জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদ বিস্তারিত আলোচনা টেকজ সঞ্জীব

 জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদ  বিস্তারিত আলোচনা টেকজ সঞ্জীব 

জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদ

 

জ্ঞানের-উৎস-সম্পর্কে-অভিজ্ঞতাবাদ-বিস্তারিত-আলোচনা-টেকজ-সঞ্জীব

 

জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদ: 

 

অভিজ্ঞতাবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় হল— ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞানের একমাত্র উৎস (Experience is the only source of knowledge)। অভিজ্ঞতাবাদকে মূলত বুদ্ধিবাদের একটি বিরোধী মতবাদরূপেই গণ্য করা হয়। জ্ঞানের উৎপত্তির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাবাদও গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ।

 

ফ্রান্সিস বেকন: 

 আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে অভিজ্ঞতাবাদের প্রথম সূচনা করেন ফ্রান্সিস বেকন (Becon)। তিনি মনে করেন যে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের পরিচিত হওয়ার একমাত্র পথ হল আমাদের বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলি ৷ এই সমস্ত বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমেই বহির্জগৎ আমাদের মনে প্রতিফলিত হয়। যথার্থ জ্ঞানলাভের জন্য আমাদের বাহ্য ইন্দ্রিয়গুলির সুস্থতা এবং সংস্কারমুক্ত মনের প্রয়োজন। এইভাবেই বেকন আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

  • আরো পড়ুন 

জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ গুলি আলোচনা কর teacj sanjib

বুদ্ধিবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় গুলি আলোচনা করো Teacj Sanjib

 

 আইজাক নিউটন: 

 অনেকে আবার বলেন যে, আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় মহাবিজ্ঞানী নিউটনের সময়ে। কারণ, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই পরিবর্তনশীল জগতে সর্বজনগ্রাহ্য এবং অবশ্যম্ভাবী জ্ঞান সম্ভব নয় বলে প্লেটো যে দাবি করেছিলেন, তাকে মিথ্যা বলে প্রথম প্রমাণ করেন বিজ্ঞানী নিউটনই। তিনি তাঁর সার্বিক সূত্রগুলির মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, এই পরিবর্তনশীল জগতেও সার্বিক জ্ঞান সম্ভব।

 

প্রাচীন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ:

 

  অভিজ্ঞতাবাদের সূত্রপাত আরও অনেক আগে গ্রিক দর্শনের যুগে দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিক পরমাণুবাদী (Atomists), সোফিস্ট (Sophists), প্রোটোগোরাস (Protagoras) এবং জর্জিয়াস (Gorgious) ইত্যাদি সম্প্রদায়ের দার্শনিকেরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞানলাভের কথা বলেন। পরবর্তী পর্যায়ে এপিকিউরাস (Epicurus) প্রমুখ দার্শনিক জ্ঞানের উৎস সম্পর্কিত এই ধারণাকে আরও স্পষ্টতা প্রদান করেন। দার্শনিক বেকন (Bacon)-এর সময় এই ধারণা একটি আকার লাভ করতে শুরু করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে হবস, লক, বার্কলে, হিউম, জন স্টুয়ার্ট মিলের আলোচনায় এটি একটি পৃথক মতবাদের মর্যাদা লাভ করে। এই পৃথক মতবাদের মূল বিষয়বস্তু হল—জ্ঞানের উৎস বুদ্ধি নয়, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা।

 

 

 অভিজ্ঞতাবাদের দুটি রূপ-নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ এবং চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ :

 

অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী স্বীকার করা হয় যে, অভিজ্ঞতাই জ্ঞানলাভের একমাত্র উৎস। প্রকৃত জ্ঞান ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমেই লাভ করা যায়। ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে জ্ঞানলাভ সম্পর্কে সমস্ত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকই ঐকমত্য পোষণ করলেও, তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিজ্ঞতা বাদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগ লক্ষ করা যায়। বস্তুতপক্ষে, বুদ্ধিবাদের মতোই অভিজ্ঞতাবাদকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে— নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ (moderate empiricism) এবং চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ (extreme empiricism)।

 

নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ

 

নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদীরা মনে করেন যে, ইন্দ্রিয় সংবেদন জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হলেও, অপরাপর উৎস তথা বুদ্ধির মাধ্যমেও জ্ঞান হতে পারে। নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে শীর্ষ সম্মান লাভ করেছেন প্রখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ডেভিড হিউম (David Hume)। ডেভিড হিউম ছাড়াও লক (Locke), বার্কলে (Berkeley) প্রমুখ নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (J. S. Mill) ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতাকেই সমস্ত জ্ঞানের একমাত্র আসল ভিত্তিভূমি রূপে অভিহিত করেছেন। কিন্তু দার্শনিক হিউম মিলের মতকে গ্রহণ করতে রাজি হননি। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা ছাড়াও, বুদ্ধির মাধ্যমে আমাদের কোনো কোনো প্রকার জ্ঞানের সম্ভাবনা থাকেই। ডেভিড হিউম তাঁর ‘Treatise’ এবং ‘Enquiry’ গ্রন্থে দু-প্রকার জ্ঞানের কথা উল্লেখ করেছেন। এই দু-প্রকার জ্ঞান হল যথাক্রমে— ও জাগতিক ঘটনা বিষয়ক জ্ঞান (knowledge concerning matters of fact) এবং ও ধারণার সম্বন্ধের পারস্পরিক বিষয়ের জ্ঞান (knowledge concerning relations of ideas) |

 

● সম্ভাবনামূলক জ্ঞান: 

 

 প্রথম প্রকারের জ্ঞান তথা জাগতিক বিষয়ক জ্ঞান হল অভিজ্ঞতার পরে পাওয়া নতুন কিছু জ্ঞান—যাকে বলা হয় পরতসাধ্য সংশ্লেষক বচন (synthetic a-posteriori)। দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান তথা ধারণার সম্বন্ধের পারস্পরিক বিষয়ের জ্ঞান হল পূর্বতসিদ্ধ বিশ্লেষক বচন (analytica-priori)। প্রথম প্রকারের জ্ঞানের ভিত্তি ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতা হওয়ায়, তা সত্যও হতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে। সুতরাং এ ধরনের জ্ঞান হল আপতিক (contingent) এবং পরতসাধ্য তথা নতুনত্বের আস্বাদনযুক্ত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। এ ধরনের জ্ঞান সবসময়ই সম্ভাবনামূলক। তা কোনো সময়েই সন্দেহাতীত ও নিশ্চিত নয়।

 

 সন্দেহাতীত জ্ঞান অলভ্য : 

 দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান অভিজ্ঞতা-নিরপেক্ষ এবং বুদ্ধিনির্ভর রূপে পরিগণিত হওয়ায় তা অনিবার্যভাবে সত্য এবং সন্দেহাতীত। গণিত এবং যুক্তিবিজ্ঞানের জ্ঞান হল এই দ্বিতীয় পর্যায়ের জ্ঞান। সুতরাং গাণিতিক স্বতঃসিদ্ধ (axioms) এবং যুক্তিবিজ্ঞানের মূলনূত্রগুলি (fundamental principles of logic) কখনোই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রাপ্ত নয়, এগুলি বুদ্ধির মাধ্যমেই পাওয়া যায় বলে অনিবার্যভাবে সত্য। এগুলি থেকে অবরোহ পদ্ধতিতে যা কিছুই অনুসৃত হয়, তাও অনিবার্য সত্য।

 

 সংবেদনিক জ্ঞানের উপর গুরুত্ব:

 

  হিউম এই দুই প্রকার জ্ঞানকে স্বীকার করেছেন ঠিকই, কিন্তু অভিজ্ঞতানির্ভর সংবেদনিক জ্ঞানের ওপরই সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অভিজ্ঞতানির্ভর সংবেদনিক জ্ঞান তথা পরতসাধ্য সংশ্লেষক বচনকে স্বীকার করলেও তিনি কিন্তু বুদ্ধির সাহায্যে প্রাপ্ত ধারণাসমূহের পারস্পরিক সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞানকেও অস্বীকার করেননি। তিনি একমাত্র সেই সমস্ত জ্ঞানসমূহকেই অস্বীকার করেছেন, যেগুলি এই দুটি উপায়ের যে-কোনো একটির মাধ্যমে প্রাপ্ত নয়।

 

সংশয়বাদ:

 নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে হিউমের আরও একদফা পরিচয় ঘটে তাঁর সংশয়বাদের মাধ্যমে। হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের স্বাভাবিক পরিণতি হল সংশয়বাদ (scepticism)। তাঁর অভিজ্ঞতানির্ভর তথ্য

 

সংক্রান্ত জ্ঞানসমূহ হল এক-একটি সাধারণ বা সর্বজনীন বচন (universal proposition)। এগুলির সত্যতা অনিবার্যভাবে সত্য নয়, এগুলি তাই সম্ভাব্য। যেমন, “আগুন দহন ক্রিয়া সম্পন্ন করে” —এই বচনটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—সমস্ত ক্ষেত্রেই যে সত্য হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

মনস্তাত্ত্বিক নিশ্চয়তা; 

 আবার জ্ঞানের ক্ষেত্রে কার্যকারণ সম্পর্কের বিষয়টির ক্ষেত্রেও হিউম এক বৈপ্লবিক মতবাদের অবতারণা করেছেন। কার্যকারণ সম্পর্কের অবতারণা করে তিনি বলেন যে, অনিবার্য নিশ্চয়তা বলে কিছুই নেই, যা আছে তা হল মনস্তাত্ত্বিক নিশ্চয়তা (psychological necessity)।

 

চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ

 

নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের বিপরীতে উল্লেখ করা যায় চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদের। চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদ অনুযায়ী স্বীকার করা হয় যে, ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞানের একমাত্র মাপকাঠি। অর্থাৎ, আমাদের সমস্তরকম জ্ঞান উৎপন্ন হয় এই অভিজ্ঞতা থেকেই। অভিজ্ঞতা ছাড়া আর অন্য কোনোভাবেই জ্ঞান উৎপন্ন হতে পারে না। অভিজ্ঞতা তথা ইন্দ্রিয় সংবেদনকে তাই তাঁরা জ্ঞানের একমাত্র উৎস বলে দাবি করেন (Experience is the only source of knowledge ) |

 

● মিলের পরতসাধ্য আপতিক জ্ঞান:

 

  চরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) উল্লেখ করেন যে, আমাদের ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল সমস্ত প্রকার জ্ঞানের উৎস। তাঁর দাবি হল, ইন্দ্রিয় সংবেদন ছাড়া আমরা কোনো প্রকার জ্ঞানই লাভ করতে পারি না। তাঁর মতে, সমস্ত প্রকার জ্ঞানই হল—অভিজ্ঞতালব্ধ বা পরতসাধ্য। সুতরাং কোনো জ্ঞানকেই অবশ্যম্ভাবীরূপে স্বীকার করা সংগত নয়, সমস্ত প্রকার জ্ঞানই হল আপতিক ।

 

 জ্ঞানলাভের পদ্ধতি হল আরোহমূলক;

  সমস্ত প্রকার জ্ঞানলাভের পদ্ধতি হিসেবে মিল আরোহমূলক পদ্ধতি (inductive method)-কে স্বীকার করেন, অবরোহমূলক পদ্ধতি (deductive method)-কে নয়। আরোহ অনুমানের সিদ্ধান্তটি কেবল সম্ভাবনামূলক, নিশ্চিত নয়। সেজন্য সমস্ত জ্ঞান আরোহ অনুমান নির্ভর হওয়ায়, সেগুলি অবশ্যই আপতিক। এগুলি সত্যও হতে পারে, আবার মিথ্যাও হতে পারে।

 

যুক্তিবিজ্ঞানসম্মত এবং বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান আরোহলব্ধ: 

 

 অনেকে যুক্তিবিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান এবং গাণিতিক জ্ঞান—এই উভয় প্রকার জ্ঞানকে বৌদ্ধিক জ্ঞানরূপে অভিহিত করলেও, মিল এগুলিকে আরোহলব্ধ জ্ঞানরূপেই স্বীকার করেছেন। আমাদের কতকগুলি বিরোধহীন অবাধ অভিজ্ঞতাই এই জ্ঞানসমূহের উৎস বলে মিল মনে করেন। কাজেই “সকল মানুষ মরণশীল” এবং “২+২= ৪” –এই দুই প্রকার বচনই হল সম্ভাব্য, নিশ্চিত নয়। কাজেই এদের মধ্যে পার্থক্য শুধুই মাত্রাগত বা পরিমাণগত, প্রকৃতিগত নয়। তাই আমাদের সমস্ত প্রকার জ্ঞানই হল সম্ভাব্য বা আপতিক এবং অবশ্যই অভিজ্ঞতানির্ভর।

 

 

 অভিজ্ঞতাবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় (Main Tenets of Empiricism)

 

অভিজ্ঞতাবাদের আলোচনায় তার বিভিন্ন রূপ দেখা গেলেও, এ কথা সত্য যে সমস্ত অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এ সমস্ত সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে অভিজ্ঞতাবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয়রূপে গণ্য করা হয়। অভিজ্ঞতাবাদের মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় বা বৈশিষ্ট্যগুলি হল—

 

জ্ঞানের মূল উৎস ইন্দ্রিয় সংবেদন:

  অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ তাঁদের জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবাদের পরিপ্রেক্ষিতে স্বীকার করেন যে, ইন্দ্রিয় সংবেদন তথা অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞানের মূল উৎস। অন্তদর্শনের সাহায্যে আমরা যে প্রকার জ্ঞান লাভ করি, সেগুলিকেও তাঁরা ইন্দ্রিয় সংবেদনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ ছাড়া যৌক্তিক নীতি গাণিতিক সত।সমূহকেও তাঁরা ইন্দ্রিয় সংবেদনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। 

 

আরোহমূলক পদ্ধতিতে জ্ঞানলাভ:

 

  অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ স্বীকার করেন যে, জ্ঞানলাভের একমাত্র পদ্ধতি (method) হল আরোহ পদ্ধতি (induction), অবরোহ পদ্ধতি (deduction) নয়। আরোহ পদ্ধতির সাহায্যে আমরা বিশেষ বিশেষ বস্তু বা ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষণের সাহায্যে যাচাই ক’রে একটি সার্বিক সংশ্লেষক বচন প্রতিষ্ঠা করি। সুতরাং, আরোহমূলক পদ্ধতি ছাড়াও অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরা পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণকে তাঁদের পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তাঁরা আরও বলেন যে, আমরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ বস্তুরই যে জ্ঞান লাভ করি, এমন নয়। এগুলি ছাড়াও আমরা বিমূর্ত সাধারণ ধারণাসমূহকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লাভ করি।

 

 সহজাত বা অন্তর ধারণার অনস্তিত্ব:

  মনোবিজ্ঞানসম্মত দিকের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকেরা কোনো অন্তর ধারণা বা সহজাত ধারণার (innate ideas) অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মতে, জন্মের সময় আমাদের মন থাকে একপ্রকার পরিষ্কার প্লেট বা সাদা কাগজের (tabula rasa) মতো। অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই আমাদের মনে ধারণা মুদ্রিত হয় এবং এই ধারণা অনুযায়ীই আমরা জ্ঞান লাভ করি। সহজাত ধারণার অস্তিত্বই হল অবান্তর।

 

পূর্বতসিদ্ধ বিশ্লেষক এবং পরতসিদ্ধ সংশ্লেষক বচনের স্বীকৃতি:

 

  অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরা বচনকে দুভাগে ভাগ করেছেন- i পূর্বতসিদ্ধ (a-priori) এবং ii পরতসিদ্ধ (a-posteriori)। যেসব বচনের সত্যতা অভিজ্ঞতার পূর্বেই সিদ্ধ বা প্রমাণিত, সেগুলিকে বলা হয় পূর্বতসিদ্ধ বা অভিজ্ঞতাপূর্ব। এই ধরনের বচনগুলি নতুন কোনো জ্ঞান প্রদান করে না বলে এগুলি হল বিশ্লেষক (analytic)। সুতরাং পূর্বতসিদ্ধ বাক্য বা বচনগুলি হল বিশ্লেষক। অপরদিকে, যে সমস্ত বচনগুলির সত্যতা অভিজ্ঞতা তথা ইন্দ্রিয় সংবেদনের ওপর নির্ভরশীল, সেই সমস্ত বচনগুলিকে বলা হয় পরতসিদ্ধ। ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে এই ধরনের বচনগুলি পাওয়া যায় বলে এইগুলি নিত্যনতুন জ্ঞানের সন্ধান প্রদান করতে পারে। ফলত এই ধরনের বচনগুলি হল পরতসিদ্ধ সংশ্লেষক (synthetica-posteriori)বচন। এই দুই ধরনের বচন ছাড়া আর অন্য কোনো তৃতীয় প্রকারের বচন সম্ভব নয় বলে অভিজ্ঞতাবাদীরা দাবি করেন।

 

 অধিবিদ্যক জগতের অস্তিত্বহীনতা:

  অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরা মনে করেন যে, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার বাইরে যে অধিবিদ্যক জগৎ, তার প্রকৃত কোনো অস্তিত্বই নেই। অধিবিদ্যা সংক্রান্ত যাবতীয় বচনও তাই মূল্যহীন। অন্যভাবে বলা যায় যে, অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে ঈশ্বর, আত্মা ইত্যাদি সংক্রান্ত বচনগুলি অর্থহীন ও বিভ্রান্তিকর।

 

● মূল্যসূচক বচনগুলির দ্বারা জ্ঞানলাভ অসম্ভব: 

 

 অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ মূল্যসূচক বচন (valued propositions) সম্পর্কে এই অভিমত পোষণ করেন যে, এই জাতীয় বচন দ্বারা আমাদের বিষয় সম্পর্কে কোনো জ্ঞানলাভ হয় না। বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হলে একমাত্র তথ্যসূচক বচনের (factual propositions) ওপরই নির্ভর করতে হবে। এই তথ্যসূচক বাক্যকেই বিজ্ঞানসম্মত বাক্যরূপে অভিজ্ঞতাবাদীরা অভিহিত করেন। একটি তথ্যসূচক বাক্যে কোনো একটি তথ্য বা ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়। যেমন—“বইটি টেবিলের ওপর আছে”। কিন্তু মূল্যসূচক বচনের ক্ষেত্রে কোনো তথ্য বা ঘটনাকে উল্লেখ করা হয় না। এই ধরনের বচন দ্বারা একটি ঘটনা বা তথ্যের মূল্যায়ন করা হয় মাত্র, যেমন— ‘টেবিলটি হয় সুন্দর।”

 

ইন্দ্রিয় সংবেদনে জ্ঞানের যথার্থতা যাচাই :

 

  আধুনিক কালের অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকগণ ইন্দ্রিয় সংবেদনকে কেবলমাত্র জ্ঞানোৎপাদনের উৎস হিসেবেই যে স্বীকার করেছেন, তা নয়। তাঁরা ইন্দ্রিয় সংবেদনকে জ্ঞাননির্ণায়ক বাক্যসমূহের অর্থ নির্ণয়ের মানদণ্ড ( criterion of meaningfulness)-রূপেও স্বীকার করেছেন। আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী যৌক্তিক দার্শনিকগণ বলেন যে, একটি জ্ঞান সম্বন্ধীয় বাক্য যথার্থ কি না—তার যাচাই সম্ভব একমাত্র ইন্দ্রিয় সংবেদন দ্বারাই, অন্য কোনোভাবে নয়।

 

জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অভিজ্ঞতাবাদ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *