সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি | Comprehensive Test Ban Treaty |C.T.B.T – চুক্তি

 সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি (Comprehensive Test Ban Treaty) |C.T.B.T – চুক্তি

সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি:

 

সার্বিক-পারমাণবিক-অস্ত্র-পরীক্ষা-রোধ চুক্তি-Comprehensive-Test-Ban-Treaty-CTBT-চুক্তি

 

সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি: আংশিক অস্ত্র-পরীক্ষা রোধ চুক্তি :

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একদিকে যেমন ‘ঠাণ্ডা লড়াই’-এর উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে, তেমনি এর পাশাপাশি অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। ১৯৪৫ সালে নাগাসাকি ও হিরোসিমাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে-আণবিক বোমা ফেলেছিল, তার ব্যাপক ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির সপক্ষে বিশ্ব-জনমত গড়ে উঠেছিল। বিশ্ব-শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এবং তারই উদ্যোগে অস্ত্র-নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণের প্রয়াস শুরু হয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলি মুখে শান্তির কথা বললেও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে নিজেদের অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করার জন্য একের পর এক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা শুরু করে। এইভাবে ১৯৬৪ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য ক’রে ভারত-সহ বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস ও নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে।

  ১৯৫৪ সালের ২রা এপ্রিল লোকসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের উদ্দেশে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানান। এর পর থেকে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা ও অস্ত্র-প্রসার রোধের আন্তর্জাতিক প্রয়াস। কিন্তু অতি

বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি (Super Powers) -র আন্তরিকতার অভাবে ১৯৫৮ সালে একটি সার্বিক অস্ত্র-পরীক্ষা রোধ চুক্তি সম্পাদনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। ঐসব শক্তি পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা ও অস্ত্র-প্রসার রোধ করতে কিংবা নিরস্ত্রীকরণের পথে পা বাড়াতে আদৌ রাজী ছিল না। 

 যাই হোক্, শেষ পর্যন্ত ১৯৬৩ সালে সম্পাদিত হয় আংশিক অস্ত্রপরীক্ষা রোধ চুক্তি (Partial Test Ban Treaty — PTBT)। এই চুক্তিতে জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষে (in the atmosphere, outer space and under water) পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষার কথা বলা হয়। ৫ই আগস্ট সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের তদানীন্তন মহাসচিব উ-থান্ট (U-Thant)-এর উপস্থিতিতে ঐ চুক্তি সম্পাদিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন-সহ ১০৬টি রাষ্ট্র ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। নভেম্বর মাসে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা একটি প্রস্তাব গ্রহে মাধ্যমে ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষরদানের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের নিকট আবেদন জানায়। কিন্তু ফ্রান্স ও চীন ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। 

 অপরদিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি কেনেডি (Kennedy) সেনেটের অনুমোদনের জন্য পি.টি.বি.টি. পেশ ক’রে সেনেট-সদস্যদের আশ্বাস দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও সামরিক ক্ষেত্রে পূর্ণ জ্ঞানার্জন ও অস্ত্র-শস্ত্রের উন্নতি বিধানের জন্য ভূগর্ভে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা অব্যাহত রাখবে। পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নও প্রায় অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিল। বলা বাহুল্য, পি.টি.বি.টি. স্বাক্ষরের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্স ও চীনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার প্রয়াস ব্যর্থ ক’রে দেওয়া। অনুরূপ উদ্দেশে পাঁচটি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র ১৯৬৮ সালে এন.পি.টি. স্বাক্ষরের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বিশ্বের শান্তিকামী জনগণ ও রাষ্ট্রসমূহ একথা যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, যতদিন পর্যন্ত সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ সম্ভব না হবে, ততদিন পর্যন্ত ‘শান্তির ললিত বাণী’ ‘মিথ্যা পরিহাসে’ পরিণত হতে বাধ্য। 

 বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানিগণ ও শান্তিবাদী সংগঠনগুলি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা, উৎপাদন ও প্রয়োগ নিষিদ্ধকরণের দাবি জানান। এইভাবে সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্ব লাভ করে। এই দাবির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ক’রে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা করেছিল যে, ১৯৮৫–৮৭ সালে সে পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা একতরফাভাবে স্থগিত ( moratorium) রাখবে। ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে ভারত, র্জন্টিনা, গ্রীস, মেক্সিকো, সুইডেন ও তানজানিয়া পি.টি.বি.টি. সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সম্মেলন আহ্বানের জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে অনুরোধ জানায়। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে ১৯৯১ সালের জানুয়ারী মাসে পি.টি.বি.টি.-সংশোধন সম্মেলন (The PTBT Amendment Conference) আহ্বান করা হয়।

  কিন্তু চরম মতপার্থক্যের দরুন ঐ সম্মেলন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে ব্যর্থ হয়। ঐ বছরের অক্টোবর মাসে পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনরায় ১ বছরের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করে। এর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সোভিয়েত ইউনিয়নের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। এমতাবস্থায় ১৯৯৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা যত শীঘ্র সম্ভব একটি সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা রোধ চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন (Conference on Disarmament— CD) আহ্বানের ব্যাপারে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সাধারণ সভার ১৮টি রাষ্ট্রকে নিয়ে যে-নিরস্ত্রীকরণ কমিটি (The 18-Nation Disarmament Committee) এতদিন বর্তমান ছিল, ১৯৭৮ সালের প্রথম দিকে সেই কমিটির নাম পরিবর্তন করে নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন রাখা হয় এবং ঐ সম্মেলনের তখন সদস্যসংখ্যা ছিল ৩৮। ১৯৯৩ সালে সি.ডি.-র সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৬১-তে দাঁড়ায়। তবে যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার ফলে সে কার্যকর সদস্য বলে বিবেচিত না হওয়ায় বাস্তবে সি.ডি.-র সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ৬০।

 

সি.টি.বি.টি. সম্পাদনের পটভূমি :

 

  লক্ষণীয় বিষয় হোল—যতদিন পর্যন্ত বিশ্ব-রাজনীতিতে ঠাণ্ডা লড়াই-এর পরিবেশ বর্তমান ছিল, ততদিন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারে কোনরূপ তৎপরতা প্রদর্শন করেনি। আশির দশকের শেষ দিকে পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়, নব্বই-এর দশকের প্রথম দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, গণ-সাধারণতন্ত্রী চীন কর্তৃক পরিকল্পিত পণ্য অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির প্রবর্তন, ‘ঠাণ্ডা লড়াই’-এর অবসান, পাশ্চাত্যের পুঁজিপতিদের জন্য চীনের বাজার উন্মুক্তকরণ, ন্যাটোর সম্প্রসারণ, রাশিয়ার নতুন শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রভৃতি বিশ্ব-রাজনীতির প্রকৃতির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনে দেয়। 

 এমতাবস্থায় ১৯৯৬ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি বা সি.টি.বি.টি. গৃহীত হয়। অনেকে সি.টি.বি.টি.-কে পি.টি.বি.টি.-র উত্তরসূরি বলে চিহ্নিত করেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পঞ্চাশের দশকে যে-ভারত পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, সেই ভারত কিন্তু সি.টি.বি.টি. স্বাক্ষরের পথে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

 

 

সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি: ভারত কর্তৃক পক্ষপাতমূলক সি.টি.বি.টি. খসড়ার বিরোধিতা : 

 

 ১৯৯৪ সালের জানুয়ারী মাসে জেনেভাতে অনুষ্ঠিত সি.ডি.-র অধিবেশনে সি.টি.বি.টি.-র খসড়া রচনার কাজ শুরু হয়। সি.ডি.-র সভাপতি নেদারল্যান্ডের জাপ রামাকার (Jaap Ramakar) ছিলেন সি.টি.বি.টি.-খসড়ার প্রধান রূপকার। ১৯৯৬ সালের ২৮শে জুন তিনি সি.ডি.-র সভায় ঐ খসড়া উত্থাপন করেন। কিন্তু ভারত ও ইরান ঐ খসড়া চুক্তির চরম বিরোধিতা করে। সি.ডি.-র নিয়মানুযায়ী কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সি.ডি.-র সদস্য রাষ্ট্রগুলির ঐকমত্য একান্তভাবেই প্রয়োজন। ১৯শে আগস্ট ভারত সি.টি.বি.টি.-খসড়ায় কার্যতঃ ভিটো প্রয়োগ করে। ফলে ঐ চুক্তি গ্রহণের ব্যাপারে সি.ডি.-তে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভার কাছে সি.টি.বি.টি.-র খসড়াটিকে গ্রহণের জন্য প্রেরণ করতে সি.ডি. ব্যর্থ হয়।

  এইভাবে সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ভারত সি.টি.বি.টি.-র বিরোধিতা করার জন্য বিশ্বের সংবাদপত্রগুলির শিরোনামে চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই আচরণে ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়ারেন ক্রিস্টোফার (Warren Christopher)-এর বিবৃতির মধ্যে মার্কিন সরকারের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া যায়।* তিনি ভারতের প্রতি কার্যতঃ হুমকি দিয়ে একথা বলেছিলেন যে, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র খসড়া চুক্তিকে সমর্থন করলে ভারত তাতে সম্মতি জানাতে বাধ্য হবে।* ক্রিস্টোফারের এই উক্তি সি.ডি.-র কার্য-পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী

ছিল।

 

  কারণ, ঐকমত্য ছাড়া ঐ চুক্তি গৃহীত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। ভারতের মূল বক্তব্য ছিল—পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে না দিলে সার্বিক নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্য অপূর্ণই থেকে যাবে। তাছাড়া, চুক্তিটির বৈষম্যমূলক প্রকৃতির জন্যও ভারত তাতে স্বাক্ষর করতে আপত্তি করে। সি.ডি.-র পূর্ণাঙ্গ সভায় ভারতের প্রতিনিধি অরুন্ধতী ঘোষ তাঁর প্রতিবাদী বক্তৃতায় একথা বলেন যে, ভারত সবসময়ই একথা বিশ্বাস করে যে, সি.টি.বি.টি.-র লক্ষ্য হোল পারমাণবিক অস্ত্র সম্প্রসারণের পরিসমাপ্তি ঘটানো। কিন্তু সি.টি.বি.টি.-র খসড়াতে কেবল পারমাণবিক বিস্ফোরণ বন্ধ করার কথা বলা হলেও পারমাণবিক অস্ত্রধর উন্নত রাষ্ট্রগুলি সি.টি.বি.টি.-কে এড়িয়ে ‘কম্পিউটার সিমুলেশনে’র মাধ্যমে পরীক্ষাগারের চার দেওয়ালের মধ্যেই অনায়াসে গোপন পরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে।

  কিন্তু ভারতের লক্ষ্য হোল একটি প্রকৃত সি.টি.বি.টি. সম্পাদন, কেবল পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ নয়। ভারত চায় একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গঠন করতে। তাই সে পক্ষপাতমূলক সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষরদান করতে পারে না।**

 

সি.টি.বি.টি. প্রস্তাব গৃহীত হলেও অদ্যাবধি কার্যকর হয়নি:

 

কিন্তু ক্লিন্টন প্রশাসন সি.টি.বি.টি.-র বিষয়ে ভারতের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে সি.ডি.-র সুপারিশ ছাড়াই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় চুক্তিটি উত্থাপনের ব্যবস্থা করে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের বর্শাফলক হিসেবে কাজ করেছিল অস্ট্রেলিয়া। রামাকারের খসড়া চুক্তিটিকেই অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য কয়েকটি রাষ্ট্র তাদের যৌথ প্রস্তাব হিসেবে সাধারণ সভায় উত্থাপন করে। ১৯৯৬ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর সাধারণ সভায় সি.টি.বি.টি.- সংক্রান্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছিল ১৫৮টি এবং প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল কেবল ভারত, ভুটান ও লিবিয়া। লেবানন, সিরিয়া, মরিশাস, তানজানিয়া ও কিউবা ভোটদানে বিরত ছিল। পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও একথা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিল যে, সে কেবল তখনই সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষরদান করবে, যদি তা সার্বিক প্রকৃতিসম্পন্ন হয়। 

 বলা বাহুল্য, পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল ভারত। ভারত এই চুক্তিতে স্বাক্ষরদান করলেই কেবল পাকিস্তান স্বাক্ষর দেবে। যাই হোক্,—১৯৯৬ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ৯৪টি রাষ্ট্র সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষর করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ক্লিন্টন ১৯৯৯ সালে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন সেনেটে পেশ করলেও সেনেট তাতে অনুমোদন দিতে অস্বীকার করে। এর থেকেই সি.টি.বি.টি.-র ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত মনোভাব বোঝা যায়। কিন্তু ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার আইনসভায় সি.টি.বি.টি. অনুমোদিত হওয়ার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ঐ দেশের ‘স্টকপাইল স্টিউয়ার্ডশিপ প্রোগ্রাম* অনুযায়ী নির্মাণযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রগুলি ‘নিরাপদ’ ও ‘বিশ্বাসযোগ্য’ কিনা, তা পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরণ ঘটানোর রাস্তা খোলা রাখার উদ্দেশেই সম্ভবতঃ মার্কিন সেনেট সি.টি.বি.টি. অনুমোদন করেনি।

  তাছাড়া, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি.আই.এ.-র বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভে কোনও নিম্নমাত্রার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হলে ভূকম্পন নির্ণায়ক যন্ত্র (Seismograph)-এ তা সবসময় ধরা নাও পড়তে পারে। এমতাবস্থায় সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষর ক’রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভূগর্ভে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাবার পথ বন্ধ ক’রে দিতে আদৌ আগ্রহী নয়। অদ্যাবধি সি.টি.বি.টি. কার্যকর হয়নি। কারণ, এই চুক্তির ১৪নং ধারায় একথা বলা হয়েছে যে, চুক্তির ২নং পরিশিষ্টে যে-৪৪টি রাষ্ট্রের নাম রয়েছে, তার সবগুলিই স্বাক্ষর ও অনুমোদন না করলে চুক্তিটি কার্যকর হবে না। এই ৪৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও ইস্রায়েল। ইস্রায়েল সম্প্রতি সি.টি.বি.টি. অনুমোদন করলেও ভারত ও পাকিস্তান অদ্যাবধি তা করেনি।

সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি

সি.টি.বি.টি.-র নীতি ও উদ্দেশ্য :

 

  চুক্তিটির একটি প্রস্তাবনা, ১৭টি ধারা, ২টি পরিশিষ্ট এবং তদারকি পদ্ধতি সমন্বিত ২টি পরিশিষ্ট-সহ একটি আচরণবিধি (a protocol with two annexes detailing verification procedures) রয়েছে। প্রস্তাবনার মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত নীতি ও লক্ষ্যসমূহ লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাছাড়া, কোন্ রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে চুক্তিটি রচিত হয়েছে, তার বিশ্লেষণও রয়েছে প্রস্তাবনার মধ্যে। প্রস্তাবনায় বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র-হ্রাস এবং চূড়ান্তভাবে নিরস্ত্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ‘একটি অর্থবহ পদক্ষেপ’ (a meaningful step) বলে ঘোষণা করা হয়েছে। * সি.টি.বি.টি.-র ১নং ধারায় সি.টি.বি.টি.-র উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলি যে-কোন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরণ বা অন্যান্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ (any nuclear weapon test explosion or any other nuclear explosion) ঘটাতে পারবে না।

 

চুক্তি রূপায়ণকারী সংস্থাসমূহ:

 

চুক্তির ২নং ধারায় চুক্তি রূপায়ণের এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলিকে পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য সংগঠন (organization) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। [i] চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির একটি সম্মেলন (a Conference of the State Parties), [ii] একটি কার্যনির্বাহী পর্ষদ (an Executive Council) এবং [iii] একটি প্রায়োগিক সচিবালয় (a Technical Secretariat)-কে নিয়ে সি.টি.বি.টি.-র সংগঠন গঠিত হবে। সংগঠনের কার্যালয় গড়ে উঠবে ভিয়েনাতে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (International Atomic Energy Agency— IAEA)-র সঙ্গে গঠনগত দিক থেকে এই সংগঠনের কোন সম্পর্ক না থাকলেও কর্মগত ক্ষেত্রে তারা পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। বছরে একবার সাধারণভাবে সম্মেলনের অধিবেশন বসবে। 

 চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির সম্মেলন সংগঠনের পরিচালক সংস্থা (Governing Body) হিসেবে চুক্তি-সংক্রান্ত নীতিগত বিষয় (treaty related policy issues) এবং চুক্তির রূপায়ণ তদারকি করার দায়িত্ব পালন করবে। কার্যনির্বাহী পর্ষদ প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা হিসেবে কার্য সম্পাদন করবে। এই পর্ষদের সদস্যসংখ্যা হবে ৫১। এই ৫১ জনের মধ্যে আফ্রিকার সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে থেকে ১০ জন, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি থেকে ৭ জন, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান থেকে ৯ জন, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে ৭ জন, উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে ১০ জন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দূরপ্রাচ্য থেকে ৮ জন সদস্য আসবেন। পর্ষদের সদস্যরা সম্মেলন কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। চুক্তির বাস্তব রূপায়ণ পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব প্রায়োগিক সচিবালয়ের হাতে অর্পিত থাকবে। এই ক্ষমতাবলে সচিবালয় আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা (International Monitoring System—IMS)-র তত্ত্বাবধান করবে এবং সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ ক’রে তার ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রদান করবে। সচিবালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে আন্তর্জাতিক তথ্যকেন্দ্র (International Data Centre—IDC) পরিচালনা করা। প্রতিটি চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র চুক্তির দায়দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে ৩নং ধারায় বলা হয়েছে। বিশ্বের কোনও

 

৪ নং ধারা এবং সত্যতা যাচাইয়ের আচরণবিধি (verification protocol) স্থানে পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা হচ্ছে কিনা, সে সম্পর্কে তদারকি ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করেছে। এই তদারকি ব্যবস্থার ৪টি মৌলিক উপাদান (basic অস্ত্র-পরীক্ষা বিষয়ে elements) হোল—[i] আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা (IMS), তদারকি ব্যবস্থা [ii] পরামর্শ ও ব্যাখ্যা প্রদান (consultation and clarification), [iii] ‘সাইট’ পরিদর্শন (on-site inspections) এবং [iv] আস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ (confidence-building measures)। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত চুক্তিটি বলবৎ না হবে, ততদিন পর্যন্ত সত্যতা যাচাইয়ের উপাদানগুলি কার্যকর হবে না। আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হোল—পারমাণবিক বিস্ফোরণ হয়েছে কিনা, তা খুঁজে বের করা এবং তাকে চিহ্নিত করা। 

 ৫০টি প্রাথমিক এবং ১২০টি সহায়ক ভূকম্পন তদারকি কেন্দ্র (seismological monitoring stations)-কে নিয়ে তদারকি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তাছাড়া, এই ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে ৮০টি রেডিও নিউক্লাইড স্টেশন ও ১৬টি রেডিও নিউক্লাইড গবেষণাগার। এগুলির কাজ হবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের সময় তেজস্ক্রিয় কণাগুলি (radioactive particles)-কে চিহ্নিত করা। এছাড়া, আই.এম.এস.-এর থাকবে ৬০টি ইনফ্রা সাউন্ড ও ১১ টি হাইড্রোঅ্যাকুটিক্স (Hydroacoustic) কেন্দ্র। এগুলির কাজ হবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের শব্দ খুঁজে বের করা। আই.এম.এস. যেসব সংবাদ সংগ্রহ করবে, সেগুলিকে সে আন্তর্জাতিক তথ্য কেন্দ্র (IDC)-এর নিকট পাঠিয়ে দেবে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে কেউ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে অন্যান্য রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার কিংবা সংগঠনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে যে, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে। এর পর প্রয়োজন হলে কার্যনির্বাহী পর্ষদ যে-কোন সদস্য-রাষ্ট্রের অনুরোধক্রমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরজমিনে তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে। এরূপ তদন্তের সময়সীমা সাধারণভাবে সর্বাধিক ৬০ দিন হলেও ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে তা অতিরিক্ত ৭০ দিন ধরে চলতে পারে। সি.টি.বি.টি.-র ৫নং ধারায় বলা হয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী কোন রাষ্ট্র চুক্তির শর্তাবলী লঙ্ঘন করলে সম্মেলন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের চুক্তি-প্রদত্ত আধিকারগুলি বাতিল করতে কিংবা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করতে অথবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ‘দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। আবার, চুক্তির প্রয়োগ বা ব্যাখ্যার ব্যাপারে কোন বিরোধ উপস্থিত হলে তার নিষ্পত্তি কীভাবে করা হবে, সে সম্পর্কে ৬নং ধারায় আলোচনা করা হয়েছে।

৭নং ধারায় কীভাবে সি.টি.বি.টি.-র সংশোধন করা যাবে, সে সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। বলা হয়েছে যে, চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পর যে-কোন চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারবে। তবে সি.টি.বি.টি.-র সংশোধনের জন্য একটি চুক্তি সংশোধন সংশোধনী সম্মেলন (An Amendment Conference) আহ্বান করতে হবে। ঐ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিক্রমে যে-কোন সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হতে পারবে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী কোন দেশ নেতিবাচক ভোট দিলে সংশোধনী প্রস্তাবটি গৃহীত হতে পারবে না। এর অর্থ—চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিটি দেশের হাতেই কার্যতঃ ‘ভিটো’ প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে।

 

পুনর্বীক্ষণ সম্মেলন:

 

চুক্তির ৮নং ধারায় বলা হয়েছে যে, সি.টি.বি.টি. কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পরে প্রস্তাবনাসহ চুক্তির শর্তাবলী (provisions) কতখানি কার্যকর হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এই উদ্দেশে পুনর্বীক্ষণ সম্মেলন (Review Conference) আহ্বান করা হবে এবং যে-কোন সদস্য-রাষ্ট্র তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ (peaceful nuclear explosions)-কে আলোচ্য বিষয়সূচীর মধ্যে স্থান দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারে। পুনর্বীক্ষণ সম্মেলন

 

অন্যান্য ব্যবস্থা:

 

৯নং ধারায় বলা হয়েছে যে, সি.টি.বি.টি. অনির্দিষ্টকাল ধরে কার্যকর থাকবে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী কোন দেশ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে তার ‘সর্বোচ্চ স্বার্থ’ (supreme interest) বিনষ্ট   হচ্ছে বলে মনে করলে সে চুক্তির বাইরে চলে যেতে পারে। অবশ্য সেজন্য তাকে অন্ততঃ ৬ মাস পূর্বে নোটিস দিতে হবে। ১০নং ধারায় চুক্তির ‘পরিশিষ্ট আচরণবিধি’ এবং ‘আচরণবিধির পরিশিষ্টগুলি’কে চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ (formal part) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পূর্বে যে-কোন রাষ্ট্র তাতে স্বাক্ষর প্রদান করতে পারবে বলে ১১নং ধারায় বলা হয়েছে। আবার, ১২নং ধারায় বলা হয়েছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজ দেশের সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুযায়ী চুক্তিটি অনুমোদন করবে। চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পূর্বে কোন রাষ্ট্র তাতে সই না করলেও পরবর্তী যেকোন সময়ে তাকে চুক্তি স্বাক্ষরের অধিকার ১৩নং ধারায় প্রদান করা হয়েছে।

 

 

সি.টি.বি.টি. চুক্তি কার্যকর হওয়ার শর্ত:

 

সি.টি.বি.টি.-র ১৪নং ধারাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারায় বলা হয়েছে যে, চুক্তির ২নং পরিশিষ্টে বর্ণিত ৪৪টি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও অনুমোদিত না হলে চুক্তিটি কার্যকর হবে না।

 

এই ৪৪টি রাষ্ট্রের মধ্যে ৫টি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন) যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভারত, ইস্রায়েল ও পাকিস্তান। এই ৪৪টি রাষ্ট্র যেদিন  স্বাক্ষরদান করবে, তার ১৮০ দিন পর থেকে চুক্তিটি কার্যকর হবে। কিন্তু স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করার দিন থেকে ৩ বছরের মধ্যে চুক্তিটি কার্যকর না হলে চুক্তি অনুমোদনকারী রাষ্ট্রগুলি একটি সম্মেলনে সমবেত হবে। সেখানে অনুমোদন প্রক্রিয়া কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, সে বিষয়ে সমবেত সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।

শর্তাবলী সংরক্ষণ:

চুক্তির ১৫নং ধারায় চুক্তির শর্তাবলী সংরক্ষণের অধীন (subject to reservations) নয়  বলে এবং ১৬নং ধারায় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মহাসচিবকে চুক্তির রক্ষাকর্তা (dispository of the treaty) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। চুক্তির ১৭নং ধারায় ৬টি ভাষায় চুক্তিটি প্রকাশ করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মূল্যায়ন (Evaluation) : আপাতদৃষ্টিতে সি.টি.বি.টি.-কে নিরস্ত্রীকরণের একটি সুদৃঢ় পদক্ষেপ বলে মনে করা হলেও বাস্তবে এই চুক্তির বিভিন্ন ধারার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্রগুলির, বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সি.টি.বি.টি.-র বিরুদ্ধে ভারতের বক্তব্য যে যথার্থ, তা নিম্নলিখিত আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় ঃ

 

 

  [১] অস্পষ্টতা-দোষে দুষ্ট `

 

 সি.টি.বি.টি.-র প্রস্তাবনা এবং ১নং ধারাটি* বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বর্তমান চুক্তির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলি পরিভাষা (term)-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে ‘পারমাণবিক অস্ত্রের গুণগত উন্নতি’ (qualitative improvement of nuclear weapons), ‘উন্নত নতুন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র’ (advanced new types of nuclear weapons), ‘পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ’ (nuclear weapon test explosions), ‘অন্যান্য পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ (other nuclear explosions) প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যায়।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফল:

 

 [২] সি.টি.বি.টি.-র মধ্যে ‘পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা’ (test of nuclear weapons) এবং‘পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার’ (use of nuclear weapons )-এর মধ্যে কোন পার্থক্য নিরূপণ করা হয়নি। সি.টি.বি.টি.-র মাধ্যমে এই দু’টির মধ্যে কোন্‌টিকে নিষিদ্ধ করতে চাওয়া হয়েছে, পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না) এন. ডি. জয়প্রকাশ ( N. D. Jayaprakash)-এর মতে, এটি অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি নয় ; বরং তা মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফল মাত্র। এই বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯৭ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ক্লিন্টন কর্তৃক সেনেটের নিকট প্রদত্ত ১নং ধারার ব্যাখ্যার মাধ্যমে।* কিন্তু প্রশ্ন হোল—পারমাণবিক অস্ত্রের ‘পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ’ বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে সি.টি.বি.টি.-র মধ্যে কোন আলোচনা না থাকায় এই ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে কিনা, সে বিষয়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে?

  তাছাড়া, পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের দ্বারা সি.টি.বি.টি.-র শর্তাবলী ভঙ্গ করা হয়েছে কিনা, তার বিচারও হবে কীভাবে? মজার ব্যাপার হোল—পূর্বোক্ত মার্কিন ব্যাখ্যার ১০ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, সি.টি.বি.টি.-র ১নং ধারা কোনভাবেই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলির পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ কিংবা অন্য কোন ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাবার সামর্থ্যের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে না।** এর অর্থ হোল—সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্রপরীক্ষা রোধে সম্মত হওয়ার পরেও চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলি পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষামূলক বা অন্য যে-কোন ধরনের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবে। মার্কিন প্রশাসনের চোখে চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির এই ধরনের আচরণ চুক্তিভঙ্গ নয়! বলা বাহুল্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিভিন্ন ধারাকে নিজের সুবিধা ও ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা প্রদানের উদ্দেশেই চুক্তির মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন পরিভাষা (term)-কে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা না করার ব্যবস্থা করেছিল।

 

পরীক্ষাগারে গোপন বিস্ফোরণ ঘটানোর সুযোগ:

 

[৩] (সি.টি.বি.টি.-র মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণ পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হলেও ‘কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষাগারে বিস্ফোরণ ঘটাবার ওপর কোন বাধা-নিষেধ  আরোপ করা হয়নি। ফলে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি অতীতে সংঘটিত বিস্ফোরণগুলি থেকে সংগৃহীত পর্যাপ্ত তথ্যের সাহায্যে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষাগারের চার-দেওয়ালের মধ্যেই পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। এইভাবে সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও তারা ভবিষ্যতে উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের জন্য অনায়াসেই গোপন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে। তাই সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষর করার পূর্বে ফ্রান্স বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। 

 ঐসব বিস্ফোরণের উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, যা দিয়ে ভবিষ্যতে কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে গবেষণা চালানো সম্ভব হবে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ১৯৯৫ সালের মে মাসে রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ‘স্টকপাইল স্টিউয়ার্ডশিপ অ্যান্ড মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম’ (Stockpile Stewardship and Maintenance Programme — SSMP) গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে ভূগর্ভে পারমাণবিক বিস্ফোরণ না ঘটিয়েও গবেষণার মাধ্যমে পরীক্ষাগারে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা সম্ভব হবে। এই সব কারণে ভারত সি.টি.বি.টি.-র তীব্র বিরোধিতা করেছিল।*

 

পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির মজুত পারমাণবিক অস্ত্র-হ্রাসের কথা বলা হয়নি:

 

[৪] বর্তমান সি.টি.বি.টি.-র প্রধান উদ্দেশ্য হোল গঠিত ‘পারমাণবিক ক্লাবে’ নতুন সদস্যের অন্তর্ভুক্তির পথ রোধ করা। দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন চুক্তিতে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির মজুত পারমাণবিক অস্ত্র-হ্রাসের কথা বলা হয়নি যুক্তরাষ্ট্র এই অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুতঃ, সি.টি.বি.টি.-র মধ্যে স্বীকৃত পাঁচটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মজুত পারমাণবিক অস্ত্রহ্রাসের কোন কথা আদৌ বলা হয়নি। এর প্রতিবাদে ভারত যখন সি.টি.বি.টি. এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে এক সূত্রে গ্রথিত করার দাবি জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখনই তার চরম বিরোধিতা করেছে। মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি হোল—এই দু’টি বিষয়কে এক ক’রে ফেলে ভারত সি.টি.বি.টি.-কে কার্যকর করার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ক’রে চলেছে। এই অপরাধের জন্য ভারত ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা (economic sanctions) গ্রহণের কথা মার্কিন প্রশাসন ঘোষণা করেছে। অথচ নিজের আধিপত্যকে বিশ্বব্যাপী সুদৃঢ় করার উদ্দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ন্যাশনাল মিসাইল ডিফেন্স’** (National Missile Defence—NMD) নামক একটি ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। মার্কিন কংগ্রেস এই কর্মসূচী কার্যকর করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছে। মার্কিন প্রশাসনের ঘোষণা হোল – ২০০৫ সালের মধ্যেই এন.এম.ডি. ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ সম্পূর্ণ হবে। এই কর্মসূচী রূপায়ণের জন্য আগামী ২০ বছরে ক্লিন্টন-প্রশাসন ৬০ বিলিয়ন (অর্থাৎ ৬,০০০ কোটি ডলার) বরাদ্দ করলেও বুশ-প্রশাসন বরাদ্দের পরিমাণ অনেক বেশি বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার অর্থই হবে রাশিয়ার সঙ্গে ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত ‘অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল’ (ABM) চুক্তির নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করা। মার্কিন চুক্তিটির সংশোধন করতে বিশেষ আগ্রহী। কিন্তু

 

রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিন তা করতে একেবারেই রাজী নন। তিনি এই বলে হুমকি দিয়েছেন যে, এ.বি.এম. চুক্তির পরিবর্তন করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশি চাপ সৃষ্টি করলে রাশিয়া ‘স্টার্ট-২’-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যাবতীয় চুক্তি বাতিল করে দেবে। একই সঙ্গে পুতিন চীনকে সঙ্গে পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০০ সালের জুলাই মাসে চীন সফরে গিয়ে তিনি চীনের রাষ্ট্রপতি জিয়া জেমিনের সঙ্গে যৌথভাবে মার্কিন এন.এম.ডি. কর্মসূচীর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছেন। এদিকে এন.এম.ডি.-তে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি ছাড়াও পরিবেশবাদীদের সংগঠন ‘গ্রীন পিস’ এই কর্মসূচীর বিরোধিতা করেছে। ২০০০ সালের জুলাই মাসে এন.এম.ডি.-সংক্রান্ত পরীক্ষা যেদিন সংঘটিত হওয়ার কথা, তার আগের দিন ৫০ জন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ক্লিন্টনের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেন। তাতে বলা হয় যে, এন.এম.ডি. ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা নিরাপত্তা দিলেও তার ফলে যে-ভয়ংকর অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে, তা সমগ্র বিশ্বের বিপদ ডেকে আনতে পারে। সুতরাং বলা যায়, তথাকথিত সি.টি.বি.টি.-র প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে এন.পি.টি., সি.টি.বি.টি. প্রভৃতির কথা বললেও বাস্তবে নিজের সঞ্চিত পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস কিংবা পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করতে আদৌ আগ্রহী নয়। 

 

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর প্রত্যক্ষ আক্রমণ 

 

[৫] বর্তমান সি.টি.বি.টি.-র বিরুদ্ধে ভারতের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হোল—চুক্তির ১৪নং ধারাটিতে চুক্তি স্বাক্ষরে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রকেও বলপূর্বক স্বাক্ষরদান (Entry Into Force)-এর কথা বলা হয়েছে। এর ফলে ভারতের মতো কোন দেশ  চুক্তিটিকে বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক বলে মনে করলেও ৩ বছরের মধ্যে চুক্তি মেনে নিতে তাকে বাধ্য করা হবে। অথচ আন্তর্জাতিক আইনানুসারে কোন দেশকে জোর করে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করা যায় না। তাই ভারত চুক্তিটিকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্বের ওপর প্রত্যক্ষ আক্রমণ বলে মনে করে। কোন রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারি করতে রাজী না হলে সি.টি.বি.টি.-র এই ধারাটি প্রয়োগ করে তার সার্বভৌমিকতায় হস্তক্ষেপ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী অপচেষ্টার আরেকটি প্রমাণ হোল — সি.টি.বি.টি.-র সঙ্গে সঙ্গে ‘ফিসাইল মেটিরিয়ালস কাট্ অফ্ ট্রিটি’ (Fissile Materials Cut off Treaty—FMCT) ভারতের মতো দেশগুলির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাপিয়ে দিতে চাইছে। এই চুক্তিটি হোল সহজে বিভাজনযোগ্য পদার্থের সরবরাহ বন্ধ করার এমন এক চুক্তি, যা ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মতো মৌল পদার্থগুলির ওপর পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী ক’রে তুলবে। এটিও একটি বৈষম্যমূলক চুক্তি। ভারত সরকার সঙ্গত কারণেই সি.টি.বি.টি.-র বিরোধিতা করেছেন। তাই দলমত নির্বিশেষে ভারতীয় জনগণের সমর্থন ভারত সরকারের প্রতি রয়েছে।

 

সাম্প্রতিককালে সি.টি.বি.টি. বিষয়ে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন

 

কিন্তু বি. জে. পি.-র নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সাম্প্রতিককালে সি.টি.বি.টি. নিয়ে ভারতের এতদিনকার অবস্থানের পরিবর্তন সাধনের ব্যাপারে যে আগ্রহী, তার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতকে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলে ভারত সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষর করতে আপত্তি করবে না—এমন ইঙ্গিতও   পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছে।বিশেষতঃ, ১৯৯৮ সালের মে মাসে পোখরানে দ্বিতীয়বার পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর থেকে ভারত সরকার পারমাণবিক অস্ত্র-পরীক্ষা স্থগিত (moratorium) রাখার কথা ঘোষণা করেছে। বর্তমান পররাষ্ট্র মন্ত্রী যশোবন্ত সিং-এর সাম্প্রতিক

 

বক্তব্য থেকেই একথা প্রমাণিত হয়।* এর অর্থ—ভারত এতদিন পর্যন্ত যে-সার্বিক পারমাণবিক বলা বাহুল্য, এর ফলে বিশ্ব-রাজনীতিতে ভারতের মান-মর্যাদা যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষুণ্ন হবে।

 

নিরস্ত্রীকরণের কথা বলে এসেছিল, বর্তমান সরকার তার থেকে সরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার জন্য সি.টি.বি.টি.-তে সই করতেও দ্বিধান্বিত নয়।(বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সহস্রাব্দ বৈঠকে ভাষণদানের সময় এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, সি.টি.বি.টি. কার্যকর করার পথে ভারত বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তবে অন্য সব দেশকেও কোনরূপ পূর্বশর্ত ছাড়াই এই চুক্তির চতুর্দশ ধারাটি অনুমোদন করতে হবে। তিনি একথাও জানান যে, সি.টি.বি.টি.-তে স্বাক্ষরদানের ব্যাপারে ভারতের জনগণ একমত হলেই ভারত এই চুক্তির শরিক হবে। প্রধানমন্ত্রীর এরূপ বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এরূপ ঘোষণার মাধ্যমে ভারতের এতদিনকার পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন যে অনিবার্য, তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বস্তুতঃ, ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা’ (nuclear security) প্রতিষ্ঠার নামে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ যে-এন. এম. ডি. কর্মসূচীকে বাস্তবায়িত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, রাশিয়া, চীন, এমনকি ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের জাতীয় স্বার্থে তার বিরোধিতা করতে পিছপা হয়নি। কিন্তু বাজপেয়ী সরকার এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ (a major positive step) হিসেবে চিহ্নিত ক’রে তার প্রতি ভারতের আন্তরিক সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন। কেউ কেউ কেন্দ্রীয় সরকারের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গীকে ভারতের জাতীয় স্বার্থে গৃহীত ‘বাস্তবধর্মী’ (pragmatic) দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। কিন্তু বাজপেয়ীসরকারের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সার্বিক পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা রোধ চুক্তি:

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *