প্রবন্ধ রচনা একটি গাছ, একটি প্রাণ / পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা

 প্রবন্ধ রচনা একটি গাছ, একটি প্রাণ / পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা

 

 

বাংলা প্রবন্ধ রচনা একটি গাছ, একটি প্রাণ

প্রবন্ধ-রচনা-একটি-গাছ-একটি-প্রাণ-পরিবেশ-উন্নয়নে-ছাত্রছাত্রীদের-ভূমিকা

 

* ভূমিকা : : মানবসভ্যতার উন্মেষদ্বার মুক্ত করেছে অরণ্য। তার স্নেহশীতল ছায়া, কোমল স্নেহাঙ্ক, উদার-প্রশান্ত পরিবেশ, প্রাণদ শ্যামলতা মানুষকে দিয়েছে আদি আশ্রয়, দিয়েছে বিচরণক্ষেত্র, দিয়েছে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণের ফলমূল, বসনের বল্কল, অলংকরণের পুষ্পসম্ভার, যজ্ঞের সমিধ, পরবর্তীকালে বাসগৃহের উপাদান কাঠ-লতা-পাতা, আসবাবপত্রের প্রয়ােজনীয় কাষ্ঠরাজি। ভারতের বৈদিক সভ্যতা ছিল প্রধানত অরণ্যকেন্দ্রিক। রাজালয়ের উপকণ্ঠ থেকে পােবন পর্যন্ত ছিল অরণ্যের বিস্তার। ঋষিদের আশ্রম ও সাধনক্ষেত্র ছিল তপােবন রামায়ণ-মহাভারতের নানা ঘটনা ও কাহিনির মধ্যেও অমর হয়ে আছে পঞ্চবটী, দণ্ডকারণ্য।

 

অরণ্যের উচ্ছেদ অথচ অরণ্য মানুষের পরম বন্ধু। 

 পুরাকালে পৃথিবীর স্থলভাগের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ ছিল অরণ্যাবৃত। লােকবসতির বিস্তার, কৃষি ও শিল্পের প্রসারের ফলে অরণ্য-উচ্ছেদের কাজে কোমর বেঁধে কুঠার ধরল মানুষ। হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত ভূখণ্ডের বনস্পতির দল প্রাণ দিল নিষ্ঠুর পরশুরামদের হাতে। যে অরণ্য শেষাবধি পরিত্রাণ পেয়ে আপন অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারল, বর্তমানে তার পরিমাণ হলাে পৃথিবীর মােট স্থলভাগের শতকরা ২৭ ভাগ মাত্র। অপরিণামদর্শী মানুষ জানে না কী অপূরণীয় ক্ষতি করেছে সে। উদ্ভিদ মানুষের পরম বন্ধু, পরমাত্মীয়। একটি গাছ, একটি প্রাণ। হয়তাে তারও বেশি। প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় অরণ্য বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ দেয় বাড়িয়ে। হয় বৃষ্টি। দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইডকে শুষে নিয়ে দেয় প্রাণের অপরিহার্য অক্সিজেন। অরণ্য ঝড়ের গতিবেগকে করে প্রতিহত, মরুভূমির সম্ভাবনা ও প্রসারকে করে প্রতিরােধ, জৈবপদার্থ সংযােজনায় মৃত্তিকাকে করে উর্বর। ভূমিক্ষয় নিবারণ, বন্যারােধ প্রভৃতি মানবকল্যাণকর কাজেও তার অবদান অতুলনীয়। তা ছাড়া বনভূমি থেকে আমরা পাই না, রজন, লাক্ষা, গদ, রবার, কুইনাইন, কপূর, মােম, মধু প্রভৃতি। ভেষজ ওষুধের উপাদান হিসেবে কত গাছগাছড়াই না ব্যবহৃত হয়। অথচ আমরা কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের দল স্বার্থসিদ্ধির জঘন্য অরণ্যকে করছি উচ্ছেদ।

 

বৃক্ষরোপণ মহোৎসব:

ক্রমবর্ধমানঅরণ্য ভয়াবহ পরিণাম হতে পারে, সে-কথা ভেবেই কল্যাণকামী মানুষ গুরুত্ব দিয়েছে বৃক্ষরােপণ ও বনসংরক্ষণের ওপর। বৃক্ষরােপণের

কার্যক্রমই ‘বনমহােৎসব’ নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে আশ্রমবাসীদের নিয়ে বর্ষায় সাড়ম্বরে বৃক্ষরােপণ তথা বনমহােৎসব পালন করতেন। সরকারিভাবে ভারতে বনমহােৎসবের সূচনা হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। সেই অবধি প্রতি বছর সপ্তাহকালব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বৃক্ষরােপণ করে এই উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে সারা ভারতে। ভারতের মােট ভূভাগের শতকরা প্রায় কুড়ি ভাগ অরণ্য। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ১৯৫২ ২ খ্রিস্টাব্দে ভারতে অরণ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে নীতি গৃহীত হয়, তা হলাে মােট আয়তনের শতকরা ৩৩.৩ ভাগকে অরণ্য অঞ্চলে পরিণত করার পরিকল্পনা, অর্থাৎ মােট আয়তনের একের তৃতীয়াংশ হবে অরণ্যভূমি। এই লক্ষ্যমাত্রাকে কার্যকরী করবার অভিপ্রায়ে পঞ্চবার্ষিকী প্রকল্পগুলির ওপর গুরুত্ব দেওয়া ২ হয় ; এবং লক্ষ লক্ষ গাছের চারা রােপণ করা হয় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে।

 

: বনসংরক্ষণ ও বন সংরক্ষণের জন্য পালনীয়ু ব্যবস্থা: 

 কিন্তু গাছ লাগালেই গাছ হয় না। তার য-পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাদি না থাকলে অকালমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তা ছাড়া পুরােনাে অরণ্যরাজির যওে সংরক্ষণাদি প্রয়ােজন। অর্থ ব্যয় করলেই অরণ্য সম্প্রসারণ, অরণ্য সংরক্ষণের লক্ষ ও উদ্দেশ্য সার্থকভাবে রূপায়িত হতে পারে না। এই উদ্দেশ্যে দরকার একদিকে বনভূমি সৃজনের, অপরদিকে কঠোর হস্তে অরণ্য-উচ্ছেদের অপপ্রয়ােগকে নিয়ন্ত্রণ করা। কয়েকটি পালনীয় ব্যবস্থার কথা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়। এক  অরণ্যের অবাধ ও যথেচ্ছ উচ্ছেদ নিবারণ। দুই – নতুন চারাগাছ লাগানাে এবং তার প্রয়ােজনীয় পরিচর্যা। তিন – কেবল পরিণত বৃক্ষছেদন, অপরিণত বৃক্ষছেদন যাতে না হয়, আইন করে তা নিষিদ্ধ করা। চার – নতুন বনভূমিতে পশুচারণ নিষিদ্ধ  করা। পাঁচ – দাবানলের গ্রাস থেকে অরণ্যকে রক্ষা করা। ছয় – কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। সাত © অরণ্যগবেষণার প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা করা।

 

প্রবন্ধ রচনা একটি গাছ, একটি প্রাণ উপসংহার : 

 লৌহ-লােষ্ট্র-প্রস্তরের কৃত্রিম নাগরিক জীবনের অভিশাপ থেকে মানুষ বােধ করি মুক্তি পেতে চায়, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর’। নগরজীবনকে বর্জন করে অরণ্য ফিরে পাওয়া মানুষের পক্ষে আজ আর সম্ভব নয়। তবে অরণ্যের পুণ্যচ্ছায়া একটু চেষ্টা করলেই সে পেতে পারে। ঘরের আঙিনায়, আশপাশে, চলার পথের ধারে, পার্কে-হাটে-বাজারের উপকণ্ঠে সে যদি আদিম বন্ধু উদ্ভিদকে রােপণ করে, সস্নেহে পরিচর্যায় পত্রপুষ্পে সুশােভিত হতে দেয়, ওই আদি, অকৃত্রিম বন্ধুই কৃত্রিমতার অভিশাপকে মুছে দিয়ে দেবে সঞ্জীবনী প্রাণদ বায়ু, দেবে পরম শান্তি, আর্থিক সমৃদ্ধি।

 

প্রবন্ধ রচনা পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা 

 

ভূমিকা : পণ্ডিতেরা বলছেন আমরা পৃথিবীর যে পরিবেশে বাস করছি তা গড়ে উঠতে নাকি সময় লেগেছে প্রায় পাঁচশাে কোটি বছর। পরিবেশের উপাদানগুলি প্রধানত দু-ভাগ, জড় ও জীব। জল, মাটি, আলাে, বাতাস, উন্নতা, আদ্রর্তা ইত্যাদি জড়, আর গাছপালা, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু ও মানুষ হল জীব। তাহলে আমরা মানুষেরাও প্রকৃতির অঙ্গ তথা পরিবেশের অন্যতম উপাদান মজার ব্যাপার হল সেই মানুষ যবে থেকে পরিবেশের দাস না হয়ে প্রভু হয়ে বসেছে, তখন থেকে পরিবেশের অঙ্গে শুরু হয়েছে দূষণজনিত পচনক্রিয়া। পরিবেশের ওপর খবরদারির প্রথম শক্তি হল আগুন। মানুষের হাতে এ শক্তি আসতেই তার ধূম্রজালে দূষণের সূচনা হয়েছিল। তারপর বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি ও পারমাণবিক শক্তির হাত ধরে মানুষ যত শক্তিমান হতে লাগল, পাল্লা দিয়ে যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশ হতে থাকল, আমাদের পালয়িত্রী বসুন্ধরাও তত দৃণভরে হতে থাকল জর্জরিত।

 

শহরের দূষিত পরিবেশ এ তাে গেল বৃহত্তর পার্থিব পরিবেশের কথা। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আশেপাশে যে পরিমণ্ডল, যার কোলে আমাদের দিনের চব্বিশ ঘণ্টা কাটে, তার

 

দূষণক্লিষ্ট দৈন্যদশাও তাে উপেক্ষা করার মতাে নয়। প্রথমে দেখা যাক শহুরে মানুষের পরিবেশ জীবনের ছবিখানা। বাড়ির পাশের নর্দমা, নইলে আবর্জনার স্তৃপ, যা শুধু দুর্গন্ধই ছড়াচ্ছে না, নানা সংক্রামক ব্যাধিরও সূতিকাগৃহ, যার বাহন মশককুল, মাছিবাহিত নানা রােগের উৎসও বটে। বিশুদ্ধ বাতাস ও স্বচ্ছন্দচারী আলাের অপ্রাচুর্য কত রকম জটিল ব্যাধির কারণ। তা ছাড়া আছে যানবাহন কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, আর কান-ফাটানাে অবিরাম আওয়াজ, যা এককথায় প্রাণঘাতী। একান্তই প্রাণ হননকারী।

 

গ্রাম-গঞ্জে দূষণেৱ ছবি : 

 আর গ্রাম-গঞ্জের ছবি ? সেখানে পানীয় জল প্রায়শ আর্সেনিক যুক্ত। পুকুর-ডােবা পাঁক আর পানায় ভরা, মশামাছির রাজ্য। যত্রতত্র মলমূত্রের ছড়াছড়ি। বৃষ্টির জলে তা মিশে পুকুরের জল হয় অব্যবহার্য। তা ছাড়া আছে নানা উৎসবঅনুষ্ঠান, মেলা, পুজো-পার্বণ উপলক্ষ্যে মাইকের বিরামহীন গগনভেদী আওয়াজ।

 

পরিবেশ শিক্ষার বাস্তবায়ন : 

 শহরে ও গ্রামে-গঞ্জে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উন্নয়নে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেই পারে। শহরে ও গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্রই বিদ্যার্থীরা আছে। আনন্দের কথা, স্কুল পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পরিবেশ শিক্ষা এখন পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা পবিবেশ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের ফিল্ড ওয়ার্ক ও সমীক্ষার কাজও করছে। ফলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষা ও সচেতনতা লাভ করছে শিক্ষার্থীরা। তাদের শিক্ষা ও সচেতনতার আলােকে আমজনতাকে ঋদ্ধ করবে এটাই কাঙ্ক্ষিত। তাদের লন্ধ শিক্ষা হবে বাস্তবায়িত।

 

পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা :

  ছুটি ছাটায়, পরীক্ষা দেওয়ার পরে দীর্ঘ অবকাশে ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ সুরক্ষায় অগ্রণী হতে পারে। শহরে নর্দমা ও আবর্জনা পরিষ্কারের কাজে, বিশুদ্ধ জল সরবরাহে, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরােধের জন্য পুরসভার সহায়তায় তারা কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। গ্রামে-গঞ্জের ছাত্ররা দূষণমুক্ত পরিবেশ সম্পর্কে গ্রামের মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে পারে। পুকুর-ডােবা পরিষ্কার করা, পথঘাট আবর্জনামুক্ত করা, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ না করা—এসব বিষয়ে মানুষকে বুঝিয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে । :

 

প্রবন্ধ রচনা পরিবেশ উন্নয়নে ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা উপসংহার :

  আসলে দূষণমুক্ত পরিবেশই তাে প্রকৃত বাসযােগ্য ভূমি। রােগমুক্ত সুস্থ সুঠাম দেহ ও আনন্দোজ্জ্বল পরমায়ু দিতে পারে যথার্থ বাসযােগ্য পরিবেশ। বাসযােগ্য পরিবেশ গড়ার অঙ্গীকার হতে পারে সেইসব মানুষের, যাদের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে বােধ ও সচেতনতার ভিত পাকাপােক্তভাবে গড়ে উঠেছে। এই গঠনকাজে ছাত্রছাত্রীদের দায়বদ্ধতা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *