বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা আলোচনা করো – টেকজ সঞ্জীব|The role of the World Trade Organization

 বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা আলোচনা করো – টেকজ সঞ্জীব|The role of the World Trade Organization

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা

বিশ্ব-বাণিজ্য-সংস্থার-ভূমিকা-আলোচনা-করো-টেকজ-সঞ্জীব-The-role-of-the-World-Trade-Organization

 

বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা

 

  বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকাকে কেন্দ্র ক’রে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কারণ, এই সংস্থা উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষিত বহুজাতিক বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থাসংক্রান্ত নানাবিধ চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য সংস্থাগুলির স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এইসব দেশ ও সংস্থা স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আই.এম.এফ., বিশ্ব-ব্যাঙ্ক প্রভৃতির মতো ঋণদানকারী সংস্থাকে যেমন কাজে লাগায়, ঠিক তেমনি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির বাজার দখলের জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গড়ে তুলেছে।

  লক্ষণীয় বিষয় হোল— বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক অনুসৃত বিধিগুলি ‘গ্যাট’, ‘বহুপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তিসমূহ’ (Multilateral Trade Agreements — MTA) প্রভৃতির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তির মধ্যে বর্তমান রয়েছে। গ্যাট ও এম.টি.এ.-র কিছু কিছু শর্তের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে উরুগুয়ে পর্যায়ের বৈঠকের শেষে সম্পাদিত চুক্তিসমূহের মাধ্যমে সমবেত রাষ্ট্রগুলি এম.টি.এ.-র শর্তাবলী মেনে নেয়। তার ফলে ঐ বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটে। গ্যাট-এর উরুগুয়ে পর্যায়ের বৈঠক শেষে গুরুত্বপূর্ণ ২৮টি বিষয়ে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। এগুলির মধ্যে ২৫টি ছিল পণ্য-বাণিজ্য-সংক্রান্ত এবং ৩টি ছিল পরিষেবা, বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও মেধা সুরক্ষা অধিকার-সংক্রান্ত চুক্তি। 

 এগুলির ভিত্তিতেই বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা তার কার্যাবলী সম্পাদন করে। এইভাবে

 [i] পণ্য—বাণিজ্য-সংক্রান্ত বহুপাক্ষিক চুক্তি (Multilateral Agreements on Trade in Goods ),

 [ii] পরিষেবা-বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (General Agreement on Trade in Services), 

[iii] বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার-সংক্রান্ত চুক্তি (Agreement on TRIPs), 

[iv] বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে নিয়মাবলী ও পদ্ধতিসমূহ 

 [v] বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থাদি বিষয়ক চুক্তি (Agreement on Trade Related Investment Measures – TRIMs),

 [vi] বাণিজ্য নীতি পুনর্বীক্ষণ কার্য সম্পাদন প্রক্রিয়া (Trade Policy Review Mechanism-TPRM) প্রভৃতি ।

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা-সংক্রান্ত চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। বস্তুতঃ, ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মুক্ত-বাজার ও অবাধ বাণিজ্যের পরিধি সম্প্রসারণের জন্য যে-প্রচেষ্টা শুরু হয়, তার ফলশ্রুতি হিসেবে ‘গ্যাটস্’ (General Agreements on Trade in Services — GATS) নামে নতুন একটি চুক্তি আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই কার্যকর হতে চলেছে। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই এই চুক্তি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

  এই চুক্তির মূল কথা হোল — মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পরিষেবাকে অবাধ বাণিজ্য ও মুক্ত-বাজারের আওতায় আনা হবে। এখানে কোন রকম সরকারী ভর্তুকি ও প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। কোন্ বিষয়ে জনসাধারণকে কী পরিষেবা প্রদান করা হবে, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব থাকবে একচেটিয়া বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি কর্তৃক নিযুক্ত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির হাতে।

 

উপরি-উক্ত বিষয়গুলির মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা:

কৃষি-সংক্রান্ত চুক্তির ফলে কৃষি-নির্ভর দেশগুলির ক্রমবর্ধমান সঙ্কট :

 

[১] প্রথমেই আসা যাক কৃষি-সংক্রান্ত চুক্তির কথায়। এই চুক্তির ফলে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল কৃষি-নির্ভর দেশগুলি সঙ্কটের মধ্যে পড়ে। ঐসব দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির কৃষি জন্য যে-ভর্তুকি প্রদান করা হয়, নতুন চুক্তিতে তা হ্রাস করার এবং বাধ্যতামূলকভাবে কৃষিপণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ভর্তুকির পরিমাণ মোট উৎপাদন-মূল্যের ১০%-এর বেশি হবে না। এর ফলে ভারতের মতো দেশগুলি সমস্যায় পড়বে। তবে এই চুক্তির সমর্থকরা মনে করেন যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে ভারতের কোন অসুবিধা হবে না। কারণ, ভারতে কৃষিক্ষেত্রে ভর্তুকির পরিমাণ ১০%-এর কম। কিন্তু এই যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ, বিদ্যুৎ এবং ভূগর্ভস্থ জলের হিসেব ধরলে ভারতে কৃষিখাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১০%-এর অনেক বেশি হবে। তাছাড়া, বিকাশশীল দেশগুলি যাতে কৃষিতে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য ঐ চুক্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে কৃষিপণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ— ভারতের মতো দেশগুলি কৃষিতে স্বনির্ভর হলেও তাকে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি কৃষিপণ্যের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রথমে ২% এবং পরে ৩% বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এইভাবে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থাকে ব্যবহার ক’রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে ঐসব উন্নত দেশের লাভ হলেও স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল কৃষি-নির্ভর দেশগুলি যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা:

ট্রিম্সের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্ষতিসাধন:

 

 [২] বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য সম্প্রসারণের নীতি গ্রহণ করেছে। ‘গ্যাট’-এর উরুগুয়ে পর্যায়ের বৈঠক শেষে সম্পাদিত চুক্তিগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিনিয়োগ ব্যবস্থা বা ট্রিম্‌স্‌। মূলতঃ বৈদেশিক বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নিয়মকানুন ‘ট্রিম্‌স্‌’ নামে পরিচিত। ট্রিম্‌ম্সে বিদেশী পুঁজিকে যে-কোন সদস্য-দেশে কেবল প্রবেশাধিকার প্রদানের কথাই বলা হয়নি, সেই সঙ্গে বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর বিশেষ কোন শর্ত আরোপ বা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা চলবে না বলেও বলা হয়েছে। এর ফলে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলি উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পুঁজিপতিদের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হবে। এতদিন পর্যন্ত ভারতের মতো দেশগুলিতে বিদেশী কোম্পানীগুলির ওপর নানাধরনের বাধা-নিষেধ আরোপ করা হোত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঐসব কোম্পানীকে দেশের মধ্যে কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে; সংশ্লিষ্ট কোম্পানীতে যেসব ইঞ্জিনিয়ার থাকবেন, তাঁদের মধ্যে অন্ততঃ ৩৩% ভারতীয় হবেন ; উৎপাদিত দ্রব্য সামগ্রীর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভারতে বিক্রি করতে হবে; লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ ভারতে ব্যয় করতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু ট্রিম্‌ম্সে স্বাক্ষরদানের পর বিদেশী কোম্পানীগুলির ওপর থেকে এইসব বাধা-নিষেধ কার্যতঃ উঠে যাবে।

 

 

ট্রিপস’ চুক্তি ও তার কুফল:

 

[৩] গ্যাট চুক্তির মাধ্যমে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি এবং ঐসব দেশের বহুজাতিক সংস্থাগুলি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার দখলই করেনি, সেই সঙ্গে স্বল্পোন্নত বা উন্নতিকামী দেশগুলি ভবিষ্যতে যাতে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তাদের  প্রতিযােগী হিসেবে আবির্ভূত হতে না পারে তারও ব্যবস্থা করে। এই উদ্দেশ্য নিয়েই বাণিজ্য-সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব অধিকার বা ‘ট্রিপস’ (TRIPS) চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করা হয়। এই চুক্তির মূল কথা হােল—যে-কোন উদ্ভাবকের স্বীকৃতিদান এবং তার উদ্ভাবনের জন্য তিনি যাতে আর্থিক প্রতিদান পান, তা সুরক্ষিত করা। মেধাস্বত্ব নানা ধরনের হতে পারে, যথা কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পেটেন্ট ইত্যাদি। কপিরাইট বলতে বােঝায় কোন লেখক, গায়ক বা শিল্পীর কোনকিছু সৃষ্টিকে তার অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। 

 

 ট্রিপস্ চুক্তিতে কপিরাইটের ব্যাপারে বার্নে কনভেনশন (Berne Convention)-কে অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। ট্রেডমার্ক বলতে কোন বাণিজ্যিক নাম বা চিহ্নকে বােঝায়। প্রত্যেক বড় কোম্পানীরই নামের একটি মাহাত্ম্য রয়েছে এবং তাদের চিহ্ন বা ‘লােগাে’ দেখে মানুষ সহজেই কোম্পানীটিকে চিহ্নিত করতে পারে। এই নাম বা চিহ্ন বিক্রি করেই কোম্পানী কয়েক হাজার কোটি ডলার উপার্জন করতে পারে। আবার, পেটেন্ট বলতে স্বত্বাধিকারকে বােঝায়। পেটেন্ট ব্যবস্থায় কোন গবেষক, প্রযুক্তিবিদ বা বৈজ্ঞানিক তার আবিষ্কার বা উদ্ভাবিত পণ্য এবং সেই পণ্য তৈরির পদ্ধতির জন্য আইনগতভাবে বিশেষাধিকার লাভ করেন। তিনি বা তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ তা উৎপাদন করতে পারবেন না। তবে সাধারণতঃ ৫-১৫ বছরের জন্য তিনি এই অধিকার ভােগ করেন। ভারত ১৯৭০ সালে একটি পেটেন্ট আইন প্রণয়ন করে।

  এই আইন অনুযায়ী একজন আবিষ্কারক বা উদ্ভাবককে দুধরনের পেটেন্ট দেওয়া হয়, যথা—[i] পণ্য-পেটেন্ট এবং [i] পদ্ধতি-পেটেন্ট। উভয় ক্ষেত্রেই পেটেন্টের সাধারণ সময়সীমা হােল ১৪ বছর। খাদ্য, ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যের মতাে কিছু জিনিসকে পণ্য-পেটেন্টের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে এবং এসব ক্ষেত্রে পদ্ধতি-পেটেন্ট দেওয়া হলেও তা কোনমতেই ৫-৭ বছরের বেশি সময়ের জন্য প্রদান করা হয় না। তবে সজীব বস্তুর ওপর পেটেন্টের কোন ব্যবস্থা ১৯৭০ সালের আইনে রাখা হয়নি। এই পেটেন্ট আইনের ফলে ভারতের কৃষিক্ষেত্র ও ওষুধ উৎপাদন শিল্প সব থেকে বেশি উপকৃত হয়েছিল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী একটি মৌলিক ওষুধ আবিষ্কারের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য ভারতের নেই। তাই ভারতীয় কোম্পানীগুলি বিদেশ থেকে কোন নতুন ওষুধ এনে নিজেদের গবেষণাগারে তা বিশ্লেষণ করে উৎপাদনের বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করে থাকে এবং সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে উৎপাদন করার ফলে বিশ্বের মধ্যে ভারতের ওষুধের দাম সব থেকে কম। একই কথা প্রযােজ্য কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে। কিন্তু ট্রিপস চুক্তির ফলে এই সুযোেগ ভারতের হাতছাড়া হতে চলেছে। ট্রিপ অনুযায়ী পণ্য ও পদ্ধতি উভয় ক্ষেত্রেই পেটেন্টের সময়সীমা হবে ২০ বছর। পণ্য-পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর একই পণ্যের ওপর আবার পদ্ধতি-পেটেন্টের সুযােগ নেওয়া যাবে। অর্থাৎ একবার কোন একটি জিনিস আবিষ্কৃত হলে অন্ততঃ ৪০ বছর তার অন্য কোন উন্নত মডেল বাজারে আসবে না। এর ফলে লাভবান হবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির বহুজাতিক সংস্থাগুলি। কারণ, মৌলিক গবেষণার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়ােগ করার সামর্থ্য কেবল তাদেরই রয়েছে। অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ঐসব জিনিস আমদানি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে। তাছাড়া, ট্রিপস চুক্তির এই অংশে সজীব বস্তুর ওপরেও পেটেন্ট নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে শস্যবীজও পেটেন্টের আওতায় এসে যাবে। ফলে ভারতের কৃষি-বিজ্ঞানীরা এতদিন বিদেশ থেকে আমদানি করা শস্যবীজ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তাকে এদেশের জল-হাওয়ার উপযােগী করে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

 বলা বাহুল্য, কৃষি-বিজ্ঞানীদের এই সাফল্যই ভারতকে খাদ্যে প্রায় স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ট্রিপস চুক্তি ভারতসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির খাদ্য সঙ্কট বাড়িয়ে দেবে। কারণ, নিত্যনতুন বীজ তৈরি ও বীজের সংকরায়ন তাে দূরের কথা, চাষীরা এবার তাদের বীজ সংরক্ষণের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে। বহুজাতিক সংস্থাগুলি যে-বিশাল বীজ-ভাণ্ডার তৈরি করেছে, তা একবারের বেশি দু’বার ব্যবহার করা যাবে না। পূর্বোক্ত চুক্তি অনুযায়ী আমাদের পেটেন্ট আইন ২০০৪ সালের ১লা জানুয়ারির মধ্যে সংশােধন করতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভারত সরকার সম্প্রতি ভারতের পেটেন্ট আইনে কিছু সংশােধনী সংযােজন করেছে। তাছাড়া, ২০০০ সালের শেষ দিকে পেটেন্ট আইন সংশােধনের জন্য পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করা হয়েছে। এইভাবে ট্রিপস-এর মাধ্যমে মেধাস্বত্বের তথাকথিত আন্তর্জাতিকীকরণের ফলে স্বল্পোন্নত ও উন্নতিকামী দেশগুলির চরম সর্বনাশের পথ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা:

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরােধ নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকার প্রকৃত স্বরূপ:

 

[৪] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্বসূরি গ্যাটের মধ্যে বিরােধ নিষ্পত্তির জন্য কোন সংগঠন ছিল না। কারণ, গ্যাট নিজেই কোন সংগঠন হিসেবে কাজ করত না। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্যতম প্রধান কাজ হােল বিরােধ নিষ্পত্তি করা। সেই উদ্দেশে একটি  বিরােধ নিষ্পত্তিকারী সংস্থা সে গঠন করেছে। বাণিজ্য-সংক্রান্ত কোন  বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিরােধ বাধলে এই সংস্থা প্রথমে আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে তা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে পরামর্শ দেয়। কিন্তু তা করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিচারের দায়িত্ব এই সংস্থা নিজের হাতে তুলে নেয়। লক্ষণীয় বিষয় হােল—এই সংস্থার কোন নির্দিষ্ট বিচারকমণ্ডলী নেই। 

 বিশেষ বিশেষ বিরােধ মীমাংসার জন্য সংস্থা তার সদস্য-দেশগুলির মধ্য থেকে কয়েকজন প্রতিনিধির একটি প্যানেল তৈরি করে। এই প্যানেলভুক্ত প্রতিনিধিরাই বিরােধ নিষ্পত্তির জন্য শুনানি করেন ও রায় দেন। উন্নত কোন দেশের সঙ্গে বিকাশশীল কোন দেশের বিরোেধ বাধলে বিকাশশীল দেশটি চাইলে প্যানেলের মধ্যে বিকাশশীল দেশসমূহের প্রতিনিধিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিরােধ নিষ্পত্তির ব্যাপারে ঐ সংস্থা কীরূপ ভূমিকা পালন করছে, তা দু’একটি উদাহরণের সাহায্যে আলােচনা করা যেতে পারে। ১৯৯৫ সালের পর থেকে ভারতকে বেশ কয়েকবার বিরােধ নিষ্পত্তিকারী সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিরােধী পক্ষ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

 ১৯৯৫ সালের ১৪ই জুলাই মার্কিন সরকার সে দেশে ভারতীয় পশম বস্ত্র রপ্তানির ওপর পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পুরুষদের জ্যাকেট ও শার্ট এবং মেয়েদের ব্লাউজ ও জ্যাকেট বছরে কতগুলি রপ্তানি করা হবে, তার পরিমাণ মার্কিন সরকার বেঁধে দেয়। তিন বছরের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে বলে ঘােষণা করা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ভারতীয় বস্ত্রের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আমেরিকার বস্ত্রশিল্পকে সঙ্কটের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হােল—মুক্ত বাণিজ্য নীতির প্রধান প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্যের কথা বললেও নিজের দেশের ক্ষেত্রে তার বিপরীত নীতি অনুসরণ করতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া, ভারতীয় পশম বস্ত্র রপ্তানির ফলে মার্কিন বস্ত্রশিল্পের সঙ্কট আদৌ আসেনি। কারণ, ভারত সস্তা মানের সাধারণ পশম বস্ত্র রপ্তানি করে ; আর মার্কিন পশম বস্ত্র অতি উন্নত মানের। তাছাড়া, ভারত যে-পরিমাণ পশম বস্ত্র রপ্তানি করে, তার ফলে মার্কিন বস্ত্রশিল্পে সঙ্কট আসার কথাই নয়।

  ১৯৯৪ সালে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৫ কোটি টাকার পশম বস্ত্র। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ভারত বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থার কাছে অভিযোগ করলে প্রায় ১৮ মাস পরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি খারিজ করে দেয়। ১৯৯৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের চিংড়ি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল যে, সামুদ্রিক কচ্ছপের সুরক্ষার যথেষ্ট ব্যবস্থা না ক’রেই ভারতে চিংড়ির চাষ করা হচ্ছে। অথচ একথা সর্বজনবিদিত যে, চিংড়ি রপ্তানি হোল ভারত সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম প্রধান উপায়। 

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ জানালে তা ভারতের পক্ষেই রায় দেয়। এইভাবে নানা অছিলায় ভারতের মতো দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু ক’রে দেওয়ার চক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত চালিয়ে যাচ্ছে। এই চক্রান্তের অন্য একটি উদাহরণ হোল বাসমতি চালের পেটেন্ট নেওয়া। বাসমতি ধানের আদি জন্মভূমি হোল হিমালয়ের তরাই অঞ্চল, দেরাদুন এবং বর্তমান পাকিস্তানের শিয়ালকোট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাইটেক্ কোম্পানী ১৯৯৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর সেখানকার পেটেন্ট অফিস থেকে বাসমতি চালের পেটেন্ট লাভ করে। এই চাল রপ্তানি ক’রে ভারত বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আয় করে। বাসমতি চালের পেটেন্ট লাভ করার পর ঐ কোম্পানী ভারতের রপ্তানি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। অন্যান্য দেশে রাইস্টেকের পেটেন্ট অধিকার খর্ব ক’রে দেওয়ার জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা ‘কৃষিজাত দ্রব্যাদি বিকাশ কর্তৃপক্ষ’ (Agricultural Products Development Authority) একাধিক মামলা লড়েছে। 

 গ্রীসে ভারত জয়লাভ করেছে। ব্রিটেন এবং সৌদি আরব ভারত ও পাকিস্তানের বাসমতিকেই স্বীকৃতি দিয়েছে, রাইস্‌স্টেকের তথাকথিত বাসমতিকে নয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হোল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অফিসে বাসমতি নিয়ে রাইটেকের বিরুদ্ধে পাকিস্তান অভিযোগ দায়ের করলেও ভারত সরকার এ ব্যাপারে অতি সম্প্রতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেছে। এইসব ঘটনা থেকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির বুভুক্ষার হাত থেকে বিকাশশীল দেশগুলিকে রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু এই ধারণা আদৌ সত্য নয়। কারণ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ভারতের পশম বস্ত্ৰ রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা খারিজ করতে সময় নিয়েছিল দেড় বছর। এই দেড় বছরে ভারতের বিশ্ব বাজারের একটি অংশ যেমন নষ্ট হয়ে গেছে, তেমনি উৎপাদকদের মনোবলও যথেষ্ট ভেঙে গেছে। 

 তাছাড়া, উন্নয়নশীল দেশগুলির সপক্ষে রায় দিয়ে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলতে চাইছে। ভবিষ্যতে তার প্রকৃত রূপ যে প্রকাশিত হবে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

 

‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’-এর অভিযোগ:

 

আসলে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা হোল একটি বৈষম্যমূলক সংস্থা। এর কাজ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি এবং ঐসব দেশের বহুজাতিক সংস্থাগুলির স্বার্থ রক্ষা করা। এই সংস্থা যেসব বিধি  নিষেধ ও নিয়মাবলী রচনা করেছে, তার প্রত্যেকটির লক্ষ্য হোল স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিকে শোষণ করা। এখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বয়স হোল পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সহায়তায় ধনশালী দেশগুলি অধিকতর ধনশালী এবং দরিদ্র দেশগুলি অধিকতর দরিদ্র হয়েছে। তাই বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অন্যতম নেটওয়ার্ক ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’ (Global Exchange) বৈষম্যমূলক বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার বিরোধিতা করার জন্য বিশ্বের সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিককে আহ্বান জানিয়েছে। 

 তাদের বক্তব্য হোল : [i] বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থা কোন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু সমাজের সর্বক্ষেত্রেই এদের প্রভাব বিদ্যমান। বহুজাতিক সংস্থাগুলি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইন তৈরি করেছে এবং তারাই একে পরিচালনা করছে। উপভােক্তা, শ্রমিক সংগঠন, পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির কোন সুপরামর্শই এই সংস্থা অদ্যাবধি গ্রহণ করেনি।

  [ii] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হােল আসলে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত আদালত। যে-কোন বিরােধ নিষ্পত্তির দায়িত্বে রয়েছেন তিন জন আমলা। তারা যদি কোন সদস্য-দেশের সার্বভৌম আইনকে অবাধ বাণিজ্যের পথে বাধা বলে মনে করেন, তাহলে সেই আইন বাতিল করতে সদস্য-রাষ্ট্রগুলি বাধ্য। এর ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির রাজনৈতিক সার্বভৌমিকতাও আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

  [iii] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা মানবাধিকার ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারকে খর্ব করছে। কারণ, বাণিজ্য-ক্ষেত্রে সুবিধা লাভের উদ্দেশে বহুজাতিক সংস্থাগুলি শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারের ওপর আঘাত হানলেও তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। কারণ, তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরােপের কোন ক্ষমতা এই সংস্থার নেই।

 [iv] ট্রিপস চুক্তি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানীগুলির স্বার্থরক্ষার জন্যই সম্পাদিত হয়েছে। কারণ, এই চুক্তি অনুযায়ী তৈরি ওষুধের যা দাম হবে, তাতে বিশ্বের অর্ধেক মানুষের পক্ষে সেই দামে ওষুধ ক্রয় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে তাদের কার্যতঃ বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

  এগুলি হােল—[ক] জেনেরিক ব্র্যান্ডের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, [খ] চিকিৎসকদের ওষুধ কোম্পানীগুলি যে-সুবিধা দেয়, তা নিষিদ্ধকরণ এবং [গ] অন্য দেশ থেকে সস্তায় ওষুধ আমদানি। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এইসব ব্যবস্থা গ্রহণের তীব্র বিরােধিতা করেছে। 

 [v] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা স্থানীয় উন্নয়নের এবং দরিদ্র দেশগুলির উন্নতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। যেসব কোম্পানী স্থানীয় শ্রমিক, কাঁচামাল এবং পরিবেশ-সহ প্রযুক্তি ও উপাদান ব্যবহার করে, বহু উন্নয়নশীল দেশ তাদের কিছু বাড়তি সুবিধা প্রদান করে। বর্তমানে যেসব দেশ শিল্পোন্নত বলে বিবেচিত হয়, এক সময় তারা তাদের সদ্যোজাত দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ প্রদানের জন্য সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এসব কিছুরই বিরােধী।

  [vi] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হােল বৈষম্য বৃদ্ধিকারী একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের ২০% ধনশালী মানুষ বিশ্বের মােট সম্পদের ৮৬% ভােগ করে এবং অবশিষ্ট ৮০% মানুষের ভাগে থাকে মাত্র ১৪%। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যকলাপের ফলে এই বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে।

  [vii] এই সংস্থাকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের পথে প্রধান বাধা বলে মনে করা হয়। কারণ, কোন দেশের জাতীয় সরকার জন-স্বার্থে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পূর্বাহেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অনুমােদন প্রয়ােজন।

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরুদ্ধে উন্নত দেশগুলির বিরুদ্ধে অভিযােগ:

 

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রথম বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশগুলি এই অভিযোেগ উত্থাপন করে যে, উরুগুয়ে চুক্তির পরবর্তী সময়ে তারা তাদের আমদানি শুল্কের হার যথেষ্ট হ্রাস করলেও উন্নত দেশগুলি উন্নয়নশীল দেশগুলির কিন্তু তা করেনি। বস্তুতঃ, ঐ সম্মেলনে  নিজেদের বাজার উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে উন্মুক্ত না করে দেওয়ার, অন্যায়ভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির বাজার দখল করে নেওয়ার এবং ডাম্পিং’-এর অভিযােগ তােলা হয়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এরূপ নেতিবাচক ভূমিকার বিরুদ্ধে কেবল তৃতীয় বিশ্বের মানুষই নয়, উন্নত দুনিয়ার নাগরিকরাও প্রতিবাদে সােচ্চার হয়ে উঠেছেন। খােদ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮% মানুষ অবাধ বাণিজ্যকে সে দেশের অর্থনীতির পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকর বলে মনে করেন।

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভূমিকা:

সিয়াটেল বৈঠক ও বিশ্বায়ন বিরােধী বিক্ষোভ প্রদর্শন:

 

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সিয়াটেলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শনের কারণে ভেস্তে যায়। সিয়াটেল বৈঠকে উত্থাপিত অমীমাংসিত বিষয়গুলি নিয়ে কেবল উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির  মধ্যেই নয়, উন্নত দেশগুলির নিজেদের মধ্যেও, বিশেষতঃ মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরােপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মতবিরােধ তুঙ্গে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে নয়া সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ উদ্দেশ্যসাধক সংস্থা আঙ্কটাডের গুরুত্ব হ্রাস করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে নিজের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে চরিতার্থ করতে চাইছে। কিন্তু বিশ্বায়নের ফলে যে কেবল ধনী দেশগুলি সুবিধা ভােগ করবে, আঙ্কটাডের ব্যাঙ্কক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে জাতিপুঞ্জের মহাসচিব কোফি আন্নান সেকথা স্মরণ করিয়ে দিতে ভােলেননি। 

 সিয়াটেলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির পক্ষ থেকে বাণিজ্যের সঙ্গে শ্রমমান রক্ষার নামে শিশুশ্রম, জবরদস্তিমূলক শ্রম প্রভৃতি এবং পরিবেশ-সংক্রান্ত বিষয়কে যুক্ত করে উন্নয়নশীল দেশগুলির উৎপাদিত পণ্য ঐসব দেশে যাতে রপ্তানি না হয়, সেজন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিশ্বায়ন-বিরােধী ব্যাপক জমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দের কঠোর সমালােচনার ফলে সিয়াটেল বৈঠক কার্যতঃ ব্যর্থ হয়ে যায়। সিয়াটেলে প্রদর্শিত সুবিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের অন্যতম উদ্যোক্তা হােল সিটিজে গ্লোবাল ট্রেড ওয়াচ’। 

 একই ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয় আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাঙ্কের ওয়াশিংটন ও প্ৰাগ সম্মেলনে। ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ঐ দু’টি সংস্থার সম্মেলনের সময় ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক’ (Direct Action Network), মবিলাইজেশন ফর গ্লোবাল জাস্টিস’ (Mobilization for Global Justice) প্রভৃতি সংগঠনের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। অনুরূপ বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে ২০০১ সালের ২০-২২শে জুলাই জেনােয়াতে অনুষ্ঠিত জি-৮ বৈঠকে।

  ইতালীর পুলিশ বিশ্বায়ন-বিরােধী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য চরম নৃশংসতার আশ্রয় গ্রহণ করে। পুলিশের গুলিতে নিহত হন এক ইতালীয় তরুণ কালো জিওলানি। বিশ্বায়ন-বিরােধী বিক্ষোভের তিনিই হলেন প্রথম শহীদ। এর থেকেই প্রমাণিত হয় যে, আই.এম.এফ., বিশ্বব্যাঙ্ক এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে নয়া-সাম্রাজ্যবাদের কবলে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে এবং ভারতের মতাে তৃতীয় বিশ্বের অনেকগুলি দেশ এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের পরিবর্তে নয়া সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ভারত সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপে একদিকে যেমন সরকারী ক্ষেত্রগুলিতে বেসরকারীকরণের কর্মসূচী গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে তেমনি নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদিতে ভর্তুকি হ্রাস বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। এর ফলে ভারতের মতাে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা যে মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পাবে, সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *