রমশ এক নিপ্রাণ সমাজ গড়ে উঠেছে। কিন্তু সে সমাজ তাে পৃথিবী থেকে আলাদা নয়। অন্যান্য দেশের সমাজের মধ্যে যে গতিময়তা রয়েছে, তারজন্যই সেখানে নতুন চেতনার ঔজ্জ্বল্য দেখা যায়। তাদের তুলনায় নিজেদের সমাজের বদ্ধরূপ স্বাভাবিকভাবেই কয়েকজনের মনে আন্দোলন জাগায়।‘কর্তার ভূত’ রচনার চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে প্রচলিত ছড়ার মােড়কে এই প্রশ্নগুলিকেই তুলে ধরা হয়েছে।

 

কর্তার ভূত গল্পের সারাংশ

 

অতীতের সংস্কারকে আঁকড়ে ধরা, অভিশপ্ত এদেশের সমাজচিত্রই এ রচনার বিষয়বস্তু। তবে, রচনার বিষয়কে প্রকাশ করতে লেখক গল্প বলার এক বিশেষ ভঙ্গিকে গ্রহণ করেছেন। তবে, বক্তব্য প্রাধান্য পেলেও ‘কর্তার ভূত’ ‘প্যারাবল’ বা নীতি গল্প নয়। একেরূপক ব্যঙ্গবারূপকধর্মী ছােটোগল্পই বলা সংগত।

 

প্রশ্নঃ।। কর্তার ভূত রচনাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।

 

কর্তার ভূত গল্পের নামকরণের সার্থকতা

 

নামকরণ

 

সাধারণত বিষয়বস্তু, স্থান-কাল, চরিত্র এবং ব্যঞ্জনার দিকে লক্ষ রেখেই সাহিত্যে নামকরণ করা হয়। কোনাে রচনার নাম শুধু রচনাটিকে চিহ্নিত করার উপায়মাত্র নয়। এটি পাঠকের কাছে রচনাটিতে প্রবেশের একমাত্র চাবিকাঠি, তাই সাহিত্যরচনায় নামকরণের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘লিপিকা’ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘কর্তার ভূত’ আসলে একটি রূপকধর্মী ছছাটোগল্প। এই গল্পে রূপকের আড়ালে প্রাচীন সভ্যতার অন্ধকুসংস্কারের কারাগারে বন্দি থাকা ভারতবাসীর মৃতপ্রায় অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে।বুড়ােকর্তার মৃত্যুকালে ভারতবাসী অভিভাবকহীন হয়ে পড়ার ভয় অনুভব করলে দেবতার দয়ায় বুড়ােকর্তা প্রেত হয়ে তাদের ছত্রছায়া হয়ে রইলেন। ফলে তাদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের সুরাহা না হলেও, তারা শান্তিতে রইল। দু-একজন মানুষ মৌলিক চিন্তায় ভাবিত হলে তাদের কপালে জুটল ‘ভূতের কানমলা’ অর্থাৎ শাস্তি। কিন্তু অন্ধের মতাে কর্তার ভূতকে অনুসরণ করে চলা সাধারণ দেশবাসী এই ঘটনায় গর্ব অনুভব করল। ভূতুড়ে জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না বলে, সেই কারাগার থেকে বেরােনাের উপায়ও কারাের জানা নেই। আর এই জেলখানার ঘানি ঘােরালে শুধু মানুষের তেজ বের হয়। তাই ভূতুড়ে জেলখানার কয়েদিরা ঠান্ডা থাকে, শান্তিতে থাকে মৌলিক চিন্তাশীল ব্যক্তিরা অন্য কথা বললে কর্তার ভূতের সহযােগী শিরােমণি চূড়ামণির দল দেশবাসীকে জানায় যে, “বেহুঁশ যারা তারাই পবিত্র, হুঁশিয়ার যারা তারাই অশুচি।” দেশবাসী এতে আশ্বস্ত হলেও নবীনের দল যখন প্রশ্ন তােলে, “ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চলবে”, তখন ভূতের নায়েব রেগে গিয়ে ভয় দেখিয়ে বলে, “চুপ | এখনাে ঘানি অচল হয় নি। দেশের কয়েকজন বুড়ােকর্তার ভূতের কাছে মুক্তির আবেদন করলে তিনি জানান যে, “…তােরা ছাড়লেই আমার ছাড়া।” এ কথা শুনে তারা জানায় যে, ভূতুড়ে বুড়ােকর্তার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হতে তারা ভয় পায়। বুড়ােকর্তার ভূত তখন বলেন, “সেইখানেই তাে ভূত৷” এই হল গল্পটির বিষয়বস্তু।

 

এইভাবে ‘কর্তার ভূত’ রচনাটিতে লেখক ‘কর্তা’ তথা প্রাচীন সভ্যতার ‘ভূত’ তথা অন্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্নতার কথা আলােচনা করেছেন। এ গল্পে ‘দেশবাসী অর্থাৎ ভারতবাসীর মানসিক অবস্থার বর্ণনাও আমরা পাই।

 

কর্তার ভূত

 

কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভূতগ্রস্ত দেশবাসী প্রচলিত শাসনতন্ত্রের স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারে না কোনােভাবেই। যাই হােক, ‘কর্তার ভূত’, ছােটোগল্পে বুড়ােকর্তাকে কেন্দ্র করেই সমগ্র গল্পটি আবর্তিত হয়েছে এবং তিনিই সমগ্র গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

কর্তার ভূত গল্পের top 3 প্রশ্ন উত্তর

অতএব এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, কর্তার ভূত’—এই রূপকধর্মী ছােটোগল্পের নামকরণটি অবশ্যই শিল্পসম্মত এবং সার্থক হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *