দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর বাংলা থার্ড গ্রেড Teacj Sanjib

 দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর বাংলা থার্ড গ্রেড Teacj Sanjib

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

 দেনা পাওনা উপন্যাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হয়েছে।

দেনা পাওনা উপন্যাসে ষোড়শীর চরিত্র

প্রশ্ন । “দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নায়িকা ষােড়শী শরৎচন্দ্র সৃষ্ট একটি অসাধারণ নারী চরিত্র। ষোড়শীর অসাধারণত্ব কোথায়, চরিত্রটি বিশ্নেষণ প্রসঙ্গে তা বুঝিয়ে দাও।

দেনা-পাওনা-উপন্যাস-প্রশ্ন-উত্তর-বাংলা-থার্ড-গ্রেড-Teacj-Sanjib

 

অথবা, ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নায়িকা ষােড়শী চরিত্র বিশ্লেষণ কর। 

 

উত্তর ঃ শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলি সাধারণভাবে নায়িকা প্রধান। নারী ব্যক্তিত্বের পরিচয় যত বিচিত্রভাবে শরৎ সাহিত্যে প্রকাশ পেয়েছে, অন্য কারাে উপন্যাসে তেমন ভাবে প্রকাশ পায় নি। তুলনামূলকভাবে শরৎ সষ্ট পুরুষ চরিত্রগুলি একঘেয়ে বৈচিত্রহীন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ছন্নছাড়া, উদাসীন—নারীর প্রখর ব্যক্তিত্বের পাশে “লন, ছায়াছন্ন। শরৎচন্দ্র সণ্ট নারী চরিত্রের চিত্রশালায় ষােড়শী নিঃসন্দেহে একটি অপব সংযােজন। তাকে সমদ্ধ করে তুলতে কিছুমাত্র কাপণ্য করেনি ঔপ-ন্যাসিক। রপ-গণ-বুদ্ধি, স্নেহ-প্রেম-করুণা কোনো কিছুরই অভাব নেই তার।

 

এত সব মানসিক গণের অধিকারিণী হলেও ষোড়শী প্রথম থেকেই ভাগ্যবিড়বিতা। প্রথম জীবনে ষােড়শীর নাম ছিল অলকা। বিবাহের পর মাত্র এবশ টাকার লােভে তার স্বামী জীবানন্দ তাকে পরিত্যাগ করে পালায়। এই অলকাই। ঘটনাচক্রে হয়ে ওঠে চণ্ডীগড় গ্রামেরই চণ্ডীর ভৈরবী ষোড়শী। বীজগাঁয়ের জমিদার জীবানন্দের সঙ্গেই তার সংঘাত বাধে। এই সংঘাতের মলে ছিল অবশ্য তার পিতা তারাদাসের কাছ থেকে বলপবক টাকা আদায় করেছিল জীবানন্দ। তারই প্রতিবাদ করতে ষােড়শী একা যায় জমিদারের কাছে। সেই রাত্রেই জীবানন্দ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ষােড়শীকে সে একটি নির্জন ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। পরদিন সকালে রাত্রির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবতিত হয়ে গেছে। যে জীবানন্দ গত রাত্রিতে ষােড়শীকে উত্যক্ত করছিল—সে নিজেই এখন বিপন্ন, এবং ষােড়শীর সাহায্যপ্রাথী। তারাদাসের কথায় ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব এসেছিলেন ষােড়শীকে সারা রাত্রি আটক করে রাখার অপরাধের তদন্ত করতে। ইচ্ছা করলেই ষােড়শী প্রতিশোধ নিতে পারত। কিন্তু তার পরিবর্তে সে বলল সে স্বেচ্ছায় জমিদারের কঠিতে এসেছে এবং স্বেচ্ছায় সেখানে রাত কাটিয়েছে। জমিদার তার ওপর বলপ্রয়ােগ মোটেই করেনি। তারাদাস।

 

এই মিথ্যে বীকারােক্তি ষােড়শীর জীবনে বিপর্যয় নিয়ে এল। শিরােমণি, জনার্দন প্রমুখ গ্রামের যারা মাথা তারা জমিদারের সঙ্গে একত্রিত হয়ে ষােড়শীকে ভৈরবী পদ থেকে অপসারিত করতে চাইল। তারাদাসও তাদের সহায় হল এ ব্যাপারে। তাদের অভিযােগ ষোড়শী কলকিণী। দুঃখে অপমানে জর্জরিত হল যােড়শী। জরাজীর্ণ কটিতে একা রাত কাটাতে হল তাকে। এত দুঃখেও কিন্তু সে ভেঙে পড়েনি। তার শুভাথী যারা—সেই ফকির সাহেব, হৈম, নির্মল, সাগর, হরিহ সকলেই তার আচরণে বিস্মিত হয়েছে। কিছুই সে বলেনি; মুখ বুজে নীরবে সে নিজের সকলে অবিচলিত থেকেছে।

 

প্রকৃতপক্ষে জীবানন্দের সংস্পর্শে প্রথম দিন আসার পর থেকে তার নারীত্বের জাগরণ শুরু হয়েছে। স্বামীর মুখে ‘অলকা’ ডাক তাকে ভেতরে ভেতরে দুবেল ও চঞ্চল করে তুলেছে। বাইরে সে ভৈরবী, সন্ন্যাসিনী—কঠোর কৃচ্ছসাধনে অভ্যস্ত। কিন্ত, ভেতরে ভেতরে সে চিরকালের বাঙালী নারী স্বামী পরিবৃত সংসার—যা কিছুতেই মন থেকে মুছে যাবার নয়। সেই জন্যেই যে মুহূর্তে সে জানাল, জীবানন্দই তার স্বামী; সে একদিন বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল তার সঙ্গে,’সে মুহূর্তে সে তাকে সব-সংস্কার হতে মুক্ত হয়ে বাঁচাবার সংকল্প করল। হৈম নির্মলের দাপত্যজীবনের চিত্র তার সেই সকল্পের অগ্নিতে ইন্ধন যােগাল।

 

ভৈরবী জীবন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে যে ধারণা আছে, যােড়শী তার মূর্তিমতী ব্যতিক্রম। ভৈরবী জীবনের সব রকম কৃচ্ছসাধনার সাধনার অন্তরালে থাকে ভােগলালসাময় উচ্ছৃলতা চারিত্রিক অধঃপতন। জনসাধারণ তাই মন্দিরের ভৈরবীকে বিদ্রুপ মিশ্রিত উপেক্ষার চোখে দেখতে অভ্যস্ত। জমিদারের সঙ্গে জড়িয়ে সর্বেশ্বর শিরােমণি-প্রমুখেরা ঘােড়শীকে সেই জন্যই শাস্তি দিতে উদ্যত হয়েছে। ষােড়শীর একনিষ্ঠ প্রেমের কাছে, চরিত্র গৌরবের কাছে এই সব মিথ্যা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। ষােড়শী বেরিয়ে এসেছে শ্বাসতী নদীর অম্লান মহিমা নিয়ে।

 

ষােড়শী-চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা চমৎকার ফুটে উঠেছে সর্বেশ্বর শিরােমণি পিতা তারাদাস বা জমাদন রায়ের সঙ্গে সংগ্রামের মধ্যে। তার চরিত্রের একটি দিক যেমন কঠোর, অন্য দিকটি তেমনি কোমল। সাগর ও হরিহর তার সেই কোমলতার দিকটির সন্ধান পেয়েছে। জমিদারের অত্যাচারের হাত থেকে তাদের সে বাঁচিয়েছে, নিজের এলাকায় সে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। সেই জন্যেই তাে তারা তাকে মা বলে গেছে। তার বিপদে ছুটে এসেছে ; সব রকম বিঘ্ন-বিপদ থেকে তাকে বাঁচাবার জন্যে জীবন পর্বত পণ করেছে। জমিদার জীবানন্দও তার কোমল হৃদয়ের সন্ধান পেরেছে। এই হতভাগ্য নিরাশ্রয় মানুষকে সে সযত্নে আশ্রয় দিয়েছে। পশমণির স্পর্শে লোহা সােনায় পরিণত হয়। উচ্ছল, মদ্যপ জীবানন্দ মানুষ জীবানন্দে পরিণত হয়েছে বেড়শীর প্রেমের ছোঁয়ায়—এইটি বােধ হয় তার জীবন সাধনায় সবচেয়ে বড়ো সফলতা।

 

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

 

প্রশ্ন ।। দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নায়িকা ষোড়শী চরিত্রটি বিশ্লেষণ কর। নায়ক চরিত্রের উপর তার প্রভাৰ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ কর। 

 

অথবা, শরৎ সাহিত্যে নায়িকার তুলনায় নায়ক চরিত্র অনেকাংশে দল-দেনাপাওনা’ উপন্যাসটির মাধ্যমে মন্তব্য বিচার কর।

 

উত্তরঃ উপন্যাসের নায়ক নায়িকা হচ্ছেন উপন্যাসের মুল, চরিত্র। বিশেষ বিশেষ মানুষের বীরত্ব আর কর্মদক্ষতা চিরকালই আমাদের শ্রদ্ধা আর প্রশংসা আকর্ষণ করে এসেছে। পার্থিব জগতের মতাে আমাদের আত্মিক জগতেও তাদের প্রভাব অনস্বীকার্য। সাধারণ মানুষের মতাে সেই সব সদগুণের অভাব রয়েছে বলেই এসব মানুষদের আমরা আমাদের কাছ থেকে পৃথক করে রাখি ; ‘হিরো’ বলে তাদের সম্মান জানাই। মুলতঃ জীবনের কাহিনী নিয়ে রচিত বলেই নাটক-উপন্যাসেও এই রকম একজন নায়ক বা নায়িকার প্রয়ােজন সমালােচকেরা উপলব্ধি করেছেন। কোন, কোন গুণ থাকলে কোন কোন চরিত্রকে নায়ক বা নায়িকার ভূমিকায় বসানাে যাবে সে বিষয়ে গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টোটল কয়েকটি সংজ্ঞা নির্দেশ করে দিয়েছেন। সেই সংজ্ঞা অনুসারে মােটামুটিভাবে নায়ক হবেন উন্নত চরিত্রের। তার চরিত্রে অনেক গুণের সমাবেশ থাকবে। তিনি হবেন বীরপুরষ, মুল-কাহিনীটির ধারক ও বাহক হবেন তিনিই যাকে কেন্দ্র করে সন্নিবিষ্ট হবে নানান চরিত্র এবং ঘটনা। নায়ক ও নায়িকার ব্যক্তিতত্রবােধের সংগে জগৎ-সংসারের অনিবার্য ঘটনা প্রবাহের যে সংঘাত তারই ফলে সষ্টি হবে কাহিনীর সংঘাত এবং সেই সুঘাতের মাধ্যমেই কাহিনীটি উত্থান আর পতনের ভেতর দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। আরিস্ততলের এই সংজ্ঞা ট্র্যাজিডি নাটকের নায়ক-নায়িকাকে উপলক্ষ্য করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু, উপন্যাসেও আমরা মোটামুটিভাবে নায়কের ওপরে সেই গুণগুলিই আরােপ করেছি, এবং তাদেরই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করেছি উপন্যাসের নায়ককে। কিত, যে যুগে আরিস্ততল ট্র্যাজিডির নায়ক নায়িকার গুণাগুণ বিচার করেছিলেন সে-যুগ থেকে আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি ; বীরত্বের সেই মহীরুপ আদর্শ আমাদের কাছে আজ আর নেই। তাই আধুনিক উপন্যাসে নায়ক নায়িকার এই আভিজাত্যকে অধিকাংশে খর্ব করা হয়েছে। আধুনিক চিন্তাধারা উপন্যাসকে কোনাে বিশেষের কাহিনীর মধ্যে সীমিত রাখতে নারাজ, জনতার কাহিনী তার কাছে বেশী উপভােগ্য আবশ্যকীয় ব্যষ্টির চেয়ে সমষ্টির মল্য তার কাছে অনেক বেশী। আমাদের উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা তাই আজ আমাদেরই মতাে সাধারণ মানুষ, তবে কিছুটা স্বাতন্ত্র্য ; কিন্ত; উপন্যাসের মূল কাহিনীর ধারক ও বাহক তিনিই। মুল কাহিনীটির তারই। এবং তারই পরিণতি দেখানােই হচ্ছে উপন্যাসের নায়ক-নায়িকা হিসাবে চিহ্নিত করা।

 

শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট নায়ক চরিত্রগুলি ভাবপ্রবণ এই রকম মন্তব্য কোনাে কোনাে সমালেচক করে থাকেন। এই মন্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য তারা দেবদাস (দেবদাস), সতীশ (চরিত্রহীন ), সুরেশ ( গহদাহ ), সুরেন্দ্রনাথ ( বড়দিদি) প্রভৃতি চরিত্রগুলিকেই উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু, বজ্রের মতাে পুরুষ চরিত্রগুলিতেই শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে বিকীর্ণ হয়েছে। তার প্রমাণ হচ্ছে বিপ্রদাস ( বিপ্রদাস ), উপীনদা .( চরিত্রহীন ), রমেশ (পল্লীসমাজ), মহিম (গৃহদাহ), শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ ( শ্রীকাত ), সব্যসাচী (পথের দাবী), জীবানন্দ (দেনা-পাওনা) প্রভৃতি নায়ক চরিত্রগুলি। অর্থাৎ নিজের ভাললাগা, মন্দলাগা, নিজেদের নীতিবােধ, উদাসীনতাই তাদের চরিত্রকে কাঠিন্যের ধর্মে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তার বাইরে তাদের টেনে আনা খুবই কষ্টকর। 

  অপরদিকে শরৎচন্দ্রের নায়িকা-চরিত্রগুলি সত্যিকার কোমল এবং সেবা,মায়া আর মমতার প্রতীক তারা। সমাজের চোখে তারা যত অন্যায় করে থাকুক না কেন, ষত দুর্নামই তাদের রটুক না কেন তাদের কোমলতার তুলনা নেই। তাই শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নায়িকার তুলনায় নায়ক চরিত্রগুলি খুবই দুর্বল। যেমন, রাজলক্ষীর পাশে শ্রীকাত, (শ্রীকান্ত); অচলার পাশে সরেশ (গহদাহ); বিজয়ার পাশে নরেন ( দত্তা), ষােড়শীর পাশে জীবানন্দ (দেনা-পাওন), ভারতীর পাশে অপব (পথের দাবী)—এরা সকলেই মনন। অতএব শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলির প্রধান আকর্ষণ হলো নায়িকা চরিত্র চিত্রণে। তাদের মধ্যে শুধু, রােমান্সের মিষ্টতা নেই, রয়েছে জীবনের দুখ-ষত্রণা, জটিলতা, হৃদয় বৃত্তির ঘাত-প্রতিঘাত ইত্যাদি। পুরষ-শাসিত সমাজ শক্তির সঙ্গে ব্যক্তির আত্মচেতনা ও মানবিকতা-বােধের দ্বন্দ্ব সাৰ্থক রপে রূপায়িত হয়েছে আলােচ্য উপন্যাসে নায়িকা ষােড়শীর চরিত্রে। সে দিক থেকে আলােচ্য উপন্যাসের নায়ক জীবানন্দের চরিত্র অনেকাংশে দুর্বল, কেননা উপন্যাসের প্রথমেই তাঁকে আমরা পাই চরিত্রহীনরূপে। 

 এই লাম্পট্য জীবনের একটা জিনিস আমরা স্পষ্ট তাঁর মধ্যে দেখতে পাই অন্যায়, পাপ, চরিত্রহীনতাকে সে কোনাে সময় চাপা দেবার চেষ্টা করেনি-মদের প্রয়ােজনে টাকা সংগ্রহ করতে প্রজাদের ওপর অন্যায় জুলম করতে পিছপা হয়নি—এটা যে অন্যায় এ-বােধটা তাঁর ছিল। নেবার অধিকার কি আমারই আছে।’—জীবানন্দের এই উক্তি থেকে স্পষ্টই বােঝা যাচ্ছে পুর্বের অপকর্মের জন্য তাঁর অনুশােচনা। এই অনুশােচনাই তাঁকে পরবতী জীবনে পরিবর্তিত হতে সাহায্য করেছে। কিন্তু অন্যান্য পুরুষ চরিত্রগুলি যথা—এককড়ি, জনার্দন প্রভৃতিরা এই বােধ থেকে সহস্র যােজন দূরে ছিল। 

 কারণ তারা মনে করতাে এটা পাপই হােক আর পুণ্যই হােক—এটাই তাদের যথার্থ কর্ম। কিন্তু জীবানন্দ এর বিপরীত-নইলে তাঁর অনুশােচনা আসতো না। তা সত্ত্বেও নায়িকা ষােড়শীর মতাে সাহসিকা রমণীর নিকট নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে নায়ক জীবানন্দ। তাই এই উপন্যাসের নায়ক নায়িকার মধ্যে নায়িকা চরিত্র ষােড়শী অন্যতম। চণ্ডীর ভৈরবী হিসাবেই প্রথমেই দেখা যায় ষােড়শীকে। এখানে সকল ঘাত-প্রতিঘাত ও অন্যান্য ঘটনার সম্মুখীন হয়ে এই নারী চরিত্রটি মুল উপন্যাসে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাই ষােড়শীর চরিত্রের তুলনায় জীবানন্দের চরিত্র অনেকটা নিষ্ক্রিয়। ভৈরবী হিসাবে বেশী তথাকথিত ভূমিজ প্রজাদের নিকট মাতৃপদে অভিষিক্তা। অন্যদিকে তার পিতা তারাদাস যে কাপুরষ স্বার্থপর তা ষােড়শী তাকে ভালভাবেই চিনে নিযেছে। তাই ন্যায়পরায়ণতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা ইত্যাদি কমে অসামান্য ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যাড়ণী রুখে দাঁড়িয়েছে।

  সবশেষে ষোড়শীর প্রেমের সংপর্শে জীবনন্দের চরিত্রে দেখা যায় এক অভূতপব পরিবর্তন। এই পরিবর্তনেই ষােড়শী চরিত্রের সার্থকতা। এমন কি হৈমর পিতা জনাদনকে সে বাঁচিয়েছে ভুমিজ প্রজাদের দিয়ে মোকদ্দমা তুলে নিয়ে। এইসব শুভ সক্রিয়তাই নায়িকা ষােড়শীকে নায়ক জীবানন্দ থেকে অনেক পরিমাণে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণ বলে মনে করলে যথার্থ বিচার করা হবে। অতএব দেনা-পাওনা’ উপন্যাসটি নায়িকা প্রধান। নায়িকা ষােড়শী ভৈরবীর ভূমিকায় সমগ্র ক্যহিনীতে যত প্রাধান্য পেয়েছে তা অন্য কোনাে চরিত্র এত স্থান পায় নি। তাই এই নায়িকা চরিত্রটিই কেন্দ্রীয় নর-নারী চরিত্রদের মধ্যে প্রধান ভূমিকায় অবতীর্ণা।

দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে জীবানন্দ ও ষোড়শীর প্রেমকাহিনী

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

 প্রশ্ন ।। দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে জীবানন্দ ও ষোড়শীর প্রেমকাহিনী রােমান্টিক ভাবকল্পনার কিংবা তারণ্যের উচ্ছাসে রঙীন নয়, অভিজ্ঞতার আঘাতে পৰিণত।—এইপ একটি অভিমতের গ্রহণযােগ্যতা বিষয়ে তােমার মতামত লিপিবদ্ধ কর।

 

উত্তর : প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে, তারুণ্যের উচ্ছাসে ষােড়শী ও জীবানন্দের প্রেমকাহিনী রােমান্টিক ভাবকল্পনায় মেতে উঠে নি–মেতে উঠেছে পরিণিত বয়সে। কারণ বালিকা অবস্থায় অলকা আর জীবানন্দের সঙ্গে নিছক খেলার ছলে কলিকাতার মেস-বাড়িতে বিবাহ হয় এক শত টাকার বিনিময়ে। বিবাহের রাত্রিতেই জীবানন্দ যে পুলিশের ভয়ে উধাও হয় ; তারপর দীর্ঘদিন আর তাদের সাক্ষাৎ হয় নি। 

 এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এই বিবাহজীবনের প্রেমের স্বাদ আরােহণ করা আর তরণ বয়সে সম্ভব হয় নি জীবনের উদ্দাম স্রোতে উভয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর দীর্ঘদিন পর জমিদার রপে জীবানন্দের আত্মপ্রকাশ হয় চন্ডীগড়ে—আর সেই চণ্ডীগড়ে এই ষােড়শী যার পূর্বনাম অলকা ছিল সেই ভৈরবীরপে মন্দিরের রক্ষণবেক্ষণে বহাল রয়েছে। সেখানেই জমিদার জীবানন্দের লোকজন তার উচ্ছৃঙ্খল জীবন চরিতার্থ করবার জন্য মন্দিরের ভৈরবী ষােড়শীকে হাজির করা হয় শান্তিকুঞ্জে।

 

শান্তিকুঞ্জে লম্পট জমিদার জীবানন্দের সম্মুখে ষােড়শীকে আনা হলে স্বাভাবিক ভাবেই ভৈরবী অত্যন্ত ভীত সন্ত্রত। কারণ রমণীর দেহ নিয়ে যার বীভৎস লীলা গত বিশ বছর ধরে অবাধে চলেছে, তার দাগটুকু, অবধি এই পাপিষ্ঠ পাষন্ডের স্মরণ নেই। কিন্ত, চণ্ডীর ভৈরবী ষােড়শীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে নারীর এক ভিন্নরপ প্রত্যক্ষ করলেন জীবানন্দ। এই প্রথম জীবানন্দ তাঁর ভােগলালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে বাধা পেলেন। এখানে ষােড়শীর নারী দেহের এক অপূর্ব রুপ তার চোখে ধরা পড়ে। এই রুপ যথার্থ যৌবনের মাদকতা আনে না। 

 এই অনুভতি তার জীবনে একেবারে নটুন, তাই জীবানন্দের অপরিমেয় বিস্ময়বােধ ষোড়শীর নারীরূপের আভিজাত্যের নিকট তিনি বিমুঢ় হয়ে যান। কথা-প্রসঙ্গে এবং ঘটনাচক্রে উভয়েই অবগত হন যােড়শীর পূর্বনাম অলকা—কোন এক অতীতে জীবানন্দের সঙ্গে বালিকা অলকার যে বিবাহ হয় তা মনে রাখার মতাে পুর্ণতা মোটেই লাভ হয় নি তখন। কিন্তু, এই প্রথম সাক্ষাতের পর থেকেই একটা ভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অথবা জীবনন্দের চরিত্রের মধ্যে এমন কিছু, বীজাকারে নিহিত ছিল, যার ফলে তার এই আকস্মিক পরিবর্তন হয়। 

 শুধু তাই নয় জীবানন্দের সংস্পর্শে প্রথম দিন আসার পর থেকেই যােড়শীর নারীত্বের জাগরণ শুরু হয়। স্বামীর মুখে ‘অলকা’ ডাক ষােড়শীকে ভেতরে ভেতরে দুর্বল ও চঞ্চল করে তুলেছে, যার ফলে পরিণত বয়সে উভয়ের রােমান্টিক ভাবকল্পনার অভিজ্ঞতার আঘাতেই পরবতী প্রেমের বন্যা উভয়কে একটা অনুকল অবস্থায় পৌছে দেয়। এখানে ডঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযােগ্য। তিনি বলেছেন, “জীবানন্দের অন্তরে যে প্রণয় প্রবৃত্তি ও ভদ্রজীবন-যাপনের স্পৃহা সুপ্ত ছিল তাহা ষোড়শী-সংসর্গের মায়াদণ্ড-স্পর্শে অকস্মাৎ নবজীবন লাভ করিয়া ফুলে ফলে প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিল।” অতএব বলা যায় উভয়ের প্রেমকাহিনী পরিণত বয়সেরই প্রতিফলন যা তরুণ-বয়সে অসম্ভব ছিল।

 

শ্রীকুমারবাবু আরাে বলেছেন, “নিজ বিবাহিত পরিত্যক্ত স্ত্রী, অধুনা চণ্ডীগড়ের ভৈরবী যােড়শীর সংস্পর্শে অত্যাচারী লম্পট, পাপ-পুণ্যজ্ঞানহীন জমিদার জীবানন্দের পরিবর্তন এই উপন্যাসটির মুল বিষয়।” ঘটনাচক্রে মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ভৈরবী ষােড়শী পূজাপার্বণ কার্যে সর্বদা পুরুষের সংস্রবে যুক্ত থাকার ফলে তার চরিত্র বহুলাংশে পুরুষােচিত গুণেয় লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, বিপদে স্থিরবুদ্ধি, সাহসিকতায়, আত্মনির্ভরশীলতায় কঠোর আবার উহার সাথে রমণীসুলভ কোমলতা মিলেমিশে তার চরিত্রকে এক অপব মাধুর্যে ও গাম্ভীর্যে এক আদর্শবতী মহিলাতে পরিণত হওয়ার দরুণ জীবানন্দকে প্রবল বেগে রােমাঞ্চিত করে তার পাষাণ হৃদয়কে ম্লান করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাকে প্রথম প্রণয়ের স্বাদে আপ্লুত করে রেখেছে। এই প্রেমের পশে জীবানন্দের অকপট অনুতাপ ও সংশােধনের দঢ়তা তার চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। আবার অপরদিকে নির্মল-হৈমর দাম্পত্য জীবন হয়তো ষােড়শীর নবােম্মােষিত স্বামী-প্রেমের প্রণয়াকাক্ষা বেশ কিছুটা আবেশিত করেছিল সত্য, কিন্তু ভৈরবী জীবনের আদর্শ ও সংস্কার তাকে আবার দোলায়িত করেছে। তাই দীর্ঘকাল-বিস্মৃত প্রথম কৈশােরের মুগ্ধ প্রণয়াবেগের স্মারক ‘অলকা’ নামটি তার বিলম্বিত প্রেমের দ্বারটি যেন মন্ত্রবলে উম্মুক্ত হয়ে গেল।

 

পরিশেষে বলা যায় উভয়ের পরিণত বয়সে উভয়েই উভয়ের কোমল হৃদয়ের সন্ধান পাবার পশ্চাতে রয়েছে চণ্ডীগ্রামে জমিদার ও ভৈরবীর জীবনযাপনে সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার আঘাতেই পরিণত বয়সে উভয়ের মিলন সম্ভব হয়েছে। অত্যাচারী লম্পট জমিদার জীবানন্দ এবং ভৈরবী ষােড়শী উভয়ের মিলন পর্ব পরিণত বয়সে নানান সংঘাতের মাধ্যমে প্রেমের দোলায় যে রােমান্টিক ভাবধারায় কথাশিল্পী শরৎবাবু উপস্থাপন করেছেন তা বাস্তবসম্মত হয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। লেখক এখানে সুন্দর বর্ণনার মাধ্যমে ষােড়শীরও সতীত্ব স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। এ তো ষােড়শীর দেহ বর্ণনা নয়—যেন তার পবিত্রতার নিকট জীবানন্দের লম্পট জীবন পরাভূত হলাে—এ অভিনবত্ব জীবানন্দকে মুগ্ধ করেছে। –

 

দেনা পাওনা উপন্যাস দেনাদার ও পাওনাদার কে বা কারা

 

প্রশ্ন ।। দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা কাহিনী অনুসরণে প্রতিপন্ন কর। 

 

অথবা, দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে দেনাই বা কার আর পাওনাই বা কার—এবিষয়ে আলােচনা করে উপন্যাসটির নামকরণের স্বার্থকতা বিচার কর। 

  অথবা, দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নামকরণ কতখানি সার্থক তা কাহিনী অনপরণে দেখাও। 

 

উত্তর : শিশুর মতো, কোনাে রচনা বা কাহিনীর নামকরণ একটি প্রথাসিদ্ধ ব্যাপার ; তফাৎ যেটুক, তা হচ্ছে এই যে শিশুর নামকরণের পেছনে পিতামাতার সুচিন্তিত কোনাে পরিকল্পনা অনেক সময়েই থাকে না; কিন্ত, রচনা বা কাহিনীর নামকরণে লেখকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসাবে স্বীকৃত হলেও, তার পেছনে সব না হােক বহুজন গ্রাহ্য কিছু রীতি বা পদ্ধতি লক্ষণীয়। সেই রীতি অথবা পদ্ধতিগুলােকে আমরা সাধারণত কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি। অনেক সময় দেখা যায় যে চরিত্র অথবা ঘটনার ওপরে লেখক পাঠক-পাঠিকাদের দষ্টি আকর্ষণ করতে চান সেই চরিত্র অথবা ঘটনাকেই তিনি তাঁর গ্রন্থের নাম ভূমিকায় স্থাপন করেন। কোনো রচয়িতা নায়ক বা নায়িকা অথবা নায়ক ও নায়িকার নামে তাঁর রচনার নামকরণ করেন ? যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের চন্দ্রশেখর, সীতারাম; দ্বিজেন্দ্রলালের গাদাস, সাজাহান ; রবীন্দ্রনাথের গােরা; শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত, দেবদাস; সেক্সপীয়রের রােমিয়ে জুলিয়েট, ক্লিয়ােপেট্রা ইত্যাদি। 

 কোথাও কোথাও বিশেষ গুরত্বপূর্ণ ঘটনা বা কাহিনীকেই গ্রন্থের শিরােনামায় স্থান দেওয়া হয় ; মধুসদনের মেঘনাদ বধ, দ্বিজেন্দ্রলালের মেবারপতন, শরৎচন্দ্রের পল্লীসমাজ ; রমেশচন্দ্রের মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত ইত্যাদি। আবার কোথাও কোথাও গ্রন্থের শিরােনাম হিসাবে লেখক কোনাে সঙ্কেত বা প্রতীকের সাহায্য গ্রহণ করে থাকেন। যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ; রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, অচলায়তন; শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ, চরিত্রহীন, পথের দাবি ইত্যাদি। মােট কথা রচনার নামকরণের পুর্ণ স্বাধীনতা লেখকের কিন্ত, যথেচ্ছাচার করার স্বাধীনতা তার নেই। অর্থাৎ, রচনার নামের দিকে পাঠক পাঠিকারা সহজেই আকৃষ্ট হয় বলে তারা যাতে বিভ্রান্ত না হয় সেদিকে রচয়িতার লক্ষ্য থাকা উচিত।

 

শরৎচন্দ্রের বেশীর ভাগ উপন্যাসে দেখা যায় সেখানে বিশেষ কোনাে সমাজের চিত্র নেই—রয়েছে সমগ্র ভাবে ধসে পড়া গ্রাম বাংলার একটি বাস্তব ক্ষয়িষ্ণু  সমাজের চিত্র। সে চিত্রে দেখা গেল ধসে-পড়া গ্রাম বাংলার জীবনে নানা জটিলতা, শাশ্বত রহস্যময় জিজ্ঞাসা, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন দেনা-পাওনা যার প্রভাবে রয়েছে পারস্পরিক আদান-প্রদান ও প্রতিশ্রুতি। এ সব বিচিত্র ও জটিলপণ বাস্তব জীবনকে নিয়েই শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলি রচিত।

 

উপরিউক্ত পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য উপন্যাসের নামকরণের যৌক্তিকতা কতটা তা বিচার করতে গিয়ে প্রথমেই আমাদের চোখের সামনে যা ভেসে উঠে তা হচ্ছে শােষণ আর শাসনের নামে অত্যাচারী, লম্পট, মদ্যপ বীজগাঁয়ের জমিদার জীবানন্দ চৌধুরীর চণ্ডীগড়ে পদার্পণ। তার হুকুম এখানকার প্রাপ্য খাজনা পাঁচ হাজার টাকার পরিবর্তে

দশ হাজার টাকা আদায় করতে হবে। জমিদারের এই অন্যায় পাওনা আদায়ের জন্য চলে জমিদারের গোমস্তা এক কড়ি নন্দীর প্রজাপীড়ন। গেমতার নিবিচার পড়নে অতিষ্ট হয়ে জমিদারের অন্যায় পাওনা মিটিয়ে দেবার জন্য প্রজারা হাজির হয় মহাজন জনাদন রায়ের নিকট। এই লােভী মহাজনের কাছ থেকে প্রজারা ঘটি-বাটি বন্ধক রেখে উচ্চ হারে সুদে টাকা সংগ্রহ করে তথাকথিত অন্যায় দেনা পরিশােধ করে। এটা হলো উপন্যাসের প্রারম্ভিক দেনা-পাওনার কাহিনী—অথাৎ সর্বস্বান্ত ও নিঃব প্রজারা দেনা করে অত্যাচারী জমিদারের অন্যায় পাওনা মেটায়। আলোচ্য উপন্যাসটির নামকরণের প্রাথমিক উদেশ্যের সার্থকতা এখানে।

 

 কিন্ত, এই দেনা-পাওনার একটি মনােগত উদ্দেশ্য রয়েছে এই উপন্যাসে। সেটা হলো জমিদারীতে অভিষেক হওয়ার পবের জীবানন্দ এবং ভৈরবী হওয়ার পর্বের অলকার সম্পর্ক বিষয়ে। কলিকাতার মেসবাড়ীতে অলকার মায়ের কাছ থেকে একশত টাকা পণ নিয়ে জীবানন্দ সকলের অগােচরে অলকাকে বিবাহ করে। তার পরেই নানা প্রবঞ্চনার অজুহাতে জীবানন্দের কারাবাস চলে এক নাগাড়ে বৎসর দুই। এভাবে ঘটনার স্রোতে এই দুই নর-নারী সম্পণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জীবানন্দ ছিলেন অপুত্রক বীজগাঁয়ের জমিদার কালীমোহনবাবুর ভানে। কালীবাবুর মত হলে জীবানন্দ এলেন সেখানকার জমিদার হয়ে। তখন অলকা চণ্ডীগড়ের দেবী চণ্ডীর ভৈরবী ষােড়শীতে রুপান্তরিতা। তব, জীবানন্দের স্ত্রীর মর্যাদা পাবার অধিকার ছিল অলকার। কিন্তু, মদ্যপ-লম্পট, অত্যাচারী প্রজাপীড়ক, নারী লােলুপতা জমিদার জীবানন্দের নানা উচ্ছলতার আবতনে বিবাহিতা অলকাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে আর তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। অতএব জীবনের এই কত ব্য-ভ্রষ্টতাই জীবানন্দকে ঋণী করেছে। এখানে অলকা অথাৎ ঘােড়শী ঋণদাতা এই ঋণের দেনা পরিশােধ করার প্রবৃত্তি জীবানন্দের তখন আর ছিল না। বরং গ্রামের মােড়লদের সাথে এক জোট হয়ে চণ্ডীর ভৈরবী যােড়শীকে অবজ্ঞা করে দেবত্ব সম্পত্তি মাদ্রাজী সাহেবকে বিক্রি করে দেয়। চণ্ডীগড়ের জমিদার জীবানন্দের পদাপণের পরে একটার পর একটা ঘটনায় তাকে পরিবতিত করে নতন জগতের আলো দেখাতে—সেখানে তিনি ভৈরবী ঘোড়ণীকে পেতে চায় অলকা হিসাবে ; কারণ এটা অতিরিক্ত কিছ; নয়—এটা তার ন্যায্য পাওনা বেহেত, তাদের পবে বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু নানান ঘটনার আবতনে বেড়শীকে আর অলকায় ফিরে যাওয়া সম্ভব কি ? অন্তরের এই দেন-পাওনা হৃদয়ের মনােগত ভৰাকে আরো জটিল করে তুলেছে। এটাই দেনা-পাওনা উপন্যাসের শিরোনামের সংকেত ধনি।

 

সবার জীবনের যথার্থ দেনা-পাওনা বােঝা খুবই দুরহ। কে দেনাদার আর কে গণদাতা তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। জীবানন্দ-যােড়শীর জীবনের ক্ষেত্রে এটা নির্ণয় করা বেশ শন্ত। জীবানন্দ দেনাদার ? না যােড়শী ? জীবানন্দ একশত টাকা পণ নিয়ে অলকাকে বিবাহ করে ঘটনাচকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান—সেই বিবাহ সত্রে

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

তখন অলকার যে দাবি বা পাওনা ছিল তা জীবানন্দ মিটিয়ে দিতে সমর্থ হয় নি। এক দিকে বহিঃজগতের এবং অপর দিকে মনােজগতের দেনা-পাওনার এই জটিলপণ সমস্যাই আলােচিত উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে। এই বর্ণিত বিষয়সমূহকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাসের নামকরণ করা হয়েছে দেনা-পাওনা।

 

সবশেষে হৈম নির্মলের মধুর দাম্পত্যজীবনের সুমধুর চিত্রটি যােড়শীর মতো নিষ্ঠাবতী ভৈরবীর সংপর্শে অলকা-সত্তাটি জাগ্রত হয়ে যােড়শীর প্রেম ক্ষুধার্ত হৃদয়ে পরিবর্তন এনে দেয়। পরিণামে যােড়শীর অন্তরে প্রেমের বন্যা প্রবাহিত হয়ে সকল দ্বন্দ্বের অবসান হয়। আবার অপর দিকে গােমস্তা এককড়ি, মহাজন জনার্দন প্রভৃতি দুষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং নিজেকে সকল দোষ থেকে মুক্ত করে যােড়শীর চাহিদা মত ভুমিজ প্রজাদের মঙ্গল কর্মে, মন্দিরের বিবিধ উন্নতিমূলক কর্মে জীবানন্দের আত্মনিয়ােগ উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতির মাধ্যমে দেনা-পাওনার সহজতর সমাধান এই উপন্যাসটিকে উজ্জল করে তুলেছে। 

 অন্তিম অংশে জীবানন্দ একটু, হেসে যােড়শীর হাত ধরে উঠে বলল, “এমন করে আমার সমস্ত ক্ষমতা তুমি কেড়ে নিও না অলকা—আমাকে দুঃখীর কাজে লাগিয়ে দেখাে কখনাে ঠকবে না। এমন আত্মসমর্পণের দ্বারা জীবানন্দ ষোড়শীর সর্বব জয় করে সমস্ত দেনা-পাওনার এরূপ ভাবে মীমাংসা করে নিয়েছিল তা মহত্বেরই পরিচয় বহন করেছে তার চরিত্রটি। উভয়ের এই পরিবর্তন অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য বলে আমাদের মনে হয় না। সাংসারিক জীবনের বিচিত্র জটিল দ্বন্দ্ব ও দেনা-পাওনার সমস্যা শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে যে বাস্তব চিত্রকল্প একেছেন তা উপন্যাসটিকে সজীব করে রেখেছে। এইসব বিচার করলে উপন্যাসটির নামকরণ যে সার্থক হয়েছে সে-বিষয়ে আমাদের মনে কোনাে সন্দেহ নেই। 

 

দেনা পাওনা উপন্যাসে জীবানন্দের চরিত্র

 

– প্রশ্ন )। জীবানন্দের পরিবতন অপ্রত্যাশিত হইলেও অসমঞ্জস্য নহে’শরৎচন্দ্রের দেনা-পাওনা উপন্যাসের জীবানদের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করে এই মন্তব্যের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন কর।

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

= অথবা, “দেনা-পাওনা উপন্যাসের প্রধান পুরুষ চরিত্র জীবানন্দের পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত হইলেও অসমঞ্জস্য নহে।”—মন্তব্যটির আলোকে জীবানন্দ চরিত্র ৰিলেষণ কর। 

 

উত্তর : ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের নায়ক জীবানন্দ চৌধুরী ছিলেন বীজগ্রামের জমিদার কালীমােহন বাবুর ভাগ্নে। অপুত্রক অবস্থায় কালীবাবুর মৃত্যু হলে জীবানন্দ জমিদার হন। জীবানন্দ ছিলেন মদ্যপ, লম্পট, উচ্ছৃংখল প্রকৃতির প্রজাদের কাছে মূর্তিমান অত্যাচার-স্বরূপ। কালীবাবুও মনে মনে বিরক্ত ছিলেন। তার ওপর রাগ করে তাকে ত্যাগ করবার সঙ্কল্পও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হওয়ায় সেই সংকল্প পূর্ণ হতে পারেনি। কুৎসিত প্রবত্তি চরিতার্থতার জন্য তার অর্থের প্রয়োজন। সেই কারণে জীবানন্দের সব সময় অর্থের চাহিদা। এই অর্থসংগ্রহের জন্যে তিনি প্রজাদের ওপর নির্মম অত্যাচার করেছেন; ভােগের জন্য নারী  নির্যাতন করেছেন। এহেন জীবানন্দ চরিত্রটি উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে এসে সম্পূর্ণ চিত্র হয়ে গেছে। বীজগাঁয়ের প্রবল প্রতাপাবিত দুশ্চরিত্র জমিদার তখন জমিদার মিস্ত্রী-মজুরদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শয্যাগত হয়ে পড়েছেন। পুরুষানুক্রমে জমা করা ঋণ শােধের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন তিনি। এবং পরিশেষে যােড়ীর হাত ধরে চলেছেন নতুন জীবনের পথে।

 

উপন্যাসের একটি চরিত্র যখন এইভাবে আমুল পরিবর্তিত হয়ে যায়, প্রথম অংশ ও শেষাংশের মধ্যে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈশাদৃশ্যই বেশী হয়ে ওঠে, তখন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগা একান্ত স্বাভাবিক। সে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা করতে পারে জীবানদের এই পরিবর্তন কি উপন্যাসের শিক্ষাগত ত্রুটির কারণ নয় ? অথবা জীবানন্দের চরিত্রের মধ্যে এমন কিছু কি বীজাকারে নিহিত ছিল, যার দ্বারা তার এক আকস্মিক পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যায় ?

 

ভঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জীবানন্দের এমন পরিবর্তন সম্বন্ধে লিখেছেন জীবানদের অন্তরে যে প্রণয় প্রবৃত্তি ভদ্রজীবন যাপনের স্পৃহা সুপ্ত ছিল, তাহা ষোড়শীর সংসর্গের মায়াদণ্ড স্পর্শে অকস্মাৎ নবজীবন লাভ করিয়া ফুলে ফলে সপ্রস্ফুটিত হইয়া উঠিল।” অর্থাৎ যােড়শীর সংস্পর্শই জীবানন্দের এই পরিবর্তনের মুলভিত। কারণ নারীর সংস্পর্শে পুরুষের চরিত্রের পরিবর্তন কোনাে নতুন কথা নয়। কিন্তু, ছড়াও জীবানন্দ চরিত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আমাদের চোখে পড়ে। যেমন তার মধ্যে কোন ছদ্ম আবরণ নেই। যত অন্যায় কাজই তিনি করুন না কেন, তার কোনাে পাপবোধ নেই। সেই জন্যই তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন অসংকোচ। নিজের কাজের জন্য তিনি বিন্দুমাত্র লজ্জিত নন। গ্রামের অন্যান্য অত্যাচারী ভণ্ড চরিত্র—যেমন শিরোমণি ও জনার্দন রায়ের সঙ্গে তুলনা করলেই জীবানন্দের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

এছাড়া জীবানন্দের অত্যাচারী দুশ্চরিত্র রূপটিই যে শেষ কথা নয়—তার মধ্যে অন্য এক মানুষ যে বরাবর সুপ্ত অবস্থায় ছিল— একথা মনে করার মতো অনেক কারণ আছে। নিজের সম্পর্কে তিনি উদাসীন। অন্যকে বিশ্বাস করতে বা বিশ্বাস করে ওষুধ গ্রহণ তেও তিনি বিধাগ্রস্থ নন। এইসব ছােটখাটো অনেক ঘটনার মধ্যে দিয়ে শবু দেখিয়েছেন জীবানন্দের পরিবর্তনের বীজ তার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত ছিল। সরসীর প্রেমের স্পর্শে সেই সুপ্ত বীজ জাগ্রত হয়ে উঠেছে। কাজেই জীবানন্দের পরিবর্তন যে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, একথা স্বীকার করতে কোনাে দ্বিধা নেই। পরিশেষে ডাঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়েই সুন্দর একটি মন্তব্য দিয়ে এই প্রসঙ্গের উপসংহার টনা যেতে পারে। মন্তব্যটি হল—“সত্যভাষণের পৌরষ ও কপটাচারের প্রতি অবজ্ঞাই তাহার জীবনন্দের চরিত্রের মহত্ত্বের বীজ; প্রেমের স্পর্শে ইহা একটি অকপট অনুতাপ ও সংশােধনে দৃঢ় সংকল্প রূপে আত্মপ্রকাশ করিল। তাহার মনে প্রেমের অলক্ষিত সঞ্চার তাহার পক্ষে একান্ত অভিনব বিধা সংকোচ জড়িত অন্তদ্বন্দ অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত হইয়াছে।”

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

দেনা পাওনা উপন্যাসের ফকির সাহেবের চরিত্র

 

প্রশ্নঃ।। ফকির সাহেব চরিত্রটি উপন্যাস কত উপযোগিতা বিশ্লেষণ করো?

 

উত্তরঃ 

সমাজ জীবনের মতো নাটক উপন্যাসেও সকলেরই কিছু না কিছু ভূমিকা রয়েছে। সমাজের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে তাদেরই যৌথ কর্ম প্রচেষ্টায়। কারও অবদান বেশী যাকে আমরা নায়ক বা নায়িকা বা নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় স্থাপন করে থাকি ; কারও অবদান মাঝারী যাকে আমরা উপকাহিনী বলে থাকি বা আরাে কিছু; চরিত্র থাকে তাদের ভূমিকা প্রথম শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে বা পিছিয়ে দিয়ে থাকে ; আবার কারও অবদান সামান্য, তাদের আমরা অপ্রধান চরিত্রে চিহ্নিত করি, সেজন্য তাদের অবান্তর বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। সমাজের মতাে নাটক-উপন্যাসেও তাদের প্রয়ােজন হয় কাহিনীকে সুসংবদ্ধ গ্রন্থনায় জন্য; সে কারণে তারা নাটক উপন্যাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

 

অপ্রধান দ্বিতীয় চরিত্রটিতে ফকির সাহেবের কথা আলােচনা করা যেতে পারে। তার চরিত্র সম্বন্ধে ডঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যটি প্রণিধানযােগ্যঃ ‘ফকির সাহেবেরও উপন্যাসে বিশেষ কোন সার্থকতা নেই। তিনি বাস্তবতা প্রধান যুগে আদর্শবাদ প্রিয়তার শেষ চিহ্ন স্বরূপই প্রতীয়মান হন।” এই উপন্যাসের কাহিনীর আবর্তনে ফকির সাহেবের কোনাে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই বলে তাকে আমরা অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে রাখতে চাই। প্রথমে তার আবির্ভাব দেখতে পাই উপন্যাসের অস্টম পরিচ্ছেদে মহাজন জনার্দন রায়ের ডাকে ষোড়শী এসে উপস্থিত হয় ফকিরসাহেবকে সঙ্গে নিয়ে।

  জনার্দন-এর দলসহ নির্মল ষােড়শীকে অপদস্ত করতে চাইলে ফকিরসাহেবর তীক্ষ-বুদ্ধির কাছে সকলেই পরাভব মানে। নির্মলও বুঝতে পারে ফকিরটি সাধারণ ভিক্ষুক শ্রেণীর নয়। তাই হৈম স্বামীর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ফকিরসাহেবের আশ্রতে যাবার অনুমতি চায়। ফকিরসাহেব সানন্দে সেই অনুমতি দেন—এর ফলে ফকিরসাহেবের বদান্যতাই প্রকাশ পায়। নবম পরিচ্ছেদে দেখা গেল ফকিরসাহেব যােড়শীর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করছেন—সে স্বহস্তে আর চণ্ডীর পুজা কেন করবে না এবং সেদিন জমিদারকে কেন বাঁচালো? এর জবারে ষােড়শী নিরুত্তর থাকায় ফকিরসাহেবের শ্রদ্ধা, স্নেহ যে তার প্রতি কিছুটা খর্ব হয়েছে এবিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই। তবু কিন্ত, ঘােড়শীর আস্থা চিড় ধরেনি। 

 কারণ বােড়শীর মনে পড়ে যায় ফকিরসাহেবের একটি কথা, মা, যখন আমাকে তােমার যথার্থ প্রযোজন হবে, সত্যই ডাকবে, যেখানেই থাকি আমি তখনই এসে দাঁড়াব।” এ সম্পর্কটা ফকিরসাহেব ও ঘােড়শীর মধ্যে গড়ে উঠেছিল তা অনেক দিনের কথা মন্দিরের দক্ষিণে বড় নিমগাছটার তলায় ফকিরের বাসস্থান ছিল, তখন ষোড়শী খুবই ছােটো মেয়ে, সে-সময় থেকেই ওকে ‘মা’ বলে ফকিরসাহেব ডাকতেন। মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা গন্ধ নেই তা ফকিরসাহেব তার কর্ম-পরিচয়ে দেখিয়েছেন—নইলে নির্মলবাবুর মতাে উকিল স্বেচ্ছায় তার নিকট দেখা করে জানিয়েছেন ফকিরসাহেবের মানবতাবােধ প্রসংসার দাবি করে। 

 শুধু তাই নয় জীবানন্দবাব পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদে এক চিঠিতে ফকিরসাহেবকে, লিখে জানাল তার একান্ত মনের ইচ্ছা। সে চিঠিতে প্রকাশ পায় সােড়শীর ভবিষ্যৎ জীবন যাতে ব্যাহত না হয় তার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করতে, এজন্য যা খরচ হবে তার সবটাই জীবানন্দ দিয়ে দিবে, ফকিরসাহেব যে একদিন আইনব্যবসায়ী ছিলেন, তাও স্মরণ করে দেন।

 

ফকিরসাহেবের সেবাধর্মের মহিমা একদিকে যেমন ব্যারিস্টর নির্মল বসু, এবং অপর দিকে চণ্ডীগড়ের জমিদার উভয়কে আকৃষ্ট করেছিল তেমনি তার বাগ্মিতা ও মানবতাবােধ সকলের হৃদয় জয় করেছিল। সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদে সদরে ফকিরসাহেব ও নির্মলবাবুর কথােপকথনে প্রকাশ পায় যে জমিদার জীবানন্দের শৈবাল দীঘির সম্পত্তি ষােড়শীকে দান করার বিষয়ে উভয়ে উভয়ের প্রতি আস্থা রেখে এগিয়ে গেলেন।

 

  উপরােক্ত ঘটনাবলী থেকে ফকিরসাহেবের উপন্যাসগত চরিত্রটি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকায় অঙ্কিত না হলেও ব্যক্তিগতভাবে ষোড়শীর জীবনে তিনিই ছিলেন একমাত্র ত্রাণকর্তা। ফকিরসাহেবের বুদ্ধি-পরাস্পর্শই যােড়শীর জীবনে এনে দিয়েছে পরম নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। তখনকার সমাজে সমাজপতিদের সঙ্গে পার্থক্য কত বিরাট তা দেখবার জন্যই ফকিরসাহেবের চরিত্রটি অঙ্কিত করেছেন শরৎচন্দ্র নীচতা, হীনতা, কপটতা প্রভৃতি তার চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি, তাই ফকিরসাহেব অপ্রধান চরিত্রে ঘণায়মান হয়েও তিনি যে একজন আদর্শবাদী সন্ন্যাসী সে বিষয়ে কোনাে সন্দেহ নেই।

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসpdf

 

ব্যাখ্যা ৩। ইহার ধর্ম নাই, পণ্য নাই, সকোচ নাই,—এ নির্মম, এ পাষাণ। ( B, U. 97) ইহার মহতের প্রয়োজনের কাছেও কাহারও কোন মূল্য কোন মর্যাদা নাই।

 

উত্তর : আলোচ্য অংশটি অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেনাপাওনা’ উপন্যাসের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে সংগৃহীত হয়েছে। বীজগ্রামের অত্যাচারী জমিদার জীবানন্দের ঘরে প্রথম প্রবেশ করে দেবী চণ্ডীর ভৈরবী ষোড়শীর মনে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, আলােচ্য অংশে তারই পরিচয় মেলে। জীবনন্দের লোক অর্থের জন্য তারাদাসের সন্ধান করছিল। কিন্তু তারাদাসকে না পাওয়ায় ষােড়শীকেই তারা ধরে আনার উপক্রম করছিল। তখন ষােড়শী নিজেই জমিদারের মােকাবিলা করার জন্য এগিয়ে এসেছিল।

 

জমিদারের ঘরটি ছিল অত্যন্ত অগােছালো এবং আবর্জনা পূর্ণ। বন্য পশুর কাঁচা চামড়া ছাদ থেকে ঝােলানো। তার থেকে বিশ্রী দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। সেই পশু—বােধ হয় বন্য শৃগাল, তার রক্ত মেঝেতে পড়েছিল। জমিদার শয্যায় শুয়ে বই পড়ছিলেন। মাথার কাছে একটা মােটা বই-এর ওপর বাতি জালানাে ছিল। সেই বাতির আলোয় ষোড়শী এই সব কিছু কিছু দেখতে পাচ্ছিল। সে আরো দেখল, বিছানার উপর মুল্যবান একটি শাল চাদরের মত করে বিছানো আছে। দামী সােনার ঘড়ির ওপর আধ-পােড়া চুরুট থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে অল্প অল্প। খাটের তলায় একটি রুপাের পাত্রে গত রাত্রের কিছু; উচ্ছিষ্ট সহ হাড়-গোড় পড়ে আছে। তার কাছেই পড়ে আছে জরি পাড়ের ঢাকাই চাদর। সেটি হাত মোছার রমাল বা গামছার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

 

এই সব দেখে যােড়শীর জীবানন্দ সম্বন্ধে এক অদ্ভুত ধারণা হল। তার মনে হল, ঐ লােকটি সমাজ-সংসারের বাইরে ; পথিবীর এক বিচিত্র মানুষ হচ্ছেন তিনি। সাধারণ  মানুষের ধর্ম থাকে, পাপ পুণ্য বোধ থাকে, লজ্জা সঙ্কোচ থাকে। জীবনন্দের সে সব কিছুই নেই। মুহূর্তের প্রয়ােজনটি তার কাছে সবচেয়ে বড়াে প্রয়োজন। সেই প্রয়ােজনটি চরিতার্থ করতে সে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসও অকাতরে ব্যয় করতে প্রস্তুত

 ঘরের মধ্যে ছড়ানো বহু মূল্যবান দ্রব্যাদি মধ্যে তার সাক্ষ্য প্রমাণ মেলে বিচিত্র কুৎসিত পরিবেশে।

 

ব্যাখ্যা ১। পুরুষের ভাগ্যের সীমা যখন দেবতারাও নির্দেশ করিতে পারেন না, তখন হুজুরের নজরে পড়িলে নন্দীমশায়ের অদৃষ্টে ও কেন যে একদিন সদরের নায়েবী পদ মিলিবে না, এমন কথা কেহই জোর করিয়া বলিতে পারে না।

 

উত্তর : আলোচ্য অংশটি শরৎচন্দ্রের রচিত ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ থেকে উদ্ধত হয়েছে। বীজগারের জমিদার জীবানন্দ চণ্ডীগড়ের শান্তিকুঞ্জে এসে দিন কয়েক বাস করবেন। সে উপলক্ষ্যে গােমস্তা এককড়ি নন্দী অণকায়, উৎকণ্ঠায় চিন্তিত। এখানে সেই মানসিক প্রতিক্রিয়ার কথাই আলোচিত হয়েছে। ।

 

জমিদারের অবর্তমানে গােমস্তা, নায়েব প্রভৃতিরা ইংরাজশাসিত পল্লীগ্রামে চিরকালই প্রজাদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে কর আদায় করে জমিদারকে খুশী করত। তার উপর যদি জমিদার নিজে অত্যাচারী হন তবে তো কথা নেই— একেবারে ঘােড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া। এখানে জমিদার মদ্যপ-লম্পট, অত্যাচারী প্রজাপীড়ক, নারী-লােলুপতা প্রভৃতি সমস্ত গুণেই সমদ্ধ। পিয়াদা বিশ্বম্ভর ঠাণ্ডা মাথায় এককড়িকে চুপি চুপি সান্ত্বনা দিয়ে ইঙ্গিত দিলেন মদের বােতল, মাংস এবং আনুষঙ্গিক আরও একটা গােপন বস্তর জোগাড় রাখলেই জমিদারকে খুশী করতে কোনাে বেগ পেতে হবে না।

 

সুতরাং এককড়ি অতীতের অভ্যাসমত হুজুরকে মদ মাংস এবং অন্যান্য গােপন বস্ত, সংগ্রহ করে জমিদারকে সন্তুষ্ট করবার ব্যবস্থা করলেন। এ সবের মূল উদ্দেশ্য নিজের জন্য বেশ কিছু গুছিয়ে রাখা, কারণ সামান্য চণ্ডীপুরের গােমস্তাগিরির অয়ে এককড়ি সন্তুষ্ট নয়, এখন সে আশায় থাকতে চায় যদি হুজুর তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে কৃপা করে সদর গোমস্তার পদটি দিয়ে দেন। এ সম্ভাবনা যে নেই তা বলা যায় না; কারণ পুরুষের দশ দশা, কখনও হাতি কখনও মশা। পরুষের ভাগ্য যে কোনাে সময় পরিবর্তন হতে পারে । আজকের রাজা যেমন কাল ফকির হয়, তেমনি কালকের ফকির আজকার রাজা হওয়া এমন কিছু আশ্চর্য নয়। অতএব এককড়ির চিন্তাধারা যেমন মানবিক দুর্বলতা প্রসত তেমনি তদ্বিরভােগ্য বসুন্ধরা নীতিতে বিশ্বাসী গােমস্তাজাত চরিত্রের সফল চিন্তাধারা। বাস্তবিক পক্ষে পল্লীবাংলার সমাজে গােমস্তা চরিত্র যে রকম দেখা যায় এককড়ি হচ্ছে সে রকম একটি Type চরিত্র তা চরিতার্থ করাই তার প্রধান লক্ষ্য। সুতরাং তার অন্তরের লোভ সদরের গােমস্তাগিরির লোভনীয় পদের প্রতি। এখন তার চিন্তা হচ্ছে জমিদারকে ভেট দিয়ে তাকে খুশী করে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ গুছিয়ে নেওয়া।

 

শরৎচন্দ্রের উপন্যাস দেনা পাওনা

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নঃ

 

ব্যাখ্যা । আমার অনেক গেছে, কত যে গেছে শুনলে তুমি চমকে যাবেকিন্ত, আর আমি লোকসান করতে পারব না। 

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

উত্তর : উপন্যাসের উধতিটি ২৫-পরিচ্ছেদ থেকে গহীত। ষােড়শী ওরফে অলকার সংস্পর্শে আসার পবে বীজগাঁয়ের জমিদার জীবানন্দ এমন কোনাে কুকর্ম করেন নি যার ফলে তাঁকে সমাজ-জীবনে স্থান দেওয়া সম্ভব ছিল না। এক-কথায় বলা যায় তিনি ছিলেন মদ্যপ-লম্পট, অত্যাচারী, প্রজাপীড়ক, নারী লোলুপতা সমস্ত অসৎ গুণে সমৃদ্ধ। এ সকল অসৎ প্রবৃত্তি থাকা সত্বেও কিন্তু অন্তরে তিনি ছিলেন সহজ ও সরল মনােভাবাপন্ন পুরুষ। জমিদার হবার পবে জীবানন্দ বিবাহ করেছিলেন অলকা নামে এক বালিকাকে। বিয়ের রাত্রিতেই তিনি পলাতক হয়ে যান এবং চৌর্য অপরাধে জেল হয়। দীর্ঘ দিন আর উভয়ের সাক্ষাৎ ছিল না। চণ্ডীগড় এসে তিনি উপলবি, করলেন এই ভৈরবীই তার স্ত্রী। তখন থেকেই ফশ্যনদীর মতাে সপ্ত সং প্রবত্তিগুলাে ক্রমশ জাগ্রত হয়ে উঠতে থাকে।

 

এ-প্রসগেই জীবানন্দের সপ্ত স্নেহ ভক্ষ মানবতার পরিচয় যে লুপ্ত হয়ে যায় নি, তা আজও জাগ্রত রয়েছে—তারই অভিব্যক্তি উপরােক্ত বক্তব্যে স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে উঠে। এত দিন যে উচ্ছৃঙ্খলার মাধ্যমে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে তার হিসাব করা যে দুরুহ সে-কথাই জীবানন্দ ষােড়শীকে বলে প্রতিজ্ঞা করছে যে, সে ভবিষ্যতে এরকম লােকসান আর বহন করতে পারবে না। স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে স্ত্রী-পুত্র সম্বলিত সুখের সংসার চায় আর সমাজসেবী হিসাবে সমাজের কল্যাণের জন্য বা অর্থ ব্যয় করা আবশ্যক তার জন্য যা করণীয় জীবানন্দ এখন থেকে সে পথেই অগ্রসর হতে আগ্রহী। লাগামহীন ভােগ লালসার জীবন থেকে তিনি মুক্তি চান। তার প্রমাণ হিসাবে ফকির সাহেবের নিকট জীবানন্দের লিখিত চিঠিই উজ্জল সাক্ষ্য বহন করে। ফকির সাহেবের নিকট লিখিত পত্রে দানের বহর দেখে বিস্ময়ে ষােড়শী জীবনকে প্রশ্ন করেন যে, সমস্ত বিলিয়ে দিয়ে কি এখন তিনি সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যাবেন নাকি ? জীবানন্দ পষ্ট করে জানিয়ে দিল যে, সে সন্ন্যাসী হবে না, সংসারের কিছুই সে নষ্ট করবে না। কেবল মানুষের মতাে মানুষের মধ্যে সে সজীব হয়ে থাকতে চায়। ষোড়শী তখন সভয়ে তাকে স্মরণ করে দেয় যে, সে সন্ন্যাসীনী। এভাবে কথাবার্তার মধ্যে জীবানন্দ ষােড়শীকে বিদায় দিলেন। কিন্তু, সেদিন জীবনন্দের প্রতিশ্রুতিপূর্ণ কথাগুলাের একটা অব্যক্ত সীমাহীন ব্যাকুল ধ্বনি ষোড়শীর কান আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল এ রকম একটা পরিবর্তনের সুচনা দেখে। জীবানন্দের চরিত্রের এই পরিবর্তন অস্বাভাবিক ও অবিশবাস্য বলে আমাদের মনে হয় না।

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

দেনা পাওনা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 

ব্যাখ্যা ।। আপনি নিজে জমিদার, আপনার কাছে মামলা-মকদ্দমার বিবরণ দিতে যাওয়া বাহল্য—শেষ পর্যন্ত হয়ত বা বিষ দিয়েই বিষের চিকিৎসা করতে হবে।

 

 উত্তর : আলােচ্য অংশটি শরৎচন্দ্রের রচিত ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসের সপ্তবিংশতি পরিচ্ছেদ থেকে উধৃত হয়েছে। শান্তিকুঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের পর দেখা গেল চণ্ডীগড়ের সমাজপতিরা দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে গােমস্তা এককড়ি নন্দী, মহাজন জনার্দন রায়, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত শিরােমণি ঠাকর প্রমুখরা, আর তার বিপরীত প্রান্তে রয়েছে সেই মদ্যপ, লম্পট জমিদার জীবানন্দ—সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে সে এখন ভুমিজ প্রজাদের মঙ্গল কর্মে নিয়ােজিত। এ অবস্থায় জনার্দন রায়ের জামাতা এ্যাডভােকেট নির্মল বসু, জরুরী তার পেয়ে এসেছেন শ্বশুরকে বাঁচাতে। এতবড় প্রতাপশালী শ্বসুর নিজের গ্রামের মধ্যেই এতবড় তার দুর্গতি দেখে নির্মল বিস্মিত। যে লােকটিকে সে ঘৃণা করত সেই জমিদারের কাছেই তাকে দরবার করতে হবে বলে সে অতিশয় সঙ্কুচিত। এ রকম একটা মানসিক পরিবেশে নির্মল বসুর সঙ্গে জীবানন্দের সাক্ষাৎ হয় মাঠের মাঝখানে। উভয়ের কথা প্রসঙ্গে নির্মল বসু, জীবানন্দকে উপরােক্ত কথাগুলি বলেছিলেন।

 

নির্মল কথাবার্তায় লক্ষ্য করল জীবানন্দের কথার আচরণে গরিমা নেই, কৃত্রিমতা নেই—যেমনি সহজ, তেমনি খােলা—তাকে সন্দেহ করার কোনাে অবকাশ নেই। বেশ একটা উত্তম পরিবেশে উভয়ের কথাবার্তা চললাে। কথা প্রসঙ্গে জীবানন্দ স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন যে কৃষকদের সাত পুরষের চাষ-আবাদের মাঠ—তাদের ফিরিয়ে দিতেই হবে। এখন তারা আর জুলম সহ্য করবে না—এ অত্যাচার বন্ধ করতেই হবে। আরাে জানিয়ে দিল জনার্দন রায়ের সহযােগিতায় জোর করে ওদের কাছ থেকে যে ছয় হাজার টাকা আদায় হয়েছে—আজ তা আপনার শ্বশুরকেও শােধ করতে হবে।

  এরই উত্তরে নির্মল উপরােক্ত কথাগুলি বলেছিলেন। তার কথায় স্পষ্ট অভাসিত হয় যে তিনি যে, ভাবে উহার মীমাংসা চেয়েছেন যাতে কারও কোনাে শাস্তি ভােগ বা ক্ষতি স্বীকার করতে হবে না। তৎক্ষণাৎ জীবানন্দ সহজ ভাবেই বলে দেন যে এটা সম্ভব নয়। নির্মল এটা উপলদ্ধি করলাে যে তার শ্বশুর অনেক পাকে নিজেকে জড়িয়েছেন যা সহজে মুক্ত করা সহজ নয়। ডাক্তার যেমন অনেক রােগের চিকিৎসা বিষ দিয়ে শরীরের বিষ নষ্ট করে দেন, ঠিক সে সকল ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করলেন নির্মলবাবু : কারণ আত্মরক্ষায় সকলেরই অধিকার আছে, “শ্বশুরমশায়কেও তাই করতে হবে। জীবানন্দ উক্ত বক্তব্য সমর্থন না করলে নির্মলের মুখ রাঙ্গা হয়ে উঠে।

দেনা পাওনা উপন্যাস প্রশ্ন উত্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *