সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসার (১৮৭১-১৯১৪)

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসার (১৮৭১-১৯১৪)

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসার (১৮৭১-১৯১৪)

সমাজতান্ত্রিক-আন্দোলনের-প্রসার-১৮৭১-১৯১৪

 

 ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের রূপরেখা

আধুনিক সমাজতন্ত্রবাদের উৎসভূমি ফ্রান্স। এর উদ্ভব শিল্প বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া স্বরপ। ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দের পর কল্পনাবিলাসী সমাজতন্ত্রবাদীরাই সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রের একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে গেছিলেন।   তাঁরা পুঁজিবাদের ত্রুটিবিচ্যুতি এবং পুঁজিবাদ যে শােষণের জন্য  দায়ী তা জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা উন্নততর  শােষণহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু, সেই স্বপ্নকে সার্থক করার জন্য বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারেন নি এবং নিপীড়িত শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার কথা আদৌ ভাবেন নি। অথচ তাদের তত্ত্ব প্রচার ও তার বাস্তব প্রয়ােগের কালেই ট্রেড ইউনিয়ন ও ধর্মঘটের মাধ্যমে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানীতে শ্রমিকশ্রেণী আন্দোলন করেছিল। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডে চাটিস্ট আন্দোলন (১৮৩৬-৪৮) তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং ফ্রান্সে ‘সােস্যাল ডেমােক্রেসি’র আন্দোলন এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, এটি সেখানে ১৮৪৮ খ্রীষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারী বিলব সষ্টিতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
এই সমস্ত শক্তিশালী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজ বিপ্লব সংঘটন—বহু ত্রুটি -বিভ্রান্তি সত্ত্বেও এগুলির মল প্রােথিত ছিল সমাজতন্ত্রে। ইতিমধ্যেই কাল মার্কস ও এঙ্গেলস-এর সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রথম আন্তজাতিক প্রলেতারীয় সংগঠন কমিউনিস্ট লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (১৮৪৭ খ্রীঃ)-এর শ্লোগান ছিল “দুনিয়ার মজদুর এক হও।” লণ্ডনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অধিবেশনে এই সংস্থার কর্মসচী রচনার ভার পড়ে মার্কস ও এঙ্গেলস-এর ওপর। পর বৎসর তাঁরা ‘ম্যানিফেস্টো অফ দ্য কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ করেন—এতে ছিল ‘ বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রবাদ’ বা সাম্যবাদের মুল নীতির একটি রূপরেখা আর শ্রমিক আন্দোলনের কর্মসচী, চড়ান্ত লক্ষ্য ও লক্ষ্য সাধনের কৌশলের সুস্পষ্ট নির্দেশ। এই প্রথম সমাজতন্ত্রবাদ ও শ্রমিক আন্দোলন একটি অভিন্ন বেগবান স্রোতধারা সষ্টি করল।

১৮৪৮ খ্রস্টিাদের ফেব্রুয়ারী বিপ্লব, প্যারিসের জন অভ্যুথান ও চাটিস্ট আন্দোলনের ব্যর্থতার ফলে কিছুকালের জন্য সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে ভাটা পড়ে। কিন্ত, অল্প কিছুকাল পরেই ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে থাকে। শিল্পে ঘন ঘন ধর্মঘট দেখা দিতে থাকে এবং এক্ষেত্রে সাফল্য সমাজতান্দ্বিক আন্দোলনে গতিবেগ সঞ্চার করে। ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রলেতারীয় সঘবদ্ধতার ছবি স্পষ্ট রপ পায়। ১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের পোলিশ বিদ্রোহীদের সমর্থনে এগিয়ে আসে ব্রিটিশ ও ফরাসী শ্রমিকরা। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-৬৫) ব্রিটিশ সরকার দাসপ্রথার সমর্থক আমেরিকার দশী-গলিকে সাহায্যদানে উদ্যোগী হলে ব্রিটিশ শ্রমিক সংগঠনগুলির চাপে তা থেকে বিরত হয়।

মার্কসবাদে আন্তর্জাতিক  কতা ও প্রথম আন্তর্জাতিকতা

আন্তর্জাতিকতা মার্কসীয় সমাজতন্ত্রবাদের অন্যতম স্তম্ভ। মার্কসের মতে সব হারাদের মধ্যে কোন জাতিভেদ থাকতে পারে না, “সর্বহারাদের কোন পিতৃভমি নেই। তাই তার কম্বকণ্ঠে নিসৃত হয়েছিল শােষণের বিরুদ্ধে মার্কসবাদে আন্তর্জাতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য বিশ্বের সমস্ত সর্বহারাদের ঐক্যবদ্ধ  হওয়ার উদাত্ত আহবান। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের একটি তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি রচনার জন্য মার্কস, সচেষ্ট হন। ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৮শে সেপ্টেম্বর লন্ডনে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মান ও অন্যান্য দেশের শ্রমিকরা মিলিত হয়ে গঠন করে প্রথম আন্তর্জাতিক (First International )। প্রথম আন্তর্জাতিকের বার বৎসরের আয়ুষ্কালে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এর অধিবেশন বসেছিল এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে মত বিনিময়ের ফলে বহু দেশে সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের পথ প্রশস্ত হয়।

১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে সমাজতান্ত্রিক আন্দেলনের ধারা

প্রথম আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশে শ্রমিক আন্দোলনে পরামর্শ ও সহযােগিতা দিতে থাকে। কিন্তু  ১৮৭০ খ্রীস্টাব্দের পর এই সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে মূলতঃ অন্তর্কলহের জন্য। ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে বাকুনিনপন্থী ও মার্কসবাদীদের মধ্যে মতভেদ ও দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। অবশেষে ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে বাকুনিনপন্থীরা আন্তর্জাতিক থেকে বহিষ্কৃত হয়ে একটি নতুা সংগঠন গড়ে তােলে। এছাড়া, বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গেও মতবিরােধ ক্রমশঃ প্রবল হতে থাকায় আন্তর্জাতিকের কর্মকেন্দ্র লডন থেকে আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়। ফলে ইউরােপের সঙ্গে তার যােগাযােগ ক্ষীণ হতে থাকে। অবশেষে ফিলাডেলফিয়ায় প্রথম আন্তর্জাতিকের আনুষ্ঠানিক অবলুপ্তি ঘটে (১৫ই জুলাই, ১৮৭৬ খ্রীঃ)।

ক্যাপিট্যাল রচনা : কাল মাকস প্রথম আন্তর্জাতিকে শুধু, সক্রিয় ভূমিকাই গ্রহণ করেননি ইতিমধ্যে ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশ করেন ‘ক্যাপিট্যালে’র প্রথম খণ্ড—যে ক্যাপিট্যাল রচনা কাজের জন্য তিনি কুড়ি বৎসর পরিশ্রম করেন। ক্যাপিট্যাল গ্রন্থটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের সু-সমঞ্জস ব্যাখ্যা।

মাকসের মত্যুর (১৮৮৩ খ্রীঃ) পর প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অধিবেশন বসে (১৪ই জুলাই, ১৮৮৯ খ্রীঃ)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পব পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে সংযােগ স্থাপন ও তাদের কর্মসূচী প্রণয়নে সচেষ্ট হয়েছিল। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রাণ-পরষ ছিলেন এঙ্গেলস। তাঁর মত্যুর বৎসর অর্থাৎ ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সদস্যদের মতবিরােধ সংগঠনটিকে দবল করে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে প্রতিটি সমাজতন্ত্রী দেশ সমবেতভাবে যুদ্ধ-বিরােধিতা ও শান্তি অক্ষুন্ন রাখার নীতি বিস্মৃত হয়ে নিজ নিজ দেশের সরকারের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন জানায়। এই ভাবেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পরিসমাপ্তি ঘটে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পববতী আন্তর্জাতিক’ দুটির ব্যথতার ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাব হ্রাস পেয়েছিল মনে করলে ভূল হবে। কাল মাকস, ইউরােপের।

সমাজতন্ত্রবাদ একটি গতিময় আন্দোলন

সমাজতকে একটি প্রাণবন্ত গমিয় আন্দোলনে পরিণত করেছিলেন। প্রাক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চল্লিশ বৎসর কাল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন  ইউরােপের ইতিহাসের একটি গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিটি দেশেই সমাজতান্ত্রিক দল গড়ে উঠেছিল আর রাজনীতিবিদদের কেউই এই আন্দোলনের উত্তাপ-উত্তেজনা থেকে দূরে থাকতে পারেন নি।

জার্মানিতে সমাজতন্ত্রবাদ

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছিল জার্মানীতে। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যবদ্ধ জার্মান সাম্রাজ্য দুত শিল্পোন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়। শিল্পােন্নয়নের সাথে সাথে সমাজতন্ত্রবাদের প্রসার ঘটতে থাকে।জার্মানীর সমাজতন্ত্রীরা অবশ্য দুটি দলে বিভক্ত ছিল। ফার্ডিনান্ড লাসালের নেতৃত্বে সােস্যাল ডেমোেক্রটিক পার্টি শতিশালী হয়ে ওঠে এবং আইনসভার ভিতরে ও বাইরে আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকে। লাসাল ও তাঁর অনুগামীদের মার্কসবাদের আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাস ছিল না, তারা জাতীয় সমাজতন্ত্রবাদে আস্থাশীল ছিলেন। অন্যদিকে, কার্ল কটস্কি, নাইনেই ও বেবেল মার্কসপন্থী অন্য সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃস্থানীয় ছিলেন।

১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে দল দুটি বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর গােথাতে মিলিত হয়ে একটি আপসমূলক কর্মসূচীর ভিত্তিতে ‘সােসালিস্ট ওয়াকিংমেন পাটি অফ জামানী’ নামে একটি অভিন্ন সমাজবাদী দল গঠন করে। এই সােস্যাল ডেমােক্র্যাটরা এমনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, বিসমার্ক ও কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম এদের বিরুদ্ধে দমননীতি অনুসরণ করেন। পাশাপাশি বিসমার্ক শ্রমিক কল্যাণমূলক কর্মসুচী (অস্থতার জন্য, দুর্ঘটনার জন্য, বার্ধক্য ও অক্ষমতার জন্য বীমা আইন প্রণয়ন করুন) গ্রহণ করেন। এটি রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র’ নামে অভিহিত। এত করেও তাদের অগ্রগতি রােধ করা যায় নি। সােস্যাল ডেমােক্রাটদের অনুগামীদের সংখ্যা স্ফীত হয়ে ওঠে। অবশ্য অল্প কিছুকাল পরেই এই দলের মধ্যে তীব্র মতানৈক্য দেখা দেয়। অবশ্য এই মতানৈক্য কেবল জার্মানীতেই দেখা দেয়নি, ফ্রান্স, ইতালী, বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশেও মার্কসবাদের ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গােষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল। এই বিরােধের তীব্রতা অবশ্য জার্মানীতেই বেশি অনুভূত হয়েছিল এঙ্গেলসের মত্যুর আগেই।
সােস্যাল ডেমােক্রাটিক দলের একটি অংশ সার্বজনীন ভােটাধিকার, সার্বজনীন অবৈতনিক শিক্ষা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ইত্যাদির দাবিতে উচ্চকণ্ঠ হন। এই গােষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন এডওয়ার্ড বার্ণস্টইন। তিনি প্রচার করেন যে, মার্কসের বহ, তত্ত্ব সেকেলে ও অপ্রাসঙ্গিক। নতুন যুগের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসবাদের সংশােধন ও পুনর্বিবেচনা অত্যন্ত জরুরী। এজন্য বার্ণস্টাইন ও তাঁর অনুগামীরা ‘রিভিশনিস্ট’ বা সংশােধনবাদী বলে অভিহিত। তাঁরা মার্কস ও এঙ্গেলস প্রদর্শিত বৈপ্লবিক পথ থেকে অনেকখানি সরে এসেছেন। বার্ণস্টাইনের বক্তব্য এই যে, হিংসাশ্রয়ী বিলব দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করলেও শেষ পর্যন্ত বিশেষ ফলপ্রদ নয়। গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্রবাদে উত্তরণ ঘটবে। অর্থাৎ বিকের থেকে বির্তনের পথের ওপর তিনি আস্থাশীল।

সংশােধনবাদ আন্তর্জাতিক প্রবণতা

উপরােক্ত সংশােধনবাদ শীঘ্রই একটি আন্তর্জাতিক প্রবণতায় রপান্তরিত হয় এবং সব দেশের সমাজতান্ত্রিক দলগলি এর প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। মাকসীয় সমালােচকদের দৃষ্টিতে এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদের বিকাশের একটি নতুন স্তরের ফল মাত্র। বস্তুতঃ, দেখা গেছিল অপেক্ষাকৃত সমধিশালী দেশগুলিতেই সংশােধন বাদ শক্তিশালী  হয়েছিল।

জামনীর সােস্যাল ডেমােক্রেটিক দলের দুষ্টান্তে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে ক্যান্ডিনেভিয়া এবং হল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি দেশে সােস্যাল ডেমােক্রেটিক দল গঠিত হয়। এগুলির উদ্যোগে এই দেশগুলিতে শ্রমিক কল্যাণকর কিছু আইন প্রণীত হয় ।

ফ্রান্স: উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে ফ্রান্সে সমাজতন্ত্রবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। ১৮৭১ প্রীষ্টাব্দে প্যারিস কমিউনের অভ্যুত্থানের নেপথ্যে সমাজতন্ত্রীদের হাত আছে বলে সরকার সন্দেহ করে। এর ফলে সমাজতন্ত্রীদের ওপর নেমে আসে নির্বিচার দমনপীড়ন। একারণেই বেশ কিছুকাল শ্রমিক আন্দোলন বা সমাজতান্ত্রিক দল গঠনের উদ্যোগ নির্বাসিত বা দেশত্যাগী ফরাসীদের মধ্যেই সীমিত ছিল। সেডানের যুদ্ধের ব্যর্থতার পর ফ্রান্সে নবােদ্যমে পুনরায় দুত শিল্পােন্নয়ন হতে থাকে। এই সূত্রে সমাজতন্ত্রবাদও প্রসার লাভ করে। ১৮৭৯-৮০ খ্রীষ্টাব্দে সমাজতন্ত্রী জলেস গুয়েসেডে ( Jules Guesde) ও পল লাফার্গ-এর ( Paul Lafargue) নেতৃত্বে ‘ওয়াকার্স পাটি গঠিত হয়। এটি ছিল সম্পূর্ণভাবেই মার্কসীয় ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। কিন্তু এর পাশাপাশি অনেকগুলি অ-মার্কসীয় ব্র্যাকিপন্থী, নৈরাজ্যবাদী, সিন্ডিক্যালিস্ট ইত্যাদি শ্রমিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। এগুলির মধ্যে সিন্ডিক্যালিস্টরাই ছিল বেশ শক্তিশালী। এদের বিশ্বাস ছিল প্রলেতারীয় একনায়কতন্ত্র একটি শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র এবং গণতন্ত্রবিরম্ব আর প্রত্যেক শিল্পের মালিকানা সেই শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-সঘের ওপর ন্যস্ত থাকা সে যাই হােক, ফ্রান্সে সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যে অনৈক্যের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। উচিত।

ইংল্যান্ড : ইংল্যান্ডে সমাজতন্ত্র একটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছিল। উনবিংশ শতকের শেষদিকে মার্কসীয় সাম্যবাদবিরােধী ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারী ফেবিয় সমাজতন্ত্র প্রচলিত হয়। এই মতবাদের প্রবক্তাদের মধ্যে ছিলেন  সিডনী ওয়েব ও তাঁর স্ত্রী বিয়াট্রিস, ওয়েব, জর্জ বার্ণাড শ, মিসেস এ্যানি বেশান্ত, এইচ. জি. ওয়েলস-এর মত বুদ্ধিজীবীরা। এদের বিশ্বাস ছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ও সার্বজনীন ভােটাধিকারের মাধ্যমে দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁরা জমি ও মৌল শিল্পগুলির রাষ্ট্রায়ত্তকরণ দাবি করতেন।
তাঁদের মত ছিল বিপ্লবের পথে নয় বিবর্তনের পথ ধরে ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটবে। এজন্য এই মতবাদ সামাজিক ডারউইনবাদ’ নামে অভিহিত। ১৮৯৩ গ্রীষ্টাব্দে ফেবীয়দের একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয় এবং ইণ্ডিপেণ্ডেস্ট লেবার পাটি গঠিত হয় ১৯০৩ খ্রীষ্টাব্দে। ইংল্যান্ডে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনই শ্রমিক আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল। এই ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্বে ১৯০০ গ্রীষ্টাব্দে গঠিত হয়েছিল লেবার পার্টি এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফেবীয় দল ও ইণ্ডিপেণ্ডেস্ট লেবার দলের সমাজতন্ত্রীরা। পরে লেবার পার্টি লক্ষ্য হিসাবে সমাজতন্ত্রবাদকে গ্রহণ করেছিল কিন্তু, মার্কসীয় তত্ত্বকে কোনদিন স্বীকৃতি জানায় নি।

রাশিয়া : রাশিয়ায় স্বৈরাচারী শাসকরা সব প্রকার প্রগতিবাদী আন্দোলনের ঘাের শত্রু, ছিলেন ; তাই সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার কণ্ঠরােধ করেছিলেন কঠোর হাতে। তব শিষ্পেন্নয়নের সাথে সাথে উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে সেখানে  সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। একদা-নারদনিক  গােষ্ঠীর সদস্য ও রুশ মার্কসবাদের জনক প্লেখানভ এমানসিপেশন অফ লেবার’ নামে একটি মার্কসীয় সংগঠন গড়ে তােলেন। তরুণদের মহলে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এই তরুণদের নেতৃস্থানীয় ভি. আই. লেনিনের নেতৃত্বে ১৯৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ‘রশ সোস্যাল ডেমােক্রেটিক পার্টি’ স্থাপিত হয়। এই দল পরে বলশেভিক’ ও ‘মেনশেভিক’—এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায় । প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ে স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের যে দুর্বলতা প্রকাশিত হয় তার সদ্ব্যবহার করে বলশেভিক দল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে (১৯১৭ খ্রীঃ)! এইভাবে বিশ্বের একটি বিশাল দেশে সর্বপ্রথম সমাজতন্ত্রীরা ক্ষমতা দখল করে।

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসার উপসংহার

উপসংহার : উপরের আলােচনা থেকে বােঝা যায় যে, মাকসিস্ট, সােস্যাল ডেমােক্রাট, ফেবিয়ান, সিন্ডিক্যালিস্ট, এ্যানাকিস্ট ইত্যাদি বিভিন্ন গােষ্ঠীর মতবাদে সমাজতান্ত্রিক ধারা পষ্ট হয়েছে। এই সমস্ত বিভিন্ন মতবাদজনিত অনৈক্য সমাজতান্ত্রিক  আন্দোলনের অগ্রগতি ব্যাহত করেনি। বিভিন্ন দেশে পজিবাদের প্রসার এবং দ্রুত শিপােন্নয়ন, শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যাবধি, আন্তর্জাতিকগুলির প্রতিষ্ঠা, সমাজতান্ত্রিক পত্র-পত্রিকার বহুল প্রকাশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে গতিবেগ সঞ্চার করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *