গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও পরিবেশের সংকট এবং বিশ্ব পরিবেশভাবনা বাংলা রচনা

 গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও পরিবেশের সংকট এবং বিশ্ব পরিবেশভাবনা বাংলা রচনা

 

      গ্লোবাল ওয়ার্মিং

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও পরিবেশের সংকট

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ভূমিকা : মানবসভ্যতার ইতিহাস সুদীর্ঘ নয়। মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার বছরের।উর্বর মস্তিষ্কের মানুষ যেদিন থেকে পরিবেশের সুবিস্তৃত প্রাণীজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আপন ভােগ সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজস্ব সুসভ্য জীবনের ইমারত গড়ার কাজে কোমর বেঁধে লেগেছে, সেদিন থেকে পরিবেশের ওপর শুরু হয়েছে অত্যাচারের করাঘাত। প্রথমে তা মৃদুমাত্রায় হলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ওস্তাদ হয়ে ওঠা মানুষ যখন বিশ্বজয়ের মরিয়া চেষ্টায় উন্মত্ত হয়ে উঠল, তখন থেকে অত্যাচারিত পরিবেশের উঠল নাভিশ্বাস। বিগত একশাে বছরে অপরিণামদর্শী মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত অপকর্মে পরিবেশ শুধু লন্ডভন্ডই হয়নি, মানুষ ও তার গড়ে-তােলা সভ্যতা চরম সংকটের মুখােমুখি হয়েছে।

গ্লোবাল-ওয়ার্মিং-ও-পরিবেশের-সংকট-এবং-বিশ্ব-পরিবেশভাবনা-বাংলা-রচনা

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি:

 

পৃথিবীৱ উষ্ণতা বৃদ্ধি : লক্ষণীয় যে, পরিবেশগত বহুবিধ সমস্যার অন্যতম হল গ্লোবাল ওয়ার্মিং তথা পৃথিবীর উষ্ণতা, যা ক্রমবর্ধমান। উষ্ণতা বৃদ্ধির হার দ্রুততর না হলেও উপেক্ষা করার মতাে আদৌ নয়। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায় প্রকাশ যে, মাত্র তিরিশ বছরে পৃথিবীর মেরুপ্রদেশের তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই হারে বৃদ্ধি ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছালে তার পরিণাম যে কী ভয়াবহ হতে পারে, বিজ্ঞানীরা তারও হুঁশিয়ারি শুনিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। সেই পরিণামের কথায় আসার আগে দেখে নেওয়া যাক পৃথিবী কীভাবে ও কেন ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে।

 

উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ :

পৃথিবী যে ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তা স্পষ্টত ধরা পড়ে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে বিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায়। এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার জন্য অন্য । কিছু নয়, পরিবেশকে বুড়াে আঙুল দেখিয়ে ভােগ-সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে আকণ্ঠলিপ্ত মানুষই দায়ী। শক্তি হিসেবে তেল ও কয়লার যথেচ্ছ ব্যবহার পৃথিবীকে ক্রমাগত উষ্ণ করছে। বাতাসে বিপুল পরিমাণে মিশছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। উষ্ণতা বৃদ্ধির আর-এক কারণ গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহ, যা মানুষের সৃষ্টি। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রধান অংশ হল কার্বন ডাইঅক্সাইড, তা ছাড়া ক্লোরােফ্লুরােকার্বন, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ওজোন ও জলীয় বাষ্প।

  এগুলিকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয় এই কারণে যে, এগুলি ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপরশ্মিকে শােষণ করে অথচ তাপরশ্মিকে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয় না, সহজ কথায়, চেপে রাখে ।  গ্রিনহাউস গ্যাস বাইরে বেরােতে পারছে না ; তা ছাড়া কাঠ, কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতি যত পুড়ছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ উত্তরােত্তর বাড়ছে। গ্যাসসমূহকে কমানাের যে পার্থিব ও প্রকৃতিগত নিয়ম ছিল তা একদিকে যেমন ভেঙে তছনছ হচ্ছে, অপরদিকে তেমনি বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর জন্য উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কি কি ঘটতে পারে:

 

উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে কী কী ঘটতে পারে :

দানবরূপী গ্রিনহাউস গ্যাসের উদ্যত থাবা যে কী ভয়ংকর, তার হদিস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রসঙ্গে কিছু সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যানে আসি। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা যে হিসাব দাখিল করেছিলেন, তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, ওই বছরই পৃথিবীর বাতাসকে মানুষ উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছে ৭০০ কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। 

 অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জমা পড়েছে ১৭ হাজার কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। এভাবে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকলে বিজ্ঞানীদের অনুমান, আগামী ২০৫০ খ্রিস্টাব্দে তা দ্বিগুণে গিয়ে দাঁড়াবে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা সেই হারে বৃদ্ধি পাবে বলাই বাহুল্য। ফলে তার সম্ভাব্য পরিণাম কী হতে পারে ? মেরুপ্রদেশের ৮০ শতাংশ বরফ গলে যাবে। ইতিমধ্যে উত্তর মহাসাগরের ৪০ শতাংশ বরফ গলে গেছে। হিমালয়ের হিমবাহ অনেকখানি করে গলে গিয়ে হিমরেখা হয়েছে উধ্বগামী। বরফগলা জলে সমুদ্রে প্রতিবছর গড়ে ২ সেমি করে জলস্ফীতি ঘটছে। জলস্ফীতির হার এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ মিটারের বেশি উঁচু হবে এবং তাতে বহু দ্বীপ ও উপকূল অঞ্চল নিমজ্জিত হবে। তা ছাড়া আর কী কী ঘটতে পারে ? 

 এক ও সমতল অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ কমায় খরা ও পার্বত্য অঞ্চলে অতিবর্ষণের ফলে ভয়াবহ বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা। দুই * উন্নতার বৃদ্ধি বিগত সব রেকর্ডকে অতিক্রম করে যাবে। তিন * পােকামাকড়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটবে। চার * নতুন নতুন রােগের প্রকোপ বাড়বে। পাঁচ* পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। ছয়* সাগরজলের স্ফীতির কারণে পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মানুষ বাস্তুহারা হবে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বাড়বে।সাইক্লোন, টাইফুন, হারিকেন, | টর্নেডাে প্রভৃতি ঝড়ের প্রাবল্য বাড়বে। অটি আবহাওয়ার ঘন  ঘন পরিবর্তন দেখা যাবে। এভাবে বহুবিধ কুফলের মুখােমুখি হতে পারে মানবসমাজ ও তার বহু শ্ৰমার্জিত সভ্যতা।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও পরিবেশের সংকট মানুষের করণীয় কি:

 

. মানুষের করণীয় কী: সংকটাপন্ন পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের কী উপায় হতে পারে? পরিত্রাণের উপায় মানুষের হাতেই ন্যস্ত, কারণ, মানুষের অপরিণামদর্শিতা ও অবিবেচনাপ্রসূত কাজকর্ম ওই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী। তাহলে মানুষের করণীয় কী হতে পারে ? 

 প্রথমত, ও প্রাণঘাতী যতরকমের আগ্নেয় ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির কলকারখানা আছে, মানুষ সেগুলি বন্ধ করবে। দ্বিতীয়ত, * জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ অরণ্য সংরক্ষণ ও অরণ্য সম্প্রসারণের কাজে অগ্রণী হবে। কারণ, অরণ্যই হল পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান উম্লতা হ্রাসের সবচেয়ে বড় পরিত্রাতা। তৃতীয়ত, * গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উষ্ণতা বৃদ্ধির উৎসকে প্রতিরােধ করা। চতুর্থত, উধ্বাকাশে ওজোনস্তরে যে ভয়াবহ ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা মেরামতে সচেষ্ট হওয়া ইত্যাদি।

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও পরিবেশ সংকট উপসংহার

 

উপসংহার : সর্বাগ্রে আরও একটি সক্রিয় পদক্ষেপ দরকার, তা হলাে শিক্ষা ও পরিবেশসচেতনতার বিশ্বব্যাপী সার্বিক প্রসার। শিক্ষা দেবে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও পরিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা। মানুষ পরিবেশ ও পরিবেশের উপযােগিতা সম্পর্কে সচেতন হলে, অজ্ঞতাজনিত অপরিণামদর্শিতা দূর হবে, অপকর্মের অবলােপ হবে। তার শুভ বােধবুদ্ধির জাগরণ ও প্রয়ােগের মাধ্যমে সুস্থ ও শুদ্ধ পরিবেশ হবে মানুষের যথাযােগ্য বাসভূমি। 

 

বিশ্ব পরিবেশভাবনা বাংলা রচনা

 

বিশ্ব পরিবেশভাবনা 

ভূমিকা : আমাদের পালয়িত্রী জননী বসুন্ধরা ভালাে নেই। দূষণভারে ক্রমশ জর্জরিত। ক্রমশ এগােচ্ছে কঠিন অসুস্থতার দিকে। তার মরাবাঁচার প্রশ্নে কল্যাণেচ্ছু বিশ্বজনমানস উদবিগ্ন, চিন্তাকুল। আর সেজন্যেই রব উঠেছে ‘বসুন্ধরা বাঁচাও, সুস্থ পৃথিবীতে ও দূষণমুক্ত পরিবেশে আগামী প্রজন্মের মানুষকে বেঁচেবর্তে থাকার।

 

 বৈঠকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য :

 অতবড়াে অঙ্গীকার না হলেও বিশ্ব পরিবেশভাবনা নিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম শহর রিও-ডি-জেনেইরােতে মিলিত হয়েছিল একশাে ছেষট্টিটি দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি মিলে প্রায় পনেরাে সহস্রাধিক মানুষ। বিশ্বপরিবেশ নিয়ে এতবড়াে সম্মেলন আগে কখনও হয়নি, পরে হতেও দেখা যায়নি। এ ছিল পরিবেশবিষয়ক ঐতিহাসিক বিশ্বসম্মেলন। উদ্যোক্তা ছিল রাষ্ট্রসংঘ। তার মধ্যে ছােটো-বড়াে, ধনী-দরিদ্র, উন্নত-অনুন্নত সকল রকম দেশের শীর্ষস্থানীয় দেশনায়কেরাও ছিলেন। সেজন্যে রিও বসুন্ধরা বৈঠককে ‘আর্থ সামিট’ বা ‘ভূমণ্ডল শীর্ষ বৈঠক’ নামে অভিহিত করলে বােধকরি বেশি বলা হয় না। যাই হােক, এ বৈঠকের সূচনা হয়েছিল ৩ জুন ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে এবং চলে একটানা বারাে দিন ধরে। বিশ্বপরিবেশ নিয়ে বিস্তৃত আলােচনা, দূষণ প্রতিরােধের ভাবনাচিন্তা, পথানুসন্ধান, প্রতিকার পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে ২১ দফা প্রস্তাব তথা ‘অ্যাজেন্ডা-২১’ স্বাক্ষরিত হওয়াই ছিল এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।

 

পরিবেশদূষণের কারণ : 

 অসুস্থ বিশ্বপরিবেশের জন্যে প্রকৃতপক্ষে মানুষই দায়ী। নির্বিচারে অরণ্য উচ্ছেদের কাজে অবিবেচক মানুষের হাতে উঠেছে পরশুরামের নিষ্ঠুর কুঠার। অরণ্যের বিস্তার কমতে কমতে পৃথিবীর মােট ভূভাগের পঞ্চাশ শতাংশ জুড়ে বনাঞ্চল দাঁড়িয়েছে মাত্র পঁয়ত্রিশ শতাংশে। পরিবেশের ভারসাম্য বিচ্যুতির এটি অন্যতম কারণ। তা ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন কাজে, কলকারখানায়, যানবাহনে প্রতিদিন পুড়ছে তেল, কয়লা, জ্বালানি কাঠ, তার ফলে ভূপরিমণ্ডলে বাড়ছে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ। বিজ্ঞানীদের অভিমত, ইতিমধ্যে দু-হাজার কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড জমেছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। এর ৭৭ শতাংশ জ্বালানি পােড়ানাের জন্য এবং বাকি ২৩ শতাংশ অরণ্য উচ্ছেদের ফলে। পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলের তাপ যে বাড়ছে, তারও প্রধান কারণ কার্বন ডাইঅক্সাইড । জলাভূমিতে জাত মিথেন গ্যাসও পৃথিবীর তাপবৃদ্ধির তান্যতম কারণ। 

 

দূষণের ফল : 

বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের সংযােজনে বায়ুদূষণের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে ছাতার মতাে প্রসারিত ওজোন স্তরে ছিদ্র দেখা দিয়েছে। সূর্যের প্রাণঘাতী অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রাভায়ােলেট রে থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করছে ওজোনস্তর। এই স্তরের ঘনত্ব কমে যাওয়া বা ছিদ্রে ভরে যাওয়ার অর্থ অতিবেগুনি রশ্মির আঘাতে পৃথিবীর ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করা। অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে চোখের দৃষ্টি নষ্ট হবে, ত্বকে ক্যানসার ছড়াবে, রােগপ্রতিরােধের ক্ষমতা কমবে, গাছের সালােকসংশ্লেষের শক্তি হ্রাস পাবে, কমবে শস্য ও মাছের উৎপাদন।

 

 উপসংহার : 

কোনাে সম্মেলনই কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে পূর্ণ করে না। রিও বৈঠকের সাফল্য সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। তবে পরিবেশ সম্পর্কে শীর্ষস্থানীয় ৬৫ জন রাষ্ট্রনায়কের ভাষণ এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। পরিবেশ নিয়ে এমন ভাবনা এর 1 আগে নিখিল বিশ্বের মানুষ এমন করে একসঙ্গে ভাবেনি। এ ভাবনা ব্যর্থ হতে পারে না। এত ঠেকেও বিশ্ববাসী সজাগ না হলে তার পরিণাম তাদেরই ভােগ করতে হবে। রাষ্ট্রপুঞ্জের তৎকালীন মহাসচিব বুত্রোস ঘালির কথাই যথার্থ  ‘দূষণের ঋণ শুধতে হবে দূষণকারীকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *