সাজাহান নাটকের দিলদার চরিত্র আলোচনা বাংলা নাটক teacj sanjib

 সাজাহান নাটকের দিলদার চরিত্র আলোচনা বাংলা নাটক teacj sanjib

প্রশ্ন ।। দিলদার চরিত্র সাজাহান’ নাটকে কোন্ প্রয়ােজন সিদ্ধ করেছে? দিলদার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আলােচনা করে নাট্যকারের কৃতিত্বের পরিচয় দাও। 

সাজাহান-নাটকের-দিলদার-চরিত্র-আলোচনা-বাংলা-নাটক-teacj-sanjib

 

অথবা,

 

‘মনে ভাবছ যে জীবন সংগ্রামে তােমার জয় হয়েছে? না, এ তােমার জয় নয় ঔরংজীব। এ তােমার পরাজয়।’—এই উক্তি কার? উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার চরিত্রের কী পরিচয় পাওয়া যায় ? ঔরংজীবের কোন্ পরাজয়ের কথা এখানে বলা হয়েছে?

অথবা

দিলদার চরিত্র বিশ্লেষণ করে চরিত্রটির নাটকীয় উপযােগিতা বিচার কর।

দিলদার চরিত্র

উত্তর। দিলদার সম্পর্কে নাটকের পরিচয়লিপিতে উল্লেখ আছে—ছদ্মবেশী জ্ঞানী (দানেশমন্দ)। চরিত্রটি মূলতঃ অনৈতিহাসিক এবং দ্বিজেন্দ্রলালের মৌলিক সৃষ্টি। তবে চরিত্রটিকে যেভাবে নাটকে উপস্থিত করা হয়েছে, তাতে এই চরিত্রটির অন্তরালে ইতিহাসের দূরাগত পদধ্বনি শােনা যায়। কিন্তু নাটকে মূলতঃ তিনি বিদূষকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। হাস্য কৌতুক ও ব্যঙ্গরস পরিবেশন করা তার প্রধান কাজ। প্রাচীনকালে রাজা-রাজড়াদের দরবারে এরূপ দু’ একজন ব্যক্তির সমাবেশ ঘটতাে। এরা ক্রমে রাজার সভাসদ বা পারিষদ দলের অন্তর্ভুক্ত হতেন।

এই বিদূষক চরিত্রের প্রথম সন্ধান মেলে সংস্কৃত নাটকগুলির মধ্যে। নাটকের অন্যান্য চরিত্র থেকে সাজে-পােষাকে, আচারে ব্যবহারে, কথায় বার্তায় নাট্যকার এই চরিত্রটিকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতেন। তবে সেটা গুরুগম্ভীর বিষয় হলেও বিদূষকরা তার উত্তর দিতেন অত্যন্ত হাল্কা চালে। এই সংস্কৃত নাটকের অনুকরণে বাংলা নাটকেও বিদূষক চরিত্রের আমদানি করা হয়েছে।

দিলদার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য 

এই বিদূষক চরিত্রের বৈশিষ্ট্যে দেখি, গুরুগম্ভীর অথবা শিক্ষামূলক কোনাে বক্তব্য রাখার অধিকার এদের ছিল না বটে, কিন্তু তারা অনেক বেশী বিজ্ঞ। সােজা কথাটা সহজভাবে বলতে পারে না বলেই তারা তির্যকভাবে, ব্যঙ্গের ভঙ্গীতে সেই কথাটা প্রকাশ করে। রসিকতার ছদ্মবেশে জীবনের আর জগতের যে নির্মম সত্যগুলি প্রকাশ করে সেগুলির আবেদন গভীর অন্তর্ভেদী। সেক্সপীয়রের বিদূষকেরা তাই তার নাটকের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সাজাহান’ নাটকের দিলদার চরিত্রের মধ্যে সেক্সপীয়রের ‘Fool’ চরিত্রের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়।

আলােচ্য নাটকের দিলদার চরিত্রটির সঙ্গে নাটকের কোন অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কে নেই। কারণ কাহিনী ও ঘটনা বিন্যাসের অগ্রসরমানতায় তার কোন বিশেষ সক্রিয় ভূমিকা, অন্ততপক্ষে সম্রাট সাজাহানের কারাগারে বন্দীদশা, অপমান, লাঞ্ছনা, সম্রাট পুত্রগণের মধ্যে হানাহানি, ভ্রাতৃহত্যা প্রভৃতি ঘটনার মধ্যে দিলদারের কোন প্রত্যক্ষ যােগ ছিল না। অবশ্য তিনি কেবলমাত্র ঔরংজীব কর্তৃক দারার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা দানের ব্যাপারে, মহম্মদের কাছে লেখা ঔরংজীবের কপটপত্র সুজার কাছে পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নাট্যকাহিনীর অগ্রগতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়েছেন।

দিলদারকে প্রথম পাই প্রথম অঙ্কের দ্বিতীয় দৃশ্যে। আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে দিলদার বলেছেন—“আমি মুখে মােরাদের বিদূষক, আমি হাস্য-পরিহাস করতে যাই, সে ব্যঙ্গের ধূম হয়ে ওঠে। এখানে দিলদারের সংলাপের মধ্যে নিছক ভঁড়ামির পরিবর্তে তীক্ষ্ণ তীরবিদ্ধ বাক্যাবলী প্রকাশ পেয়েছে। এরপর দিলদারকে দেখা যায় দ্বিতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে। এখানে দিলদার যে সব ব্যঙ্গাত্মক কথাবার্তা বলেছেন, তা মােরাদের বুদ্ধিগ্রাহ্য না হলেও ঔরংজীব্বে নজর এড়াতে পারে নি। এরপর দিলদারকে পাই তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে। এইখানেই আমরা প্রথম দেখি দিলদার বিদূষকের ছদ্মবেশ ত্যাগ করে তার সত্যরূপে ঔরংজীবের প্রতি কঠোর ভৎসনা বাণী উচ্চারণ করেছেন। এইখানে দিলদার নিজের ভূমিকায় যেন ক্রমবিকাশ বর্ণনা করেছেন—প্রথমে পাঠক! তারপরে বিদূষক। তারপর রাজনৈতিক। তারপরে বােধহয় দার্শনিক। চতুর্থ অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে সুজা-মহম্মদের ঘটনায় দিলদারকে প্রত্যক্ষভাবে ঘটনার আবর্তে জড়িয়ে পড়তে দেখি। চতুর্থ অঙ্কের ষষ্ঠ দৃশ্যে ঔরংজীবের সঙ্গে দিলদারের কথাবার্তায় যেন ঔরংজীবের বিবেকের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। এর পরের দৃশ্যে দিলদারের কথাবার্তায় মৃত্যুবিলাসী একজন দার্শনিককে দেখতে পাওয়া যায় যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে দারার জীবন রক্ষা করতে চেয়েছেন। আর পঞ্চম অঙ্কের পঞ্চম দৃশ্যে ঔরংজীবের কাছে তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেন। তিনি আসলে এশিয়ার বিজ্ঞতম সুধী দার্শনিক হাজী নিয়ামৎ খ। তিনি মােগল রাজপ্রাসাদে এসেছেন রাজনীতি বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে। তাই প্রথমে মােরাদের বিদূষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও পরে ঔরংজীবের সভাসদে

পরিণত হন। তার পরিচয় পেয়ে ঔরংজীব তাকে তার রাজ্যে থাকার অনুরােধ জানালে তিনি সমস্ত প্রলােভন ত্যাগ করে মােগল সাম্রাজ্য ছেড়ে চলে যান

সাজাহান নাটক দিলদার চরিত্র

দিলদারকে প্রথমে মােরাদের বিদূষকরূপে যে সমস্ত হাস্য-পরিহাস করতে দেখা যায়, তা কখনই হাল্কা হাস্যরসাত্মক নয় ; বরং তার কথাবার্তা সবসময়ই ব্যঙ্গাত্মক এবং সেইসব ব্যঙ্গোক্তি অনেক সময়েই দার্শনিকোচিত এমনই অর্থবহ হয়ে উঠেছে যে দর্শক শ্রোতারা সচকিত হয়ে ওঠে। এই ব্যঙ্গোক্তির দ্বারাই তিনি মােরাদকে ঔরংজীব সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু স্থূল বুদ্ধি, মূর্খ মােরাদ তা বুঝতে পারে নি। অবশ্য মােরাদের প্রতি দিলদারের কোন হৃদয়সঞ্জাত প্রীতি ছিল না। তাই অনিবার্য সঙ্কটের দিকে এগিয়ে গেলেও মােরাদের জন্য দিলদার কোন দুঃখবােধ করেন নি। দিলদারের এই অনাসক্তি দার্শনিকের অনাসক্তি। আবার এই দিলদারকেই সঠিক চিনেছিলেন ঔরংজীব। তাই তাকে আপন দরবারের সভাসদ করে নিয়েছিলেন। ঔরংজীব অনেক সময়ই দিলদারের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। আবার দিলদারও স্পষ্টবক্তারূপে ঔরংজীবকে শঠ বলতেও দ্বিধা করেন নি। নাটকে পাই, দিলদারের অনুরােধে ঔরংজীব দারার প্রাণদণ্ডাদেশ রহিত করতে চেয়েছিলেন, অবশ্য শেষে শায়েস্তা খাঁর পরামর্শে তিনি মত পরিবর্তন করেন। ইতিহাসেও এর সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। 

জীবনের প্রতি অনাসক্তি ও অনাগ্রহ, দিলদার চরিত্রে একটা ঋজুতা দান করেছে। তারই দৃঢ় ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে দিলদার ঔরংজীবের মত কূট চরিত্রকে স্পষ্টভাষায় সাবধানবাণী শুনিয়েছেন। ঔরংজীবকে তিনি বিবেকের কাছে জবাব দিতে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় দারার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঔরংজীবের মনে বিবেক দংশনের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি ঔরংজীবকে বলেছেন, “ চিরকালটা পরকে ছলনা করে জাঁহাপনার বিশ্বাস জন্মেছে যে নিজেকে ছলনা কর্তে পারেন? সেইটেই সকলের চেয়ে শক্ত। ভাইকে টুটি টিপে মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু বিবেককে শীঘ্র টুটি টিপে মারতে পারেন না। হাজার তার গলা চেপে ধরুন, তবু তার নিম্ন, গভীর আচ্ছাদিত ভগ্নধ্বনি হৃদয়ের মধ্যে থেকে থেকে বেজে উঠবে— এখন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুণ। তাই তাঁর মতে এটা ঔরংজীবের জয় নয়, পরাজয়।

সাজাহান নাটকের দিলদার

আবার এই নিরাসক্ত ঔদাসীন্যই তাঁকে পার্থিব সম্পদ সম্পর্কে নির্লোভ করেছিল। ঔরংজীব তাকে সম্পদ ও সম্মান দিয়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার উত্তরে তিনি বলেন—‘ভেবেছিলে যে আমি তােমার রৌপ্যের জন্য এতদিন তােমার দাসত্ব করছিলাম ? বিদ্যার এখনও এ তেজ আছে যে সে ঐশ্বর্যের মস্তকে পদাঘাত করে’—দিলদারের এই উক্তি তার চারিত্রিক সমুন্নতি প্রমাণ করে।

দিলদার চরিত্র শাজাহান

দিলদার চরিত্রটির মাধ্যমে নাট্যকার আর একটি উদ্দেশ্য সিদ্ধ করেছেন। নাটকের মধ্যে লঘু সংলাপের মাধ্যমে নাটকের ভারী আবহাওয়া দূর করতে দিলদার সাহায্য করেছেন। তবে দিলদার নিতান্তই বিদূষক নন। তঁার হাস্য-পরিহাসের অন্তরালে সত্যদর্শনের উদঘাটনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। ফলে দিলদারের সংলাপ শুধু হাসায় না, ভাবায়-ও। আর এখানেই দিলদার চরিত্রের সঙ্গে সাধারণ বিদ্যকের পার্থক্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *