মহাবিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো Teacj Sanjib

 মহাবিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো Teacj Sanjib

মহাবিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল

প্রশ্ন  ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পরোেক্ষ ও প্রত্যক্ষ কারণগুলি উল্লেখ কর। অথবা,

সিপাহী বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল আলােচনা কর।

অথবা,

১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলি পর্যালােচনা করিয়া উহাকে গণ-বিদ্রোহ বলা যায় কিনা বুঝাইয়া দাও।

অথবা,

১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের কি কি কারণ ছিল? এই বিদ্রোহ কি “প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম” বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে? 

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের কারণ

উত্তর। বিদ্রোহের কারণ ঃ ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে যে বিদ্রোহ দেখা দিয়াছিল, তাহার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সমস্ত লেখকগণই স্বীকার করিয়াছেন; কিন্তু এই বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাহারা একমত হইতে পারেন নাই। অধিকাংশ ব্রিটিশ ঐতিহাসিক বা লেখকগণের মতে ইহা ছিল মাত্র সিপাহীদের বিদ্রোহ; কিন্তু অনেক ভারতীয় ঐতিহাসিক ইহাকে ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম জাতীয় সংগ্রাম

মহাবিদ্রোহের-কারণ-ও-ফলাফল-আলোচনা-করো-Teacj-Sanjib

 

বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এ সম্বন্ধে আলােচনা ও পর্যালােচনার আজও অবসান হয় নাই। তবে একথা সকলেই স্বীকার করেন যে, এত বড় একটি  অভ্যুত্থান মাত্র দুই-একটি কারণে সম্ভব হয় নাই; রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মনৈতিক ও সামরিক প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে ইহা সম্ভব হইয়াছিল।

মহাবিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ 

রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন অংশ ইংরাজদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হইযা উঠিয়াছিল। 

(ক) দেশীয় রাজন্যবর্গ নানা কারণে ক্রমেই ব্রিটিশ-বিরােধী মনােভাবাপন্ন হইয়া উঠিতেছিলেন। সর্বশেষে ডালহৌসীর “স্বত্ববিলােপনীতির”  যথেচ্ছ প্রয়ােগে তাহাদের মনে একাধারে আশঙ্কা ও ঘৃণার উদ্রেক প্রয়োগ করিল। দত্তকপুত্র গ্রহণের ভারতীয় প্রথাকে অগ্রাহ্য করিয়া সাতারা, নাগপুর, সম্বলপুর প্রভৃতি রাজ্যকে অধিকার করা; তাঞ্জোর ও কর্ণাট রাজপরিবারের এবং পেশােয়া-পুত্র নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করা—এ সমস্তই বিভিন্ন রাজপরিবারের ভাতা দেশীয় নৃপতিদের বিক্ষুব্ধ করিয়া তুলিয়াছিল। 

(খ) অকৃতজ্ঞতার বন্ধ,  চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া অযােধ্যার নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করা, সিংহাসনচ্যুতি চরম অমানুষিকতার পরিচয় দিয়া নাগপুরের প্রাসাদ ও অযােধ্যার কোষাগার লুণ্ঠন করা—এ সমস্ত যে কেবলমাত্র দেশীয় নৃপতিবর্গকেই আতঙ্কগ্রস্ত করিয়াছিল তাহাই নয়, সমস্ত দেশবাসীর মনকেও বিষাইয়া দিয়াছিল। * ব্রিটিশ  স্বার্থপরতার নগ্নরূপ সমস্ত দেশবাসীর নিকট প্রকাশ হইয়া পড়িল।  

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের শাসনতান্ত্রিক  কারণ

 ব্রিটিশ শাসনের ফলে ভারতে শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রেও বৈষম্য ও অত্যাচার পরিলক্ষিত হয়। একদিকে কোম্পানীর শাসনব্যবস্থায় সমস্ত পরিবারবর্গের দুর্দশা উচ্চপদ ব্রিটিশদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল এবং যােগ্যতা সত্ত্বেও ভারতবাসীর উচ্চপদে নিয়ােগের কোন সম্ভাবনা ছিল না।

 খ) এদিকে ইংরাজদের অত্যাচারে বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের কর্মচারীরা ক্ষমতাচ্যুত হইলেন এবং জীবিকাহীন হইয়া পড়িলেন। উত্তরপ্রদেশে বিশেষত অযােধ্যায় অনেক পদচ্যুত কর্মচারী বিদ্রোহে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। 

(গ) অযােধ্যা অধিকার করিয়া ইংরাজরা যে  নূতন রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করে, তাহাতে তালুকদারশ্রেণী ও তাহাদের অসংখ্য অনুচরবর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও তাহারা ইংরাজদের উপর বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠে। 

(ঘ) ইংরাজ প্রবর্তিত নূতন  বিচারব্যবস্থা পূর্বের চাইতে উন্নত হইলেও তাহা অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ ছিল;

 (ঙ) ইংরাজ রাজপুরুষদের উদ্ধত আচরণ ও অত্যাচার সর্বত্র ব্রিটিশ রাজত্ব সম্বন্ধে বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা ও বিক্ষোভ বৃদ্ধি করিয়া বিদ্রোহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিল।

মহাবিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ

 আধুনিক গবেষণার ফলে ঐতিহাসিকগণ বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণসমূহের উপরও যথেষ্ট গুরুত্ব আরােপ করিতেছেন।

 (১) ১৮৫৭ সালের পূর্বে একশত বৎসরে ইংরাজগণ এইদেশ হইতে যে পরিমাণ সােনা, রূপা প্রভৃতি মূল্যবান ধাতু লইয়া গিয়াছিল,তাহাতে এদেশের জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই শােচনীয় হইয়া উঠিতেছিল। 

(২) ইংল্যাণ্ডের শিল্প-বিপ্লবের (Industrial Revolution) প্রয়ােজনে এই দেশকে কঁাচামাল সরবরাহকারী এবং শিল্পজাত দ্রব্য আমদানিকারী রূপে পরিণত করা হইয়াছিল; এই দেশের শিল্পসমূহ ধ্বংস হওয়ার ফলে দেশবাসী আরও দরিদ্র হইয়া পড়িল। 

(৩) ইংরাজ আমলে নূতন ভূমিরাজস্ব নির্ধারিত হওয়ার ফলে অনেক স্থানের পুরাতন  জমিদারবর্গ এমনকি চাষীসম্প্রদায়ও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল  এবং নূতন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ছিল। 

(৪) চৌকিদারী করবৃদ্ধি, পথকর স্থাপন প্রভৃতি আরও বহু প্রকারের নূতন করভারে জনসাধারণের জীবন ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দে বিদ্রোহের সময় সম্রাট বাহাদুর শাহ্ যে বিখ্যাত ঘােষণা প্রচার করেন, তাহাতেও জনসাধারণের এই অর্থনৈতিক অবনতির দেশীয় ভাষায় পারদর্শীদের কথা স্পষ্টভাষায় উল্লিখিত হইয়াছে। 

(৫) ইংরাজী ভাষার অবস্থা; সিপাহীদের দারিদ্র্য প্রাধান্যের ফলে দেশীয় ভাষায় জ্ঞানীগুণীদের জীবিকা অর্জনের পথ প্রায় রুদ্ধ হইয়া আসিয়াছিল।

 (৬) ভারতীয় ও ইংরাজ সৈনিকদের মধ্যেও অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্য বজায় ছিল। বেতনাদির মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। এই অর্থনৈতিক দুর্দশাও সিপাহীদিগকে বহুদিন হইতে অসন্তুষ্ট করিয়া রাখিয়াছিল।

মহাবিদ্রোহের সামাজিক কারণ

 সামাজিক : কতকগুলি সামাজিক কারণেও ভারতবাসীর মনে অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হইয়া উঠিয়াছিল।

 (ক) বিজিত ভারতবাসীর প্রতি বিজেতা ব্রিটিশ শাসকবর্গ যে বৈষম্যমূলক ব্যবহার করিত, তাহাতে বিদ্রোহের অনুকূল অবস্থাই সৃষ্টি হইয়াছিল। ইংরাজগণ কর্তৃক বৈষম্যমূলক ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দে রচিত তথ্যসমৃদ্ধ ‘সিয়ার-উল-মুতাখরিন’ নামক গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, ব্রিটিশ শাসকদল এদেশের লােককে ঘৃণা করিত, তাহাদের সংস্পর্শ এড়াইয়া চলিত। 

(খ) ইংরাজদের মধ্যে যাহারা এই দেশের লােকের সংস্রবে আসিত, তাহাদের ব্যক্তিগত চরিত্র ও ব্যভিচার ইংরাজ জাতিকেই এদেশবাসীর চোখে কলঙ্কিত করিয়া তুলিয়াছিল। 

(গ) এইজন্যই ইংরাজদের ইংরাজ জাতি সম্বন্ধে উন্নয়নমূলক কাজগুলিকেও এদেশবাসী দুরভিসন্ধিমূলক বলিয়া ভারতবাসীর ধারণা মনে করিয়াছে; ‘সতীদাহ’-প্রথা নিবারণের ন্যায় হিতকর কার্যকে তাহারা ধর্মে হস্তক্ষেপ মনে করিয়া শঙ্কিত হইয়াছে; রেলপথবিস্তার, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার প্রচলন প্রভৃতি কল্যাণকর হইলেও এদেশবাসী তাহাকে পরাধীনতার নাগপাশ ও ইংরাজদের শক্তিবৃদ্ধির ষড়যন্ত্র বলিয়া ধরিয়া লইয়াছে। এই সকল কারণে ইংরাজদের সহিত ভারতবাসীর বিচ্ছেদ ক্রমেই বর্ধিত হইয়া উঠে।

মহাবিদ্রোহের ধর্মনৈতিক কারণ

ধর্মনৈতিক ঃ (ক) ইংরাজদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে এই দেশে আসিয়াছিল খ্রীষ্টীয় মিশনারীবৃন্দ; তাহারা প্রকাশ্যভাবে ধর্ম প্রচার করিয়া হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। জেলখানায় কয়েদীদের নিকট তাহাদের  যাতায়াত ছিল অবাধ; সিপাহীদের নিকট তাহাদের ধর্মপ্রচারের ব্যবস্থা ছিল নিয়মমত। স্বভাবতঃই হিন্দু-মুসলমান সকলেই ইংরাজ শাসকদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া উঠিল। 

(খ) এই অবস্থায় সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা-বিবাহ আইন প্রভৃতি সংস্কারমূলক কার্যকেও তাহারা  ধর্মান্তরিত করিবার কতকগুলি অভিসন্ধি বলিয়া মনে করিতে লাগিল। ধর্মান্তরিত ব্যক্তির পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার প্রদান, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন, সিপাহীদের সমুদ্রপথে যাত্রার আদেশ প্রভৃতি এই দেশবাসীর ধর্মভাবকে আঘাত করিয়া তাহাদের ইংরাজ-বিরােধী করিয়া তুলিয়াছিল। এইরূপ মনােভাবের জন্য ভেলােরের সিপাহীগণ চামড়ার টুপি পরিধান এবং দাড়ি  কামাইবার আদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছিল, এবং মুসলমানদের মধ্যে ওয়াহাবি’ (Wahabi) আন্দোলনের উৎপত্তি হইয়াছিল।

মহাবিদ্রোহের সামরিক কারণ

 সামরিক : ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়াছিল সেনাবাহিনীতে। সেনাবাহিনীর অসন্তোষই এই বিদ্রোহের সূত্রপাত করিয়াছিল।

 (১) ইওরােপীয়দের তুলনায় ভারতীয় সিপাহীরা বেতন পাইত কম; এই বৈষম্যমূলক ব্যবহার ইংরাজ ও ভারতীয় সৈনিকদের । তাহাদিগকে ইংরাজদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভাবাপন্ন করিয়া মধ্যে বৈষম্য তুলিয়াছিল। 

(২) সামরিক কারণে দূরদেশে অবস্থানকালে কেবলমাত্র ইংরাজ সৈনিকগণই ভাতা পাইবার অধিকারী ছিল। 

(৩) অভিজ্ঞ ভারতীয় সামরিক কর্মচারীদের বদলে অনভিজ্ঞ ইংরাজ কর্মচারীবৃন্দই পদোন্নতি লাভ করিত। ইহার ফলে একদিকে যেমন ভারতীয় সিপাহীগণ অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল, অপরদিকে সেনাবাহিনীর অবনতি তেমন অনভিজ্ঞ ইংরাজ কর্মচারীদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর উৎকর্ষতা হ্রাস পাইতেছিল,

 (৪) তদুপরি ইংরাজ সামরিক উদ্ধত ও অপমানজনক ব্যবহার কর্মচারীদের ব্যবহার ক্রমেই উদ্ধত, অপমানজনক হইয়া উঠিয়াছিল। শুয়ার’ প্রভৃতি গালাগালি দেওয়া তাহাদের রেওয়াজ হইয়া দাড়াইয়াছিল এবং ইহার বিরুদ্ধে অভিযােগ করিয়া কোন প্রতিকার পাওয়া যাইত না। 

(৫) এইরূপভাবে যখন ভারতীয় সিপাহীরা ইংরাজদের প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা হারাইতেছিল,  তখন ভারতীয় সিপাহীরা উপলব্ধি করিল যে তাহারাই সংখ্যায়  অধিক, এবং শুনিলযে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ইংরাজ সৈনিকগণ পরাজয় বরণ করিতেছে সুতরাং ইংরাজদের বিতাড়িত করা যে মােটেই কষ্টসাধ্য নয়, এ বিশ্বাস তাহাদের মনে বদ্ধমূল হইয়া উঠিল।

মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ:

 উল্লিখিত কারণগুলিতে কোম্পানীর সিপাহীরা বেশ কিছুদিন পূর্ব হইতেই বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিতেছিল এবং ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ মােটেই আকস্মিক ছিল না। ১৮০৬  খ্রীষ্টাব্দে ভেলােরে সিপাহীদের একটি বিদ্রোহ দেখা দিয়াছিল; অমানুষিক অত্যাচারের মাধ্যমে তাহা দমন করিয়া দেওয়া হয়। ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতার নিকটস্থ ব্যারাকপুরে সিপাহীরা ব্ৰহ্মদেশে যাত্রার আদেশের প্রতিবাদে বিদ্রোহ করে; বহুলােককে হত্যা করিয়া এই বিদ্রোহকে নিশ্চিহ্ন করা হয়। আরও কয়েক স্থানে এরপরও বিচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্রোহ দেখা দিয়াছিল।  ইংরাজরা ঐ সকল বিদ্রোহ দমন করিতে সক্ষম হইলেও কিন্তু বিক্ষোভ অন্তরে অন্তরে সুপ্ত বহ্নির মত জ্বলিতে থাকে এবং ১৮৫৭ সালে তাহা দাবিগ্নির মত সমগ্র দেশে জ্বলিয়া উঠে।

১৮৫৬ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার এনফিল্ড রাইফেল (Enfield Rifle) চালু করে, যাহার কার্তুজ দাতে কাটিয়া বন্দুকে পুরিতে হইত। সিপাহীরা শুনিল গরু ও শুকরের চর্বি-মিশ্রিত এই সমস্ত কার্তুজ হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মনাশের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ঘটনা অগ্নিতে যেন ঘৃতাহুতির মত কাজ করিল। ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের  নেতৃত্বে সিপাহীরা বিদ্রোহী হইলে ইংরাজগণ পাণ্ডেকে মৃত্যুদণ্ড দিয়া এবং রেজিমেন্ট ভাঙ্গিয়া দিয়া এই বিদ্রোহকে চাপা দিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু শীঘ্রই উহা সমস্ত দেশে ছড়াইয়া পড়িল। সুতরাং দেখা যায় বিভিন্ন কারণে ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহ সংগঠিত হইয়াছিল। সিপাহীরা এই আন্দোলনের সূচনা করিয়াছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলে উহা এক ব্যাপক গণ-বিদ্রোহের স্তরে উন্নীত হইয়াছিল।

মহাবিদ্রোহের বিদ্রোহ এবং তাহার ব্যর্থতা : 

১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৯শে মার্চ ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে সিপাহীদের বিদ্রোহ দেখা দিলে, ইংরাজ শাসকবর্গ র্তাহাকে  মৃত্যুদন্ড দিয়া এবং তাহার রেজিমেন্ট ভাঙ্গিয়া দিয়া বিদ্রোহকে দাবাইবার প্রয়াস পাইল। কিন্তু ব্যারাকপুরে উহার আর প্রকাশ না দেখা গেলেও ১০ই মে মীরাটে উহাতীব্রভাবে দেখা দিল। দিল্লীতে  শীঘ্রই তাহা বিস্তারলাভ করিল (১৮৫৭ খ্রীঃ) এবং বিদ্রোহীগণ বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট বলিয়া ঘােষণা করিল। বিদ্রোহ ক্রমে ক্রমে গাঙ্গেয় প্রদেশসমূহ ও মধ্য-ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তারলাভ করিল। অনেক স্থলে বিশেষ করিয়া অযােধ্যা ও উত্তরপ্রদেশে জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে সিপাহীদের সহিত যােগদান করাতে উহা তীব্র আকার ধারণ করিল।* কানপুরে নানা সাহেব, কঁসিতে ঝাসির বানী, বিহারের অন্তর্গত জগদীশপুরের কুনওয়ার সিংহ প্রমুখ এই বিদ্রোহে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। যথেষ্ট অসন্তোষ বর্তমান থাকিলেও সাধারণত পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায়, পাঞ্জাবের একাংশে এবং নর্মদা নদীর দক্ষিণাঞ্চলে এই বিদ্রোহ দেখা দেয় নাই।

 প্রথম দিকে ইংরাজ পক্ষের কয়েকটি স্থানে পরাজয় হইলেও, তাহারা শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহকে দমন করিতে সক্ষম হইল। ব্রিটিশ মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম দিল্লীর উপর ব্রিটিশ সৈন্য প্রতিরােধ শুরু করে। চারমাস অবরুদ্ধ থাকিবার পর স্যার জন লরেন্সের প্রচেষ্টায় দিল্লী অধিকৃত হইল। মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ্ ব্রিটিশ পক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। বাহাদুর শহর পরাজয় বিদ্রোহের ব্যর্থতার পথ উন্মুক্ত করিল। সুদক্ষ ইংরাজ সেনাপতি ও সৈন্যবাহিনীর তৎপরতায় এবং শিখ, নেপালী ও দেশীয় রাজন্যবর্গের সাহায্যে এই বিহ দমন করা তাহাদের পক্ষে সম্ভব হইয়াছিল। নৃশংস অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়া এই বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি হইল।

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ:

প্রশ্ন  ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি বিশ্লেষণ কর।

অথবা, কি কি কারণে ১৮৫৭র বিদ্রোহ বিফল হইয়াছিল ? অথবা,

১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ নির্ণয় কর। একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা স, বলা যায় কি?

উত্ত। ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহ ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক সশস্ত্র এরপ অভিনন্দিত হইয়াছে। যদিও এই বিদ্রোহ উত্তর-ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গং-সংগ্রামের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এক বৎসরের মধ্যেই এই বিদ্রোহ ব; পর্বসিত হয়।

এই বদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি ছিল একাধিক এবং ইহার বিফলতা ছিল অবশ্যম্ভাবী।  তাই সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে বিদ্রোহ গতিহীন হইয়া পড়িয়াছিল (2) বিদ্রোহ উর-ভারতের কয়েকটি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল; নর্মদা নদীর দক্ষিণাঞ্চলে সিন্ধুদেশ, রাজপুতানা, পাঞ্জাব ও বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে এই বিদ্রোহ দেখা দেয় নাই। সঙ্কটের সময় ইংরাজগণ এই সমস্ত অঞ্চলকে ভিত্তি করিয়া তাহাদের অভিযানসমূহ পরিচালিত করিতে পারিয়াছিল।

 (৩) সাধারণভাবে দেশীয় নৃপতিগণ এই বিদ্রোহে যােগদান করেন নাই; গােয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, কাশ্মীরের মহারাজা, হায়দ্রাবাদের মন্ত্রী, যােধপুরের রাজা প্রমুখ শক্তিশালী নৃপতিগণ জাপাকে অকুণ্ঠ সাহায্য দান করিয়াছে। বর্ধমানের মহারাজার মত ধনী জমিদারগণও ইংরাজদের পক্ষে অবিচলিত ছিল।

(৪) কিন্তু এসব সত্বেও বিদ্রোহ জয়যুক্ত হইতে  পারিত যদি তাহাদের মধ্যে সংহতি থাকিত; যদি তাহারা এক নীতি  ও কর্মপন্থা অনুসরণ করিতে পারিত। বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্রোহীদের  মধ্যে স্বার্থ ও লক্ষ্যের ঐক্য ছিল না; বিদ্রোহীদের এক অংশ মারাঠা প্রাধান্যপুনঃস্থাপনের জন্য সচেষ্ট ছিল, অপর অংশ বাহাদুর শাহের মাধ্যমে মােগল-সাম্রাজ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠার আশা পােষণ করিত।

(৫) নেতৃবর্গ নিজ-নিজ এলাকায় সুযােগ্য নেতৃত্বের পরিচয় দিলেও সর্বভারতীয় নেতৃত্বের অভাব সর্বভারতীয় বিদ্রোহের ব্যাপক পরিচালনার নেতৃত্ব কেহই দিতে পারেন নাই; এই দিক দিয়া সুযােগ্য নেতৃত্বের অভাবে বিদ্রোহগুলি বিচ্ছিন্নভাবেই ধ্বংস হইয়াছিল। 

(৬) ভারতীয় অভিজাত শ্রেণীর ভূমিকা বিদ্রোহের ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণ ছিল। যদিও নানা সাহেব, ঝাসীর রানী প্রমুখ সামন্ত নেতারা বীর বিক্রমে সংগ্রামে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ সামন্ত প্রভুই ব্রিটিশের পক্ষ অবলম্বন করেন। ই. এম. এস. নাম্বুদ্রিপাদ মনে করেন এই শ্রেণীর বিরােধীতাই ১৮৫৭র বিদ্রোহের প্রধান দুর্বলতা ছিল। 

 (৭) এই বিদ্রোহ ধ্বংস করিতে ইংরাজগণ শিখ, গােখা, রাজপুত প্রভৃতি দুর্ধর্ষসামরিক জাতিগুলির অকুণ্ঠ সাহায্য পাইয়াছিল।

 (৮) এদেশের নবীন মধ্যবিত্তশ্রেণী এই বিদ্রোহে সক্রিয় সমর্থন জানায়  নাই। সুতরাং নূতন নেতৃত্বের অভাব এই বিদ্রোহকে শক্তিহীন করিয়া ফেলিয়াছিল।

 (৯) ইংরাজ সেনাপতিগণ ছিলেন দক্ষ ও সমরকুশলী। লরেন্স, আউটরাম, হিউরােজ, নীল ও হ্যাভলকের ন্যায় রণনৈপুণ্য সম্পন্ন সেনাপতিগণ সহজেই বিদ্রোহীদের প্রতিরােধ চূর্ণ করিতে সমর্থ হইল। বিদ্রোহের সময় ইংরাজী শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর নির্লিপ্ত মনােভাব ইংরাজ শাসকদের প্রশংসা অর্জন করে। ১৮৫৮ খ্রষ্টাব্দে ব্রিটিশ সংসদে বলা হয় “এই সংকটকালে প্রথম হইতে ইংরাজপক্ষে সুদক্ষ সেনাপতি, শেষ পর্যন্ত তাহারা (মধ্যবিত্তশ্রেণী) ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিকট  বিশ্বস্ত ও আনুগত্যের যথেষ্ট প্রমাণ দিয়াছে।” ইংরাজপক্ষে কেবল যে সুদক্ষ সেনাপতির অভাব ঘটে নাই তাহাই নয়, তাহাদের সামরিক অস্ত্রসস্ত্র ছিল আধুনিক এবং গােলাবারুদ ছিল প্রচুর। 

(১০) রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রভৃতির সুযােগ লাভ করিয়া ইংরাজগণ অনেক স্থলেই বিদ্রোহীদের উপর অপ্রত্যাশিত আঘাত হানিতে পারিয়াছিল। ব্রিটিশের নৌবাহিনী সুবিধা গ্রহণ তাহাদিগকে নিকটবর্তী ঘাটি হইতে সৈন্যবাহিনী ও যুদ্ধের সামগ্রী সরবরাহে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছিল। 

 (১১) আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিও ব্রিটিশের অনুকূলে ছিল। এই সময় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও ইঙ্গ-চীন যুদ্ধে ব্রিটিশের জয়লাভ ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর মনে আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহ সঞ্চার করিয়াছিল। ইহা ভিন্ন, ব্রিটিশ সরকার পারস্যকে যুদ্ধে পরাজিত করায় ও আফগান সরকারের সঙ্গে অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ায় ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়।

 (১২) সিপাহীরা অনেকক্ষেত্রে অদূরদশী নেতৃত্বের পরিচালনায় বেপরােয়া হইয়া লুণ্ঠন ও নৃশংস অত্যাচারের পন্থা গ্রহণ করিয়াছিল। ইহাতে জনসাধারণের সমর্থন হারাইয়া তাহারা ক্রমেই দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। উল্লিখিত কারণগুলির জন্য বিদ্রোহী সিপাহীগণ যথেষ্ট বীরত্ব সহকারে সংগ্রাম করিয়াও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হইয়াছিল।

মহাবিদ্রোহের ফলাফল

 প্রশ্ন । ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের মহাবিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব উল্লেখ কর।

অথবা,

১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহের ফলে ভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে ও ব্রিটিশ শাসকদের মনােভাবে কি কি পরিবর্তন দেখা যায়?

উত্তর। বিদ্রোহের ফলাফল ঃ ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের অভ্যুত্থান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছিল। ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাসের মধ্যেই সিপাহীদের সংগঠিত প্রতিরােধের অবসান হইয়া গিয়াছিল। বিদ্রোহ বিফল হইলেও তাহার ফলাফল যে সুদূরপ্রসারী হইয়াছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। এই ব্যর্থতার মধ্য দিয়া ইহাই প্রমাণিত হইল যে, বিদ্রোহের ব্যর্থতা ও তাহার অর্থ ভারতবাসিগণ বহু দিক দিয়া ইওরােপীয় জাতিসমূহ হইতে পশ্চাদপদ এবং তাহারই শাস্তিস্বরূপ তাহাদিগকে আরও দীর্ঘদিন পরাধীনতার জ্বালা সহ্য করিতে হইবে।

 (১) এই বিদ্রোহের ফলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গ্রহণ শাসনের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছিল। ভারতবর্ষে এই বিপুলায়তন সাম্রাজ্যের শাসনভার একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের হাতে ছাড়িয়া রাখা আর যুক্তিযুক্ত হইবে না মনে করিয়া ব্রিটিশ শাসকবৃন্দ উহা ব্রিটিশ সরকারের হাতে তুলিয়া লইলেন। পার্লামেন্টে এক আইন পাস করিয়া ভাইস’: কানিংহামের মত ভারতের শাসনভার একজন সেক্রেটারী এবং পনের জন সদস্য লইয়া গঠিত একটি কাউন্সিলের হস্তে অর্পণ করা হইল। 

(২) ব্রিটিশ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে ভারতের গভর্নর-জেনারেলগণ এখন ‘ভাইসরয়’ (Viceroy) বা রাজপ্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করিলেন। কানিংহাম (Cunningham) প্রমুখ কোন ঐতিহাসিকের মতে এই পরিবর্তন আনুষ্ঠানিক মাত্র। কারণ ‘পিটের ইণ্ডিয়া এ্যাক্ট (Pitt’s India Act, 1784) পাস হওয়ার পর হইতে বিভিন্ন ‘চাটার এ্যাক্টের মাধ্যমে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর ডাইরেক্টরসভার ক্ষমতা ও দায়িত্ব বহুক্ষেত্রে হ্রাস করিয়া দেওয়া হইয়াছিল।

 

ভারতবাসীর মন হইতে অশান্তি দূর করিবার উদ্দেশ্যে মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঘােষণাপত্র প্রচারিত হইল। 

(৩) দেশীয় নৃপতিদের মনে ইংরাজদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে যে সন্দেহের সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা দূর করিবার জন্য এই ঘােষণা দ্বারা ভিক্টোরিয়ার ঘােষণাপত্র : স্বত্ববিলােপ-নীতি’ পরিত্যাগ করা হইল, ব্রিটিশ সরকার স্বত্ববিলােপনীতি ভারতবর্ষে আর রাজ্যবিস্তার করিবে না বলিয়া প্রচার করা হইল। 

(৪) এই ঘােষণায় আরও বলা হইল যে, অতঃপর দেশীয় নৃপতিগণ দত্তকপুত্র গ্রহণ করিতে পারিবেন। তাহাদের সহিত সম্পাদিত সন্ধিসমূহ মান্য করা হইবে।

 (৫) ঘােষণায় বলা হইল যে, একমাত্র ব্রিটিশ নাগরিক ও প্রজাদের হত্যাকাণ্ডের সহিত কেপূহ গ্রহণ: সন্ধির প্রতি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিগণ ভিন্ন অপর সকলকে মুক্তি দেওয়া হইবে। (৬) জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গুণানুযায়ী ভারতবাসীকে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত করা হইবে।

 (৭) কাহারও ধর্মবিশ্বাস ও বভিন্ন স্বাগাস প্রদান আচার-অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করা হইবে না। বিচার ব্যবস্থায় ভারতীয় প্রাচীন রীতি-নীতিতে শ্রদ্ধা দেখান হইবে।

 

ঘােষণায় এই সকল কথা বলা হইলেও ইংরাজগণ একথা ভুলিতে পারিল না যে, ভারতবাসীর সহিত তাহাদের ব্যবধান যথেষ্ট বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাইবে। তাই কোন ভবিষ্যৎ অভ্যুত্থানকে অসম্ভব করিবার জন্য তাহারা আরও কতকগুলি ব্যবস্থা অবলম্বন করিল।

 (৮) সমস্ত দেশবাসীর ঐক্য যাহাতে সম্ভব না ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য বিদ্রোহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; বিভেদ-নীতি হয়, তাহারই জন্য সাম্রাজ্যবাদী বিভেদনীতি প্রয়ােগ করিবার সিদ্ধান্ত হইল। সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ রােপণের চেষ্টা শুরু হইল। 

(৯) ভারতে ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হইল; গােলন্দাজবাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়ােগ বন্ধ করা হইল; যাবতীয় দায়িত্বমূলক কার্যে কেবলমাত্র ইংরাজ কর্মচারী নিয়ােগের নীতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হইল এবং ভারতীয় সৈনিকদের মধ্যে বিভাগ ও বিভেদ’ নীতি প্রয়ােগ করিয়া, হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়া রাখিবার ব্যবস্থা হইল। তাহা ছাড়াও বেতনভুক, দেশপ্রেমরহিত একদল সৈন্য সৃষ্টি করিবার সামরিক ক্ষেত্রে সতর্কতা জন্য তাহারা দেশবাসীর কয়েকটি শ্রেণীকে কৃত্রিমভাবে সামরিক (Martial) আখ্যা দিয়া কেবলমাত্র তাহাদের মধ্যে হইতেই সৈন্য ভর্তি করিবার নীতি গ্রহণ করিল।শাসনক্ষেত্রে সংস্কার : দেশের শাসনব্যবস্থাকে আরও উন্নত করিবার চেষ্টা হইল। 

(১০) পূর্বের কেন্দ্রীয়করণনীতি পরিত্যাগ করিয়া ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে নূতন কাউন্সিল এ্যাক্ট (Council Act) দ্বারা মাদ্রাজ ও বােম্বাই কাউন্সিলগুলিতে আইন-প্রণয়নের ক্ষমতা ফিরাইয়া আইনসভায় বে-সরকারী সদস্য দেওয়া হইল। ভারতের নূতন আইন-সভা গঠিত হইল এবং ইংরাজদের অনুগত কিছু রাজা-মহারাজাকে এই আইনসভায় বে-সরকারী সভ্যরূপে গ্রহণ করা হইল।

 

(১১) ইংরাজ প্রবর্তিত কয়েকটি সংস্কারমূলক কাজ ১৮৫৭ খ্ৰীষ্টাব্দের বিদ্রোহের জন্য কিছুটা দায়ী মনে করিয়া অতঃপর ইংরাজ সরকার সর্বপ্রথম সংস্কার সংস্কারের পথ পরিত্যক্ত ক্ষেত্রে একপ্রকার প্রতিক্রিয়াশীল পথই গ্রহণ করিল। ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহের পর অনিশ্চয়তার আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হইয়া গিয়াছিল, অনেক অনিশ্চয়তার অবসান হইয়াছিল। 

  ইহার পর হইতে ভারত-ইতিহাসে এক নূতন পর্যায় আরম্ভ হইল; ভারতবাসী নূতন ভাবে সাম্রাজ্যবাদীর বিরােধিতা আরম্ভ করিল। ব্রিটিশ শাসকবর্গের সাম্রাজ্যবাদী আচরণে শাসক ও শাসিতের মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান বৃদ্ধি পাইল। মধ্যবিত্তশ্রেণী বিদেশী শাসনের বৈষম্যমূলক চরিত্র সম্পর্কে সচেতন হইয়া উঠিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথে অগ্রসর হইল। এইভাবে, ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের বিদ্রোহ পরবর্তী কালে ভারতে জাতীয়তাবাদের বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়াছিল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *