ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি teacj sanjib

 ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি teacj sanjib

ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি

ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনী :

ফ্যাসিবাদ-ও-দ্বিতীয়-বিশ্বযুদ্ধের-পটভূমি-teacj-sanjib

 

সূচনা : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সমগ্র ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছিল। জার্মানি, ইটালি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, জাপান, গ্রিস, পর্তুগাল প্রভৃতি দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে এবং একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। এই একনায়ক শাসকদের মধ্যে ইটালিতে প্রথম একনায়ক শাসন প্রতিষ্ঠা হয় এবং জার্মানিতে হিটলার ও স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কো ছিলেন এক নায়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শাসক।

 

ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি: মুসোলিনীর উত্থানের পটভূমি ঃ

 

  ইটালি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর এই দেশে জাতীয় উন্নয়নের হার ছিল খুবই নগণ্য। দেশে গণতান্ত্রিক শাসনে কেবলমাত্র সম্পদশালী লোকেদেরই প্রাধান্য ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইটালিতে ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট দেখা দেয়। এর ফলে ইটালিতে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছায়। এই সংকটের পিছনে যে কারণগুলি ছিল –

  (১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইটালি বিজয়ী মিত্রপক্ষে যোগদান করে। ইটালি আফ্রিকায় কিছু উপনিবেশ ও আলবেনিয়া পাবে আশা করেছিল। কিন্তু ইটালিকে এই বণ্টনের ব্যাপারে বঞ্চিত করা হয়। ফলে ইটালির জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল।

  (২) যুদ্ধের পরে শিল্প উৎপাদন ও কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। বেকারত্ব, প্রবল খাদ্যাভাব, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। যুদ্ধশেষে সেনাবাহিনী থেকে সেনাদের ব্যাপক ভাবে সেনা ছাঁটাই করা হয়। এই অবস্থা দেশবাসীকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।

  (৩) রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রভাবে ইটালিতে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ দ্রুত জনপ্রিয় হয়। বেকার যুবক ও শ্রমিকরা দলে দলে সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দেয়। সমাজতন্ত্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত শ্রমিকরা মজুরী বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য হ্রাস, কাজের সময়সীমার দাবিতে কলকারখানায় ধর্মঘট করতে থাকে। কৃষকরা খাজনা বন্ধ করে দেয়। দেশের চারিদিকে ধর্মঘট, হাঙ্গামা, লুঠতরাজ চলতে থাকে। মধ্যবিত্ত, জমিদার, শিল্পপতিরা, সমাজতন্ত্রিদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

  (৪) এই অবস্থায় ক্ষমতাসীন নেতৃবর্গ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়। ইটালিতে ১৯১৯ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছয়টি মন্ত্রিসভার পরিবর্তন ঘটে।

  (৫) জমিদার, শিল্পপতি, মধ্যবিত্তরা সুদক্ষ স্থায়ী শাসনব্যবস্থার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তারা সমাজতন্ত্রীদের অগ্রগতি প্রতিরোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞবদ্ধ হয়। এই অভ্যন্তরীণ শোচনীয় অবস্থায় ইটালিতে বিনিতো মুসোলিনীর নেতৃত্বে ফ্যাসীবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

মুসোলিনীর ক্ষমতা লাভঃ 

 

 ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইটালির প্রেদ্যপ্পিও নামক স্থানে মুসোলিনী জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা গ্রহণ করেন। পরে তিনি সমাজতন্ত্রবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং আভান্তি (প্রগতি) নামে একটি সমাজতান্ত্রিক পত্রিকা সম্পাদনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তাকে বিপ্লবী সন্দেহে কারারুদ্ধ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদানকে কেন্দ্র করে সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে মুসোলিনীর মতভেদ দেখা দেয় এবং তাঁকে দল থেকে বিতাড়িত করা হয়। যুদ্ধের পরে আহত অবস্থায় তিনি দেশে ফিরে আসেন।

 

বিশ্বযুদ্ধের পরে ইটালির সর্বত্র সাম্যবাদীদের অরাজকতা এবং গণতন্ত্রীদের অপদার্থতায় দেশের মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুসোলিনী কর্মচ্যুত সৈনিক ও দেশপ্রেমিকদের নিয়ে ফ্যাসিস্ট দল গড়ে তোলেন। এই দলের প্রতীক ফ্যাসিস্ ছিল দড়ি বাঁধা কাঠ খণ্ড যা প্রাচীন রোমের রাজশক্তির প্রতীক ছিল। কর্মচ্যুত সৈনিক ও বেকার যুবকদের নিয়ে তিনি এক আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলেন। দলের সদস্যরা কালো পোশাক পরত বলে তাদের ‘ব্ল্যাক শার্ট’ বাহিনী বলা হত। এই দলের লক্ষ্য ছিল – (১) ইটালির মর্যাদা বৃদ্ধি, (২) কমিউনিষ্ট প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করা, (৩) ইটালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ বিদেশি নীতি, (৪) ব্যক্তিগত ধর্ম সম্পত্তি রক্ষা করা।

 

এই দলের শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে লাগলে দেশের হতাশাগ্রস্ত মানুষ, শিল্পপতি, জমিদার প্রভৃতি মুসোলিনীকে ত্রাণকর্তা রূপে মান্য করতে লাগল। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর দলের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এই দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লক্ষ হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে ফ্যাসিবাদী বাহিনী মুসোলিনীর নেতৃত্বে রাজধানী রোমের অভিমুখে অভিযান করে। গৃহযুদ্ধ পরিহার করার উদ্দেশ্যে রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইম্যানুয়েল মুসোলিনীর হাতে দেশের শাসনভার অর্পণ করেন।

 

ফ্যাসিস্ট ইল-ডুচে বা একনায়ক মুসোলিনী প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিরোধী দলগুলির উপর দমন পীড়ন ও নানা অত্যাচার চালাতে থাকেন। ফ্যাসিস্ট বিরোধিতার অজুহাতে বিরোধী নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ ও হত্যা করা হয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে গুন্ডামী ও কারচুপির দ্বারা ফ্যাসিস্টদল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সংবিধান পরিবর্তন করে বেআইনি একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

 

তিনি বহু অভ্যন্তরীণ সংস্কার করেছিলেন। (১) গ্রামস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত প্রশাসনকে ফ্যাসিস্ট দলের নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং দেশের সমস্ত ক্ষমতা করায়ত্ত করা হয়। রাজা নামমাত্র পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। (২) তিনি ২০ জন ফ্যাসিস্ট নেতাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন। (৩) সরকারি ও আধা সরকারি চাকরি ও সেনা বাহিনীতে ফ্যাসিস্ট দলের লোককে নিয়োগ করা হয়। (৪) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বাক্ স্বাধীনতা নিষিদ্ধ করা হয়। (৫) পেডেস্টাস নামে কর্মচারীদের হাতে পৌর শাসন ভার অর্পণ করা হয়।

 

অর্থনেতিক উন্নয়ন ঃ 

 

 (১) তিনি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারি আয় ব্যয়ের হিসাবের বিধান করেন, (২) শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি স্থির, কাজের সময় হ্রাস, ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা এবং দ্রব্যের দাম বেঁধে দেন। শ্রমিকদের চিকিৎসার সুযোগ, সবেতন ছুটি ও বীমার সুবিধা দেওয়া হয়। (৩) কৃষি ব্যবস্থা উন্নয়নে সেচ, উন্নত বীজ, কৃষি ঋণদান, জলা জমি উদ্ধার, গমের চাষ বৃদ্ধি, যব ও কার্পাস চাষ প্রভৃতি পদক্ষেপ নিয়ে দেশকে খাদ্য স্বয়ম্ভর করা হয়। তাঁর উদ্যোগে জাহাজ নির্মাণ, বিমান নির্মাণ, বেতার বিদ্যুৎ, মোটরগাড়ি, সিল্ক প্রভৃতি শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটে। এছাড়া বেকার সমস্যা সমাধান কল্পে হাসপাতাল, সেতু, রেলপথ রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শিল্পোন্নয়ন দপ্তর গঠন করা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বৃহৎ পরিবার সৃষ্টির উৎসাহ দিতেন।

 

শিক্ষা ও ধর্মসংস্কার ঃ

 

 শিক্ষা সংস্কারে মুসোলিনী বহু বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিস্টদেরই নিয়োগ করা হত। বিদ্যালয়ে মুসোলিনীর ছবি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। মুসোলিনী পোপের সঙ্গে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ল্যাটেরান চুক্তির দ্বারা রোমান ক্যাথলিক ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে ধর্মীয় মীমাংসা করেন। এছাড়া ভ্যাটিকান নগরীকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেন।

 

মুসোলিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কারে নানা ত্রুটি ছিল। (১) তাঁর শাসনে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়। (২) শ্রমিকদের ছিল মজুরী কম, পরিশ্রম বেশি এবং তাদের ধর্মঘটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। (৩) গমের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়নি, (৪) মুসোলিনী ইটালিতে গণতন্ত্রের বিনাশ ঘটিয়েছিলেন, (৫) শিক্ষায় স্বাধীন চিন্তার বিনাশ ঘটেছিল। 

 

● মুসোলিনীর বৈদেশিক নীতি ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন :

 

মুসোলিনীর পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল ইটালির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। তাই সাম্রাজ্যবাদ যুদ্ধনীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

 

→ ফ্রান্স বিরোধিতা : মুসোলিনী ফরাসি বিজয়ী মিত্র পক্ষে যোগ দিয়েও যুদ্ধান্তে

 

বিরোধী ছিলেন। কারণ, (ক) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইটালি ফ্রান্সের আপত্তিতে টিউনিশিয়া, কর্সিকা, স্যাভয়, নীস প্রভৃতি স্থান লাভে বঞ্চিত হয়। (খ) ফ্যাসি বিরোধী বহু ইটালিয়কে ফ্রান্সে বাস করতে দেওয়া মুসোলিনীকে ক্ষুদ্ধ করে। (গ) ইটালির আধিপত্য বিস্তারে ফ্রান্স ছিল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

 

মুসোলিনী সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ইটালি অধিকৃত সোমালিল্যান্ড ও ইরিত্রিয়ার মধ্যবর্তী আবিসিনিয়া দখল করা প্রয়োজন মনে করেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবিসিনিয়া আক্রমণ করেন। জাতিসংঘ ইটালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করলেও তা ব্যর্থ হয়।

 

মুসোলিনী

 

আবিসিনিয়া দখল : অবশেষে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়ার রাজা.দেশ ত্যাগ করলে তিনি আবিসিনিয়া দখল করেন। আফ্রিকার তিনটি রাজ্য নিয়ে ইটালি পূর্ব আফ্রিকা নামে নতুন রাষ্ট্র গঠন করে।

 

O স্পেনে মুসোলিনীর হস্তক্ষেপ ঃ স্পেনে সাম্যবাদ প্রসারিত হয়েছিল। স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কো ও রাজতন্ত্রের মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। সাম্যবাদ বিরোধী মুসোলিনী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর পক্ষে স্পেনে হস্তক্ষেপ করে ফ্রাঙ্কোর একনায়কতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘটনা জাতি সংঘের ব্যর্থতা প্রমাণ করে।

ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *