আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার উদ্দেশ্য গঠন ভুমিকা ও কার্যাবলি Teacj Sanjib

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার উদ্দেশ্য গঠন ভুমিকা ও কার্যাবলি Teacj Sanjib

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার

আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার (International Monetary Fund— IMF)

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার:

আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার হোল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ উদ্দেশ্যসাধক সংস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় বিশ্বের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমস্যাবলী সমাধানের উপায় অন্বেষণের উদ্দেশে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উড্‌ড্সে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহৃত হয়। ঐ সম্মেলনের আহ্বায়ক ছিলেন তদানীন্তন মার্কিন বাণিজ্য সচিব হেনরী মর্গেনথাউ (Henry Morgenthau)। ঐ সম্মেলনে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধি যোগদান করেন।
অনেক আলাপ-আলোচনার পর সমবেত প্রতিনিধিবৃন্দ আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার নামে একটি সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং ২২শে জুলাই চুক্তির শর্তাবলী ( Articles of Agreement) চূড়ান্ত করা হয়। ১৯৪৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর ২৯টি দেশ আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের চুক্তির শর্তাবলী বা সনদ (Charter)-এ স্বাক্ষর করলে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের

সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের একটি চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১লা মার্চ সাধারণ সভা সেই চুক্তি অনুমোদন করলে তা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যসাধক সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করে। আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের প্রধান কার্যালয় ওয়াশিংটনে অবস্থিত। বর্তমানে (নভেম্বর, ২০০০) এর সদস্যসংখ্যা হোল ১৮২। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশ আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের সদস্যপদ গ্রহণ করেনি।

আন্তর্জাতিক-অর্থভাণ্ডার-উদ্দেশ্য-গঠন-ভুমিকা-ও-কার্যাবলি-Teacj-Sanjib

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এর উদ্দেশ্য (Purposes) :

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার

ব্রেটন উড্স চুক্তির (যা Articles of Agreement বা Charter নামে পরিচিত) ১ নং ধারায় আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের কতকগুলি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। এইসব উদ্দেশ্য হোল :

[১] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের মতো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার প্রসার ঘটানো ;

[২] আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও ভারসাম্যমূলক বিকাশসাধন ;

[৩] সর্বাধিক কর্মসংস্থানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধিতে সহায়তাদান ;

[৪] সদস্য রাষ্ট্রগুলির উৎপাদনশীল সম্পদ (productive resources)-এর বিকাশসাধন ; [৫] বিনিময় ব্যবস্থার সুস্থিতকরণ ;

[৬] সদস্য-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সুশৃঙ্খল বিনিময় ব্যবস্থা (orderly exchange arrangements)-র প্রবর্তন ;

[৭] বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যহ্রাস (competitive exchange depreciation) বর্জন ;

[৮] সদস্য-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি বহুমুখী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তাদান ;

[৯] বিশ্ব-বাণিজ্যের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার উদ্দেশে বৈদেশিক বিনিময়ের ওপর থেকে বাধা-নিষেধ প্রত্যাহারে সাহায্যদান; এবং

[১০] সদস্য রাষ্ট্রগুলির বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশে যথেষ্ট রক্ষাকবচ-সহ সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে ঋণ প্রদান।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার গঠন

● সাংগঠনিক কাঠামো (Organizational Structure) :

ব্রেটন উড্স চুক্তির ১২ নং ধারাতে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ঐ ধারা অনুসারে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের সাংগঠনিক কাঠামো
[i] গভর্নরপর্ষদ (Board of Governors), [ii] কার্যনির্বাহী পরিচালক পর্ষদ (Board of Executive Directors), [iii] প্রধান পরিচালক (Managing Directors) এবং [iv] একটি সচিবালয় (Secretariat)-কে নিয়ে গঠিত হয়।
গভর্নর-পর্ষদে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র ১ জন ক’রে গভর্নর নিয়োগ করে। এই পর্ষদই হোল অর্থ-ভাণ্ডারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। অর্থ-ভাণ্ডারের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব পর্ষদের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
গভর্নর পর্ষদ বছরে ১ বার করে মিলিত হয়। গভর্নর পর্ষদে সব সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে না। সদস্য রাষ্ট্রের প্রদত্ত চাঁদার পরিমাণের আনুপাতিক হারে ভোটের পরিমাণ স্থিরীকৃত হয়। অর্থাৎ যে সদস্য-রাষ্ট্র যত বেশি চাঁদা দেবে, তার ভোট-সংখ্যাও তত বেশি হবে।

সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সর্বাধিক (২৩%) চাঁদা প্রদান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাই সর্বাধিক পরিমাণ ভোটদানের অধিকার তার রয়েছে। ব্রিটেন, জার্মানী, ফ্রান্স ও জাপান যথাক্রমে ৯.৬%, ৫.৫%, ৫.১% এবং ৪.১% চাঁদা প্রদান করে। ভারতের প্রদেয় অর্থের পরিমাণ হোল ৩.২%। এমন অনেক সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে, যাদের প্রদত্ত চাঁদার পরিমাণ হোল .৫%।
স্বাভাবিক কারণে ভোটদানের ক্ষেত্রেও তাদের স্থান সবার নিম্নে। একটি দেশের মোট উৎপাদনের পরিমাণ, বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলের অবস্থা, রপ্তানি করার ক্ষমতা প্রভৃতির ভিত্তিতে চাঁদার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের একটি কার্যনির্বাহী পরিচালক পর্ষদ রয়েছে। ২২ জন সদস্য নিয়ে এই পর্যদ গঠিত হয়। প্রতি সপ্তাহে পরিচালকমণ্ডলীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কার্যনির্বাহী পরিচালক পর্ষদ অর্থ-ভাণ্ডারের প্রধান পরিচালককে নিয়োগ করে। তিনি পর্ষদের সভাপতি হিসেবে কার্য সম্পাদন করেন।
তাছাড়া, সংস্থার সাধারণ কাজকর্ম পরিচালনা এবং কর্মচারীদের কাজকর্ম তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব তাঁকেই পালন করতে হয়। এইসব পরিচালন-কর্তৃপক্ষ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের একটি সচিবালয় রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মচারী নিয়ে তা গঠিত হয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে সম্পদ স্থানান্তরকরণের বিষয়ে সুপারিশ করার জন্য ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার এবং বিশ্ব-ব্যাঙ্ক যৌথভাবে একটি উন্নয়ন কমিটি (Development Committee) গঠন করেছিল।
এই কমিটি একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি’ (Interim Committee) হিসেবে কার্য সম্পাদন ক’রে চলেছে। এই কমিটি ছাড়াও আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের মন্ত্রী পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটি ও গোষ্ঠী গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে এরূপ তিনটি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে। এগুলি ‘১০টি রাষ্ট্রের গোষ্ঠী’, ‘৭টি রাষ্ট্রের গোষ্ঠী’ ও ‘২৪টি রাষ্ট্রের গোষ্ঠী’ নামে পরিচিত। শেষোক্ত গোষ্ঠীর প্রধান কাজ হোল— উন্নয়নশীল দেশসমূহের আর্থিক সমস্যাবলীর প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার কার্যাবলী

কার্যাবলী (Functions) :

আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার যেসব কার্য সম্পাদন করে, সেগুলির

মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হোল :

[১] সদস্য-রাষ্ট্রগুলির বাণিজ্য ক্ষেত্রে স্বল্পকালীন ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণের উদ্দেশে শর্তসাপেক্ষে তাদের ঋণদান করা ;

[২] আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটানো ;

[৩] বিশ্ব-বাজারে বিভিন্ন মুদ্রার বিনিময় হারের মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ;

[৪] সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে যথাযথ বিনিময় ব্যবস্থার প্রবর্তন করা ;

[৫] বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মুদ্রার মূল্যহ্রাস বন্ধ করা ;

[৬] সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শদান করা : [৭] সদস্য-রাষ্ট্রগুলির অর্থনীতিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করা ; এবং [৮] সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে প্রযুক্তিগত বিষয়ে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা।

• ভূমিকা (Role) ঃ

আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ৫৫ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সুদীর্ঘকাল ধরে সংস্থাটি যে-ভূমিকা পালন করেছে, তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টি দিকই রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ইতিবাচক ভূমিকা (Positive Role) :

অর্থ-ভাণ্ডারের ইতিবাচক ভূমিকাকে নিম্নলিখিত কয়েকটি দিক থেকে আলোচনা করা যেতে পারে :

[১] বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে স্বল্পকালীন ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণের জন্য সদস্য-রাষ্ট্রগুলিকে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রদান করেছে। এই উদ্দেশে ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ‘কাঠামোগত সামঞ্জস্য বাণিজ্যিক ঋণ প্রদান রক্ষার সুযোগ’ বা ‘সাফ্’ (Structural Adjustment FacilitySAF) নামে একটি নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এর মাধ্যমে স্বল্প আয়বিশিষ্ট দেশগুলিকে তাদের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি ও কাঠামোর পুনর্বিন্যাস সাধনে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার বিশেষভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে। ২.৭০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ট্রাস্ট ফান্ড’ (Trust Fund) নামে অর্থ-ভাণ্ডার যে-তহবিল গড়ে তুলেছিল, মূলতঃ তা থেকেই বিভিন্ন স্বল্পোন্নত দেশকে সাহায্য করা হোত। এর পর ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে ৬ বিলিয়ন ডলার নিয়ে অন্য একটি নতুন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়।
ঐ কর্মসূচীটির নাম ‘বর্ধিত কাঠামোগত সামঞ্জস্য বিধানের সুযোগ বা ‘ইসাফ্’ (Enhanced Structural Adjustment Facility—ESAF)। জাপান ও জার্মানী-সহ মোট ২০টি দেশ এই কর্মসূচী রূপায়ণের জন্য অর্থ প্রদান করেছিল। ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৭২টিরও বেশি রাষ্ট্র ‘সাফ্’-এর তহবিল থেকে ঋণের জন্য আবেদন করেছিল এবং আবেদনকারী রাষ্ট্রগুলিকে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ২.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
তাছাড়া, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি যাতে অধিক পরিমাণে ঋণ গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য আশির দশকের শেষ দিকে অর্থ-ভাণ্ডার সুদের হারও অনেকখানি কমিয়ে দেয়। কিন্তু ১৯৯৩ সালের নভেম্বর মাসের শেষে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের কার্যনির্বাহী পরিচালক পর্ষদ সাফ্ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এর পর ১৯৯৪ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মাসে ‘ইসাফ্’-এর কর্মক্ষেত্রের পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। স্বল্প আয়বিশিষ্ট দেশগুলির বাণিজ্যিক লেনদেনের ঘাটতি পূরণের জন্য ইসাফ্’ ব্যবস্থা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ঐসব দেশকে অধিক পরিমাণে ঋণদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ‘ইসাফ্ ট্রাস্ট’ (ESAF Trust) নামে সংস্থার একটি মজুত ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে।
বর্তমানে এই ভাণ্ডারে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ হোল ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ৫ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পরিশোধযোগ্য ঋণ সাধারণতঃ ১০টি কিস্তিতে শোধ করতে হয়। সুদের হার একেবারেই নগণ্য (বছরে ০.৫%)। ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ৭৮টি সদস্য রাষ্ট্র এই ঋণ লাভ করেছিল। ঋণ গ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আলবেনিয়া, মঙ্গোলিয়া, পাকিস্তান, কেনিয়া, ভারত প্রভৃতি রাষ্ট্র রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিককালে মেক্সিকোর মুদ্রা ‘পেসো’র অচলাবস্থা দূরীকরণের উদ্দেশে বিপুল পরিমাণ ঋণদানকে অনেকে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অবদান বলে চিহ্নিত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবির ভিত্তিতে তড়িঘড়ি ক’রে অর্থ-ভাণ্ডার মেক্সিকোকে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেয়, তার সাহায্যে ঐ দেশের মুদ্রা-ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

[২] সদস্য রাষ্ট্রগুলির মুদ্রা সঙ্কটের সমাধানের জন্য ১৯৬৯ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার এক নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। এই ব্যবস্থা ‘অর্থ তোলার বিশেষাধিকার’ বা এস.ডি.আর. (Special Drawing Rights — SDR) নামে পরিচিত। ১৯৭০ সাল থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়।
এস.ডি.আর.-এর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের একটি পৃথক খাত (account) থাকে। সদস্য রাষ্ট্রগুলি কর্তৃক প্রদত্ত অর্থের অর্থাৎ কোটার একটি অংশ নিয়ে এস.ডি.আর. প্রকল্প গড়ে ওঠে। কোন সদস্য রাষ্ট্র তার বৈদেশিক মুদ্রার সাময়িক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য অন্য যে-কোন সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে তার মুদ্রা বিনিময় করতে পারে।
সেজন্য তাকে প্রতি ইউনিট পিছু বাৎসরিক ১.৫% হারে সুদ দিতে হয়। অবশ্য কোন্ সদস্য-রাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বোক্ত রাষ্ট্রটি তার মুদ্রা বিনিময় করবে, তা অর্থ-ভাণ্ডারই ঠিক করে দেয়। তবে পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমেও সদস্য-রাষ্ট্রগুলি নিজেদের মধ্যে মুদ্রার স্বেচ্ছামূলক হস্তান্তর করতে পারে।
১৯৯৩-৯৪ সালে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনকারী দেশগুলি, পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এস.ডি.আর.-প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছিল।

[৩] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার পূর্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনরূপ স্থিতাবস্থা ছিল না। কারণ, তখন কোন সুনির্দিষ্ট বিনিময় হার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গড়ে ওঠেনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আশানুরূপভাবে প্রসারলাভ করতে পারেনি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার পর বৈদেশিক বাণিজ্যের বিনিময় হার নির্ধারণের ফলে পূর্বাবস্থার যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে।

[4] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠার পূর্বে মুদ্রার আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের ব্যাপারে প্রতিটি দেশ তার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। ফলে আন্তর্দেশীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ততার সৃষ্টি হোত। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটেছে। অর্থ-ভাণ্ডারের অনুমতি ছাড়া কোন সদস্য-রাষ্ট্র তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে না।
তাছাড়া, বিভিন্ন দেশের মুদ্রার আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রচলিত অসুবিধা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার আন্তর্জাতিক স্বর্ণমান (International Gold Standard) নির্দিষ্ট ক’রে দিয়েছে।
এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ লেনদেনের পথ প্রশস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের এরূপ ভূমিকার জন্য অধ্যাপক হাম (Halm) এটিকে ‘আন্তর্জাতিক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক’ (International Reserve Bank) বলে অভিহিত করেছেন।

[৫] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হোল অবাধ বিশ্ব-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও ভারসাম্যমূলক বৃদ্ধি সাধন। তাই সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে জনসাধারণের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও প্রকৃত আয় যাতে উচ্চহারে বৃদ্ধি পায়, সেজন্য অর্থ-ভাণ্ডার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তাছাড়া, সদস্য-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে চলতি লেনদেন (current transactions) যাতে বৃদ্ধি পায়, সেজন্য একটি বহুপক্ষীয় লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে অর্থ-ভাণ্ডার সচেষ্ট হয়।
ঐসব উদ্দেশ্যসিদ্ধির অন্যতম প্রধান উপায় হোল চলতি আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর থেকে বিনিময়-সংক্রান্ত বাধা-নিষেধের বিলোপসাধন। অর্থ-ভাণ্ডারের ৮ নং ধারায় এ সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় শতাধিক রাষ্ট্র এই ধারাটি মেনে নেওয়ার ফলে অবাধ বিশ্ব বাণিজ্যের পথ বিশেষভাবে প্রশস্ত হয়েছে। এইভাবে বিশ্বায়নের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পেরেছে।

[৬] সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শদান করা হোল আন্তর্জাতিক অর্থভাঙারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সাধারণতঃ ৫টি উপায়ে অর্থ-ভাণ্ডার এই কার্য সম্পাদন ক’রে থাকে। এগুলি হোল— সদস্য রাষ্ট্রগুলির
[i] রাজস্ব ও অর্থ-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও রূপায়ণ ; [ii] কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ও কোষাগার (treasury)-এর মতো প্রতিষ্ঠান গঠন ; [iii] পরিসংখ্যানমূলক তথ্যাদি ( statistical data) সংগ্রহ ও পরিশুদ্ধিকরণ, [iv] আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দান এবং [v] প্রচলিত আইনসমূহের পুনবীক্ষণ কিংবা নতুন আইনের খসড়া প্রণয়নে সাহায্যদান।
সদস্য রাষ্ট্রগুলির আধিকারিকদের প্রশিক্ষণদানের উদ্দেশে ১৯৬৪ সালে ‘আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের প্রতিষ্ঠান’ (IMF Institute) নামে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ওয়াশিংটনে প্রতিষ্ঠিত হয়। অদ্যাবধি ১৬১টি সদস্য রাষ্ট্রের ৮,০০০-এরও বেশি আধিকারিককে ঐ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে কারিগরি সাহায্য প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ১৯৬৩ সালে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা’ (Central Banking Service) গড়ে তুলেছে। সদস্য-রাষ্ট্রগুলি ছাড়াও ২০টির বেশি বহুজাতিক সংস্থা (multinational organizations) এই সংস্থাটির কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ ক’রে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে।
অনেক সময় আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার সদস্য রাষ্ট্রগুলির ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থার কর্মসূচীর পরিবর্তন সাধনের জন্য পরামর্শদানের উদ্দেশে বিশেষজ্ঞদের প্রেরণ ক’রে থাকে। ১৯৬৩ সালের পর থেকে অর্থ-ভাণ্ডার ১,০০০-এরও বেশি বিশেষজ্ঞের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলি যে-কোন সময় ব্যাঙ্কিং সমস্যা নিয়ে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে।
তাছাড়া, ১৯৬৪ সালে অর্থ-ভাণ্ডারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি ‘রাজস্ব-সংক্রান্ত বিভাগ’ (Fiscal Affairs Department)। সদস্য-রাষ্ট্রগুলি ছাড়াও আন্তঃ-সরকারী সংগঠনসমূহ রাজস্ব-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে এই বিভাগের পরামর্শ গ্রহণ ক’রে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের ভূমিকা বিশেষ ইতিবাচক।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার নেতিবাচক ভূমিকা

নেতিবাচক ভূমিকা (Negative Role) :

কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের নেতিবাচক ভূমিকাটি আদৌ উপেক্ষণীয় নয়। এই ভূমিকাকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ ক’রে বিচারবিশ্লেষণ করা যেতে পারে :

[i] সদস্য-রাষ্ট্রগুলির বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার শর্ত-সাপেক্ষে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদান করে। মূলতঃ স্বল্পোন্নত ও উন্নতিকামী দেশগুলি এই ঋণ গ্রহণ ক’রে থাকে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও জাপানের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির অঙ্গুলি সংকেতে পরিচালিত হয় বলে ঋণ-গ্রহণকারী দরিদ্র দেশগুলির ওপর তারা যেসব শর্ত আরোপ করে, সেগুলি আদৌ সম্মানজনক নয়।
ঋণদানের পূর্বশর্ত হিসেবে শ্রমিকদের মজুরী হ্রাস, সরকারী ব্যয় বরাদ্দ ব্যাপকভাবে হ্রাস, বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া, শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারীকরণ, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার মতো বহু জন-বিরোধী পদক্ষেপ ঋণগ্রহণকারী দরিদ্র রাষ্ট্রগুলিকে গ্রহণ করতে হয়।
এর ফলে তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমিকতা বিনষ্ট হয়। ভারত সরকার যেসব শর্তে আন্তর্জাতিক অর্থ-ডাণ্ডারের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে, সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হোল— আমদানির ওপর পরিমাণগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিলোপসাধন, বিভিন্ন সরকারী ও

আধা-সরকারী সংস্থাগুলির বেসরকারীকরণ, আমদানি নীতির উদারীকরণ, আমদানি শুল্ক হ্রাস, ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বিদেশী পুঁজির ব্যাপক বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বাজেট ঘাটতি হ্রাস প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বলা বাহুল্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো, নয়া সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি সাম্প্রতিককালে ‘বিশ্বায়ন’, ‘উদারীকরণ’ ও ‘বেসরকারীকরণে’র যে স্লোগান তুলেছে, তাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারকে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্বল্পোন্নত বা উন্নতিকামী তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে সস্তায় কাঁচামাল আমদানি এবং চড়া দামে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার হিসেবে ঐসব দেশকে তারা ব্যবহার করতে চাইছে। এর ফলে বিদেশী পুঁজি ও পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঐসব সদস্য রাষ্ট্রের দেশীয় পুঁজি ও পণ্য পিছু হটতে শুরু করেছে। ফলে ঋণগ্রহণকারী দেশগুলির অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে।

[ii] বিগত শতাব্দীর আশির দশক থেকে বিশ্বায়ন ও পুঁজির ফাটকাবাজারি যতই বেড়ে চলেছে, আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে আন্তর্জাতিক পুঁজির গোলামি করতে ততই বাধ্য করছে।
একদিকে ধনশালী ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ও ধনহীন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অর্থ-ভাণ্ডার যেমন বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণ করছে, অন্যদিকে তেমনি দরিদ্র দেশগুলিকে প্রদত্ত ঋণের সুদ বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের কার্যতঃ ঋণের চক্রব্যূহের মধ্যে আটকে রাখার চক্রান্ত চলছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার দরিদ্র দেশগুলি কর্তৃক গৃহীত ঋণের ওপর সুদের হার কোনরূপ কারণ ছাড়াই বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে ঋণ-গ্রহণকারী উন্নয়নশীল দেশগুলি বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ করা সত্ত্বেও তাদের ঋণের বোঝা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ১৯৮৩-৮৯ সালে উন্নয়নশীল ঋণ-গ্রহণকারী দেশগুলি ২৪২ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পরিশোধ করলেও আশির দশকে তাদের ঋণের বোঝা ৬৫০ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ১,৩৫০ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছিল। এইসব কারণে ডেভিসন বুধু নামে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের একজন অর্থনীতিবিদ ঐ সংস্থার কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করেন।
সর্বোপরি, যেসব রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোলামি করে সেইসব রাষ্ট্র অর্থ-ভাণ্ডারের কাছ থেকে যত বেশি ঋণ এবং অন্যান্য সাহায্য লাভ করে, অন্যরা তা পারে না। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে। মেক্সিকোর মুদ্রা ব্যবস্থার অচলাবস্থা দূরীকরণের উদ্দেশে ঋণ প্রদানের সর্বপ্রকার নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে অর্থ-ভাণ্ডার ঐ দেশটিকে ১৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করে।
জার্মানী, ফ্রান্স ও জাপানের মতো অর্থ-ভাণ্ডারের শক্তিশালী সদস্যরাষ্ট্রগুলি অর্থ-ভাণ্ডারের এরূপ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

[iii] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের নিয়মানুসারে কোন দেশ তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে করের হার বৃদ্ধি, সামাজিক পরিষেবা খাতে ব্যয় হ্রাস প্রভৃতির মতো আভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।
কিন্তু ১৯৪৮ সালে অর্থ-ভাণ্ডারের এই নিয়ম-নীতি অগ্রাহ্য করে ফ্রান্স তার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। সেজন্য তার বিরুদ্ধে কিন্তু কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আবার, বিগত শতাব্দীর শেষ দশকে ইয়েন ও মার্কের তুলনায় মার্কিন ডলারের অবমূল্যায়ন ঘটলেও করের হার বৃদ্ধি,

সামাজিক পরিবেশ খাতে ব্যয় হ্রাস প্রভৃতির মতো আভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সে আদৌ রাজী নয়। সুতরাং বলা যায়, আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের বিধি-বিধানগুলি দরিদ্র দেশগুলির ওপর
জোর ক’রে চাপিয়ে দেওয়া হলেও ধনশালী সদস্য রাষ্ট্রগুলির ক্ষেত্রে সেগুলি প্রযুক্ত হয় না।

[iv] যতদিন পর্যন্ত ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল, ততদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু ‘ঠাণ্ডা লড়াই’-এর অবসান ঘটার পর বর্তমানে জার্মানী ও জাপান এবং কিছু পরিমাণে ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের স্বার্থে অর্থ-ভাণ্ডারকে কাজে লাগাবার জন্য সচেষ্ট হয়েছে।
তবে যেহেতু অর্থ-ভাণ্ডারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গচ্ছিত টাকার অংশ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি (২৩%), স্বাভাবিকভাবেই যে-কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার মতামতই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে চেরিল পেয়র ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন যে, যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধনকুবেরদের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে মতপার্থক্য উপস্থিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের নীতিমালা অকেজো হয়ে পড়ে।
কিন্তু দুর্বল জাতিগুলির ক্ষেত্রে সেগুলি কার্যতঃ অলঙ্ঘনীয় বলেই বিবেচিত হয়।

[v] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হোল—সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শদান করা। কিন্তু এরূপ পরামর্শদানের জন্য অর্থ-ভাণ্ডারের যেসব নিজস্ব অর্থনীতিবিদ রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শেষের সারির ছাত্র।
ফলে তাঁরা যেসব পরামর্শ দেন, সেইসব পরামর্শ ত্রুটিপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার সেগুলিকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেয়। তাছাড়া, কোনও দেশকে সাহায্য বা ঋণ দেওয়ার পূর্বে অর্থ-ভাণ্ডার সংশ্লিষ্ট দেশে তার নিজের অর্থনীতিবিদদের প্রেরণ করে।
কিন্তু ঐসব অর্থনীতিবিদ সরজমিনে তদন্ত না ক’রে অনেক সময় পাঁচতারা হোটেলে বসে রিপোর্ট তৈরি করেন। তার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশের কল্যাণ অপেক্ষা অকল্যাণই বেশি পরিমাণে সাধিত হয়। আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ যোশেফ স্টিগ্‌লিজ তাঁর সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন যে, আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার যেসব অঙ্কের মডেল ব্যবহার করে, সেগুলি হয় ত্রুটিপূর্ণ, নয় তো সেকেলে।
অর্থনীতির ব্যাপারে অর্থ-ভাণ্ডার চটজলদি যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেগুলি বিশেষভাবে অগভীর প্রকৃতিসম্পন্ন। তাঁর অভিযোগ হোল — সাহায্য-গ্রহণকারী দেশগুলির ভাল-মন্দ নিয়ে অর্থ-ভাণ্ডার ভাবনা-চিন্তা করতে আদৌ রাজী নয়। তা দরিদ্র দেশগুলিকে শোষণ করতেই ব্যস্ত থাকে।
অনেক সময় আবার অর্থ-ভাণ্ডারের অর্থনীতিবিদরা কোন দেশের ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে চাইলেও ঐ সংস্থার পুরানো লোকজনেরা তাদের সে ব্যাপারে বাধাদান করেন। সর্বোপরি, ঋণ-গ্রহণকারী দেশগুলির মেধাবী ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যকে অর্থভাণ্ডারের অর্থনীতিবিদরা আদৌ আমল দেন না।
এইসব কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের গৃহীত নীতি ও কর্মসূচীর ফলে ঋণ-গ্রহণকারী দেশগুলির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় ঘটতে দেখা যায়।

বিগত প্রায় দু’দশক ধরে বিশ্বায়নের নামে দরিদ্র দেশগুলির বাজার দখল ও সম্পদ লুণ্ঠনের যে-চক্রান্ত শিল্পোন্নত ও ধনশালী দেশগুলি অব্যাহতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চালিয়ে যাচ্ছে, তার সহায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের ভূমিকার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের সূচনা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার উপসংহার

উপসংহার:

বিভিন্ন প্রতিবাদী সংগঠনকে নিয়ে গঠিত ‘মবিলাইজেশন ফর গ্লোবাল জাস্টিস’ (Mobilization for Global Justice) নামক একটি সংস্থা ২০০০ সালের এপ্রিল ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ওয়াশিংটন ও প্রাগে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডারের সম্মেলন চলাকালে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল।
বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে সিয়াটেলে প্রদর্শিত সুবিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের অন্যতম উদ্যোক্তা ‘সিটিজেন্‌স গ্লোবাল ট্রেড ওয়াচ’ (Citizens Global Trade Watch)-এর নেতা স্কটনোভা মন্তব্য করেছেন যে, আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার তার ইতিহাসে এত ব্যাপক বিক্ষোভের মুখোমুখি কোনদিন পড়েনি।
বিশ্বায়ন-বিরোধী কর্মসূচী সামনে রেখে বিক্ষোভকারী সংগঠনগুলি আই.এম.এফ.-এর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করে যে, সমগ্র বিশ্বের দরিদ্র মানুষ, শ্রমিক ইউনিয়ন ও পরিবেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার, বিশ্ব-ব্যাঙ্ক ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা সীমাহীন ধনসম্পদের মালিক বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও প্রাগে বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার মধ্যে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দরিদ্র দেশগুলির যাবতীয় ঋণ মকুবের দাবি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বলাভ করেছিল। কারণ, ঐসব দেশের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা তো দূরের কথা, প্রতি বছর ঋণ বাবদ প্রদেয় সুদের অর্থ সংগ্রহ করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেবল আফ্রিকার দেশগুলিকেই ৩৫ হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণের সুদ প্রদান করার জন্য জাতীয় বাজেটের ৪০% ব্যয় করতে হয়। জাম্বিয়ার মতো এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বছরে যে-পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তার থেকে অনেক বেশি অর্থ ব্যয়িত হয় বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে।
এইভাবে ঋণের দায়ে বিকিয়ে যাওয়া ৪০টি দেশকে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ও বিশ্ব-ব্যাঙ্ক ১৯৯৬ সালে ভীষণভাবে ঋণগ্রস্ত দরিদ্র দেশ’ (Heavily Indebted Poor Countries — HIPC) হিসেবে চিহ্নিত করে। ঐসব দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার মাথা-পিছু দৈনিক আয় ১ ডলারেরও কম।
ঐসব দেশে ৫ বছর বয়স হওয়ার পূর্বেই গড়ে প্রতি ৬ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অপুষ্টিজনিত অসুখে মারা যায় এবং প্রায় ৫ কোটি শিশু বিদ্যালয়ের মুখই কোনদিন দেখেনি। ১৯৯৯ সালে কোলনে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলির সংগঠন জি-৭-এর শীর্ষ বৈঠকে পূর্বোক্ত ৪০টি দরিদ্র দেশের মোট ২৬ হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলার ঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়।
কিন্তু ২০০০ সালের জুলাই মাসে ওকিনাওয়ায় ঐ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির সম্মেলনের সময় দেখা যায় যে, ঋণ মকুবের কাজ বিশেষ এগোয়নি। যাই হোক, বিগত বছরে ঘোষিত ১০ হাজার কোটি ডলার ঋণ মকুবের প্রসঙ্গ এড়িয়ে ১,৫০০ কোটি ডলার ঋণ মকুবের কথা ঘোষণা করা হয়।
যে-৯টি দেশের ঋণ মকুব করা হবে, তাদের নামও ঐ সম্মেলন ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সম্মেলন মঞ্চ থেকে একথাও বলা হয় যে, যথাযথভাবে শর্ত মেনে চললে চলতি বছরের মধ্যে সর্বমোট ২০টি দেশকে ঋণ মকুবের সুবিধা প্রদান করা হবে।
কিন্তু ঐ ঋণ আদৌ মকুব করা হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আর, মকুব করা হলেও তার ফলাফল কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে ‘অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনাল’নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ১২টি ভীষণভাবে ঋণগ্রস্ত দরিদ্র দেশকে নিয়ে যে-সমীক্ষা চালিয়েছে, তাতে দেখা গেছে যে,
ঐসব দেশের মধ্যে মাত্র ৩টি দেশ ছাড়া অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রে ঋণমকুবের পরেও অবশিষ্ট ঋণের সুদ পরিশোধ করতে যে-অর্থ ব্যয়িত হবে, তা ঐসব দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের থেকে অনেক বেশি।

ঐ ১২টি দেশের মধ্যে ৬টি দেশের ক্ষেত্রে ঋণ মকুবের পর ঋণ পরিশোধ করার জন্য রাজস্বের ১৫% এবং জাম্বিয়া, ক্যামেরুন ও মালাই-এর মতো দেশের ক্ষেত্রে রাজস্বের ৪০% ঋণ পরিশোধের জন্য খরচ হবে।
মার্কিন রাষ্ট্রপতি ক্লিন্টন ঐসব রাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের জন্য ৪৩ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেও মার্কিন জনপ্রতিনিধি সভা ঐ ঋণের পরিমাণ হ্রাস ক’রে ২২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারে নামিয়ে এনেছে। এতসব করার পরেও ফিল গ্রাম নামে একজন রিপাবলিকান সদস্যের আপত্তিতে পুরো প্রস্তাবটি মার্কিন সেনেটে আটকে রয়েছে।
এদিকে মার্কিন অর্থ ছাড়া ঋণ মকুবের কর্মসূচী কার্যকর করা সম্ভব হবে না বলে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ও বিশ্ব-ব্যাঙ্ক পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এইসব ঘটনা থেকে প্রমাণ হয় যে, আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার কিংবা বিশ্বব্যাঙ্ক কার্যতঃ বৃহৎ পুঁজিবাদী দেশগুলির, বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *