পারমাণবিক শক্তি বলতে কী বােঝ? ভারতে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের বন্টন উল্লেখ করাে। এই শক্তির ব্যবহার লেখাে।

 ■ পারমাণবিক শক্তি বলতে কী বােঝ? ভারতে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের বন্টন উল্লেখ করাে। এই শক্তির ব্যবহার লেখাে।

পারমাণবিক-শক্তি-বলতে-কী-বােঝ-ভারতে-পারমাণবিক-শক্তিকেন্দ্রের-বন্টন-উল্লেখ-করাে-এই-শক্তির-ব্যবহার-লেখাে

 

 

পারমাণবিক শক্তি

 

, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে পরমাণু চুল্লিতে তেজস্ক্রিয় বা পারমাণবিক খনিজের (যথা—ইউরেনিয়াম 235) পরমাণুর বিভাজনের মাধ্যমে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তার সাহায্যে জল গরম করে টারবাইন ঘােরানাে হলে, তখন টারবাইনের সঙ্গে সংযুক্ত জেনারেটার ওই গতিশক্তিকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত করে। পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে এই বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদিত হয় বলে একে পারমাণবিক শক্তি নামে অভিহিত করা হয়। ইউরেনিয়াম, থােরিয়াম প্লুটোনিয়াম, লিথিয়াম প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের মােট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় 15% পারমাণবিক শক্তি থেকে আসে। ভারতও পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে পিছিয়ে নেই।

 

 ভারতে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের বণ্টন

 

ভারতে যে যে রাজ্যে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলি হল—

 

 মহারাষ্ট্র –তারাপুর, জইতাপুর (নির্মীয়মান) 

তামিলনাড়ু — কালপক্কম, কুদানকুলাম  রাজস্থান –কোটা, রাওয়াতভাটা

 কর্ণাটক –কৈগা

 

 গুজরাত –কাকরাপাড় 

উত্তরপ্রদেশ –নারােরা।

 অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিভেন্দুলা (নির্মীয়মান)

 

নামাণবিক শক্তির ব্যবহারগুলি হল

 

পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার 1. বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। 

2 চিকিৎসাক্ষেত্রে : পারমাণবিক শক্তি চিকিৎসার কাজেও ব্যবহার করা হয়।

 3. সমুদ্রজল লবণমুক্ত করতে : সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করার জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হয়। 

4 সাবমেরিন ও জাহাজ চালাতে ; সাবমেরিন ও জাহাজ চালাতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহৃত হয়। 

5. ধ্বংসাত্মক কাজে : সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই পারমাণবিক বােমা তৈরি করে মানবসভ্যতা ধ্বংসের কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

মাত্র 1 পাউন্ড বা প্রায় 150 গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে 12000 মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে 6000 টন কয়লার প্রয়ােজন হয়। তাই পারমাণবিক শক্তিকে বিশের সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাময় শক্তির উৎস বলা হয়।

 

■  ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখাে। |

 

পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধা পদার্থের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের বিভাজন বা সংযােজন ঘটিয়ে যে শক্তি উৎপাদন করা হয়, তাকে পারমাণবিক শক্তি বলে।

 

সুবিধা

 

পদার্থের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের প্রধান সুবিধাগুলি হল

 

1. অধিক শক্তি উৎপাদন : খুব সামান্য পরিমাণ কাচামাল (ইউরেনিয়াম, থােরিয়াম প্রভৃতি) ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা যায়। যেমন—1 পাউন্ড ইউরেনিয়াম থেকে প্রায় 12000 মেগাওয়াট ঘন্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

 

2. শক্তিকেন্দ্র স্থাপন : কাঁচামাল কম লাগে বলে উন্নত প্রযুক্তি, মূলধন, বিদ্যুতের চাহিদা এবং কাঁচামাল হিসেবে ইউরেনিয়ামের জোগান থাকলে যে-কোনাে স্থানে পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র স্থাপন : করা যায়।

 

3. স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদন : পারমাণবিক শক্তির উৎপাদন খরচ কম। তাই সস্তায় প্রচুর বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া যায়।

 

4. প্রত্যক্ষভাবে পরিবেশদূষণ ঘটে না : বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয় তা তেজস্ক্রিয় হলেও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে পরিবেশদূষণের ভয় থাকে না।

 

অসুবিধা

 

পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের প্রধান অসুবিধাগুলি হল—

 

1. তেজসিকাতার সমস্যা : পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের সময় যে তেজস্ক্রিয় শক্তি নির্গত হয় তা থেকে ক্যানসার ও অন্যান্য রোগ হয় এবং জীবজগতের ক্ষতি করে।

 

2. উৎপাদান অসুবিধা পারমাণবিক শক্তির কাঁচামালগুলিকে এখনও লাভজনকভাবে ব্যবহার করা যায়নি। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ বহু দেশ বেশি অর্থ দিয়ে অন্যদেশ থেকে ভারী জল (deuterium oxide) আমদানি করে বলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।

 

3. অন্যান্য অসুবিধা:  পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত মূলধনের প্রয়োজন হয় বলে সব দেশ বা অঞ্চলের পক্ষে-এর ব্যবহার সম্ভব হয় না।  পারমাণবিক চুল্লির বয়স 30 – 40 বছর হলে নতুন চুল্লি বসাতে হয়, ফলে খরচ বেড়ে যায়। 3) এ ছাড়া পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে যে-কোনাে সময় বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক উত্তরধর্মী প্রশ্নাবলি

 

● প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখাে।

 

• প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের সুবিধা: ১.প্রচলিত শক্তির উৎসগুলি দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, ফলে এই শক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজলভ্য। ২. কোনাে দেশে এই শক্তি না থাকলেও, প্রচলিত শক্তির উৎস পরিবহণযােগ্য বলে (জলপ্রবাহ ছাড়া) এগুলি দেশ থেকে সহজেই আমদানি করে ব্যবহার করা

 

প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের অসুবিধা : ১.অধিকাংশ প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারে পরিবেশ দূষিত হয়। ২. অধিকাংশ প্রচলিত শক্তির উৎস সঞ্জিত বা ক্ষয়িষ্ণু (fund or exhaustible) হওয়ায় ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে এগুলি নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারে। ৩. আহরণ এবং ব্যবহার বা বিকাশের জন্য প্রচুর মূলধন এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়ােজন ৪. প্রচলিত শক্তি উন্নত এবং অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে সৃষ্ট কে আরও প্রকট করে।

 

■  পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে কেন?

 

। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকার কারণ: 

  বর্তমান বিশ্বের মােট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় 15 শতাংশ বিদ্যুৎ পারমাণবিক শক্তি থেকে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, 1 পাউন্ড ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম থেকে প্রায় 12000 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া থােরিয়াম, লিথিয়াম প্রভৃতি মৌলিক পদার্থ থেকেও পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদিত হয়। ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় উপাদানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা এতটা বেশি হলেও বা উন্নত দেশগুলিতে এক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটলেও ভারতের মােট উৎপাদিত বিদ্যুৎতের মাত্র 3 শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি। ভারতে মােট 6টি পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের মােট উৎপাদন ক্ষমতা 4780 মেগাওয়াট ঘণ্টা।

 

 ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কম উৎপাদনের কারণগুলি হল— 

১. ভারতে খুব অল্প পরিমাণে ইউরেনিয়াম ও থােরিয়ামের সঞয় রয়েছে। তাই কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান অন্তরায়।

 

 ২. পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকাঠামাে গড়তে বিপুল অর্থের প্রয়ােজন হয়, ভারতের মতাে উন্নতিশীল দেশের পক্ষে যার ব্যবস্থা করা যা অসুবিধাজনক। 

 

 ৩. ভারতের মতাে দেশে পরমাণু বিদ্যুতের উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করা নিয়ে নানাবিধ সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

 

 ৪. ভারতে বিপুল পরিমাণে কয়লা উৎপাদিত হয় বলে অল্প প্রয়াসেই তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অগ্রগতিতে অন্যতম অন্তরায়।

 

● জলবিদ্যুৎকে সাদা কয়লা’ বলার কারণ লেখাে।

 

 জলবিদ্যুৎকে ‘সাদা কয়লা’ বলার কারণ: বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান কয়লা। কিন্তু কয়লা একটি গচ্ছিত সম্পদ এবং পরিবেশদূষণ ঘটায়। তাই বর্তমানে প্রবহমান জলধারার মাধ্যমে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এটি প্রবহমান সম্পদ হওয়ায় ভবিষ্যতে ফুরিয়ে যাবার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ বিশেষ ঘটে না বলে এর ব্যাবহারিক গুরুত্বও বেড়েছে। জলবিদ্যুতের এরূপ ব্যাবহারিক গুরুত্ব উপলবদ্ধি করে একে কয়লার সাথে তুলনা করে সাদা কয়লা’ বলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *