মেঘনাদবধ কাব্য প্ৰশ্ন উত্তর বাংলা Teacj Sanjib

 মেঘনাদবধ কাব্য প্ৰশ্ন উত্তর বাংলা Teacj Sanjib

 

মেঘনাদবধ কাব্য

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মেঘনাদবধ কাব্য প্ৰশ্ন উত্তর

 

মেঘনাদবধ-কাব্য-প্ৰশ্ন-উত্তর-বাংলা-Teacj-Sanjib

 

 মেঘনাদবধ কাব্যের সারসংক্ষেপ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

 

মেঘনাদবধ কাব্য প্রথম সর্গের সারসংক্ষেপ :

 

বাণী বন্দনার মাধ্যমে কবি মেঘনাদবধ কাব্যের সূচনা করেছেন। সম্মুখ সমরে রাবণপুত্র বীরবাহর মৃত্যুর পর, রাক্ষসরাজ রাবণ কাকে সেনাপতি পদে বরণ করলেন, এবং কেমন করে উর্মিলার পতি লক্ষণ অজেয় মেঘনাদকে নিহত করে দেবরাজ ইন্দ্রকে নিঃশঙ্ক করলেন এই কাহিনী কবি বর্ণনা করতে চান। কবি জানেন চোর রত্নাকর বাগদ্ববী সরস্বতীর কৃপায় কাব্য রত্নাকর বা বাল্মীকিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি জানেন বাগদ্ববীর কৃপায় বিষবৃক্ষও সুচন্দন বৃক্ষের শােভা ধারণ করতে সক্ষম। তিনি জানেন তিনি গৃণহীন, কিন্তু মা তাঁর গুণহীন সন্তানকেই বেশী স্নেহ করেন বলেই তিনি আশা করেন বাগদেবী তাঁকে নিশ্চয়ই কৃপা করবেন। তাই তাঁর রসনায় অধিষ্ঠিতা হবার জন্যে কবি তাঁকে আহবান করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি আহবান করছেন কল্পনাদেবীরও। কবি বীররসের মহাকাব্য রচনা করবেন—বঙ্গভাষাভাষীরা যেন চিরকাল আনন্দচিত্তে সেই রস পান করে তৃপ্ত হতে পারেন।

 

রাক্ষসরাজ দশানন হেমমুকুট পরিধান করে সুমেরু; পর্বতের ন্যায় স্বর্ণসিংহাসনে বসে আছেন। তাঁর রাজসভা স্ফটিকে গঠিত, নানান প্রকার মূল্যবান রত্নরাজিতে সেই সভা অলংকৃত। সুচার-লােচনা কিঙ্করীরা মৃণাল বন্দিত ভুজে তাঁকে বীজন করছে, হরকোপানলে একদা ভস্মীভূত মদনের মত সুন্দর চেহারার ছত্রধর দশাননের মাথার ওপর ছত্র ধরে রয়েছে। দ্বারদেশে ভীষণ চেহারার দৌবারিক। সেখানে চির বসন্ত বিরাজমান। এক কথায় পাণ্ডবদের তুষ্ট করবার জন্যে ময়দানব ইন্দ্রপ্রস্থে যে অপরূপ সভা গড়েছিল রাবণের সভা তার চেয়েও সুন্দর।

 

  ভগ্নদুত মকরাক্ষ যুদ্ধের সংবাদ দশাননের কাছে নিবেদন করছিলেন। যুদ্ধে বীরবাহু; নিহত হয়েছেন এই সংবাদ দেওয়ার জন্যেই দশাননের সম্মুখে তিনি দাড়িয়েছিলেন। সেই সংবাদ শুনে দশানন পুত্রশােকে অশ্রুপাত করতে লাগলেন। অমরবৃন্দ যাঁর ভুজবলে কাতর তাঁকে ভিখারী রাঘব কেমন করে হত্যা করলেন। তিনি কি স্বপ্নে কারও কথা শুনেছেন ? কিন্তু সংবাদটি যে সত্য তাহা তিনিও জানতেন, এবং মানতেন বলেই নিজের ভাগ্যকে তিনি দায়ী করতে লাগলেন, দায়ী করতে লাগলেন সূর্পণখাকে ; কারণ, পঞ্চবটী বনে লক্ষণের কাছে নাক আর কান কাটা যাওয়ার ফলে, সেই তাঁকে সীতার সংবাদ দিয়েছিল। রাম তাে মানুষ নয়, কালভুজঙ্গ। কারণ তাঁরই হাতে লঙ্কার একটির পর একটি বীরযােদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছেন। দিনের পর দিন হতশ্রী হয়ে পড়েছে। তিনি জানেন এইভাবে আর কিছুদিনের মধ্যেই তিনিও ভিখারী রাঘবের হাতে সবংশে নিহত হবেন। পুত্রশােকে তিনিই এতই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন যে মন্ত্রী সারণের সান্ত্বনাতেও তিনি কিছুমাত্র সান্ত্বনা পেলেন না। কিছুক্ষণ পরে শােকাবেগ কিছুটা শান্ত হলে বীরবাহু কিভাবে মত্যুবরণ করেছিলেন ভগ্নদুত মকরাক্ষকে তাহা বর্ণনা করতে নির্দেশ দিলেন।

 

মকরাক্ষের মুখে বীরবাহর বীরত্বপূর্ণ দুর্ধর্ষ সংগ্রামের কথা শুনে বীরপুত্রের গর্বে তার বুক ফুলে উঠল। পুত্রের বীরত্বের অজস্র প্রশংসা করে পাত্রমিত্র সভাসদদের নিয়ে প্রাসাদ-শিখরে আরােহণ করে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেখান হতে লঙ্কাপুরীকে বড়ই সুন্দর দেখাচ্ছিল। রাক্ষসরাজ লক্ষ্য করলেন রামের কপিসৈন্যরা উত্তর, দক্ষিণ, পুর্ব এবং পশ্চিমে লঙ্কাকে অবরােধ করে রেখেছে। পূর্ব দ্বারে নীল, দক্ষিণ দ্বারে অঙ্গদ, উত্তর দ্বারে সুগ্রীব এবং পশ্চিম দুয়ারে স্বয়ং দাশরথি রামচন্দ্র ও লক্ষণ এবং বিভীষণ বীর হনুমানের সঙ্গে দণ্ডায়মান। দুরে যুদ্ধক্ষেত্রে অসংখ্য মৃতদেহ : হয়, হস্তী, রথ বিকীর্ণ হয়ে পড়ে রয়েছে। শকুনি-গৃহনি এবং শৃগাল কুকুরের দল মৃতদেহগুলিকে ভক্ষণ করার জন্যে কলরব করছে সে এক বীভৎস দৃশ্য ! সেই মহাশসানে শত্রুদের মৃতদেহের ওপরে মহাবীর বীরবাহুর বিশাল মৃতদেহটি পড়ে রয়েছে। পুত্রের এই বীরশয্যা দেখে দশানন যুগপৎ বিমর্ষ এবং হরষিত হলেন। শত্রুদল নিধন করে তার নিজেরও ওইভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে শয়ন করার অভিলাষ রয়েছে। কিন্তু তবু পুত্রশােক তাে ভুলার নয়। 

মেঘনাদবধ কাব্য

এইভাবে শােক করতে করতে হঠাৎ তাঁর সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি পড়ল। তিনি দেখলেন সমুদ্রের বুকে সেতু বাধা হয়েছে। এই দেখে সমুদ্রকে তিনি ধিক্কার দিলেন। বানরের দল তার মতো বীরের কঠে শৃঙ্খল পরিয়েছে এত বড় অপমান সমুদ্রকে আর কেউ কোনােদিন করতে পারে নি। ছিঃ ছিঃ ! কী লজ্জার কথা।

 

তারপর দশানন পাত্র-মিত্র-সভাসদদের সাথে আবার সিংহাসনে এসে বসলেন। এমন সময় পুত্রশোকে কাতরা রাজমহিষী চিত্রাঙ্গদা ক্রন্দন করতে করতে সখিপরিবৃত হয়ে রাজসভায় উপস্থিত হলেন। তাঁর শােকে সবাই শােকার্ত হয়ে উঠল।

 

বীরবাহর জননী চিত্রাঙ্গদা সভায় এসে স্বামী রাবণকে বীরবাহুর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। বিধাতা তাঁকে একটিমাত্র সন্তানই দিয়েছিলেন ; সেই সন্তানটিকে তিনি রাজার কাছে রেখেছিলেন। সেই ধনটি তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে রাজার কাছে তিনি প্রার্থনা জানালেন। চিত্রাঙ্গদার অনাযােগ শুনে রাবণ নিহত পুত্রের জন্যে পুনরায় অশ্রুপাত করে বললেন তিনি নিজেই গ্রহের বিপাকে পড়েছেন। নিয়তিই তাঁকে সবংশে নিহত করবে । সুতরাং তাকে বৃথা গঞ্জনা দিয়ে লাভ নেই। তাতে মড়ার ওপরে খাঁড়ার আঘাত করা হবে। তা ছাড়া, চিত্রাঙ্গদা যদি তাঁর একটিমাত্র পুত্রের জন্যে এত কাতর হন তাহলে শত শত প্রজার মৃত্যুতে তিনি যে কত বেদনা ভোগ করেছেন তা একবার ভেবে দেখলে চিত্রাঙ্গদা আর তাঁকে অভিযুক্ত করতেন না। তাতেও যখন চিত্রাঙ্গদাকে বােঝানো গেল না তখন রাবণ তাঁকে অন্য কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন বীরবাহু দেশের বীর সন্তান। দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে রক্ষার জন্যে তিনি মত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে লঙ্কার রাজবংশ উজ্জল হয়েছে। বীরপুত্রের জননী হয়ে তাই তাঁর ক্রন্দন করা উচিত নয়।

 

এই সান্ত্বনায় চিত্রাঙ্গদা প্রবােধ তো মানলেই না; বরং ক্ষোভে উন্দীপ্তা হয়ে উঠলেন। তার বক্তব্য স্পষ্ট প্রাঞ্জল। রামচন্দ্র করে লঙ্কা অধিকার করে দশাননকে সিংহাসনচ্যুত করতে দুর দেশ অযােধ্যা থেকে আসেন নি। এসেছেন তার অপহৃতা পত্নীকে উদ্ধার করতে। নিরপরাধিনী সীতাকে দশাননই অপহরণ করেছেন। রামচন্দ্র যদি রাজ্যলােভে লঙ্কা জয় করতে আসতেন, এবং সেই যুদ্ধে বীরবাহু যদি নিহত হতেন তাহলে জননী হিসাবে তিনি গর্ব অনুভব অবশ্যই করতেন। কিন্তু ঘটনাটি তা নয়। এই কাল-সমরের জন্যে দায়ী একমাত্র দশানন নিজে। সেইজন্যে তাঁর কৈফিয়তে চিত্রাঙ্গদা সন্তুষ্ট নন। চলে যাবার সময় তিনি অভিযােগ করে গেলেন যে নিজের কর্মদোষে দশানন নিজে মজেছেন, লঙ্কাকে ধংস করছেন। 

 

এ অভিযােগের কোন উত্তর ছিল না দশাননের। তাই চিত্রাঙ্গদার প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘােষণা করলেন যে তিনি নিজেই যুদ্ধে গমন করে পুত্রহত্যার প্রতিশােধ নেবেন। এই ঘােষণার পরেই চারপাশে রাক্ষসদের মধ্যে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল। তাদের পদভরে স্বগ-মত, রসাতল কেঁপে উঠল।

 

রাক্ষস সৈন্যদের পদভারে সমুদ্র হয়ে উঠল উত্তাল। সমুদ্রতলে রাজপ্রকোষ্ঠে সমুদ্র-সম্রাজ্ঞী বারণী মনে করলেন প্রভঞ্জন বুঝি বা সন্ধির শর্ত ভুলে সমুদ্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধে নেমেছে। কিন্তু, তার সখী মুরলা তার নিকট আসল ঘটনাটি

 

নিবেদন করলেন। তিনি বললেন, ঋড় নহে ‘ঝড়াকারে’ রাবণের যােদ্ধবৃন্দ বীরদর্পে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করেছে। এই শুনে বারণী তাঁকে লঙ্কার রাজলক্ষী রমার কাছে যুদ্ধের সংবাদ জানার জন্যে পাঠালেন ।

 

বিষ্ণুপ্রিয়া রমা লঙ্কার রাজপুরীতে বাস করছিলেন। রাক্ষেরাজ প্রতিদিন তাঁকে পরম ভক্তিভরে পুজা করতেন। মুরলা সেই মন্দিরে উপস্থিত হয়ে রমাকে বারণীর সংবাদ দিলেন, তারপর লঙ্কাযুদ্ধের সমাচার জিজ্ঞাসা করলেন। রমার কথায় তিনি জানতে পারলেন কুম্ভকর্ণ আদি বীর লঙ্কার যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, শেষ বলি বীরবাহু। তাঁরই হত্যার প্রতিশােধ নেবার জন্যে রাবণ নিজেই যুদ্ধে যাবার আয়ােজন করছেন। তারপরে, ছদ্মবেশে দুজনেই পথে বার হলেন যুদ্ধের আয়ােজন দেখতে। সেই বিপুল আয়ােজন দেখার পরে মুরলা বীর ইন্দ্রজিতের প্রসঙ্গ তুললে রমা বললেন যে ইন্দ্রজিৎ প্রমােদ-উদ্যানে বিহার করছেন। তাঁর মৃত্যু না হলে রাবণবধ হবে না, এবং রাবণবধ সমাপ্ত না হলে তিনি লঙ্কাপরী ছেড়ে বৈকুণ্ঠে যেতে পারবেন না। তাই তিনি অনতিবিলম্বে ইন্দ্রজিৎকে লক্কায় আনার জন্যে প্রমােদ কাননে যাবেন।

 

রমা তাঁকে মুরলাকে বিদায় দিয়ে রমা ধাত্রী প্রভাষার বেশে ইন্দ্রজিতের প্রমােদ-উদ্যানে উপস্থিত হলেন। ধাত্রীকে দেখে প্রমােদ উৎসবে রত ইন্দ্রজিৎ স্বর্ণ সিংহাসন হতে নেমে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে তাঁর আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে অনুরােধ করলেন তিনি যেন ত্বরায় লঙ্কায় গমন করে মায়াবী রামের হাত থেকে লঙ্কাকে উদ্ধার করেন।

 

এই সংবাদে ইন্দ্রজিৎ রােষে পুষ্পমাল্য ছিড়ে ফেলে দিলেন। লঙ্কার বিপদের সময় তিনি যে প্রমােদ-উদ্যানে নারীদের মধ্যে বসে রয়েছেন এতেই তিনি তারপরে কোনো রকম বিলম্ব না করেই তিনি লঙ্কায় যাবার জন্যে রথে আরোহণ করলেন। এমন সময় পত্নী প্রমীলা এসে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁকে ছেড়ে তিনি যাচ্ছেন কেন ? উত্তরে ইন্দ্রজিৎ মিষ্টি হেসে বললেন রাম-লক্ষণকে হত্যা করে তিনি অচিরেই ফিরে আসবেন। 

 

তারপরে, তিনি পুষ্পক রথে চেপে বসলেন। আকাশের মধ্যে দিয়ে তীব্র বেগে সেই রথ লঙ্কাপুরীর দিকে ধাবিত হল। লঙ্কায় প্রবেশ করে পিতা দশাননের কাছে দণ্ডবৎ হয়ে অনুরােধ করলেন তাঁকেই যেন যুদ্ধে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি থাকতে দশানন যদি যুদ্ধে যান তাহলে ত্রিভুবনে কুযশ ঘােষিত হবে। পুত্রকে নিবৃত্ত করতে না পেরে দশানন তাঁকেই সেনাপতি পদে বরণ করলেন। সেই সঙ্গে বললেন আগামী কাল নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সমাপণ করে তিনি যেন যুদ্ধে গমন করেন। ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতিপদে বরণ করা হয়েছে এই সংবাদে লঙ্কাপুরী আনন্দে মেতে উঠল। ‘বাজিল রাক্ষস-বাদ্য’—জয়ধবনিতে ভরে উঠল কনক-লংকার আকাশ-বাতাস।

 

 দ্বিতীয় সর্গে মৈঘনাদকে কি করে বধ করা যায় তারই পরিকল্পনা করার জন্যে রমা সেদিন রাত্রিতেই ইন্দ্রের রাজসভায় গমন করলেন। তার অনুযােগ সেই এক। মেঘনাদের মৃত্যু না হলে রাবণের মৃত্যু হবে না ; এবং রাবণের মৃত্যু না হলে লঙ্কা থেকে তার মুক্তি হবে না ; কারণ, রাবণ প্রতিদিন ভক্তিভরে তাঁকে পূজা করেন । অথচ, বৈকুণ্ঠপরীতে মন ব্যাকুল হয়েছে। কিন্তু মেঘনাদকে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সমাপন করার সুযােগ দিলে তাঁকে বধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই ইন্দ্রকে তিনি কৈলাসে মহাদেবের কাছে পাঠালেন বধের উপায় জানতে । কারণ রাবণ মহাদেবের আশ্রিত। রমার অনুরােধে দেবরাজ ইন্দ্র পত্নী শচীদেবীকে সঙ্গে নিয়ে । কৈলাসে গমন করলেন। মহাদেব তখন যােগাসন পর্বতে তপস্যা করছিলেন। উমার সাহায্যে মহাদেবের কাছ থেকে মেঘনাদের বধের উপায় জানা গেল। তাঁর নির্দেশে ইদ্র গেলেন মায়াদেবীর আবাসে। সেখান থেকে সুবর্ণ ফলকে মণ্ডিত অসি নিয়ে এলেন তিনি। তারপর মায়াদেবীর পরামর্শে সারথী চিত্ররথকে দিয়ে সেই অসি পাঠিয়ে দিলেন রামচন্দ্রের কাছে। সেই অস্ত্র দিয়েই পরদিন প্রাতে লক্ষণ মেঘনাদকে নিধন করবেন। এইভাবে দ্বিতীয় সর্গের কাহিনী শেষ হয়েছে।

 

মেঘনাদবধ কাব্য তৃতীয় সর্গের সারসংক্ষেপ :

 

প্রমােদ কানন থেকে লঙ্কার পথে যাত্রা করার সময় ( ১ম সগ) মেঘনাদ তাঁর পত্নী প্রমীলাকে বলে এসেছিলেন রাম-লক্ষণকে অচিরেই বধ করে তিনি সেখানে ফিরে যাবেন। কিন্তু অপরাহ্ন শেষ হয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলাে। সন্ধ্যাও ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চললাে রাত্রির দিকে। তবু মেঘনাদ ফিরলেন না। এই দেখে প্রমিল অস্থির হয়ে উঠলেন।

 

এখনই আসবাে বলে যিনি চলে গেলেন তাঁর এত বিলম্ব হচ্ছে কেন ? সান্ত্বনা দেবার জন্যে সখী বাসন্তী বললেন মেঘনাদের জন্য তিনি বৃথাই ভাবনা করছেন ; কারণ তাঁকে নিধন করতে পারে এমন বীর ত্রিভুবনে কোথাও নেই। তিনি শত্রুকে নিধন করে ত্বরায় ফিরে আসবেন। এখন ফুলবনে গিয়ে ফুলের মালা গেথে সময়টা কাটিয়ে দিলে তাঁর পক্ষে ভালােই হবে। মেঘনাদ ফিরে এলে সেই ফুলের মালা দিয়ে তিনি তাঁর অভ্যর্থনা করবেন।

 

বাসন্তীর কথা শুনে প্রমীলা তাকে সঙ্গে করে ফুলবনে নিয়ে গেলেন। অনেক ফুল ফুটেছিল সেখানে। ম্লানমুখী সূর্যমুখীর কাছে গিয়ে সহানুভূতি বরে নিজের দুঃখের কথা তাঁকে জানালেন। তারপরে অনেক ফুল তুললেন দুজনে। মালাও গাঁথলেন। কিন্তু সবই যে বৃথায় যায় । মেঘনাদ তখনও ফিরলেন না। হতাশায় ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত সেই রাত্রিতেই লঙ্কায় যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন তিনি। বাসন্তী ওই প্রস্তাবে বিস্মিত হয়ে বলেন সে সম্ভব নয়। লকার চারপাশে ঘিরে রয়েছে রাঘবের সেনানী। লক্ষ লক্ষ শত্রু অস্ত্র হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে দিয়ে লঙ্কায় প্রবেশ করা কেবল দুঃসাধ্য নয় অসাধ্য। এই শুনে প্রমীলা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে পর্বত ছেড়ে নদী যখন প্রবল বেগে সাগর অভিমুখে ধাবিত হয় তখন তার গতিরােধ করতে কেউ পারে না। তিনি সহজ নারী নন ; দানব-নন্দিনী তিনি, আর রক্ষঃ-কুল বধ। তাঁর শ্বশুর রাবণ, স্বামী মেঘনাদ ; ভিখারী রাঘবকে তিনি ডরান না। লঙ্কায় তিনি যাবেই। রাঘব কেমনভাবে তাঁকে বাধা দেন তা তিনি দেখবেন।

 

তাঁর নির্দেশে চারপাশে সাজ-সাজ রব পড়ে গেল। তাঁর নারীবাহিনী সঞ্জিতা হলাে অস্ত্রশয্যায়। চারপাশে কেপে উঠলাে ধনুকটকারে। কটিদেশে তাদের অসি; । হাতে ধনুক, শুল ; কাঁধে তণীর। একশ চেড়ী প্রমিলার সঙ্গে যাবার জন্যে প্রস্তুত হলাে। প্রমীলা নিজেও রণরঙ্গিনীর বেশভূষা করলেন। কবরীর ওপরে তার শােভা পেল কিরিটির ছটা, অঞ্জনের রেখা ভালে ; উচ্চ কুচ দুটি কবচে আবৃত ; কটিদেশ স্বর্ণ-সরাসন। হৈমময় কোষে খরশান অসি ; করে দীর্ঘ শুল। লঙ্কাযাত্রার প্রস্তুতিপর্ব তার সমাপ্ত। তারপর সখী সৈনিকদের সম্বোধন করে তিনি বললেন : অরিন্দম ইন্দ্রজিৎ লঙ্কা থেকে ফিরে আসতে কেন এত বিলম্ব করছেন তা আমি জানি না। আমি আজ রামচন্দ্রের কটককে বাহুবলে পরাজিত করে লঙ্কাপুরে প্রবেশ করবো। আমার কপালে যা থাকে থাক।

 

এইভাবে বীরাঙ্গনা সখীদের নিরে প্রমীলা বীরদর্পে লঙ্কার অভিমুখে যাত্রা করলেন। কনক লঙ্কা টলে উঠলাে, গর্জে উঠলাে জলধি । অক্ষরের ধলিতে আবরিত হলাে চারিদিকে। কিন্তু তাতে বামাদের উজ্জল দেহ-কান্তি ঢাকা পড়লাে না।

 

কিন্তু, লঙ্কায় প্রবেশ করার পথে প্রথম বাধা এলো পবন-নন্দন ভীষণ দর্শন হুনুর কাছ থেকে। তার ধারণা হয়েছিল রাক্ষসেরা মায়াবলে সুন্দরী রমণীদের বেশ ধরে রাঘব সেনানীদের ক্ষতি করার জন্যে সেখানে এসে হাজির হয়েছে। এই মনে করে সে গর্জন করে সামনে এগিয়ে গেল। প্রমীলার সখী নুমুণ্ডমালিনী কোদণ্ডের এই মনে

 

টঙ্কার দিয়ে বীর দর্পে হুঙ্কার ছেড়ে বলল  তার মতাে ক্ষুদ্র জীবকে সে হত্যা করতে চায় না। তার চেয়ে সে যেন সীতানাথকে ডেকে আনে—সেই সঙ্গে ঠাকুর লক্ষণ আর রাক্ষস-কুল-কলঙ্ক বিভীষণকে। আরাে সে জানালাে যে অরিন্দম ইন্দ্রজিতের পত্নী প্রমীলা সুন্দরী প্রতিপদ পূজার জন্যে বাহ,বলে লঙ্কায় প্রবেশ করবেন।

 

 এই শুনে বীরর হনুমান একটু এগিয়ে গিয়ে সভয়ে চেয়ে দেখলাে বীরাঙ্গনাদের মাঝখানে যােদ্ধবেশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রমীলা। লঙ্কায় অনেক সুন্দরী রমণীদের সে দেখেছে, কিন্তু এত রূপবতী কোনাে রমণীই তার চোখে পড়ে নি। তাই সে বিনীতভাবে প্রমীলাকে সম্বোধন করে জানালাে যে রঘুকলরবি রামচন্দ্র লক্ষ লক্ষ বীরদের নিয়ে সেতুবন্ধন করে লঙ্কায় এসেছেন। তাঁর অরি রক্ষোরাজ। কিন্তু, অবলাদের বিরুদ্ধে তার কোনাে অভিযােগ নেই। রঘুনাথ দয়ার সিন্ধু। তার কাছে প্রমীলার কোনাে অনুরােধ থাকলে, বা কেন তিনি এসেছেন তা জানতে পারলে রঘুনাথকে সে জানাবে। প্রমীলা তখন দুতী নমুণ্ডমালিনীকে হনুমানের সঙ্গে দিয়ে বললেন তাঁর বক্তব্য সে রঘুনাথকে জানাবে।

 

প্রভু রামচন্দ্র, লক্ষণ, বিভীষণ এবং অন্যান্য যােদ্ধাদের সঙ্গে বসে বসে মায়াদেবীর প্রেরিত দেব-অসির প্রশংসা করছিলেন। এমন সময় ভৈরবরূপিণী নৃমুন্ডমালিনীকে সেখানে উপস্থিত হয়ে গুরজনদের প্রণাম জানিয়ে প্রমীলার বার্তা তাঁকে দান করে বলল, হয় তাকে লঙ্কাপুরে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে দিতে হবে, নচেৎ তার সাথে করতে হবে অসি-যুদ্ধ। এই শুনে রঘুপতি বললেন কারও সঙ্গে তিনি অকারণে বিবাদ করেন না। তাছাড়া তার একমাত্র শত্রু, রক্ষঃরাজ রাবণ ; প্রমীলার সঙ্গে তাঁর কোনো বিরােধ নেই। প্রমীলা স্বচ্ছন্দে লঙ্কাপুরে প্রবেশ করতে পারেন। এর পরে তাকে আশীর্বাদ করে তাদের পথ ছেড়ে দিতে এবং বামাদের প্রতি শিষ্টাচার দেখাতে হনুমানের প্রতি নির্দেশ দিলেন তিনি। রামচন্দ্রের নির্দেশে হনুমান নৃমুন্ডমালিনকে নিয়ে প্রস্থান করলাে। তার পরেই বামদল নিয়ে প্রমীলা সুন্দরী  দশ দিক উজ্জ্বল করে লঙ্কাপুরীর দিকে প্রস্থান করলেন। সেই অপরুপ নারী বাহিনীকে দেখার জন্যে সকলের সঙ্গে রামচন্দ্র শিবিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন কৃষ্ণ অশ্বে আরূঢ়া হয়ে নৃমুণ্ডমালিনী চলেছে সকলের আগে। তার পেছনে বাদ্যকারী বিদ্যাধরি দল । পেছনে শুলধারীদের মাঝখানে স্বয়ং প্রমীলা।

 

প্রমীলাকে দেখে রামচন্দ্র বিভিষণকে বললেন এমন রমণী তিনি ত্রিভুবনে কোথাও দেখেননি। সতিই কি প্রমীলা কোনাে রমণী, অথবা, মায়াবিনী কোনো রাক্ষসী ? বিভীষণ বললেন-কালনেমি নামে বিখ্যাত দৈত্যোর কন্যা প্রমীলা ; মহাশক্তি বংশে তার জন্ম । বীর্যবতী রমণী। কালহস্তী সম মেঘনাদ বীর তার প্রেমের নিগড়ে বাধা পড়েছেন। রামচন্দ্র মেঘনাদের বীরত্বের প্রশংসা করে চিন্তিত হলেন। কারণ, এক মেঘনাদকেই এটে ওঠা ভার, তার ওপরে তার সঙ্গে যােগ দিলেন দানবী বীর রমণী প্রমীলা । এখন বিভীষণই তার একমাত্র ভরসা। সৌমিত্র কেশরী লক্ষণ। বললেন দেবতারা তাঁর সহায়। সুতরাং মেঘনাদকে আর তিনি ডরায় না। পিতা রাবণের পাপে পুত্র মেঘনাদের পতন অনিবার্য। বিভীষণও লক্ষণের মন্তব্যে সায় দিয়ে বললেন, যথা ধর্ম তথা জয় । রাবণ পাপী তাই তার ধংস অনিবার্য।

মেঘনাদবধ কাব্যের সারাংশ

এদিকে প্রমীলা সহচরীদের সঙ্গে নিয়ে লঙ্কার কনকদ্বারে উপস্থিত হলেন। সেই রাত্রিতে তাঁদের দেখে শত্রু মনে করে রাক্ষসদ্বারীরা চারপাশে শিঙ্গা, দুন্দ্বুভি বাজিয়ে ঘােররবে গর্জন করে বাধা দিল তাদের। কিন্তু তারপর তাদের সত্যিকার পরিচয় পেয়ে আনন্দে উম্মুক্ত করলাে ফটক। আনন্দে কনকলঙ্কা প্রমীলার জয় ধ্বনিতে ফেটে পড়লাে। কুলবধুরা দিল উলু ধবনি। প্রমীলা প্রবেশ করলে পতির মন্দিরে। তার পরে স্বামীকে সম্ভাষণ করে মন্দিরে প্রবেশ করলেন তিনি। বীরের ভূষণ পরিত্যাগ করে কুলবধু পরিধান করলেন রেশমী শাড়ী; অলঙ্কারে সজিত হলেন তিনি। তারপরে ফিরে এসে স্বামীর সঙ্গে তিনি বসলেন স্বর্ন সিংহাসনে। চারপাশে ভরে উঠলাে আনন্দ সঙ্গীতে ।

 

এদিকে কৈলাসে উমা সখী বিজয়াকে প্রমীলার সুন্দরীর রূপ আর গুণ ব্যাখ্য করে বললেন যে, তাঁর অংশে প্রমীলার জন্ম। আগামীকাল তাঁর তেজ তিনি হরণ করবেন । সৌমিত্রি লক্ষণ পরদিন প্রাতে মেঘনাদ শুরকে বধ করলে পতিসহ প্রমীলা কৈলাশধামে উপস্থিত হয়ে সখী হিসাবে প্রমীলাকে তুষ্ট করবেন তিনি।

 

মেঘনাদবধ কাব্য প্ৰশ্ন

 

 প্রশ্ন ।। মধুসূদনকে অনুসরণ করে প্রমীলার লঙ্কা লঙ্কা প্রবেশের বর্ণনা দাও। 

 

উত্তর : কবি মধুসূদন প্রমীলার বীরাঙ্গনার মূর্তিটি চিত্রিত করেছেন। তৃতীয় স্বর্গে বিশেষ করে স্বামী মেঘনাদের মিলনের উদ্দেশ্যে লঙ্কা যাত্রা এবং লঙ্কা প্রবেশের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বীরকুলচুড়ামণি রাঘবকেও তিনি বিন্দুমাত্র ভয় করেন না। নিজের শক্তির ওপরে অগাধ আস্থা তার—সত্যিকার বীর, একটি সেনাবাহিনীর পরিচালিকা সেই যোদ্ধবেশ-ধারিণী দুর্গার সঙ্গে প্রমীলার তুলনা করেছেন কবি।

 

কবি এখানে শতসঙ্গিনী বেষ্টিতা প্রমীলার লঙ্কাপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। পতির সঙ্গে মিলনের আকাঙক্ষায় রণসাজে সজ্জিতা শত সঙ্গিনীদের যাত্রা যেন অভিসার যাত্রা না হয় যুদ্ধযাত্রা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধু কালে মত্ত মাতঙ্গিনী যুথের মত ভীম অস্ত্রধারিণী অগ্নিবণ্য সঙ্গীসেনানীরা দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে নিজেদের পথে। তাদের অশ্বের ক্ষুরধনিতে চারপাশ টলমল করছে । সেই সব ক্ষুরের আঘাতে উথিত ধুলিতে রাত্রির আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে ; কিন্তু সঙ্গিনীদের উজ্জ্বল দেহকান্তি, শাণিত অস্ত্রগুলির আভা তার ফলে বিন্দুমাত্র ম্লান হয় নি। সকলের মধ্যমণি রপসী দেহকান্তি আর সৌন্দর্যের ছটা অগ্নিময়ী দীপ্ত আকাশের সমস্ত মালিন্য ভেদ করে জ্বল জ্বল করে জ্জ্বলছে। প্রমীলার লঙ্কা যাত্রার দৃশ্যে তার সৌন্দর্য এবং বীর্যবত্তাকে প্রকাশ করার জন্য কোনাে অলঙ্করণই বাদ দেন নি কবি।

 

পতি মেঘনাদের সঙ্গে মিলনের জন্য প্রমীলা শত সঙ্গিনীবেষ্টিত হয়ে রণরঙ্গিনীর বেশে লঙ্কায় এসে উপস্থিত হয়েছেন; কিন্তু লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ করতে হলে শত সৈন্যদের বহু ভেদ করতে হবে। নিশাকালে রাম সেনাপতি হনুমান তাদের দেখে সজাগ হয়ে উঠেন। তাই তিনি গর্জন করে আগন্তকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। প্রমীলার অনুচররা তাদের বীরত্ব প্রকাশ করে বলেন যে তারা তো তুচ্ছ, তাদের রাঘব রাজকে যেন খবর দেন যে, অরিন্দম ইন্দ্রজিতের পত্নী প্রমীলা সুন্দর পতিপদে পুজার জন্য প্রয়ােজন হলে বাহুবলে লঙ্কায় প্রবেশ করবেন। সেই সঙ্গে ঠাকুর লক্ষণ আর রাক্ষস-কুল-কলঙ্ক বিভীষণকেও যেন উহা বলে।

 

 এই শুনে বীর হনুমান যথারীতি রামচন্দ্রকে প্রণাম করে প্রমীলার বার্তা জানিয়ে দিল ; হয় তাকে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে দিতে হবে, নচেৎ যুদ্ধ করতে হবে। এই শুনে রঘুপতি বললেন, তিনি অকারণের যুদ্ধ করবেন না। বিশেষ করে প্রমীলার সাথে তার কোনো বিরােধ নেই—তার শত্রু হচ্ছে স্বয়ং রাবণ। প্রমীলা স্বচ্ছন্দে লঙ্কাপুরে প্রবেশ করতে পারেন। এরপর রামচন্দ্র হনুমানকে জানিয়ে দেয় যে । তাদের পথ ছেড়ে দিতে এবং বামাদের প্রতি শিষ্টাচার যেন প্রদর্শিত হয়। যথারীতি আদেশ পালিত হয়।

 

তারপরেই বামাদল নিয়ে প্রমীলা সুন্দরী দশ দিক উজ্জ্বল করে লঙ্কাপুরীর দিকে প্রবেশ করলেন। সেই অপরুপ নারীবাহিনীকে দেখার জন্যে সকলের সঙ্গে রামচন্দ্র শিবিরের বাহিরে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন কৃষ্ণ-অশ্বে আরূঢ়া হয়ে নৃমণ্ডমালিনী চলেছে সকলের আগে। তার পশ্চাতে বাদ্যকরী বিদ্যাধরী দল। । তাদের পেছনে শুলধারীদের মাঝখানে স্বয়ং প্রমীলা ।

 

প্রমীলাকে দেখে রামচন্দ্র বিভীষণকে আশ্চর্য হয়ে বললেন এমন রমণী তিনি ত্রিভুবনে কোথাও দেখেননি। সত্যই কি প্রমীলা কোনাে রমণী, অথবা মায়াবিনী কোনাে রাক্ষসী ? বিভীষণ তার পরিচয় দিলে রামচন্দ্র চিন্তিত হলেন। রামকে লক্ষণ ও বিভীষণ উভয়েই আশ্বাস দেন।

 

এদিকে প্রমীলা সহচরীদের সঙ্গে নিয়ে লঙ্কার কনকদ্বারে উপস্থিত হলে রাক্ষসদ্বারীরা শত্রু মনে করে চার পাশে শিঙ্গা, দুন্দুভি বাজিয়ে ঘােররবে গর্জন করে বাধা দিতে অগ্রসর হয়। যখন তাদের সত্যিকার পরিচয় পায় তখন তারা আনন্দে উন্মুক্ত করলাে ফটক। আনন্দে কনকলঙ্কা প্রমীলার জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়লাে। কুলবধুরা দিল উলু ধ্বনি। প্রমীলা প্রবেশ করলেন পতির মন্দিরে। তারপর স্বামীকে সম্ভাষণ করে মন্দিরে প্রবেশ করে বীরের ভুষণ পরিত্যাগ করে রেশমী শাড়ী পরিধান করে কুলবধুর অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে তিনি বসলেন স্বর্ন সিংহাসনে। চারপাশ ভরে উঠলাে আনন্দ সঙ্গীতে। এভাবেই প্রমীলার লঙ্কা যাত্রা ও প্রবেশ সমাপ্ত হয়েছিল কবি মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্যে।

 

মেঘনাদবধ কাব্য নামকরণের তাৎপর্য

 

প্রশ্ন ।। মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গটির নামকরণের  তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।

 

অথবা, ‘মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গের নাম কি ? এই সর্গের কাহিনী বিশ্লেষণ করে উহার নামকরণের সার্থকতা দেখাও।

 

 অথবা, মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গের নাম ‘সমাগম’ রাখা , কতখানি যুক্তিসঙ্গত তা সবিস্তারে আলােচনা কর।  সর্গের নাম মহাকবি

 

অথবা, ‘মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গের নাম মহাকবি মধুসূদন ‘সমাগম’ রেখেছেন। এই নামকরণ সার্থক হয়েছে কিনা বিচার কর। 

 

উত্তর : ‘সমাগম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘উপস্থিত। মহাকাব্যের একটি লক্ষণ হচ্ছে এই যে ঘটনার প্রাধান্য বা তাৎপর্য অনুসারে প্রতিটি সর্গেরর একটি নামকরণ করতে হবে। কিন্তু মেঘনাদবধ কাব্যকে সত্যিকার মহাকাব্যের [ Authentic Epic ] পর্যায়ে ফেলা যায় না; সত্যিই তাে বিরাট কোনো জাতীয় ঐতিহ্য এখানে নেই। রামায়ণ মহাভারতের মতাে এখানে এমন কিছু নেই যাহার ভিতর দিয়া একটি সমগ্র দেশ, একটি সমগ্র যুগ আপনার হৃদয়কে, আপনার অভিজ্ঞতাকে ।

 

 ব্যক্ত করিয়া তাহাকে মানবের চিরন্তন সামগ্রী করিয়া তোলে। কিন্তু ভার্জিলের ‘ইলিয়াড’, ট্যাস্যের জেরুজালেম উদ্ধার’, ভলতেয়ারের ‘হরিয়ড’, মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, কালিদাসের ‘কুমার সম্ভব’ ইত্যাদির মতাে এই কাব্যটিকে Literary Epic হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। সাহিত্য দর্পণে উল্লিখিত বিশ্বনাথের প্রাচীন অনুশাসনকে মেনে না নিলেও মেঘনাদবধকে মহাকাব্যের কাঠামােতে সাজানাের জন্যে কিছু অনুশাসন না মেনে মধুসূদনের উপায় ছিল না। সেই খাতিরেই প্রতিটি সর্গের তিনি বিভিন্ন রকম নামকরণ করেন ঐ সর্গের বিষয়বস্তু অনুসারে।

 

তৃতীয় সর্গটিকে কবি পুরােপুরি ভাবে ব্যবহার করেছেন প্রমীলার লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ বর্ণনায় । প্রমােদ উদ্যানে থেকে সাময়িকভাবে বিদায় নিয়ে মেঘনাদ গিয়েছিলেন লঙ্কায় বীরবাহুর বধের প্রতিশােধ নিতে। আগেও তিনি রাম-লক্ষণকে পরাজিত করেছিলেন । সুতরাং এবারকার যুদ্ধে তিনি যে রামকে পরাজিত করবেন সে বিষয়ে তার মনে সন্দেহের কোনো রেখাপাত হয় নি। তাই তিনি প্রমীলাকে বলেছিলেন রাম-লক্ষণকে অচিরাৎ বধ করে তিনি প্রমােদ উদ্যানে ফিরে আসবেন। কিন্তু অপরাহ্ন শেষ হয়ে সন্ধ্যা এগিয়ে এলাে ; সন্ধ্যাকে সরিয়ে তার স্থান দখল করলাে রাত্রি। মেঘনাদ ফিরলেন না। মেঘনাদের ‘অচিরাৎ’ পবসতি হবার উপক্রম করলাে ‘চির’তে। একটা অজানা আশংকায় দর দর করে কেঁপে উঠলাে প্রমীলার মন। প্রেম চিরকালই ভীরু ভালােবাসার মানুষকে হারানাের ভয়ে সে সব সময় তটস্থ। হঠাৎ তার প্রাণ কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠলো। মনে হলো মেঘনাদের সঙ্গে তাঁর যেন আর দেখা হবে না। তাই রাত্রির শুকিয়ে-যাওয়া সূর্যমুখী ফুলকে সম্বােধন করে বিষাদের সুরে তিনি বললেন: 

যে রবির ছবি পানে চাহি বাঁচি আমি। অহরহ, অস্তাচলে আচ্ছন্ন লাে তিনি। আর কি পাইব আমি ( ঊষার প্রসাদে পাইবি যেমতি, সতি; তুই) প্রাণেশ্বরে ? 

 

প্রমীলার মনে হঠাৎ এই সংশয় কেন ? পূর্বে আর কখনাে কি মেঘনাদের সঙ্গে প্রমীলার সাময়িকভাবে বিচ্ছেদ হয় নি ? মেঘনাদ ছিলেন ত্রিভুবন বিজরী বীর ; প্রমীলা সেই বীরের পত্নী। সুতরাং এ-রকম সাময়িক বিচ্ছেদ তাকে আগেও অনেকবার হয়ত সহ্য করতে হয়েছিল। তা’হলে এই সাময়িক বিচ্ছেদ তার কাছে এত দুর্বিসহ হয়ে উঠলাে কেন ? তবে কি এখানে কোনাে ভবিষ্যৎ বিপদের পবাভাষ ছিল ?

 

প্রমীলা তা জানতেন না; কিন্তু আমরা তা জানি প্রমীলায় দঃখের দিন তড়িৎ গতিতে এগিয়ে আসছে। দ্বিতীয় সর্গে আমরা দেখেছি মেঘনাদকে কেন্দ্র করে সর্গলােকে বিরাট একটি চক্রান্ত শুরু হয়েছে : মেঘনাদবধের পরিকল্পনা সমাপ্ত হয়েছে ইতিপূর্বে। শিবের পরামর্শে মায়াদেবীর কাছ থেকে স্বর্ন মণ্ডিত ফলক বিশিষ্ট তাড়কাসুরনিধনকারী অসি, অক্ষয়শরণে তরুণীর এবং ধনুরবার্ন সংগ্রহ করে দেবরাজ ইন্দ্র চিত্ররথের হাত দিয়ে ইতিপূর্বে রামচন্দ্রের হাতে তুলে দিয়েছেন । এবং পরদিন প্রাতে স্বয়ং মায়াদেবী এসে লক্ষাণকে যে সাহায্য করবেন সেই আশ্বাসও তাকে চিত্ররথ দিয়ে গিয়েছেন। আমরা জানি পরদিন প্রাতেই দেবতাদের আশীবাদপুষ্ট লক্ষণের হাতে মেঘনাদের পতন হবে ; সুতরাং স্বামীকে জীবিতাবস্থায় দেখতে গেলে প্রমীলাকে সেই রাত্রিতেই লঙ্কায় প্রবেশ করতে হবে ।

 

এই প্রয়ােজনেই দুর্ধর্ষ রাঘবের চমুকে উপেক্ষা করেই প্রমীলাকে লঙ্কায় যেতে হয়েছিল ; লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ করে মেঘনাদকে দেখে স্বস্তি আর আনন্দের নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন প্রমীলা। ইন্দ্রজিতের কৌতুক হাস্যের উত্তরে তিনি বলেছিলেন :

  বিরহ অনলে | (দুরুহ) ডরাই সদা; তেই সে আইনু নিত্য নিত্য মন বারে চাহে, তাঁর কাছে। পশিল সাগরে আসি রঙ্গে তরঙ্গিনী

 

  তার পরেই প্রমিলা তার রণরঙ্গিনীর বেশ পরিবর্তন করে প্রেমময়ী মূর্তিতে স্বামীর বাহর মধ্যে ধরা দিলেন। দুজনে মিলে হয়ে গেলেন এক । এতক্ষণ মেঘনাদ ছিলেন অর্ধেক প্রমীলার ‘সমাগমে তিনি হলেন পূর্ণ।

 

কিন্তু লঙ্কাপুরে প্রবেশের পথে বীর্যবতী দানব-নন্দিনী প্রমীলাকে দেখে । কৈলাসে হৈমবতীর সখী বিজয়া সন্ত্রস্ত। কারণ একা মেঘনাদে রক্ষা নাই, তার উপর প্রমীলার সমাগম ।

  একাকী জগৎ-জয়ী ইন্দ্রজিৎ তেজে । তা সহ মিলিল আসি প্রমীলা ; মিলিল বাযু-সখী অগ্নিশিখা সে বায়ুর সহ ! কেমনে রক্ষিবে রমে কহ, কাত্যায়নী।

 

 বিজয়ার এই আশংকাকে তিরােহিত করে কাত্যায়নী বললেন যে তাঁর অংশে প্রমীলার জন্ম বলেই আগামী কালই তাঁর তেজ তিনি হরণ করবেন:

  পতি সহ আসিবে প্রমীলা এ পুরে ; শিবের সেবা করিবে, রাবণি ; সখী করি প্রমীলারে তুষিব আমরা।

 

মেঘনাদের সঙ্গে প্রমীলার ইহ জীবন লীলা সমাপ্ত হলাে, কিন্তু মেঘনাদ এবং প্রমীলা ইহ-জীবনে অভেদাত্মা বলে প্রমীলাকে মেঘনাদের কাছে আসতেই হবে। প্রমােদ উদ্যানে বসে মেঘনাদকে আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনলে দুজনের মধ্যে শেষ মিলন হবে না। তাই লঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের কাছে প্রমীলার ‘সমাগম’ অথাৎ উপস্থিতি ছিল একান্ত প্রয়ােজনীয়। সেইজন্যে কবি এই সর্গটির নামকরণ করেছেন ‘সমাগম’ এবং এই দিক থেকে তা সার্থক হয়েছে।

 

মেঘনাদবধ কাব্য নারী চরিত্র প্রমিলা

 

প্রশ্ন ।। “প্রেমই প্রমীলাকে বীরাঙ্গনা করেছে”-মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গ অবলম্বনে উক্ত মন্তব্য’ বিচার কর। 

 

 

অথবা, মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গে প্রমীলা চরিত্রের যে সব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে তার পরিচয় দাও। 

 

অথবা, ‘মেঘনাদবধ কাব্যের তৃতীয় সর্গে প্রমীলা চরিত্র অঙ্গনে মধুসূদন যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তা আলােচনা কর। 

 

অথবা, প্রমীলার জীবনে বীরত্বের আধারে পতিপ্রেম সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে, তােমার পাঠ্যাংশ অবলম্বন করে এই মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।

 

উত্তর : মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্যে মধুসদন যে ক’টি নারীচরিত্র অঙ্কন করেছেন তাদের সব কটিই নিজ নিজ  বৈশিষ্ট্য উজ্জল ; নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করেছে তারা, কেউ অন্য কারও চৌহদ্দীর মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করে নি। চিত্রাঙ্গদা প্রমীলা, সীতা, সরমা, মন্দোদরী এই আলোচনা থেকে আমরা বারুণী, মুরলা. রমা, শচী, বিজয়া এবং উমা প্রভৃতি দেবীচরিত্রগুলিকে বাদ দিচ্ছি । এরা সবই রমণী, এবং বরপত্নী। তবে এদের জাত আলাদা, স্বাদ আলাদা। চিত্রাঙ্গদার পুত্র স্নেহ প্রবল, সত্যবাদিনী তিনি। নিজের অপরাধজনিত কালানলে পুত্রকে আহুতি দেবার জন্যে স্বামীর কাছে কৈফিয়ৎ চাইতে তিনি দ্বিধান্বিতা নন। মন্দোদরীর পুত্রবৎসলা; কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে নিজের সুখ আর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তিনি প্রস্তুত। সরমা ভক্তিমতী রমণী ; যথা ধর্ম তথা জয় এই আপ্ত বাক্যে বিশ্বাস ছিল তার। তাই রাঘবের হাতে তাঁর একমাত্র পুত্র নিহত হওয়া সত্ত্বেও, রাঘব-জায়া সীতার তিনি পরম হিতৈষিণী। একমাত্র সীতা ও প্রমীলাকেই এদের মধ্যে থেকে স্বতন্ত্র ধরা যায়। দু’জনেই নিঃসন্তান ; তাই সম্ভবত দুজনেই পতিগতপ্রাণ। কিন্তু দু’জনের মধ্যে পার্থক্য এইখানে যে সীতা বীরাঙ্গনা নয়, প্রমীলা বীরাঙ্গনা ; অর্থাৎ সীতা প্রমীলা হলে রাবণের হয়ত সাধ্য হতাে না তাকে অপহরণ করার। প্রমীলার পিতৃকুল এবং শ্বশুরকুলের চেয়ে সীতার পিতৃকুল এবং শ্বশুরকুল কোনাে দিক থেকেই হীন ছিল না; বরং রামায়নাকার রামচন্দ্র কে ভগবানের অবতার এবং সেকালের শ্রেষ্ঠ যােদ্ধা হিসাবে তাঁর মতাে গৌরবের অধিকারী তিনি ত্রিভুবনবিজয়ী মেঘনাদকে করেনি।

 

কিন্তু তবু প্রমিলা নিজ বীর্যবলে কোনােদিন ত্রিভুবন কেন, একটি ভুবনের এক শতাংশ জয় করে নি: এত বড়ো লঙ্কাকাণ্ডের মধ্যে একটি যুদ্ধেও একটি শরও নিক্ষেপ করেননি তিনি। স্বামী পুত্রহারা রাক্ষস জননী এবং পত্নীদের হাহাকারের শরিক নন তিনি। যুদ্ধের সময় প্রমােদ কাননে স্বামীর সঙ্গে তিনি নিরুপদ্রব জীবন যাপন করেছেন। কারণ স্বামীই ছিল তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, জীবনস্বরূপ। বাঙালী বধুর প্রথাসিদ্ধ সুকুমার গুণগুলিই ছিল তাঁর চরিত্রের একমাত্র বৈশিষ্ট্য। স্বামীগত-প্রাণা নারীর কোমল চিত্তবত্তির ছায়াতেই কবি তাঁকে বর্ধিত করেছেন, কুলবধুর কমনীয় স্বভাবের অপরুপ স্নিগ্ধতায় মন্ডিত করেছেন তাঁকে। প্রথম সর্গের শেষ অংশে স্বামীকে সাময়িক ভাবে বিদায় দেবার সময় যে মর্মান্তিক দুঃখ তাঁকে অভিভূত করেছিল কোনাে বীরাঙ্গনার পক্ষেই তা লােভনীয় নয়, এমন কি বীরজায়াদের পক্ষেও তাকে হাস্যপদ হিসাবে চিহ্নিত করাটাও অযৌক্তিক হবে না। কিন্তু এই দুঃখ সাধারণ নয়, জয়-পরাজয় যুদ্ধের অঙ্গ। স্বামী বীরধর্ম পালন করবেন বীরজায়ার কাছে এর চেয়ে বড়াে গৌরব আর নেই। তবু অনাগত ভবিষ্যতের আশংকা সেই সময় প্রমীলাকে সম্ভবতঃ ব্যথিত করেছিল। আমরা জানি তারপরে মেঘনাদ আর প্রমােদ উদ্যানে ফিরে আসেন নি ; দৈবী চক্রান্তে পরের দিন প্রাতেই ইহজীবনে প্রমীলাকে ছেড়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন চিরকালের মতাে। অনাগত বিপদের সেই ছায়ায় রাহুর মতাে প্রমীলাকে গ্রাস করেছিল তখন। চরম বিপদের একটি ঘন্টাধ্বনি দুর থেকে কীভাবে ভেসে আসছিল তাঁর কানে। মত্যুর বিরুদ্ধে নশ্বর মানুষ রখে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু প্রতিহত করতে পারে না তার অমােঘ শক্তিকে। তবু প্রমীলা মেঘনাদকে একবারও বাধা দেননি; কেবল হৃদয়ভরা ভালােবাসা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চারি বছরের কন্যাটির মতো হয়ত মনে মনে বলেছিলেন ঃ যেতে আমি দিব না তোমায়। । তবু তাঁকে যেতে দিতে হয়েছিল । কারণ বীর স্বামীর কর্তব্যে বাধা সৃষ্টি করা কোনাে বীর-জারার কর্ম নয়, ধর্ম তো নয়ই। মেঘনাদকে বিদায় দেবর সময় স্বামি-বিচ্ছেদকাতরা প্রমীলা কেবল বলেছিলেন ? 

 কোথা প্রাণসখে,

রাখি এ দাসীরে, কহ, চলিলা আপনি :

কেমনে ধরিবে প্রাণ তােমার বিরহে/এ অভাগী? (১ম সর্গ ৭০০-৩) 

 

এই পর্যন্ত প্রমীলাকে আমরা দেখেছি পতিগতপ্রাণা, স্বামীবিচ্ছেদকাতরা, প্রেমময় পত্নী হিসাবে। তার মধ্যে বীরাঙ্গনার বাষ্পটকুও আমাদের চোখে পড়েনি, মনে হয়েছে পেলব-লতার মতাে প্রমীলা আর দশটা বাঙালী কুলবধুর সমগােত্রা।

 

প্রমীলার বীরাঙ্গনার মূর্তিটি ফুটে উঠেছে তৃতীয় সর্গে। এই সর্গে চিত্রিতা প্রমীলার সঙ্গে প্রথম সর্গে চিত্রিতা প্রমীলার দুরত্ব সহস্র যােজন। প্রমীলাকে এক বাটখারায় ওজন করা যায় না। এখানে তিনি খর-দীপ্তিময়ী, নিজ উদ্দেশ্য সাধনের দৃঢ়-সংকল্পতা, বীর রমণী। এ তাঁর অন্য রূপ, এখন আর তিনি পেলব-লতা নয়, সত্যিকার বীর, এবং ক্ষুদ্র হলেও একটি সেনাবাহিনীর পরিচালিকা ; বরিকুলচুড়ামণি রাঘবকেও তিনি বিন্দুমাত্র ভয় করেন না। নিজের শক্তির ওপরে অগাধ আস্থা তাঁর। পিতৃকুলের এবং স্বামীকুলের গরবে গরবিনী তিনি। সখী বাসন্তীর ভয়ের আশংকাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে প্রমােদকাননে তিনি যুদ্ধের দামামা বাজানাের নির্দেশ দিলেন,প্রমােদ-কানন আর প্রমােদকানন নয়, যুদ্ধশিবির।

 

চারপাশে সাজো  সাজো রব। অসির ঝনঝনায়, কামুরকের টঙ্কারে কিঙ্কিনীর বােলে, অশ্বের হ্রেষায়, গজের বৃনহতিতে প্রমােদকানন সহসা পরিণত হলাে একটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে। সেই রণসজ্জায় স্বর্গলােকে অমর, পাতালে নাগ আর নরলােকে নর চমকে উঠলাে। প্রমীলা নিজে সাজলেন বীরঙ্গনার বেশে ঃ মাথার ওপরে তাঁর কিরীটছটা, ভালে অঞ্জনের রেখা, উচ্চ কুচ কবচে আবৃত কটিদেশে সােনার কমরবন্ধ, পিঠে শরপূর্ণ তরুণীর, হৈমময় কোষে খরশান অসি, করে দীর্ঘ শুল! মনে হলাে মহিষাসুর শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রভৃতি অতিকায় দানবদের সর্বসংহারমূর্তিতে দমন করার জন্যে স্বয়ং হৈমবতী অস্ত্রসাজে সজ্জিত হয়েছেন।

 

কিন্তু এই যােদ্ধ,বেশ কেন ? রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্যে নয়, বিশ্বজয় করার জন্যে নয় ; লঙ্কার পতিপদ পুজার জন্যে। পতি মেঘনাদের কাছ থেকে কেউ আর তাকে সরিয়ে রাখতে পারবে না। তাই তিনি বাসন্তীকে বলেছিলেন ? 

 পর্বতগৃহ ছাড়ি

বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,…..

 (তৃতীয় সগ ৭৫-৭৮) ? 

 

এই সিন্ধু মেঘনাদ। মেঘনাদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্যে প্রমীলা প্রবল বেগে লঙ্কার দিকে ছুটে যাচ্ছেন। রামচন্দ্রের শক্তি নেই তাঁর গতি রােধ করার। লঙ্কায় প্রবেশের পথে হনুমানের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘অবলা কুলের বালা, আমরা সকলে, অথাৎ আসলে তিনি কুলবধু, যুদ্ধ করা তাঁর কাজ নয়। তিনি লঙ্কাপুরে প্রবেশ করতে চান পতিপদ পুজার জন্যে, কিন্ত লঙ্কাপুরে প্রবেশ করার পথ যদি তিনি সহজে না পান তাহলে তিনি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। রামচন্দ্র  মুহুর্তে তাঁর সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দিলেন তখনই প্রমীলা আবার সেই শান্ত রমণী।

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে পতি-প্রেমই প্রমীলাকে প্রমােদ কাননের শান্ত শ্যামল নিরুপদ্রব পরিবেশ থেকে টেনে এনেছে রণভূমিতে। কোনাে কোনাে সমালােচক তাই বলেছেন ‘প্রমীলা বীরাঙ্গনাও নয়, লজ্জাশীলা কুলবধও নয়, পতিগতপ্রাণা। সেই একই প্রেমের দায়ে সে কখনও বীরাঙ্গনা ; কখনও কুলবধু নতুবা তার আসল রপ একই। মধুসূদন একটি কামনাবলিষ্ঠ প্রেমের আদর্শে প্রমীলার চরিত্রটিকে নতুনভাবে সষ্টি করেছেন । সমালােচক মােহিতলালের মতে প্রমীলার চরিত্রে কবি আমাদের দেশের মুক দাম্পত্য থেকে যে মুখরতা দান করিয়াছেন, এবং তাহার যে দুঃসাহস, তাহা-তেই নবযুগের নবসাহিত্যের সুচনা হইয়াছে। এই প্রেম নিজের অক্ষমতায় প্রথার যুপকাষ্ঠে নিজেকে আহুতি দেয় না, জোর করে সর্বসমক্ষে নিজের প্রেমকে সার্থক করে। এই প্রেম ভীরু রমণীর মর্মন্তুদ হাহাকারের মূলধন করে বিলুপ্তির গহবরে নিজেকে সমাহিত করে না। এই প্রেম সােচ্চার কণ্ঠে ঘােষণা করে, প্রেমেই প্রেমিকার অধিকার, ন্যায়ত, এবং ধর্মত। সেই অধিকার থেকে কেউ তাকে বঞ্চিত করতে পারবে না। প্রমীলার এই বলিষ্ঠ প্রেমই  না কে পরাজিত করেছিল বীরাঙ্গনায়।

 

মেঘনাদবধ কাব্য চিত্রাঙ্গদার চরিত্র

 

প্রশ্নঃ।। মেঘনাদবধ কাব্যে চিত্রাঙ্গদার চরিত্র প্রথম সর্গ বিশ্লেষণ করে তার সার্থকতা কোথায় বুঝাইয়া দাও।

 

অথবা, চিত্রাঙ্গদা রাবণকে কেন অভিযুক্ত করেছিলেন ? তঁার অভিযােগ কী ছিল ? রাবণ উত্তরে কী বলেছিলেন ? উভয়ের বক্তব্য থেকে উভয়ের চরিত্র বিশ্লেষণ কর। 

 

উত্তর : উপন্যাস, নাটক অথবা কাব্যরচনার সময় লেখককে সব সময় নায়ক-নায়িকা এবং ঘটনাপ্রবাহেরর দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় ; কারণ নায়ক-নায়িকার চরিত্র আর জগৎসংসারে অনিবার্য ঘটনাপ্রবাহের তীব্র সংঘাতের মধ্যেই নাটকের প্রাণ, আর গতি অব্যাহত থাকে। এই দুটি ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়েই নাটক বা উপন্যাস তার পরিণতির পথে এগিয়ে চলে। এদের ঘিরে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হয় তার চারপাশে আরও অনেক চরিত্র ঘুরে বেড়ায় ; তাদের মধ্যে কিছু বড়ো চরিত্র যেমন থাকে, তেমনি থাকে মাঝারি আর ছোট। তারা পথক পৃথকভাবে চিন্তা করে, পৃথক পৃথক ভাবে কাজ করে ; কিন্তু নায়ক-নায়িকার গতিপথ থেকে নিজেদের তারা দুরে রাখে না। অনেক ক্ষেত্রে লেখক মাত্র কয়েকটি আঁচড় দিয়েই কোনাে একটি বিশেষ চরিত্রকে শেষ করে দিয়েছেন ; গােটা নাটক বা উপন্যাসের মধ্যে আর তাকে দেখা যায় নি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সেই বিশেষ চরিত্রটির কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু তা নয়। তারও বিশেষ একটি ভূমিকা রয়েছে।

 

চিত্রাঙ্গদার চরিত্রটিও সেই জাতীয়। ন’টি সর্গের মেঘনাদবধ কাব্যের মধ্যে চিত্রাঙ্গদা অতি সামান্য একটু স্থান অধিকার করে আছেন। প্রথম সর্গে মাত্র কয়েকটি আঁচড়ে চিত্রাঙ্গদাকে উপস্থাপিত করে মধুসূদন তাকে চির বিদায় দিয়েছেন। বীরবাহুর জননী চিত্রাঙ্গদা। রাবণের বহু মহিষীর মধ্যে [ রামায়ণের ভাষায় রাবণের মহিষী।

 

চিল চৌদ্দ হাজার ] চিত্রাঙ্গদা একজন। সুতরাং স্বামীর গরবে তিনি গরবিনী নন, বীরবাহর জননী হিসাবেই নিজেকে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেই একমাত্র পুত্রের অকাল মৃত্যুতে তিনি যে শােকে অধীর হয়ে উঠবেন তাতে তার আশ্চর্য হওয়ার কী রয়েছে ? যুদ্ধক্ষেত্রে পুত্রের বীরশয্যা নিরীক্ষণ করে শােকাতুর রাবণ যখন সিংহাসনে এসে বসলেন ঠিক সেই সময় বীরবাহুর জননী চিত্রাঙ্গদা আলুথালু বেশে আভরণহীন হয়ে রাজসভায় প্রবেশ করলেন। নিশ্চয় তিনি শােকাকুলা, কিন্তু স্বামীর কাছে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্যে তিনি আসেন নি ; এসেছেন পুত্রের অকাল মৃত্যুর জন্যে কৈফিয়ৎ চাইতে। রাবণ বারবারই তার দুর্দশার জন্য সে বিধাতা কেই দায়ী করেছেন।

 

 

 রাবণ তাকে এই বলে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন যে তার পুত্র কালসময়ে রিপুদল নাশ করে বীরের শেষ শয্যা গ্রহণ করেছে। বীর-মাতার সেজন্য শােক করা উচিত নয়। তা ছাড়া, তার কথাটাও রাজমহিষীর চিন্তা করা উচিত; চিত্রাঙ্গদা একটি মাত্র পুত্রের জন্যে ব্যাকুলা; আর শতপুত্রের শােকে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। বিধি তার প্রতিকুল। সুতরাং পুত্রের মৃত্যুর জন্যে তাকে দায়ী করা উচিত নয় চিত্রাঙ্গদার। আবার পুত্র হারা মা, স্বামীহারা পত্নীর আকুল আর্তনাদ সমষ্টিগতভাবে রাবণ নিজেরই আর্তনাদে বলেছেন।

 

এই কাব্যে কোথাও রাবণ অপরাধ স্বীকার করে নি। সবসময় সে নিয়তিকেই ভাগ্যের জন্য দায়ী করে চলেছেন। কিন্তু চিত্রাঙ্গদা প্রত্যক্ষভাবে রাবণকেই দায়ী করেছেন। এখানে চিত্রাঙ্গদার বক্তব্য:

 ‘যুযিছে কি দাশরথি ? বামন হইয়া কে চাহে ধরিতে চাঁদে? তবে দেশরিপু কেন তারে বল, বলি ? কাকোদর সদা নম্রশিরঃ; কিন্তু তারে প্রহারহে যদি কেহ, উদ্ধ-ফণা-ফণী দংশে প্রহারকে। কে, কহ, এ কাল-অগ্নি জালিয়াছে আজি লণ্ডকাপরে ? হায়, নাথ, নিজ কর্ম-ফলে, মজালে রক্ষাসকুলে, মজিলা আপনি?” (৩৯৭-৪০৫ ) 

 

 এই দুর্ভাগ্যের জন্য যে রাবণ নিজেই দায়ী এ কথা অনেকেই মনে মনে জানলেও প্রকাশ্যে কেউ তা বলতে সাহস করেন নি। একমাত্র চিত্রাঙ্গদার পক্ষেই সম্ভব।চিত্রাঙ্গদার চরিত্র এইখানেই সার্থক।

 

এ অজুহাত মানতে চিত্রাঙ্গদা রাজি নন। রাম দেশবৈরী নন । কারণ তিনি লঙ্কারাজ্য জয় করার জন্যে আসেন নি, তিনি এসেছেন সীতাকে উদ্ধার করতে ; এবং সেই সীতাকে অপহরণ করেছেন স্বয়ং রাবণ। সুতরাং এ-সময় যদি কাল-সমরই হয় তাহলে তার জন্যে দায়ী একমাত্র তিনি। তাই বীরবাহু দেশের স্বার্থরক্ষার জন্যে মত্যু বরণ করেনি; করেছে রাবণের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তাই বীরবাহুর অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী তিনি নিজেই, আর কেউ নয়। তারপরেই দৃপ্তকণ্ঠে তিনি ঘােষণা করলেন যে রাবণ নিজ কর্মদোষে নিজে মজেছেন ; মজিয়েছেন রাক্ষসকুলকে।

 

রাবণকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনাে সুযােগ না দিয়েই [ সুযােগ কিছ; কি তার হিল ? ] চিত্রাঙ্গদা রাজ-অন্তঃপুরের নিরালা কক্ষে শুন্য মাতৃহৃদয় নিয়ে ফিরে গেলেন।

 

সামান্য কয়েকটি কালির আঁচড়। এদেরই ভেতরে চিত্রাঙ্গদার অপরূপ, দীপ্তিময় চরিত্রটি ফুটে উঠেছে ; অতি গভীর রেখায় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে একটি নারীর জীবন ও চরিত্র। তার আত্মচেতনা অটুট ; বুদ্ধি তীক্ষা; তীব্র ভাষায় স্বামীর মুখের ওপরে সত্য কথাটাও বলতে তার বাধে নি। রক্ষোপুরে এই সত্য কথাটা অন্য কেউ রাবণের মুখের ওপরে বলতে সাহস করেনি। বিভীষণ একবার সে চেষ্টা করে পদাঘাত খেয়ে নিবাসিত হয়েছিলেন। অথচ সেই অপবাদটা মহিষী চিত্রাঙ্গদার মুখে শুনে রাবণকে নির্বিবাদে তা হজম করতে হলাে। এইখানেই চিত্রাঙ্গদার বৈশিষ্ট্য। লঙ্কার বিপর্যয়ের জন্যে সূর্পণখার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে রাবণ এতদিন বালির ওপরে আত্মপ্রাসাদের যে মর্মরসৌধ গঠনের চেষ্টা করেছিলেন চিত্রাঙ্গদার তীব্র অভিযােগে তার সেই প্রাসাদ ঝরঝর করে ভেঙ্গে পড়লাে

মেঘনাদবধ কাব্য মধুসূদন দত্ত

এখানে যে প্রশ্নটা স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে জেগে ওঠে তা হচ্ছে এই যে চিত্রাঙ্গদাকে তিনি নিয়ে এলেন কেন ? আর এলেনই যদি, তাহলে এত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় দিলেন কেন ?

প্রথম প্রশ্নটির উত্তর মধুসূদনের রাবণ চরিত্র পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে । মধুসূদন চেয়েছিলেন রাবণকে ট্র্যাজিডির নায়ক করতে। য়েরােপীয় ক্ল্যাশিক্যাল ট্র্যাজিডির নায়ক হবেন সর্বগুণান্বিতা পুরষ । কিন্তু তার চরিত্রে থাকবে একটি মহা ত্রুটি। সেই ত্রুটির ছিদ্রপথে শয়তান প্রবেশ করে তাকে অমঙ্গলের পথে পরিচালিত করবে, যেপথের শেষ সীমান্ত হচ্ছে মৃত্যু। এই ত্রুটি সম্বন্ধে নায়ক সম্পূর্ণ অবহিত থাকেন । অজ্ঞানতা জনিত এটি কোনাে নায়কের জীবনে ট্রাজেডির বাহক হতে পারে না। কিন্তু সীতাকে অপহরণ করা যে একটা অপরাধ রাবণ তা স্বীকার করতেন না; রমণীরা চিরকালই রাজভােগ্যা; তাছাড়া, রামায়ণের পরিসংখ্যানে রাবণ যে সব রমণীকে ইতিমধ্যেই অপহরণ করেছিলেন তাদের সংখ্যা চৌদ্দ হাজার [ রাবণে বেড়িয়া কান্দে চৌদ্দ হাজার নারী ]। আর একটি রমণীতে তিনি ভেবেছিলেন কিছু আসবে না। চিত্রাঙ্গদাই তাকে সে বিষয়ে সচেতন করে দিয়েছিলেন। বিদ্যুতের ঝিলিকের মতাে রাবণের অপরাধপ্রবণ চরিত্রকে তার সামনে প্রকাশ করে দিয়ে চিত্রাঙ্গদা বিদায় নিলেন তারপর এ কাব্যে তার আর প্রয়োজন ছিলনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *