ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো Teacj Sanjib

 ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো Teacj Sanjib

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

 

ভারতীয় পরিবার ব্যবস্থা | The Indian Family System by Teacj Sanjib

 

পরিবারের সংজ্ঞা | Definition of Family)

ভারতীয়-পরিবারের-মূল-বৈশিষ্ট্য-গুলি-আলোচনা-করো-Teacj-Sanjib

 

পরিবার কাকে বলে

সমাজের মধ্যে পরিবার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গােষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হলেও পরিবারের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রশ্নে সমাজতত্ত্ববিদদের মধ্যে মতপার্থক্য বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে পি. এন. পারভূ (P. N. Parbhu) তার ‘ হিন্দু সসাশ্যাল অর্গানাইজেশন’ (Hindu Social Organisation) গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিকে সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্তভাবে সংজ্ঞায়িত করা যথেষ্ট কঠিন। পেজের মতে, পরিবার হােল এমন একটি গােষ্ঠী, যার মধ্যে সন্তান উৎপাদন ও প্রতিপালনের উদ্দেশে সুনির্দিষ্ট ও স্থায়িভাবে দাম্পত্য সম্পর্ক  বর্তমান থাকে। 

 কিন্তু এরূপ সংজ্ঞা সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট। কারণ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হলেই যে সন্তান উৎপাদিত হবে, এমন কোন কথা নেই। এমন অনেক দম্পতি রয়েছেন, যারা সন্তানহীন। তাছাড়া, একটি পরিবারের মধ্যে এমন অনেকে থাকে, যাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারটি। অবান্তর। উদাহরণ স্বরূপ একই পরিবারভুক্ত ভাই-বােনের সম্পর্কের কথা বলা যায়। অধ্যাপক অগবার্ন ও নিমক পরিবারের অপেক্ষাকৃত একটি ব্যাপক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাদের মতে, পরিবার হােল মােটামুটিভাবে এমন একটি স্থায়ী সংগঠন, যা স্বামী ও স্ত্রীকে নিয়ে গড়ে ওঠে। তাদের সন্তান-সন্ততি থাকতে পারে, আবার নাও পারে।  সন্তান-সংক্রান্ত কাজই হােল পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিংসলে ডেভিস পরিবারকে পরস্পরের মধ্যে রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে-ওঠা ব্যক্তিবর্গের এমন একটি গােষ্ঠী বলে চিহ্নিত করেছেন, যাদের মধ্যে নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধন বর্তমান থাকে। বার্জেস ও ল (Burgess and Locke) তাদের দ্য ফ্যামিলি (The Family) নামক গ্রন্থে বলেছে যে, পরিবার হােল বিবাহ, রক্তের সম্পর্ক বা দত্তকসূত্রে সুসংবদ্ধ ব্যক্তিবর্গের এমন একটি গােষ্ঠী, যার সদস্যরা স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, পুত্র কন্যা ও ভাইবােন হিসেবে একই বাসগৃহে বসবাস করে এবং তাদের নিজ নিজ সামাজিক ভূমিকার ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ও সংযােগ সাধনমূলক কার্যে লিপ্ত থাকে। 

 এরূপ মিথস্ক্রিয়াও সংযােগ সাধনের মাধ্যমে তারা একটি সাধারণ সংস্কৃতি’ (a common culture) গড়ে তােলে এবং সেটিকে রক্ষা করে।* জি. পি. মারডক (G. P. Murdock)-কে অনুসরণ করে আমরা পরিবারের একটি সংজ্ঞা প্রদান করতে পারি : পরিবার হােল সাধারণ বাসস্থান, অর্থনৈতিক সহযােগিতা এবং পুনরুৎপাদনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি সামাজিক গােষ্ঠী। প্রাপ্তবয়স্ক সেইসব নারী ও পুরুষকে নিয়ে এটি গঠিত হয়, যাদের মধ্যে অন্ততঃ দু’জন সমাজ-স্বীকৃত দাম্পত্য সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে এবং তাদের সম্পর্ক সস্তৃত অথবা দত্তক রূপে গৃহীত এক বা একাধিক সন্তান-সন্ততি রয়েছে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য

 পরিবারের বিভিন্ন রূপ | 

 

পরিবার হােল মানব-সমাজের একটি বিশ্বজনীন ও শ্বাশ্বত সংগঠন। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিবারের শ্রেণীবিভাজন করার ফলে তার বিভিন্ন রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। পরিবারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ বা ধরন সম্পর্কে নিম্নে আলােচনা করা হােল ।

 

[১] রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে রালফ লিন্টন (Ralph Linton) পরিবারকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন, যথা—[i] সুগােত্র পরিবার (consanguine family) এবং [ii] দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার (conjugal family)। রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে মা, বাবা,  ভাই, বােন এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে যে-পরিবার গড়ে ওঠে তাকে সগােত্র পরিবার বলা হয়। এরূপ পরিবার কেবল স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে না বলে একে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবার (joint or extended family) বলেও অভিহিত করা হয়। কিন্তু কেবল স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে যে-পরিবার গড়ে ওঠে, তাকে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার বলা হয়।**

 

[২] বংশ পরিচয় (descent)-এর ভিত্তিতে পরিবারকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়, যথা— [i] পিতৃপরিচায়ী (patrilineal), [i] মাতৃপরিচায়ী (matrilineal) এবং.[iউভপরিচায়ী (bilineal) অর্থাৎ পিতৃ-মাতৃপরিচায়ী। পিতার বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে  যে-পরিবারের সন্তানের পরিচয় নির্ধারিত হয় এবং তা বংশানুক্রমিক  ভাবে চলতে থাকে, তাকে পিতৃপরিচায়ী পরিবার বলা হয়। এরূপ পরিবার ব্যবস্থায় সম্পত্তি পিতার কাছ থেকে কেবল পুত্ররাই লাভ করে, কন্যারা নয়। ভারতের সনাতন পরিবার ব্যবস্থা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত কিন্তু যে-পরিবার ব্যবস্থার বংশপরিচয় ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার মাতার বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাকে মাতৃপরিচায়ী পরিবার বলা হয় এরূপ ব্যবস্থায় সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে পুত্ররা বঞ্চিত হয়। ভারতে খাসি ও গারােদের, শ্রীলঙ্কায় ভেদ্দাস এবং উত্তর আমেরিকায় ভারতীয়দের মধ্যে এরূপ পরিবার ব্যবস্থা বর্তমান রয়েছে। আবার, যখন পিতা ও মাতা উভয়ের বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে সন্তানের বংশপরিচয় নির্ধারিত হয়, তখন সেই পরিবারকে উভপরিচায়ী বা পিতৃ-মাতৃপরিচায়ী বলে চিহ্নিত করা হয়। আমেরিকানরা উভপরিচায়ীর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে তারা তাদের পদবী ব্যবহারের সময় পিতার পদবীই গ্রহণ করে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[৩] কর্তৃত্বের ভিত্তিতে পরিবার তিন ভাগে বিভক্ত, যথা-[i] পিতৃশাসিত পরিবার (patriarchal family), [i] মাতৃশাসিত পরিবার (matriarchal family) এবং [i] সুসম্বদ্ধ (symmetrical) বা সমতাভিত্তিক পরিবার (egalitarian family)। যে-পরিবারে পিতা, স্বামী বা সর্বাপেক্ষা বয়ােজ্যেষ্ঠ পুরুষের হাতে পরিবারের যাবতীয় কর্তৃত্ব ন্যস্ত থাকে, তাকে পিতৃশাসিত পরিবার বলা হয়। ভারতের যৌথ পরিবারগুলি পিতৃ-শাসিত কর্তৃত্বের ভিত্তিতে শ্রেণীপরিবারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অবশ্য চীন ও জাপানেও একসময় এই  ধরনের পরিবার যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান ছিল। কিন্তু যে-পরিবারে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পুরুষের পরিবর্তে সর্বাপেক্ষা বয়ােজ্যেষ্ঠা স্ত্রীলােকের হাতে অর্পিত থাকে, তাকে মাতৃশাসিত পরিবার বলে। এরূপ পরিবারের অস্তিত্ব বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে। তবে জাপানের গ্রামাঞ্চলে এখনও এই ধরনের কিছু কিছু পরিবার রয়েছে। সুপ্রাচীনকালে মাতৃ-শাসিত পরিবারের অবস্থিতি ছিল বলে কেউ কেউ মনে করলেও ম্যাকআইভার ও পেজ এরূপ পরিবারের অস্তিত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে মায়ের নামেই পরিবার পরিচালিত হােত। এরূপ পরিবারকে তিনি মাতৃ-শাসিত পরিবার না বলে মাতৃকেন্দ্রিক’ (maternal) পরিবার বলার পক্ষপাতী। আবার, যে-পরিবারের স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রয়ােগ করে, সেই পরিবারকে সুসম্বদ্ধ বা সমতাভিত্তিক পরিবার বলে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিককালে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরূপ পরিবারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

 

 [4] বিবাহের পর দম্পতির বাসস্থানের ভিত্তিতে পরিবারকে যে-তিনটি ভাগে ভাগ করা হয় সেগুলি হােল [i] পিতৃ-আবাসিক (patri-local) পরিবার,,[i] মাতৃ-আবাসিক (matrilocal) পরিবার এবং [ii] নয়া-আবাসিক (neo-local) পরিবার। বাসস্থানের ভিত্তিতে শ্রেণী-বিভাজন বিবাহের পর স্ত্রী যখন তার পিতৃগৃহ ত্যাগ করে শ্বশুরালয়ে বসবাস করে, তখন সেই পরিবারকে পিতৃ-আবাসিক পরিবার বলা হয়। ভারতে এই ধরনের পরিবার যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান রয়েছে। কিন্তু বিবাহের পর স্ত্রীর পরিবারভুক্ত হয়ে স্বামী বসবাস করলে সেই পরিবারকে মাতৃ-আবাসিক পরিবার বলে। মেঘালয়ের খাসিদের মধ্যে এরূপ পরিবার-প্রথা বর্তমান। অনুরূপভাবে, হােপিদের মধ্যেও এরূপ পরিবার ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। আবার, নববিবাহিত দম্পতি পূর্বোক্ত দু’টি পরিবারের কোনটিতেই বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করতে থাকলে সেই পরিবারকে নয়া-আবাসিক পরিবার বলা হয়। বিশ্বের সব দেশেই এরূপ পরিবারের অস্তিত্ব রয়েছে।

 

_[৫] অন্তগোষ্ঠী (in-group) ও বহিগোষ্ঠী (out-group) সম্বন্ধের ভিত্তিতে পরিবার দু’টি ভাগে বিভক্ত, যথা—[i] সূবর্ণ (endogamous) এবং [ii] অসবর্ণ (exogamous)। যখন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের বৃহত্তর গােষ্ঠীর মধ্যে অর্থাৎ হস্তগোষ্ঠী ও বহির্গোষ্ঠীর সমধর্মীয়, সম-শ্রেণীভুক্ত, সম-জাতিগত ও সমবংশগত গােষ্ঠীর ভিত্তিতে শ্রেণী-বিভাজন মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন সেই পরিবারকে সবর্ণ পরিবার বলে। কিন্তু এর বিপরীত ঘটনা ঘটলে অর্থাৎ অন্য শ্রেণী, বর্ণ, জাতি, ধর্ম, বংশ প্রভৃতিভুক্ত পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে সেই পরিবারকে অসবর্ণ পরিবার বলে। বিশ্বের সব দেশেই এই দু’ধরনের পরিবারের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করা যায়। ভারতে প্রথমােক্ত শ্রেণীর পরিবারের সংখ্যা সাধারণভাবে শেষােক্ত শ্রেণীভুক্ত পরিবারের সংখ্যা থেকে অনেক

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[৬] বিবাহের ভিত্তিতে পরিবারকে সাধারণভাবে [i] একগামী (nonogamous) পরিবার এবং [ii] বহুগামী (polygamous) পরিবার—এই দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক পতি ও এক

পত্নীবিশিষ্ট পরিবারই হােল একগামী পরিবার। ভারত-সহ বিশ্বের সব দেশেই এরূপ পরিবারের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করা যায়। কিন্তু যখন একজন পতি ও একাধিক পত্নী বিবাহের ভিত্তিতে কিংবা একজন পত্নী ও একাধিক পতিকে নিয়ে পরিবার গড়ে ওঠে, বিভাজন তখন তাকে বহুগামী পরিবার বলা হয়। ইসলামী দুনিয়ায় এবং ভারতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের পরিবার ব্যবস্থা বর্তমান রয়েছে।

ভারতীয় পরিবার

[৭] প্রতিটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবারকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, যথা—[i] পালয়িত্ব পরিবার (family of orientation) এবং [i] জন্মদাত্রী পরিবার (family of procreation)। একজন ব্যক্তি যে-পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আশৈশব লালিত-পালিত হয়, সেই পরিবারকে পালয়িত্ব পরিবার) শ্রেণী-বিভাজন বলে। কিন্তু ঐ ব্যক্তি বিবাহ করার পর যখন পৃথক পরিবার গঠন করে এবং সন্তানের জন্ম দেয়, তখন তার পরিবার জন্মদাত্রী পরিবার বলে পরিচিত হয়। এইভাবে একজন ব্যক্তি তার জীবনকালে দু’টি পৃথক পৃথক পরিবারের সদস্য বলে বিবেচিত হতে পারে। ভারত-সহ বিশ্বের সব দেশেই এই দু’ধরনের পরিবার প্রত্যক্ষ করা যায়।

 

[৮] আকৃতি বা গঠনের ভিত্তিতে পরিবারকে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে ভাগ করা হয়, যথা— [i] দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার (nuclear family) এবং i] যৌথ পরিবার (joint family)। যে-পরিবার পতি-পত্নী এবং তাদের নিজেদের অবিবাহিত সন্তান-সন্ততি  কিংবা দত্তকুদের নিয়ে গঠিত হয়, তাকে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার বলা হয়। বিশ্বের সব দেশেই, বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতাে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে এরূপ পরিবারের অবস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অনেকগুলি দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার রক্তের সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি পরিবার গঠন করলে তাকে যৌথ পরিবার বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়, রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, বাবা, মা, জ্যাঠা, কাকা, ভাই, বােন এবং তাদের প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে যে-পরিবার গড়ে ওঠে, তা হােল যৌথ পরিবার। অনেকে এরূপ পরিবারকে সম্প্রসারিত (extended) পরিবার বলেও চিহ্নিত করেন। ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে এক সময় এই ধরনের পরিবার বিশেষভাবে বিদ্যমান ছিল এবং এখনও বর্তমান রয়েছে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

যৌথ পরিবারের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ |Basic Features of Joint Family

 

 ভারতের যৌথ পরিবার ব্যবস্থার কয়েকটি উল্লেখযোেগ্য বৈশিষ্ট্য হােল ।

 

[১]  ভারতের যৌথ পরিবারগুলি কাঠামােগতভাবে বৃহদায়তনবিশিষ্ট। কোন কোন যৌথ পরিবার শতাধিক সদস্য নিয়েও গঠিত হােত। আসলে এইসব পরিবার কতকগুলি দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের যােগফল মাত্র। পিতা-মাতা, ভাই-বােন, তাদের সন্তান সন্ততি, নাতি-নাতনি, এমনকি বিধবা কন্যা ও তার সন্তান-সন্ততিরাও এরূপ পরিবারের সদস্য বলে বিবেচিত হওয়ায় স্বাভাবিক কারণেই পরিবারের আয়তন বৃদ্ধি পায়।

 

 [২] যৌথ পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নীচে বসবাস করে। অবশ্য বৃহদায়তনবিশিষ্ট পরিবারের সদস্যসংখ্যা যথেষ্ট বেশি হওয়ায় অনেক সময় পরস্পর সংলগ্ন কয়েকটি বাসগৃহেও সদস্যরা বসবাস করে থাকে। কিন্তু তারা একই সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে বলে অনেক সময় যৌথ পরিবারকে একান্নবর্তী পরিবার বলেও চিহ্নিত করা হয়। 

 

[৩] যৌথ পরিবারগুলি মূলতঃ কৃষি-নির্ভর হওয়ার ফলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকেই কৃষিকার্যের সঙ্গে কোন না কোনভাবে যুক্ত থাকতে হয়। অবশ্য শিল্পকর্মে নিযুক্ত যৌথ পরিবারের অবস্থিতিও যে ভারতে লক্ষ্য করা যায়, তা বলাই বাহুল্য। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, বৃহৎ ভূস্বামী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যৌথ পরিবার গঠনের প্রবণতা যথেষ্ট বেশি। অপর দিকে, দরিদ্র শ্রেণী ও নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্যে নানা কারণে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার গড়ে তােলার বিশেষ প্রবণতা স্য যায়।

 

(৪) কর্তৃত্বমূলক কাঠামাে (authoratarian structure) হােল ভারতীয় যৌথ পরিবার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যৌথ পরিবারকে কর্তৃত্বমূলক বলার কারণ হােল—এখানে পরিবারের প্রধান অর্থাৎ কর্তা বলে পরিচিত ব্যক্তিটির হাতে যাবতীয়  সিদ্ধান্ত গ্রহণের চুড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকে। পরিবারের মধ্যে তার কথাই শেষ কথা বলে বিবেচিত হয়। পরিবারের প্রবীণতম পুরুষই হলেন পরিবারের কর্তাব্যক্তি। বয়স ও অভিজ্ঞতার নিরিখেই কর্তা নির্ধারণের বিষয়টি যৌথ পরিবার ব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। সাধারণভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা যথেষ্ট কম থাকলেও

পরিবার-প্রধান ইচ্ছা করলে বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। তবে পরিবারের কোন্ কোন্ সদস্যের সঙ্গে আলােচনা করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী তিনি নিজেই। লক্ষণীয় বিষয় হােল—এরূপ পরিবারের কর্তৃত্ব সব সময়ই পরিবারের প্রবীণতম পুরুষের হাতেই অর্পিত হয়, স্ত্রীলােকের হাতে নয়।

 

[৫] যৌথ পরিবারের সদস্যদের কাছে সামগ্রিকভাবে পরিবারই হােল সব। অর্থাৎ, যৌথ পরিবারের সামগ্রিক স্বার্থের যুপকাষ্ঠে সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে বলিদান করতে হয়। এর অর্থ—পরিবারের লক্ষ্যই হােল পরিবারের প্রতিটি সদস্যের লক্ষ্য।  রাম আহুজা (Ram Ahuja) একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি সামগ্রিক স্বার্থকে সম্পর্কে আলােচনা করেছেন। পরিবারের কোনও নবীন সদস্য যদি  স্নাতক ডিগ্রী লাভ করার পর অধিকতর উচ্চশিক্ষা লাভ করতে চায়, সেক্ষেত্রে তার ইচ্ছাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে না। কারণ, পরিবারের প্রধান তথা সামগ্রিকভাবে পরিবারটি যদি চায় যে, সংশ্লিষ্ট সদস্যটি উচ্চশিক্ষা লাভের পরিবর্তে পরিবারের দোকান দেখাশুনা করুক, তাহলে তাকে তা-ই করতে হবে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[৬] পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা স্থিরীকৃত হয় তাদের বয়স ও সম্পর্কের নিরিখে। এরূপ পরিবারের মধ্যে স্ত্রীলােক অপেক্ষা পুরুষের মর্যাদা অনেক বেশি। যে-যৌথ পরিবার দুই বা তিন  নারীপ্ৰজন্মবিশিষ্ট, সেখানে প্রথম প্রজন্মের মর্যাদা সর্বাধিক। মর্যাদার দিক  থেকে তার পরবর্তী স্থানে দ্বিতীয় প্রজন্মের অবস্থান। আবার, একই। প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যক্তির মর্যাদার ক্ষেত্রে যথেষ্ট তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। বয়ােজ্যেষ্ঠরা কনিষ্ঠদের অপেক্ষা অধিক পদমর্যাদার অধিকারী। আবার, যৌথ পরিবারের নারীদের মর্যাদা তাদের স্বামীর মর্যাদা অনুসারে স্থিরীকৃত হয়।

 

[৭] যৌথ পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হােল দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর অপত্য ও  ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্কের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। অন্যভাবে বলা যায়, এরূপ পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অপেক্ষা পিতা-পুত্র কিংবা ভাই-ভাই সম্পর্ক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এর ফলে যৌথ পরিবারভুক্ত প্রতিটি দম্পতিকে তাদের পারস্পরিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সংযত  থাকতে হয়।

 

 [৮] যৌথ পরিবার বহু সদস্যবিশিষ্ট হলেও পরিবারভুক্ত সব সদস্যের প্রতি সমান দৃষ্টি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের রােজগারের বিষয়টি আদৌ গুরুত্ব পায় না। পরিবারের কেউ যদি মাসে দশ হাজার টাকা এবং অন্য একজন যদি দেড় হাজার টাকা আয় করে, তাহলে প্রথমােক্ত সদস্য কিংবা তার স্ত্রী ও সন্তানসস্ততি বিশেষ কোন সুযােগ-সুবিধা লাভ করে না। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আলােচনা করা যেতে পারে। পূর্বোক্ত দু’জন ব্যক্তির সন্তান-সন্ততিদের শিক্ষার জন্য একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। যার মাসিক আয় বেশি, তার সন্তান-সন্ততিদের নামী-দামী শিক্ষায়তনে ভর্তি করা যৌথ পরিবারের নিয়মনীতির বিরােধী। এইভাবে পরিচালিত হওয়ার ফলে যৌথ পরিবারের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অনেক বেশি সুদৃঢ় হয়।

 

[৯] যৌথ পরিবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎপাদন ও ভােগের একটি একক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের সব সদস্য তার সাধ্যমতাে উৎপাদনের কাজে অংশগ্রহণ করে এবং তার প্রয়ােজনমতাে খাদ্য, পরিধান প্রভৃতি লাভ করে। পারস্পরিক সহযােগিতাই হােল এরূপ পরিবারের মূল ভিত্তি। এরূপ সহযােগিতা ছাড়া যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষার কথা কল্পনাই করা যায় না।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

ভারতীয় পরিবার ব্যবস্থা

 [১০] সনাতন হিন্দু যৌথ পরিবারের সদস্যরা উত্তরাধিকার সূত্রে যৌথভাবে সম্পত্তি লাভ ও ভােগ করত। তবে সম্পত্তির ওপর নারীদের কোন অধিকার ছিল না পরিবারভুক্ত কন্যা, পত্নী বা বিধবাদের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হােত। অবশ্য তাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব সমগ্র পরিবারই গ্রহণ করত। 

 

[১১] সদস্যদের মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য হােল ভারতীয় যৌথ পরিবারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এরূপ পরিবারের সব সদস্যই অভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ায় প্রায়শই নানা ধরনের ধর্মীয় আচার উৎপাদন ও ভােগের একটি একক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং সবাই মিলে তাতে অংশগ্রহণ করে। ধর্মীয় 

দিক থেকে অভিন্নতা থাকার ফলে প্রতিটি হিন্দু যৌথ পরিবারের নির্দিষ্ট কুলদেবতা বা গৃহদেবতা থাকেন।

 

পরিবারের ভাঙনের কারণ

 

সনাতন যৌথ পরিবারের ভাঙনের কারণ | Reasons for Disorganization of Traditional Joint Family) : 

 

ভারতের সনাতন বা সাবেকী যৌথ পরিবার ব্যবস্থার মধ্যে যেসব পরিবর্তন ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে কিংবা এখনও ঘটছে, সেগুলিকে ভাঙন বলা হবে কিনা তা নিয়ে সমাজতত্ত্ববিদ ও গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরােধ থাকলেও একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সনাতন কাল থেকে চলে আসা ভারতীয় যৌথ পরিবার ব্যবস্থার কাঠামাে ও কার্যৰ্গত ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এইসব পরিবর্তনের কারণ হিসেবে কোন একটি বিশেষ উপাদানকে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। এর পেছনে আর্থ-সামাজিক কারণ ছাড়াও অন্যান্য কারণ রয়েছে। রাম আহুজা, গুরুমুখ রাম মদন প্রমুখের আলােচনার ভিত্তিতে যৌথ পরিবারের ভাঙনের কারণগুলিকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যেতে পারে ?

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[১] শিক্ষা (Education) : স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতে শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রচেষ্টা চালানাে হয়। শিক্ষার বিস্তার সনাতন যৌথ পরিবারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। শিক্ষা

 

মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোেধ, দৃষ্টিভঙ্গী ও মতাদর্শের ক্ষেত্রেই কেবল পরিবর্তন আনে না, সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী অনুভূতি নিয়ে আসে। স্বাধীন ভারতে সার্বিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ফলে স্ত্রী-শিক্ষার বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটতে থাকে ।

 

 ১৯০১ সালে পুরুষ ও নারীদের মান যথাক্রমে ৯৮ এবং ০৬ শতাংশ। কিন্তু ১৯৫১ সালে সেই হার বৃদ্ধি পেয়ে যথাক্রমে ২৭.১৬ এবং ৮:৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এর থেকে বােঝা যায়, ব্রিটিশ আমলে স্ত্রী-শিক্ষার বিশেষ সম্প্রসারণ ঘটেনি। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ভারতে পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬৪.১৩ এবং স্ত্রীলােকদের মধ্যে ৩৯:২৯ শতাংশ। এই ক্রমবর্ধমান শিক্ষার হার নারী-পুরুষ উভয়ের জীবন দর্শন (philosophy of life)-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষিত হওয়ার ফলে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি শিক্ষিত ব্যক্তি চাকুরি করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে চায়। শিক্ষিত স্ত্রীলােকরা পারিবারিক বিষয়ে ক্রমশঃ তাদের মতামত ব্যক্ত করতে থাকে এবং তাদের ওপর পরিবারের অন্যের একাধিপত্য মেনে নিতে অস্বীকার করে। এর ফলে সনাতন যৌথ পরিবারের কাঠামাের ওপর আঘাত আসে। শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে পরিবার ব্যবস্থাকে এবং পরিবার ব্যবস্থা কীভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, সে বিষয়ে আই. পি. দেশাই ও আইলিন রস বিস্তারিতভাবে আলােচনা করেছেন। শিক্ষা প্রধানতঃ দু’ভাবে পরিবারকে প্রভাবিত করে।

  [i] শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটার ফলে তাদের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সনাতন যৌথ পরিবারের ধারণার বিরােধ দেখা দেয়। ফলে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার গড়ে তােলার মানসিকতা তাদের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।

  [i] শিক্ষালাভের পর শিক্ষিত ব্যক্তিদের চাকুরি নিয়ে বাইরে চলে যেতে এবং সেখানেই বসবাস করতে বাধ্য হতে হয়। ফলে কার্যতঃ তারা যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এইভাবে এক-একটি যৌথ পরিবার একাধিক দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশাই তার গবেষণার মাধ্যমে এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। তার মতে, ভারতে শিক্ষিতের হার যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যৌথতার বন্ধন সুদৃঢ় হচ্ছে। এবং দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার গঠনের মানসিকতা হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু রাম আহুজা দেশাই-এর এই যুক্তি মেনে নিতে রাজী নন। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, গবেষণার ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলেই দেশাই-এর গবেষণার ফল ত্রুটিমুক্ত হতে পারেনি। 

 আবার, রস তার গবেষণার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন যে, বর্তমানে চাকুরির জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের প্রয়ােজন। তাই পিতা-মাতারা, বিশেষতঃ শহরাঞ্চলের উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের পিতা-মাতারা তাদের সন্তান-সন্ততিদের এই ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে পড়েছে। এমনকি, দরিদ্র পিতা-মাতাদের মধ্যেও এরূপ প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজেরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে তাদের সন্তানদের এই ধরনের উচ্চ শিক্ষাদানের সবরকম ব্যবস্থা করে দেন। 

 কিন্তু তাদের সন্তানরা ঈপ্সিত লক্ষ্যে উপনীত হতে ব্যর্থ হলে হতাশ পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের অপদার্থ বলে চিহ্নিত করে নানাভাবে অপমান কাতে থাকেন। 

 ফলে সন্তানদের সঙ্গে তাদের বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। আবার, অত্যধিক দারিদ্র্যের জন্য কোন কোন পিতা-মাতা তাদের অত্যধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করতে সমর্থ হন না। ফলে ঐসব সন্তানের মধ্যে শহরে গিয়ে যে-কোন উপায়ে উচ্চশিক্ষা লাভের মানসিকতা দেখা যায়। সেখানে তারা চাকুরি করে কিংবা ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়ে নিজেরা নিজেদের ব্যয় নির্বাহের জন্য সচেষ্ট হয়। এর ফলে ক্রমশঃ তাদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে এবং বিবাহের পর তারা শহরেই থেকে যায়।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

স্ত্রীলােকদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার স্বামী, সন্তান ও পরিবার-পরিজনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটায়। শিক্ষিত স্ত্রীলােকেরা স্বাধীনভাবে ভাবনা-চিন্তা ও কাজকর্ম করতে পছন্দ করে। এমনকি, তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী  হওয়ার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সাবেকী যৌথ তার পরিবারের মধ্যে থেকে তারা তাদের ইচ্ছামতাে কাজ করতে পারে না। যৌথ পরিবারের অন্যদের সঙ্গে, বিশেষতঃ সনাতনপন্থী শাশুড়ীদের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এর ফলে যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার গড়ে তােলার মানসিকতা তাদের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এ. এইচ. চন্দ্রকলা (A. H. Chandrakala) মন্তব্য করেছেন যে, হিন্দু মহিলাদের অধিকাংশই যৌথ পরিবার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের সপক্ষে থাকার পক্ষপাতী। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষার বিস্তার ভারতের সনাতন যৌথ পরিবার ব্যবস্থার পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে।

 

[2] শিল্পায়ন (Industrialization) : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকে ভারতে শিল্পায়ন শুরু হয়। নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে ওঠার ফলে সেগুলিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শহর ও নগর গড়ে ওঠে। ভারতে শিল্প সভ্যতার বিকাশ পরিবারের সংগঠনের ওপর শিল্পায়নের প্রভাব ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবার ব্যবস্থা, বিশেষতঃ সাবেকী যৌথ পরিবার ব্যবস্থার ওপর তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। পরিবারের সংগঠনের ওপর শিল্পায়নের প্রভাবকে প্রধানতঃ তিনটি দিক থেকে আলােচনা করা যায়। এগুলি হােল ?

 

[i] এতদিন পর্যন্ত পরিবার উৎপাদনের একটি প্রধান একক হিসেবে কার্য সম্পাদন করত। কিন্তু শিল্পায়নের ফলে বর্তমানে তা ভােগের একটি এককে পরিণত হয়েছে। যৌথ পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য কলকারখানায় কাজ করার জন্য শহরাঞ্চলে চলে যায় এবং সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। বাসস্থানের অপ্রতুলতার জন্য ঐসব কর্মরত ব্যক্তি তাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের সঙ্গে নিয়ে যায়। অবশ্য তারা তাদের যৌথ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালন করে। এইভাবে বসবাস করার ফলে পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বন্ধন ক্রমশঃ শিথিল হয়ে যায়। 

 

[ii] কলকারখানায় চাকুরি যুবকদের কার্যতঃ তাদের পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতার হাত থেকে মুক্তিদান করে। নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন লাভ করার ফলে তারা আর্থিক দিক থেকে স্বাধীন হতে পারে। তাছাড়া, উপার্জনশীল ব্যক্তিরা তাদের উপার্জন সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ফলে পরিবারের কাছ থেকে অনেক কিছু বেশি আশা করে। এইভাবে তারা পরিবারের মধ্যে থেকেও তাদের সন্তানসন্ততিদের শিক্ষা, পােশাক-পরিচ্ছদ, প্রসাধন সামগ্রী প্রভৃতির পেছনে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় করার দাবি জানায়। কিন্তু তাদের দাবি সাবেকী যৌথ পরিবারের নিয়মনীতির বিরােধী হওয়ায় তা উপেক্ষিত হয়। ফলে তারা শেষ পর্যন্ত পৃথক হয়ে যায়। এইভাবে যৌথ পরিবারে   ভাঙন দেখা দেয়।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[iii] শিল্পায়নের ফলে পুরুষদের মতাে মহিলারাও অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, কলকারখানা প্রভৃতি স্থানে কর্মরতা হওয়ার সুযোেগ পেয়েছে। ব্যক্তিগত উপার্জন তাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষশাসিত যৌথ পরিবারের 

  রীতিনীতি মেনে নেওয়া আজকের মহিলাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি হােল যৌথ পরিবার ব্যবস্থার পরিবর্তে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের আবির্ভাব।

 

[৩] নগরায়ন (Urbanization) : ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প ও কলকারখানা গড়ে ওঠার ফলে এক একটি শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে নগর-সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইভাবে শিল্পায়ন ও নগরায়ন আজকের ভারতীয় সমাজের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যে যৌথ পরিবারের পরিণত হয়েছে। কিন্তু নগরায়নের ফলে সাবেকী যৌথ পরিবারের কাঠামাে ও কার্যগত ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। যৌথ  পরিবারের ওপর নগরায়নের বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে নিম্নলিখিত কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যেতে পারে।

 

[i] নগর জীবনের একটি বিশেষ আকর্ষণ থাকে। এখানে জীবন-জীবিকার বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত থাকে। তাছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতির বিশেষ সুযােগ-সুবিধা থাকায় গ্রামীণ মানুষের কাছে নগরজীবনের প্রতি আসক্তি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই যৌথ পরিবারের আয়তন আকর্ষণের জন্যই গ্রামীণ মানুষের একটি বড় অংশ আজ নগরমুখী। কিন্তু শহর বা নগরে এসে বসবাস করার ফলে তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের যােগসূত্র ক্রমশঃই ক্ষীণ হতে থাকে। এইভাবে যৌথ পরিবারগুলির আয়তন হ্রাস পায় এবং তার সংহতি বিপন্ন হয়।

 

[ii] জীবন-জীবিকার তাগিদে কিংবা নগর জীবনের আকর্ষণে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসার ফলে শহর বা নগরাঞ্চলে বাসস্থানের তীব্র সমস্যা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ কোনক্রমে নিজের মাথা গোঁজার একটু শহরাঞ্চলে বাসস্থানের ঠাই জোগাড় করে নিতে হিমশিম খায়। তাই তাদের পক্ষে পরিজনকে শহরে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়েই তারা তাদের স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে আসে। তাছাড়া, শহর বা নগরজীবনের জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তদের পক্ষে পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শহরবাসী পরিবারগুলি কার্যতঃ তাদের মূল পরিবার থেকে ক্রমে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

[i] নগরায়ন অন্য একভাবেও পরিবার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ যৌথ পরিবারে পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্বকে কার্যতঃ অস্বীকার করা হয়। কারণ, এরূপ পরিবারের সদস্যসংখ্যা যতই বৃদ্ধি পাবে, ততই শ্রমের যােগান বাড়বে।কিন্তু শহরাঞ্চলে বাসস্থানের অপ্রতুলতা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযােগিতা, সন্তান-সন্ততি প্রতিপালনের ব্যয়াধিক্য প্রভৃতি কারণে শহুরে দম্পতিরা তাদের সন্তান-সন্ততির সংখ্যা সীমিত রাখার পক্ষপাতী। তার ফলে তারা পৰাির পরিকল্পনা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবােধ করে না। এইসব কারণে শহরাঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন বিশিষ্ট পরিবারের সংখ্যাই অধিক পরিলক্ষিত হয়।

 

 [iv] নগরায়ন পরিবারের ভূমিকাগত ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনে দিয়েছে। গ্রামীণ যৌথ পরিবারগুলি কেবল উৎপাদনের একক হিসেবেই কাজ করত না, সেই সঙ্গে সদস্যদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আমােদ-প্রমােদ প্রভৃতি বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করত। কিন্তু শহরাঞ্চলে পরিবারের পুরুষদের এবং অনেক কার্যক্ষেত্রের পরিধির ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের যৌথভাবে উপার্জন করতে হয়। তার ফলে পরিবারের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদনের সময় তাদের থাকে না । তাই স্বাভাবিকভাবেই সন্তান-সন্ততির প্রতিপালন, অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার ব্যবস্থা, রান্নাবান্না, পােশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার প্রভৃতির দায়িত্ব তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার হাতে অর্পণ করে। এইভাবে শহরে হাসপাতাল, নার্সিংহােম, হােটেল, রেস্তোরাঁ, ক্রেশ, কিন্ডারগার্টেন, লন্ড্রী প্রভৃতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি চিত্ত বিনােদনের জন্য সিনেমা হল, থিয়েটার হলসহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও সংস্থা গড়ে উঠেছে। এর ফলে নগরে পরিবারের দায়-দায়িত্ব ও কার্যক্ষেত্রের পরিধি অনেকখানি সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

 

[v] নগরায়নের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। গ্রামীণ যৌথ পরিবারগুলির সদস্যরা পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলার বন্ধনে যেরূপ দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে এবং পরিবারের সদস্যদের পরিবার-প্রধানের নিয়ন্ত্রণাধীনে সেই সম্পর্ক যেভাবে রক্ষিত ও পরিচালিত হয়, নগরজীবনে তার একান্ত অভাব বিশেষভাবে চোখে পড়ে। শহর বা নগরের পরিবারগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি যথেষ্ট কম। এখানে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র প্রভৃতি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আনুগত্য অপেক্ষা সমতা ও বন্ধুত্বের নীতি বিশেষভাবে প্রযুক্ত হয়।

 

[৪] বিবাহ (Marriage) : সাবেকী যৌথ পরিবারে বিবাহের ব্যাপারে পাত্র-পাত্রীর নিজস্ব মতামতের কোন মূল্য নেই। কিন্তু শিক্ষার বিস্তার, শিল্পায়ন ও নগরায়ন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটিয়েছে। এর ফলে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুরুষ ও  মহিলার মতামতকে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়। আবার, অনেক  সময় প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র কন্যারা পিতা-মাতার নির্দেশ উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিবাহ করে। এর ফলে অনেক সময় পিতা-মাতার সঙ্গে তাদের বিরােধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। 

 সর্বোপরি, এরূপ স্ব-নির্বাচিত বিবাহ ব্যবস্থার ফলে অসবর্ণ বিবাহের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আইনগত দিক থেকে এরূপ বিবাহের পথে কোনরূপ বাধা না থাকায় আইনের সাহায্য নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক যুবক-যুবতীরা কোনরূপ সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিবাহকার্য সম্পাদন করে। এইভাবে বিবাহ করার ফলে অনেক সময় নবদম্পতিকে তাদের পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হয়। সুতরাং বলা যায়, পরিবারের বিবাহ-সংক্রান্ত সাবেকী প্রথার যথেষ্ট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

[৫] আইন (Laws) : ভারতে এমন কতকগুলি সমাজ-সংস্কারমূলক আইন প্রণীত হয়েছে, যেগুলি সাবেকী যৌথ পরিবার ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করেছে। এইসব আইনের মধ্যে ১৮৫৬ সালের বিধবা পুনর্বিবাহ আইন’ (Widow Remarriage Act), ১৯৩৭ সালের হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার আইন’ (Hindu Women’s Right to Property Act), ১৯৫৪ সালের 

 

‘বিশেষ বিবাহ আইন’ (Special Marriage Act), ১৯৫৫ সালের ‘হিন্দু বিবাহ আইন’ (Hindu

 

Marriage Act) ও ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন’ (Hindu Succession Act)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বিধবা পুনর্বিবাহ আইনে’ বিধবাদের পুনর্বিবাহের অধিকার প্রদান করা হয়। আবার, হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার আইনের মাধ্যমে পরিবারের যৌথ সম্পত্তির ওপর স্বামীদের যে-স্বার্থ ছিল, সেই স্বার্থ রক্ষার অধিকার হিন্দু বিধবাদের প্রদান করা হয়। কিন্তু যৌথ সম্পত্তি ভাগবণ্টনের জন্য বলার অধিকার প্রদান করা হলেও উক্ত আইনে তাকে যৌথ সম্পত্তির শরিকের মর্যাদা প্রদান করা হয়নি। বিশেষ বিবাহ আইনে’একটি নির্দিষ্ট বয়ঃসীমায় উপনীত হওয়ার পর পিতা-মাতার সম্মতি ছাড়াই পুরুষ ও মহিলাদের জাত-পাত ও ধর্ম নির্বিশেষে তার জীবনসাথী নির্বাচন এবং তাকে বিবাহ করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ‘হিন্দু বিবাহ আইন অনুসারে বিবাহ-বিচ্ছেদের স্বাধীনতা স্বীকৃতি লাভ করে। আবার, হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে’ পৈতৃক সম্পত্তির ওপর পুরুষদের মতােই মহিলাদের সমানাধিকার স্বীকৃতি লাভ করে। এইসব আইন স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বলা বাহুল্য, এর ফলে পিতৃতান্ত্রিক সাবেকী যৌথ পরিবারগুলির সংহতি বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের ভাঙনের কারণ

 

দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের ভাঙনের কারণ | Reasons for Disorganization of Nuclear Family:

 

 যৌথ পরিবারের মতাে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারও বর্তমানে ভাঙনের মুখােমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের উদ্দেশে যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে দম্পতি এরূপ পরিবার গড়ে তােলে। দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হােল

  [i] এরূপ পরিবার আকৃতিগতভাবে ক্ষুদ্র। পতি-পত্নী এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা এরূপ পরিবারের সদস্য।

 [ii] দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের স্বাধীন সত্তা থাকে। যৌথ পরিবারের মতাে এরূপ পরিবারের সদস্যদের কর্তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকতে হয় না।

 [ii] এরূপ পরিবার পতি-পত্নী—উভয়ের দ্বারা যৌথভাবে কিংবা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে, যে-কোন একজনের দ্বারা অথবা পারস্পরিক বােঝাপড়ার মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টন নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। 

[iv] এরূপ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জ্ঞাতিবর্গের বা আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপক ও ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ থাকে না। 

[v] প্রকৃতিগতভাবে এরূপ পরিবার আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু ব্রিটেন বা আমেরিকার মতাে ভারতে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারগুলির মধ্যে পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ্য করা যায় না। অন্যভাবে বলা যায়, ভারতের দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারগুলিকে সাধারণভাবে পশ্চিমী অর্থে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কারণ, এখানে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে এসে ঐ পরিবারের সদস্যরা যেসব দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবার গড়ে তােলে, সেগুলির সঙ্গে মূল পরিবারের সম্পর্ক বিনষ্ট হয় না; বরং আপদে-বিপদে প্রয়ােজনে-অপ্রয়ােজনে ঐসব পরিবারের সঙ্গে মূল পরিবারের ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ থাকে। তাছাড়া, দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের সদস্যরা তাদের পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তাদের দায়দায়িত্ব পালন করে।

 

ভাঙনের কারণ

  কিন্তু যৌথ পরিবারের মতাে ভারতের দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারগুলিও নানা কারণে ভেঙে যায়। এইসব কারণগুলিকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করে আলােচনা করা যেতে পারে। যথা—[১] ব্যক্তিগত কারণ, [2] অর্থনৈতিক কারণ, [৩] সামাজিক কারণ এবং [৪] সাংস্কৃতিক কারণ।

 

[১] ব্যক্তিগত কারণ (Personal Reasons) ঃ দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারগুলির ভাঙনের পিছনে কতকগুলি ব্যক্তিগত কারণ থাকে। এগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযােগ্য হােল ।

 

[i] ভারতে গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে পুরুষদের মতােই মহিলারা স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দমতাে ব্যক্তিকে বিবাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে বিবাহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে রােমান্টিক ভালবাসা। তবে ভালবাসার রােমান্টিক দিকটি ছাড়াও সামাজিক সমন্বয় সাধনের একটি দিক থাকে। কিন্তু যুবকযুবতীদের অনেকে রােমান্টিক ভালবাসাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়। বিবাহের প্রথম দিকে পরস্পরের প্রতি জৈবিক আকর্ষণ থাকায় তারা নিজেদের বিশ্বের সর্বাপেক্ষা সুখী মানুষ বলে ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাদের মধ্যে আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ভিন্নতা প্রকট হয়ে ওঠে। এমতাবস্থায় তাদের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরে। তাদের উভয়েই একথা ভাবতে শুরু করে যে, কী করে সে তার জীবনসাথী হিসেবে অন্যকে বেছে নিয়েছে। এইভাবে তাদের মধ্যে মানসিক ব্যবধান গড়ে ওঠার ফলে সামান্য ব্যাপার নিয়ে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়।

 

[ii] দাম্পত্য জীবনের শুরুতে পতি-পত্নী একে অপরের মনে নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণা সৃষ্টি করার কাজে আত্মনিয়ােগ করায় তাদের কারােরই প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতার প্রকাশ ঘটে । কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ব্যক্তিত্ব ও  মানসিকতার সংঘাত শুরু হয়। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আলােচনা করা যেতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বামী হৈ-হুল্লোড় করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে সময় কাটাতে ভালবাসে। তাই মাঝে-মধ্যেই সে হােটেল কিংবা বারে’ যায়। কিন্তু স্ত্রী তা একেবারেই পছন্দ করে না। সে চায় ঐ সময় স্বামী বাড়িতেই থাকুক। এই পরস্পরবিরােধী মানসিকতা এক সময় তাদের মধ্যে মানসিক ব্যবধানের প্রাচীর গড়ে দেয়।

 

[iii] দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবন-দর্শন (philosophy of life) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবােধের ক্ষেত্রে সমরূপতা বর্তমান থাকে, তাহলে দাম্পত্য জীবনে অস্থিরতা দেখা দেয় না। কিন্তু ব্যক্তিগত দন-দর্শনের মৌলিক মূল্যবোেধর ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার বিরূপ প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় এইভাবে কোন দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারের স্বামী যদি বৌদ্ধিক মূল্যবোধের দ্বারা পরিচালিত হয় অর্থাৎ সবসময়ই পড়াশুনা এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলােচনা ও গবেষণায় নিজেকে ব্যাপৃত রাখে এবং তার স্ত্রী যদি চা-পার্টি কিংবা তাস-পার্টির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে স্থাপনের চেষ্টা করে, তাহলে এরূপ জীবন-দর্শনগত ভিন্নতার জন্য তাদের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বােঝাপড়ার অভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। 

 

[iv] ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ধরনগত ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভিন্নতা থাকলে দাম্পত্য কলহ দেখা দেওয়ার সম্ভাক থাকে। অনেক সময় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মানসিক পার্থক্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আলােচনা করা যেতে পারে। কোন ভদ্রমহিলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে উচ্চৈস্বরে কথা বলা পছন্দ করে, কিন্তু তার এরূপ ব্যক্তিগত আচরণের ধরন তার স্বামীর পছন্দ নয়। স্বাভাবিক কারণে ব্যক্তিগত আচারস্বামী রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্ত্রীর এরূপ আচরণের প্রতিবাদ করে। এর ফলে স্ত্রীর মনে হতে পারে যে, তার স্বামী তার ওপর কর্তৃত্ব করতে চাইছে। ফলে তাদের মধ্যে মনােমালিন্য সৃষ্টি হয়।

 

[v] অনেক সময় মানসিক অস্থিরতারূপ ব্যাধিগত ব্যক্তিত্ব (psychopathic persona.lity)র জন্য দাম্পত্য জীবনে অশান্তি দেখা দিতে পারে। সামান্য ব্যাপারে রেগে যাওয়া, অমানবিক ব্যবহার করা, মানসিক বা দৈহিকভাবে নির্যাতন করা  প্রভৃতির মাধ্যমে এরূপ মানসিকতা প্রকাশিত হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে  যে-কোন একজন এরূপ মানসিকতাসম্পন্ন হলে অন্যজনের পক্ষে তার সঙ্গে সঙ্গে মানিয়ে চলা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একদিন দাম্পত্য জীবনে অশান্তির

 

 [2}অর্থনৈতিক কারণ (Economic Reasons) : অনেক সময় অর্থনৈতিক কারণে দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। চরম দারিদ্র্য সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তােলার পথে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক বলে বিবেচিত হয়। অবশ্য দারিদ্র্য একটি  আপেক্ষিক ধারণা। কারণ, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় তাদের কাছে যথেষ্ট বলে বিবেচিত না হলেও একটি দরিদ্র পরিবার তাকে যথেষ্ট বলে মনে করে। তবে একথা সত্য যে, সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটি পরিবারের আয় যদি যথেষ্ট বলে বিবেচিত না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে তাদের মেজাজ ঠিক রাখা যথেষ্ট কঠিন। 

 কারণ গৃহের কত্রী হিসেবে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও কোন স্ত্রীর পক্ষে স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের পেট ভরে খেতে দিতে না পারার থেকে তার কাছে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না কিন্তু স্বামীর আয় অত্যধিক কমহওয়ার ফলে সাধারণভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কোন পথ তার কাছে খােলা না থাকায় শেষ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরােধ দেখা দিতে পারে। আবার, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজন যদি উচ্চশ্রেণীর সম্রান্ত পরিবারভুক্ত হন এবং অন্যজন যদি অতি সাধারণ পরিবার থেকে আসেন, তাহলে অর্থনৈতিক কারণে তাদের মধ্যে বিরােধ দেখা দিতে পারে। সর্বোপরি, একজন উচ্চশিক্ষিত চাকুরিজীবী মহিলাকে বিবাহ করার পর স্বামী যদি তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করে, তাহলে তাদের মধ্যে মানসিক বিরােধ সৃষ্টি হতে পারে।

  এরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রীর মনে হতে পারে যে, তার স্বামী তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। আবার, স্বামী-স্ত্রী যদি একই বৃত্তিতে নিযুক্ত থাকে এবং স্বামীর থেকে স্ত্রীর যােগ্যতা ও দক্ষতা অধিক হয়, তাহলে তার স্বামী হীনমন্যতায় ভোেগ। এরূপ ক্ষেত্রে বৃত্তিগত ঈর্ষা দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি, পেশার প্রকৃতিগত কারণে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কোন স্বামী যদি এমন একটি পেশায় নিযুক্ত থাকে যাতে করে তাকে বছরের অধিকাংশ সময়েই বাড়ির বাইরে অবস্থান করতে ফলে পারিবারিক অশান্তির যথেষ্ট সম্ভারনা থাকে।

 

[৩সামাজিক কারণ (Social Reasons) : ভারতে দম্পতিকেন্দ্রিক পরিবারে স্বামী তার পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সামাজিক দায়দায়িত্ব পালন করতে চাইলেও

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

অনেক সময় স্ত্রীরা তা পছন্দ করে না। ফলে তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ঘটতে পারে। আবার, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের ব্যবধান অনেক সময় পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীর বয়স স্ত্রীর বয়স অপেক্ষা অনেক বেশি হলে তাদের মানসিক গঠনের মধ্যে ভিন্নতা আসে। অনেক সময় স্ত্রীর দৈহিক কামনা বাসনা  যথাযথভাবে পূরণ করতে স্বামী অসমর্থ হলে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল দুরারােগ্য ব্যাধি প্রভৃতি ধরার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি সুদীর্ঘকাল ধরে দুরারােগ্য ব্যাধিতে ভােগে এবং তার পেছনে পারিবারিক বাজেটের একটি বড় অংশ যদি ব্যয়িত হয়, তাহলে দাম্পত্য জীবন থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অন্তর্হিত হতে পারে। সর্বোপরি, সন্তানসন্ততিদের কেন্দ্র করে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরােধ তুঙ্গে উঠতে পারে। ছেলে-মেয়েকে কী ধরনের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ প্রভৃতি দেওয়া হবে, তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। সাধারণতঃ স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীদের অভিযোেগ হােল—সে পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে বেশি ভালবাসে। আবার, স্বামীও কন্যা অপেক্ষা পুত্রকে বেশি ভালবাসার অভিযােগ, স্ত্রীর বিরুদ্ধে তুলতে পারে।

 

[8/সাংস্কৃতিক কারণ (Cultural Reasons) ঃ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একই ধরনের বা প্রায় একই ধরনের সাংস্কৃতিক পটভূমি থাকলে দাম্পত্য জীবনে বিরােধের  সম্ভাবনা যথেষ্ট কম থাকে। কিন্তু সাংস্কৃতিক পটভূমির ক্ষেত্রে ভিন্নতা  থাকলে স্বামী-স্ত্রীর শিক্ষাদীক্ষা, আচার-আচরণ, রুচি প্রভৃতি ক্ষেত্রেও পার্থক্য প্রকট হয়ে ওঠে। তার ফলে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি দেখা দিতে পারে।

ভারতীয় পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য:

পরিবার উপসংহার

 পরিশেষে একথা বলা যেতে পারে যে, দাম্পত্য জীবনে খুব কম ব্যক্তিই আছে, যারা পুরােপুরি সুখী। আবার, একথাও সত্য যে, বিবাহ মানুষের জীবনে সুখ ও শান্তি এনে দিতে পারে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সহযােগিতা ও সহমর্মিতার  মনােভাব বর্তমান থাকে। যে-কোন পরিবারে সন্তান-সন্ততি থাকলে পিতা-মাতারা তাদের জন্য একটি যথাযথ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তােলার কাজে আত্মনিয়ােগ করলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার উত্তেজনা বহুলাংশে হ্রাস পায়। তাছাড়া, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক নির্ভরতা, শান্ত ও আনন্দদায়ক সাহচর্য, মৌলিক মূল্যবােধের ক্ষেত্রে সাদৃশ্য প্রভৃতি বর্তমান থাকলে পারিবারিক জীবনে সুখ ও শান্তি আসে। তাই অধিকাংশ পুরুষ ও স্ত্রীলােক তাদের দাম্পত্য জীবনে একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চেষ্টা করে। কিন্তু যে-পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝােতার মনােভাব আদৌ থাকে না, ভাঙনই হােল সেই পরিবারের নিশ্চিত পরিণতি। এইভাবে পরিবার থেকে পলায়ন এবং বিবাহ বিচ্ছেদকে পরিবারের ভাঙনের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *