বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য – বৈশিষ্ট্য – গঠন ও কাজ গুলি আলোচনা করো | World Trade Organization-WTO

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য – বৈশিষ্ট্য – গঠন ও কাজ গুলি আলোচনা করো | World Trade Organization-WTO

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য ও কাজ

বিশ্ব-বাণিজ্য-সংস্থার-উদ্দেশ্য-বৈশিষ্ট্য-গঠন-ও-কাজ-গুলি-আলোচনা-করো-World-Trade-Organization-WTO

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য – বৈশিষ্ট্য – গঠন ও কাজ গুলি এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা

 

 যে-তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিশ্বে বিতর্কের ঝড় উঠেছে, সেগুলি হােল আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার (IMF), বিশ্ব ব্যাঙ্ক (WB) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (World Trade Organization—WTO)। ১৯৯৫ সালের ১লা জানুয়ারী বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার জন্ম হয়। জন্মের সময় ৭৭টি দেশ সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ করলেও এই সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

  বর্তমানে (সেপ্টেম্বর, ২০০১) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা হােল ১৩৭। শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি বা গ্যাট (General Agreements on Tariffs and Trade-GATT)-এর উরুগুয়ে পর্যায় (Uruguay Round)-এর বৈঠকে (১৯৮৬-৯৪) বাণিজ্যিক বােঝাপড়ার ভিত্তিতে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত।

 

• বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উৎপত্তির পটভূমি:  গ্যাট ও ডাঙ্কেল খসড়া 

 

গ্যাট’-স্বাক্ষর:

 

 

তিরিশের দশকের প্রথম দিকে বিশ্বব্যাপী যে-অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন দেশ একদিকে যেমন তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটায়, অন্যদিকে তেমনি আমদানি হ্রাসের উদ্দেশে আমদানি-বাণিজ্যের ওপর নানাপ্রকার বাধা-নিষেধ আরােপ করতে শুরু করে। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য কার্যতঃ সংরক্ষণের চার-দেওয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্কট তীব্রতর আকার ধারণ করে। এমতাবস্থায় ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উড়স শহরে একটি আন্তঃরাষ্ট্র সম্মেলন বসে।

  এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার, বিশ্বব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন গড়ে তােলার ব্যাপারে সমবেত প্রতিনিধিবৃন্দ আলাপআলােচনায় লিপ্ত হন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠনের লক্ষ্য হবে বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ। ১৯৪৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে হাভানায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনে এরূপ সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সনদ (Charter)-ও রচিত হয়। কিন্তু মার্কিন কংগ্রেস ঐ সনদ অনুমােদন না করায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন গড়ে তােলা সম্ভব হয়নি। এর পর সনদ-স্বাক্ষরকারী ২৩টি দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ ১৯৪৭ সালে জেনেভাতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে শুল্ক ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি বা গ্যাট স্বাক্ষর করে। 

 ভারত ছিল চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলির অন্যতম। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত গ্যাটের সদস্য-দেশগুলি মােট আট বার পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলােচনায় বসেছে।

 

শুল্ক প্রতিবন্ধকতা

 

শুল্ক প্রতিবন্ধকতা (tariff barriers) হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৈষম্য (discrimination)-এর অবসানের মাধ্যমে গ্যাট যেসব লক্ষ্যে উপনীত হতে চেয়েছিল, সেগুলি হােল :

 

[i] আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, 

[ii] সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে পূর্ণ গ্যাটের লক্ষ্যসমূহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন বৃদ্ধি,

 [iii] বিশ্বসম্পদের বিকাশ ও পূর্ণ ব্যবহার এবং

 [iv] সামগ্রিকভাবে বিশ্ব-সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানােন্নয়ন। 

 পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে পাশ্চাত্তের শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির বাণিজ্যে উন্নতির ফলে প্রাথমিক পণ্য-উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাই গ্যাটের কার্যাবলী সমীক্ষার উদ্দেশে ১৯৪৭ সালে হাবারলার বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে গ্যাটের কাছে প্রদত্ত ঐ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয় যে, শিল্পোন্নত দেশগুলি কর্তৃক কৃষিপণ্য সংরক্ষণ নীতি অনুসৃত হওয়ার ফলে খাদ্য রপ্তানিকারী দেশসমূহ অসুবিধার মধ্যে পড়েছে। শিল্পোন্নত দেশগুলিতে গৃহীত বাণিজ্য ও অন্যান্য নীতির ফলে গ্যাটের উন্নয়নশীল সদস্যরাষ্ট্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

হাবারলার রিপাের্টের পরিপ্রেক্ষিতে

 [i] শুল্কহার হ্রাস,

 [i] কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং

 [ii] উন্নয়নশীল দেশগুলির বিশেষ সমস্যাসমূহ সমাধানের উদ্দেশে তিনটি কমিটি গঠিত হয়। 

 প্রথম কমিটি ১৯৬০-৬১ ও ১৯৬২-৬৭ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে ডিলন এবং কেনেডি পর্যায়ের বৈঠকে শুল্কহার সম্পর্কে আলােচনার সূত্রপাত করে।

  দ্বিতীয় কমিটি এই অভিমত ব্যক্ত করে যে, ব্যাপকভাবে শুল্কবিহীন সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে কৃষিপণ্য রপ্তানিকারী দেশগুলি গ্যাটের শুল্ক হ্রাসের সুযােগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। 

 তৃতীয় কমিটি উন্নয়নশীল দেশগুলির বাণিজ্য-সমস্যা সমাধানের জন্য গ্যাটে পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা সংযুক্ত করার সুপারিশ করে। আবার, উন্নয়নশীল দেশগুলিও গ্যাটকে ‘ধনী দেশগুলির ক্লাব’বলে চিহ্নিত করে তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মঞ্চটিকে ব্যবহার করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। তাদের প্রচেষ্টায় ১৯৬৪ সালে আঙ্কটাড (United Nations Conference on Trade and Development–UNCTAD) গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আঙ্কটাডের নতুন দিল্লী (১৯৬৮), শাস্তিয়াগাে (১৯৭২), নাইরােবি (১৯৭৬), ম্যানিলা (১৯৭৯), বেলগ্রেড (১৯৮৩), জেনেভা (১৯৮৭), কার্তাজেনা (১৯৯২) ও দক্ষিণ আফ্রিকায় (১৯৯৬) অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলির বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে বিশেষভাবে আলাপআলােচনা অনুষ্ঠিত হয়।

  এর ফলশ্রুতি হিসেবে নয়া আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা (NIEO) গড়ে ওঠে। তাছাড়া, আঙ্কটাডের ম্যানিলা বৈঠকে একটি সাধারণ তহবিল গঠন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির অনিশ্চিত রপ্তানি-আয়ের সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

উন্নত দেশগুলি কর্তিক গেটের নীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন:

 

বাণিজ্যে পক্ষপাতহীনতা এবং সমতার যে-নীতি গ্যাট গ্রহণ করেছিল, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি সেই নীতি ক্রমাগত অমান্য করতে থাকে। ইউরােপীয় অর্থনৈতিক গােষ্ঠী  গঠিত হওয়ার পর এই ঘটনা অধিক পরিমাণে ঘটতে থাকে। এই ধরনের কাজকর্মের বিরুদ্ধে গ্যাটের নীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন প্রতিবাদী দেশগুলি ১৯৬০ সালে ইউরােপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংগঠন বা ইফটা (European Free Trade Association—EFTA) গড়ে তােলে। তাছাড়া, পূর্ব ইউরােপীয় দেশগুলিও কমেকন’ (Council for Mutual Economic Association—COMECON) নামে একটি সংগঠন তৈরি করে। 

 এইভাবে গ্যাটের মূল লক্ষ্য থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলি ক্রমশঃ সরে যেতে থাকে। ইউরােপীয় অর্থনৈতিক গােষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি ১৯৬০ সালে যে সাধারণ কৃষিনীতি’ বা ক্যাপ’ (Common Agriculture Policy-CAP) চালু করে, তা ছিল গ্যাটের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী। সদস্য নয় এমন দেশগুলি থেকে খাদ্য আমদানির ওপর বিধি-নিষেধ আরােপ, কৃষিপণ্যের জন্য পরিপােষণ মূল্য প্রদান এবং উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্যের বিক্রয়ের জন্য প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মতাে পদক্ষেপ ক্যাপ’ গ্রহণ করে। আমদানি প্রতিরােধের উদ্দেশে এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যাতে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের মূল্য দেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের থেকে বেশি থাকে। এর ফলে খাদ্য রপ্তানিকারী দেশগুলি, বিশেষতঃ উন্নয়নশীল দেশসমূহ চরম অসুবিধার সম্মুখীন হয়। তৃতীয় বিশ্বের এইসব দেশ অন্যত্র খাদ্য রপ্তানির সুযােগও পায় না। কারণ, উন্নত ই.ই.সি.-ভুক্ত দেশগুলি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কৃষিপণ্যে ডাম্পিং ব্যবস্থা গ্রহণ করে। 

 ডাম্পিং’ বলতে বিদেশের বাজার দখল করার জন্য প্রথমদিকে কিছুদিন ঐসব বাজারে কোন দ্রব্যকে অপেক্ষাকৃত কম দামে, এমনকি লােকসান করেও বিক্রি করাকে বােঝায়। এর ফলে বিদেশী দ্রব্যের সঙ্গে দামের প্রতিযােগিতায় দেশী ফার্মটি রণে ভঙ্গ দিলে বিদেশী ফার্ম স্বমূর্তি ধারণ করে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় তার একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

পুঁজিবাদী দেশগুলির কর্তৃক আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ:

 

১৯৭৩ সালের পর শিল্পোন্নত দেশগুলিতে আর্থিক সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করলে ঐসব দেশের উৎপাদনকারীরা আমদানি বন্ধের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এমতাবস্থায় রপ্তানিকারক তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি পুনরায় বাণিজ্য ক্ষেত্রে পুজিবাদী দেশগুলি সুবিধাভে বঞ্চিত হয়। কিন্তু এর ফলে উন্নত  নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৩ সালের তুলনায় ১৯৭৩ সালে এরূপ বাণিজ্য বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ গুণ। ১৯৮৩-৯০ সালের মধ্যে ঐসব দেশের প্রায় আড়াই গুণ বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যে ই.ই.সি.-ভুক্ত দেশগুলির বাণিজ্যের অনুপাত ২৪:৫% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪১%-এ দাঁড়ায়। এইসব দেশের নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রায় ৩ গুণ (৮৪% থেকে প্রায় ২৪%)। এই সময় বিশ্ব বাণিজ্যে জাপানের অংশগ্রহণও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্ব-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই জাপান তার স্থান করে নেয়। এরূপ বাণিজ্যে জাপানের অংশ দাঁড়ায় প্রায় ৫৬%।

 

 

 বিশ্ব-বাণিজ্যে পরিষেবামূলক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে এরূপ বাণিজ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ৪০%। কিন্তু ১৯৯৩ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৩৪%-এ দাঁড়ায়। তাই  

 গ্যাটের উরুগুয়ে বৈঠকের পর্যায়ের বৈঠকে পরিষেবা বাণিজ্যকে গ্যাট-এর আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হয়। অনুরূপভাবে, মেধা সম্পদও একটি বাণিজ্যিক বিষয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া, উন্নত দেশগুলি বাণিজ্য সম্পর্কিত বিনিয়ােগ ব্যবস্থাকেও গ্যাটের অন্তর্ভুক্ত করে। লক্ষণীয় বিষয় হােল ১৯৮৬ সালে লাতিন আমেরিকার উরুগুয়েতে যখন গ্যাটএর অষ্টম পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়, তখনও কিন্তু টোকিও বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবগুলিকে কার্যকর করা হয়নি। এতদ্সত্ত্বেও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলি তাড়াহুড়াে করে অষ্টম পর্যায়ের বৈঠকে সমবেত হয়। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পণ্যবাণিজ্যের মতাে পরিষেবা বাণিজ্য, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়ােগ ও মেধা সম্পত্তির সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলি গ্যাট-এর অন্তর্ভুক্ত করা।

 

– কিন্তু এতগুলি বিষয়কে আলােচ্য বিষয়সূচীর অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে তীব্র মতবিরােধ দেখা দেয়। তার ফলে এক সময় আলােচনার ক্ষেত্রে কার্যতঃ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় গ্যাট-এর তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল আর্থার ডাঙ্কেল খসড়া ডাক্কেল (Arthur Dunkel) অচলাবস্থার অবসান ঘটাবার কাজে বিশেষ তৎপর হয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে উরুগুয়ে পর্যায়ের বৈঠকের আলােচনার ভিত্তিতে তিনি একগুচ্ছ প্রস্তাব সদস্য রাষ্ট্রগুলির কাছে পেশ করেন। তাঁর খসড়া প্রস্তাবগুলি ডাক্কেল খসড়া’ (Dunkel Draft) বা ডাক্কেল প্রস্তাব’ (Dunkel Proposal) নামে পরিচিত। 

 ‘ডাঙ্কেল প্রস্তাব’-এ একথা বলা হয় যে, কোন দেশ ডাঙ্কেল খসড়া আংশিকভাবে গ্রহণ করতে পারবে না। এর অর্থ—হয় এটিকে পুরােপুরি গ্রহণ করতে অথবা বর্জন করতে হবে। ডাঙ্কেল খসড়া পেশ করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির তরফ থেকে একথা প্রচার করা হতে থাকে যে, যেসব দেশ এই খসড়া মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করবে না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের একঘরে করে দেওয়া হবে। তার ফলে ঐসব দেশের অর্থনৈতিক কাঠামাে এক সময় ভেঙে পড়বে। তাই শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের ১৫ই এপ্রিল মরক্কোর মারাকেশ শহরে আলােচনাকারী দেশগুলি ডাঙ্কেল খসড়ায় স্বাক্ষর করে। এর ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা। 

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বৈশিষ্ট্য (Feature) ঃ

 

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে উল্লেখযােগ্য হােল ?

 

[১] ‘গ্যাট’ একটি চুক্তি (agreement) ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু গ্যাটের উত্তরসূরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হােল একটি বৈধ (legal) সত্তাবিশিষ্ট সংগঠন।

 

[২] আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার, বিশ্বব্যাঙ্ক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক সংস্থা বলে বিবেচিত হলেও শেষােক্তটি প্রথম দু’টির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতিবিশিষ্ট। কারণ, অর্থ-ভাণ্ডার ও বিশ্ব-ব্যাঙ্ক সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের দু’টি বিশেষ উদেশ্যসাধক সংস্থা হলেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কিন্তু তা নয়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সঙ্গে এর কোন আনুষ্ঠানিক (formal) সম্পর্ক নেই।

 

[৩] আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের ভােটদান ব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভােটদান ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পূর্বোক্ত দু’টি সংস্থার সদস্যদের ভােটের সংখ্যা নির্ধারিত হয় সংস্থার তহবিলে তাদের প্রদত্ত অর্থের পরিমাণের ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে-সদস্য-রাষ্ট্র যত বেশি পরিমাণে চাঁদা প্রদান করবে, তার তত বেশি সংখ্যক ভােট দেওয়ার অধিকার থাকবে। কিন্তু ভােটাধিকারের ব্যাপারে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যদের মধ্যে এরূপ বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। । এই সংস্থার সব সদস্য রাষ্ট্রেরই সমান ভােটাধিকার রয়েছে।

 

[4] গ্যাট ছিল একটি অস্থায়ী চুক্তি এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলি সেই চুক্তির শর্তাবলী মেনে নিতে বাধ্য ছিল না। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধীন চুক্তিগুলি স্থায়ী প্রকৃতিসম্পন্ন এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলি ঐসব চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য।

 

[৫] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গী (approach) যেমন নিয়মভিত্তিক (rule-based), তেমনি তা নির্ধারিত সময়ভিত্তিক (time bound)-ও বটে। কিন্তু গ্যাটের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল ঠিক এর বিপরীত।

 

[৬] গ্যাটের পরিধি অপেক্ষা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পরিধি অনেক বেশি ব্যাপক। কারণ, গ্যাট কেবল পণ্য বাণিজ্যের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখত। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পণ্য-দ্রব্যাদির বাণিজ্য ছাড়াও ব্যাঙ্ক, বীমা, পরিবহন, যােগাযােগ প্রভৃতির মতাে পরিষেবামূলক ক্ষেত্রগুলিকে তার এক্তিয়ারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এদিক থেকে বিচার করে বলা যেতে পারে যে, গ্যাট অপেক্ষা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কর্মক্ষেত্রের পরিধি অনেক বেশি ব্যাপক।

 

[৭] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করেছে, সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযােগ্য হােল মেধা সম্পদ অধিকার-সংক্রান্ত চুক্তি বা ট্রিপস (Trade Related Intellectual Property RightsTRIPS)। গ্যাটে এ বিষয়টি অনুপস্থিত ছিল।

 

[৮] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্বসূরি গ্যাটে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির মধ্যেকার বিরােধ নিষ্পত্তির কোন সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। কারণ, বিভিন্ন দেশকে আলােচনার টেবিলে সমবেত করাই ছিল গ্যাটের উদ্দেশ্য। তাই অনেক সময় সমবেত রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিরােধের ফলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হােত। কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিরােধ নিষ্পত্তি করা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অন্যতম প্রধান কাজ। তাই এই সংস্থার একটি বিরােধ নিষ্পত্তিকারী শাখা’ (Dispute Settlement Body) রয়েছে। বিবদমান পক্ষগুলি এর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য। এদিক থেকে বিচার করে গ্যাটি অপেক্ষা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে অনেক বেশি শক্তিশালী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

 

(৯) সর্বোপরি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামাে রয়েছে, যা গ্যাটের ক্ষেত্রে ছিল না।

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্য :

 

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার উদ্দেশ্যসমূহের বর্ণনা রয়েছে। এইসব উদ্দেশ্য হােল ?

 

[১] আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা অপসারণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পণ্যের আদান-প্রদান ত্বরান্বিত করা ;

 

[2] আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের অবসান ঘটানাে ; [৩] সদস্য রাষ্ট্রগুলির জনগণের উচ্চতর

জীবনযাত্রার মানােন্নয়ন, পূর্ণ কর্মসংস্থান, প্রকৃত আয় ও কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি এবং পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ করা ;

 

 [৪] উন্নয়নশীল দেশগুলির, বিশেষতঃ স্বল্পোন্নত দেশসমূহের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণ বজায় রাখা ;

 

; [৫] উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্ব সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারের সুযােগ সৃষ্টি করা ; এবং

 

[৬] বহুপাক্ষিক বাণিজ্য মীমাংসা-সংক্রান্ত উরুগুয়ে পর্যায়ের বৈঠকে গৃহীত সব প্রস্তাবকে একত্রিত করে একটি সুসংহত ও স্থায়ী বাণিজ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এইভাবে বিশ্বব্যাপী একটি নয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ (New Economic Order) গড়ে তােলার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার গঠন:

 

•বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামাে (Organizational structure) : 

 

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামাের শীর্ষে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (The Ministerial Conference—MC) অবস্থিত। এটি হােল এমন একটি সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন, সাধারণ পর্ষদ ইত্যাদি (Supreme governing body), যা বাণিজ্য সংস্থার যাবতীয় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। সাধারণতঃ সদস্য রাষ্ট্রগুলির বাণিজ্য মন্ত্রীদের নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন গঠিত হয়। এই সম্মেলন ছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার একটি সাধারণ পর্ষদ (General Council-GC) রয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে এই পর্ষদ গঠিত হয়। মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের হয়ে সাধারণ পর্ষদ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রকৃত ইঞ্জিন হিসেবে কার্য সম্পাদন করে। পর্ষদ একদিকে যেমন বিরােধমীমাংসাকারী সংস্থা (Dispute Settlement BodyDSB) হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে তেমনি বাণিজ্য নীতি পুনৰীক্ষণ সংস্থা (Trade Policy Review Body-TPRB) হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

  সাধারণ পর্ষদের অধীনে তিনটি পর্ষদ রয়েছে, যথা— [i] পণ্য বাণিজ্য পর্ষদ (The Council for Trade in Goods-CTG), [ii] পরিষেবা বাণিজ্য পর্ষদ (The Council for Trade in Services—CTS) এবং [iii] বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার-সংক্রান্ত পর্ষদ (The Council for Trade-Related Aspects of Intellectual Property RightsTRIPS)। তাছাড়া, বাণিজ্য নীতি পুনর্বক্ষণ সংস্থার কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য তিনটি কমিটি রয়েছে। 

 এই তিনটি কমিটি হােল ঃ [i] বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক কমিটি (The Committee on Trade and Development—CTD), [ii] আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপর বাধা-নিষেধ-সংক্রান্ত কমিটি (The Committee on Balance of Payment Restrictions—CBOPR) এবং [iii] বাজেট, অর্থ ও প্রশাসন-সংক্রান্ত কমিটি (The Committee on Budget, Finance and Administration—CBFA)। বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি এবং সাধারণ কমিটি যেসব কাজের দায়িত্ব ঐসব কমিটির হাতে প্রদান করে, সেগুলি সম্পাদন করাই হােল তাদের কাজ।

  বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটি সচিবালয় (Secretariat) রয়েছে। সচিবালয়ের প্রধান হলেন মহানির্দেশক বা ডিরেক্টর জেনারেল (Director General DG)। তিনি ৪ বছরের জন্য মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (MC) কর্তৃক নিযুক্ত হন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য ৪ জন সহকারী নির্দেশক বা ডেপুটি ডাইরেক্টর (Deputy Director) থাকেন।  সাধারণ নির্দেশক বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার প্রস্তাবিত বার্ষিক বাজেট বিচার-বিবেচনা ও সুপারিশের জন্য বাজেট, অর্থ ও প্রশাসন-সংক্রান্ত কমিটির কাছে পেশ করেন। এর পর তিনি সেটিকে সাধারণ পর্ষদের নিকট চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করেন।

 

 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যাবলী (Functions) : 

 

 বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা যেসব কার্য সম্পাদন করে, সেগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হােল :

 

[১] শুল্ক-সহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান ঘটানাের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ আচরণবিধি (code of conduct) প্রণয়ন করা ; 

 

 

[২] বিশ্ব বাণিজ্যের যুগে সদস্য দেশগুলির আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী বিধি-নিষেধগুলিকে কার্যকর করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (institutional framework) গড়ে তোলা;

 

[৩] বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (Multilateral Trade Agreements)-র লক্ষ্যসমূহের রূপায়ণ ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য একটি সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা ;

 

[৪] গুরুত্বপূর্ণ বিধিসমূহের রূপায়ণের ব্যাপারে নিশ্চয়তাদান করা ;

 

[৫] বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অধিকতর উদারীকরণের জন্য আলাপ-আলোচনার একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করা ;

 

[৬] একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বাণিজ্য নীতি নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ-ভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাঙ্কের সঙ্গে সহযোগিতা করা ; এবং

 

[৭] বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি করা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *