সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আছি পরিষদ এবং অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলােচনা কর।

  সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আছি পরিষদ এবং অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলােচনা কর। 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আছি পরিষদ

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আছি পরিষদ

সম্মিলিত-জাতিপুঞ্জের-আছি-পরিষদ-এবং-অর্থনৈতিক-ও-সামজিক-পরিষদের-গঠন-ক্ষমতা-ও-কার্যাবলী-আলােচনা-কর

 

উত্তর : সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদ বচয়িতাগণ বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলিব মধ্যে সমস্ত রকমের শােষণ, পীড়ন, অসাম্য, বৈষম্যের অবসান ঘটাতে চেয়েছিলেন। এর জন্য প্রয়ােজন ঔপনিবেশিকতার অবসান। কিন্তু বিভিন্ন রাষ্ট্রের অন্তর্গত উপনিবেশ অঞ্চলগুলির মধ্যে অনেকগুলিই তখনও স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত ছিল না। এ ধরনের অঞ্চল গুলিকে স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত করা এবং স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠাৰ উপযােগী করে গড়ে তােলার জন্য কয়েকটি বৃহৎ শক্তির শাসনাধীন রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকেও শােষিত ও অত্যাচারিত না হয়েও যাতে সেই সব অঞ্চলের মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে স্বাধীনতা লাভের যােগ্য হয়ে উঠতে পারে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সেই ব্যবস্থা করবে। আরও বলা হয় যেদিন তারা স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে, সেদিনই তাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থা অছি ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। ক্লড (Claude)-এব মতে, উপনিবেশের অপসারণ, সংশােধন ও রূপান্তরের জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের কৌশলকে অছি ব্যবস্থা বলা হয়।”

 

সনদের ৭নং ধারা অনুযায়ী নিম্নলিখিত তিন ধরনের অঞ্চল অছি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হবে :

 

(১) জাতিসংঘের আমলে ম্যানডেট ব্যবস্থার অধীনস্থ অঞ্চলসমূহ ; (২) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন শরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা অঞ্চলসমূহ এবং (৩) স্বেচ্ছায় যদি কোন রাষ্ট্র কোন অঞ্চলকে অছি পরিষদের অধীনে আনতে চায়।

 

শুরুতে যেসব অঞ্চলকে অছি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল সেগুলি হল : অষ্ট্রেলিয়ার অধীন নিউগিনি ও নাওক, বেলজিয়ামের অধীন রুয়াণ্ডা-উরুণ্ডি, ফ্রান্সের অধীন ক্যামেরুন ও টোগােল্যাণ্ড, ইতালির অধীন সােমালিল্যাণ্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং গ্রেট ব্রিটেনের অধীন দক্ষিণ ক্যামেরুন, টাঙ্গানিকা ইত্যাদি। বর্তমানে একমাত্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ছাড়া অন্যান্য সকল অঞ্চলই স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আছি পরিষদের গঠন :

 

সনদের ৮৬নং ধারা অনুযায়ী জাতিপুঞ্জের নিম্নলিখিত সদস্যদের নিয়ে অছি পরিষদ গঠিত হয় ।

 

(১) যে সব সদস্য অছি অঞ্চল সমূহের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত

 

(২) নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে যারা অছি অঞ্চলের প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত নয় এবং

 

(৩) সাধাৰণ সভা কর্তৃক তিন বছরের জন্য নির্বাচিত সদস্যগণ।

 

বর্তমানে অছি পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৬। অছি পৰিষদের প্রতিটি সদস্যের একটি করে ভােট থাকে। উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদসদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অছি পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলী : 

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অন্যতম প্রধান সংস্থা হলে ও অছি পবিষদ সাধারণ সভার তত্ত্বাবধানে কাজ করে। প্রতিটি অছি এলাকার শাসনব্যবস্থা নিরূপণের জন্য অছি পৰিষদ ও প্রশাসক রাষ্ট্রের মধ্যে যে চুক্তি হয় সাধারণ সভায় তা অনুমােদিত হওয়া দরকার। সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলির ক্ষেত্রে এই তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ওপর। সনদের ৪৭ এবং ৮৮ ধারা অনুযায়ী অছি পরিষদের ক্ষমতাগুলি হল নিম্নরূপ :

 

(১) অছি অঞ্চল সমূহের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ কবলে অছি পরিষদ তা বিচার-বিবেচনা করে দেখতে পারে।

 

(২) অছি নিয়ন্ত্রিত এলাকা সম্পর্কে যে-কোন অভিযােগ গ্রহণ করা এবং সেই অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলােচনা করে তা পরীক্ষা করা।

 

(৩) সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলােচনা করে অছি ভুক্ত এলাকায় পরিদর্শক পাঠাবার ব্যবস্থা করা।

 

(৪) অছি-চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে-কোন প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 

 (৫) অছি-অঞ্চলের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষা সম্পর্কিত অগ্রগতি পরিমাপের জন্য অছি পরিষদ প্রশ্নমালা তৈরী করে অছি এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করতে পারে। এই প্রশ্নমালার ওপর ভিত্তি করে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করে।

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অছি পরিষদের মূল্যায়ন : 

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে ঔপনিবেশিকতাবাদবিরােধী আন্দোলন শুরু হয়, অছি পরিষদের গঠন ও ভূমিকা তার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ । অছি পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে ঔপনিবেশিকতা-বিরােধী ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভানা তৈরী হয়। অছি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে তাে বটেই, অছি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নয় এমন দেশেও অছি পরিষদের কার্যাবলীর প্রভাব পড়েছে। অছি ব্যবস্থার দ্বারা উৎসাহিত হয়েই বিশ্বের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছে।

 

লীগের আমলে যে ম্যাণ্ডেট ব্যবস্থা ছিল অছি ব্যবস্থা তার তুলনায় যথেষ্ট উন্নততর ব্যবস্থা সন্দেহ নেই। কারণ ম্যাণ্ডেট ব্যবস্থায় প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মর্জির ওপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি ছিল। বর্তমান ব্যবস্থায় শাসিত জনসাধারণের আশা-আকাঙ্খ, অভাবঅভিযােগের দিকে নজর দেওয়ার সুযােগ অনেক বেশি। সর্বোপরি, আছি অঞ্চলগুলিকে স্বশাসনের অধিকার দেওয়ার ব্যাপারে আগের তুলনায় অছি ব্যবস্থা অনেক বেশি আন্তবিক।

 

আছি-পরিষদের কার্যাবলী সমালোচনার উর্ধে নয় ।প্রথমত: আছি পরিষদের কার্যাবলী পুরােপুরি রাজনৈতিক বিবেচনা মুক্ত নয় আছি অঞ্চলের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন আবশ্যক অনেক ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব দেখা গেছে। 

 

দ্বিতীয়ত, অছি পরিষদের কার্যাবলী বৃহৎ  শক্তিবর্গের প্ৰভার প্রতিপত্তি থাকতে পারে নি। বস্তুত আছি পরিষদের নিয়ে পালনের ই বুহ এবং ন্যা আকাঙ্খ ও হাথ বারবার প্রতিফলিত হয়েছে

 

তৃতীয়ত, অছি পরিষদের স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সাধারণ সভার অধীনে কাজ করতে হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আছি পরিষদকে সাধারণ সভার চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে দেখা যায় ।

 

চতুর্থত, প্রতিটি সদন যাক্টের বিশেষ অভিন্ন হতে প্রতিনি? হিসাবে প্রদান কথা। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার কেন নষ্ট মাপকাঠি না অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক বিচার বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

 

পঞ্চমত, আছি অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গ পরিচালন ও তদারকির কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে।

 

এইসব সমালোচনা সত্ত্বেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে, আছি পরিষদ যথেষ্ট কৃতিত্বের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করছে । নিকোলাসের ভাষায় হাজার 1946 সালে যাত্রা শুরু করে নিজেও ক্ষমতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আছি পরিষদ যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। আছি ব্যবস্থার অন্তর্গত ১১টি অঞ্চলের মধ্যে ১টি বাদে সব কটি স্বায়ত্তশাসন লাভই  এর সাফল্যের নিদর্শন।

 

 সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলােচনা কর। 

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদ:

 

উত্তর। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ। এই সংস্থাটি গঠনের প্রাক্কালে সনদ রচয়িতাগণ যথার্থভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তুলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। যুদ্ধ সৃষ্টির কারণগুলির বিনাশ সাধন করা একান্ত প্রয়ােজন। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যই হল যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। বস্তুত পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে দুর্বল রেখে আন্তর্জাতিক শান্তির সৌধ রচনা স্থায়ী হতে পারে না। তাই সনদ রচয়িতাগণ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসানের মাধ্যমে যুদ্ধের কারণসমূহকে নির্মূল করে বিশ্বমানবের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন।

 

উদ্দেশ্য ও সনদের ৫৫নং ধারায় বলা হয়েছে, সমানাধিকার এবং স্বায়ত্ত শাসনের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তি ও মৈত্রীর বন্ধন সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ নিম্নলিখিত কার্যাবলী সম্পাদন করবে ?

 

(ক) জীবনযাত্রার মানােন্নয়ন, পূর্ণ জীবিকার সংস্থান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনের উপযােগী শর্তাবলীর সৃষ্টি ;

 

খ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সামাজিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রভৃতি সমস্যার সমাধান এবং সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসার , এবং

 

(গ) বর্ণ, ভাষা, ধর্ম ,স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তা সংরক্ষণের চেষ্টা করবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ।

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদের গঠন :

 

 সনদের 60 নম্বর ধারা অনুযায়ী অথনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ প্রথমে গঠিত হয় 18 জন সদস্য নিয়ে। পরে ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালে দু’বার সনদ সংশোধনের মাধ্যম এর সদস্য সংখ্যা বেডে যথাক্রমে ২৭ এবং ৫s তে দাঁড়ায়। বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সদস্য ঐ একই আছে অর্থাৎ ৫৪। প্রতি তিন বছর অন্তর এই এই সংস্থার এক তৃতীয়াংশ সদস্য পদত্যাগ করেন এবং সমসংখ্যক সদস্য সম্মিলিত তবে সাধারণসভা কর্তৃক নির্বাচিত হন। সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ ৩ বছর। সহ ও সদস্যদের পুননির্বাচনের সুযােগ আছে।

 

অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে প্রতিটি সদসারাষ্ট্র একজন করে প্রতিনিধি পাঠাতে “বে এবং প্রত্যেক সদস্যের একটি করে ভােট থাকে। উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সহ] গরিকের ভােটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থনিতিক ও সামাজিক পরিষদে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের কোন বিশেষ সুযােগ-সুবিধা প্রদান করা হয় নি; তবে পরিষদে যাই পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের দেশ থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। পরিষদ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে থেকে এক বছরের জন্য একজন সভাপতি এবং দু’জন সহ-সভাপতি নির্বাচন করে। হং শক্তির কোন প্রতিনিধি সভাপতি হতে পারেন না। পরিষদের অধিবেশন বছরে দু’বার বসে—এপ্রিল ও জুলাই মাসে। পরিষদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভৌগােলিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশের ১০ জন, এশিয়া মহাদেশের ১১ জন, লাতিন আমেরিকার ১০ জন, পূর্ব ও পশ্চিম ইউরােপের যথাক্রমে ৬ জন এবং ১৩ জন সদস্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে নির্বাচিত হয়ে চলেছে।

জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কার্যাবলী ও ক্ষমতা

 সনদের ৬২ থেকে ৬৬ নং ধারাগুলিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কার্যাবলী ও ক্ষমতা উল্লিখিত হয়েছে। পরিষদের কার্যাবলী মূলত অরাজনৈতিক চরিত্রের। নিম্নে পরিষদের কার্যাবলীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা

 

(১) তথনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও বাস্থ্য বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে এবং সেই বিষয় সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরী করে সাধারণ সভা, জাতিপুঞ্জের সদস্য রাষ্ট্র এবং বিশেষীকৃত সংস্থাসমূহের কাছে সুপারিশ পেশ করতে পারে [৬২ (১) নং ধারা)।

 

(২) পরিষদ মানবিক অধিকার ও স্বাধীনতার মূলনীতিগুলির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে এবং সেগুলি মান্য করার জন্য সকল সদস্য রাষ্ট্রের কাছে সুপারিশ করতে পারে [৬২ (২) ।

(৩) সাধারণ সভার নিকট পেশ করার জন্য পরিষদ নিজ এক্তিয়ারভূক্ত কোন বিষয় সম্পর্কে সভ্য বিবরণী প্রস্তুত করতে পারে [৬২ (৩) নং ধারা]।

 

(৪) পবিসদ নিজ এক্তিয়ারভুক্ত কোন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান করতে ১ ( 5 ) নং বার] ।

(৬) বিশেষ সংস্থাসমূহ, সাধারণ সভা ও মিলিত জাতিপুরে সদস্য রাষ্ট্রগুলির সাথে আলোচনা ও সুপারিশ পেশের মাধ্যমে পরিষদ বিশেষ সংস্থাসমূহের কাজকর্মের সম? সাধন ••রতে পারে | ৬৩ (২) নং ধারা)।

 

(৭) অর্থনৈতিক ও সামাওিক পরিষদ বিশেষ সংস্থাসমূহের কাছ থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন সংগ্রহের জন্য যথাযােগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া সাধারণসভা নিও এওিয়ারভুক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে সব সুপারিশ করেছে, সেইসব সুপারিশ এবং নিজ সুপারিশগুলি কার্যকর করার ব্যবস্থাও করতে পারে পরিষদ [৬৪ (১)}।

 

(৮) সংহতি প্রতিবেদনগুলির ওপর নিজ মন্তব্যসহ পরিষদ সেগুলিকে সাধারণ সভার নিকট পাঠাতে পারে (৬৪ (২)]।

 

(9) তথনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ইচ্ছা করলে নিরাপত্তাসহ পৰিষদকে প্রয়ােজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারে এবং নিরাপত্তা পরিষদ অনুরােধ করলে তাকে সাহায্য করতে পারে [৬৫ নং ধারা]।

 

(১০) নিজ এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়ে সাধারণ সভার কোন সুপারিশ থাকলে তা কার্যকরী করার জন্য পরিষদ প্রয়োজনীয় কার্যাবলী সম্পাদন করবে [৬৬ (১) নং ধারা)। এছাড়া সাধারণ সভার অনুমতিক্রমে পরিষদ জাতিপুঞ্জের সদস্যরা? অথবা বিশেষ সংস্থাসমূহের অনুরোধ মত কার্য সম্পাদন করতে পারে [৬৬ (২) নং ধারা)।

 

(১১) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এবং মানবাধিকার সংরক্ষণ প্রভৃতি কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য প্রয়ােজনীয় বিভিন্ন কমিশন নিয়োগ করতে পারে (৬৮ নং ধারা)।

 

(১২) এ ছাড়া নিজ এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়ে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা জাতীয় সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য পরিষদ প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করতে পারে।

 

সনদ নির্দিষ্ট কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ কতকগুলি কমিশন, কমিটি ও বিশেষজ্ঞ সংস্থা গড়ে তােলে। পরিষদ যেসব কমিশনের সাহায্য গ্রহণ করে থাকে সেগুলি দু’শ্রেণীতে বিভক্ত, যথা (ক) কার্যনির্বাহী কমিশন (Functional Commission) এবং (খ) আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কমিশন (Regional Economic Commission)। মানবধিকার কমিশন, নারী জাতির মর্যাদা সংক্রান্ত কমিশন, সামাজিক উন্নয়ন সংক্রান্ত কমিশন, পরিসংখ্যান কমিশন, জনসংখ্যা কমিশন, মাদক দ্রব্য নিরােধ কমিশন, আন্তর্জাতিক পণ্য কমিশন ইত্যাদি হল প্রথম শ্রেণীর উদাহরণ। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর কমিশনগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল ইউরােপীয় আর্থিক কমিশন, এশিয়া ও দূর প্রাচ্যের আর্থিক কমিশন, লাতিন আমেরিকার আর্থিক কমিশন এবং আফ্রিকার জন্য আর্থিক কমিশন।

 

পরিষদ তার কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য যেসব স্থায়ী কমিটির সাহায্য গ্রহণ করে থাকে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মধ্যস্থতা কমিটি, প্রােগ্রাম কমিটি এবং বেসরকার। সংগঠন সংক্রান্ত কমিটি।

 

সবশেষে কয়েকটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার (Specialised Agency) উল্লেখ করতে হয়। যে ওলির সাহায্যে পরিষদ তার কার্য সম্পাদন করে থাকে, যথা (ক) আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা (ILO), আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (IM), বিশ্ব ব্যাঙ্ক (World Bank), সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিক সংস্থা (UNESCO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ইত্যাদি।

 

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামজিক পরিষদের মূল্যায়ন :

 

ওপরের আলােচনা থেকে অনুমান করা যায় যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কর্মপরিধি বহুবিত এবং গুরত্বপূর্ণ। তবে তত্ত্বগতভাবে পরিষদের ক্ষমতা ও গুরুত্ব ব্যাপক হলেও বাস্তবে তা নয়। এর ক্ষমতা মূলত সুপারিশমূলক। নিজ সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার কোন ক্ষমতা এর নেই। তাছাড়া পরিষদকে সাধারণ সভার অধীনে থেকে কার্য সম্পাদন করতে হয়। তাই অনেকে পরিষদকে সাধারণ সভার একটি সহায়ক সংস্থা (Subsidiary organ) মাত্র বলে মনে করেন। নিকোলাস (H G Nicholas) মন্তব্য করেছে, তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলি বিন্যাসের মধ্যেই পরিষদের কার্য সীমিত থাকে ।

 

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদকে রাজনীতি থেকে মুক্ত বার যে পরিকল্পনা সনদ রচয়িতাদের ছিল, বাস্তবে তা সফল হয় নি। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার, বিশ্বব্যাঙ্ক প্রভৃতি সংস্থাগুলি প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুগামী বাষ্ট্রগুলির স্বার্থরক্ষা করেছে। একই সঙ্গে এইসব অর্থনৈতিক সংস্থা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নকামী দেশগুলির প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করেছে। যেসব গরীব দেশ এইসব মার্কিন-প্রভাবিত সংস্থা থেকে ঋণ সংগ্রহ করেছে, তাদের ওপর এমন সব শর্ত আরােপ করা হয়েছে যে তাদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদ হিসাবে সােভিয়েত ইউনিয়ন সহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশ ঐ দুটি সং স্থার সদস্যপদ গ্রহণ করে নি। ১৯৯১ পরবর্তী সময়ে সােভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক দেশ গুলির বিপর্যয়ের সুযােগ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এইসব সংস্থার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছে।

 

তৃতীয়ত, নিকোলাস (Nicholas)-এর মতে, “বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে এ সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিষদ বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলির (Specialised Agencies) মধ্যে প্রয়ােজনীয় সমন্বয় সাধন করতে পারে নি।”

 

তবে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ বিশ্বের জাতি সমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহযােগিতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে তা কখনই অস্বীকার করা যায় না। মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা’, ‘আন্তর্জাতিক জরুরি শিশুভাণ্ডার’, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা’, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার মাধ্যমে পরিষদ বিশ্বের মানুষকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। শিশু কল্যাণ, মহামারী প্রতিরােধ, উত্তেজক মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, স্ত্রী স্বাধীনতার প্রসার প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিসদ যে অবদান রেখেছেন তা অনস্বীকার্য। আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ গুলিব উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার অদম্য প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে পরিষদ বিশ্বশান্তির আশাদীপকে প্রজ্বলিত করে বছে।

 

সবশেষে একটি কথা মনে রাখতে হবে, যতদিন পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য, অপুষ্টি, অনাহার, অশিক্ষা এসব থেকে মুক্তি না পাচ্ছে ততদিন বিশ্বশান্তির আশা কল্পলােকেই থেকে যাবে। ওয়াল্টার লিপম্যান যথাইহি বলেছেন, “The UN cannot live by peace alone বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে জরুরি প্রয়ােজন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সুস্বাস্থ্য, শিক্ষার প্রসার, যােগাযােগের উন্নতি, বিজ্ঞান প্রযুক্তির প্রসার এবং হস্তম্ভব। এই পরিস্থিতিতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কোন বিকল্প নাই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *